মাসুদ খান, কবি, লেখক, অনুবাদক। জন্ম ২৯ মে ১৯৫৯, জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলালে। পৈতৃক নিবাস সিরাজগঞ্জ। প্রকৌশলবিদ্যায় স্নাতক, ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর। তড়িৎ ও ইলেকট্রন প্রকৌশলী। বর্তমানে কানাডায় বসবাস। শিক্ষকতা করেন টরন্টোর একটি কলেজে। প্রকাশিত বই: ১.পাখিতীর্থদিনে (১৯৯৩, পুনঃপ্রকাশ ২০১৯) ২.নদীকূলে করি বাস (২০০১) ৩. সরাইখানা ও হারানো মানুষ (২০০৬) ৪.আঁধারতমা আলোকরূপে তোমায় আমি জানি (২০১১) ৫. এই ধীর কমলাপ্রবণ সন্ধ্যায় (২০১৪) ৬. দেহ-অতিরিক্ত জ্বর (২০১৫) ৭. প্রজাপতি ও জংলি ফুলের উপাখ্যান (২০১৬) ৮. প্রসন্ন দ্বীপদেশ (২০১৮) ৯.গদ্যগুচ্ছ (২০১৮) ১০.শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০১৮) ১১. পাখপাখালির গান পাগলাঝোরার তান (২০১৯) ১২. ঊর্মিকুমার ঘাটে (২০২০) ১৩.দুঃস্বপ্নের মধ্যপর্ব (প্রকাশিতব্য, ২০২২)
১. নদীকূলে করি বাস
কন্যা বারবার ঘুমিয়ে পড়ছে নদীতীরে
আজ সকাল থেকেই।
বারবার কেন ঘুমিয়ে পড়ছে?
যদিও নদীকূলেই বাস চিরদিন আমাদের,
একেবারে নদীতীরে নয়, একটু দূরে।
তবে কি বিশ্বের সব বিস্ময়ের শুরু এই ঘুমবিন্দু থেকে?
২. প্রাচ্যবচন
সকল উদ্বৃত্ত নিদ্রা আর আচ্ছন্নতা
পরিত্যাগ করে কন্যা একসময় গাত্রোত্থান করবে,
সকন্যা আমাদের উজ্জ্বল গৃহযাত্রা হবে--
সেই দুর্মর অভিলাষ ঘিরে এই সাধ্যসাধনা নিরন্তর।
ওই যাহ্! কন্যা আবার ঘুমিয়ে গেল!
আর আমিও এই বসে পড়লাম লালধূলি নদীতীরে
কন্যাজাগরণ সাধনায়।
৩. প্রথম অধিকরণ-- ঊর্মিকুমার ঘাট, পয়লা বৈশাখ, ১৩৯৯ সাল
কন্যা ঘুমিয়ে পড়ে নদীকূলে আজ ঊর্মিকুমার ঘাটে
আজ শুধু একটি বৃক্ষ নদীতীরে-- একা আর হরীতকী।
৪. সাধ্যসাধনা
আগুনে আকাশ আজ সারাদিন দোহন করেছে মৃত্তিকাকে।
বেলা পড়ে আসে
কত নিদ্রা যাও রে কন্যা...
গাত্রোত্থান করো
বাসকপাতা ধরে ধীরে উঠে এসো।
রৌদ্রস্রোতে আহা রূপ ধুয়ে যায় নিরন্তর
এইবেলা চলো গৃহে যাই ফিরে।
৫. সাধ্যসাধনা
তোমাকে বিধৃত করে থাকে
অশেষ-ছড়ানো দুপুরের ঘন ক্ষীরমাখানো হরিতকী ফলের প্রচ্ছায়া
বহু নিচে অকথ্য অসহ আন্দোলন,
নিচে ধীর বহমান জীবাশ্ম জ্বালানি, ম্যাঙ্গানিজ।
তবু
কত নিদ্রা যাও রে কন্যা...
জাগো, জাগো একটুখানি।
৬. পৌনঃপুনিক
পুনশ্চ ঘুমিয়ে পড়ে কন্যা নদীকূলে, ঊর্মিকুমার ঘাটে।
৭. সাধ্যসাধনা
এইমাত্র শেষ দোহনপর্যায়।
ফেনা-উৎসবে, এখনই, উপচানো সার-সার গোলাকার মাটির বালতি।
পৃথিবীর সব পাখি আজ ভিজে যাবে বালতিতে বালতিতে,
দণ্ডিত সারসসমেত (একেন পাদেন তিষ্ঠন্তম)--
চঞ্চু চঞ্চু থেকে ফেনা, সঙ্গে ত্রাহিধ্বনির তুঙ্গ মড্যুলেশন, ছিটাতে ছিটাতে।
দূর চক্রবালে ওই গোল দেয়ালে দেয়ালে
অযথাই জাগছে বৃষের পুরীষপিঠা
কোটি-কোটি গুটিবসন্তের আকারে
আচমকা, ঝলকে ঝলকে।
পালাই,
ছড়ানো সকল তৃষ্ণারেখা গুটিয়ে নিয়ে
চলো কন্যা পলিয়ে যাই এইবেলা নদীতীর থেকে।
৮. যখন ঘুমের ছায়া পড়ে নদীর ওপারে, ঘাসে
তোমার ঘুমের কাঁপা-কাঁপা ছায়া শুষে
স্ফীত হয় ওই বৃষের ককুদ, নদীর ওপারে, ঘাসে।
নিদ্রা
এমন দক্ষিণাদিনে আজ
এই দেহ থেকে গোল-গোলাকৃতি চতুষ্কোণ
কত ধ্বনি বিকীর্ণ উপর্যুপরি--
প্রতিটি ধ্বনির সঙ্গে প্রবল মোচিত হচ্ছে প্রাণ
একটু একটু করে প্রতিবার, আর
এই রাংতারঙের রাত্রিতে যারা জীব,
তারা জানে, এই ধ্বনি কী জিনিশ! কী যে অবস্তু-অতীত!
এই ধ্বনি মৃদু-মৃদু, বাগর্থেরও অধিক উত্তরে,
আজকের রাত্রিতে যেখানে যত অন্নময় ও ইলিশময় জৈবকোষ আছে
তাদের সবার সূক্ষ্ম তুঙ্গ হর্ষধ্বনিরও অতীত এই ধ্বনি।
আর
সব ধ্বনিই আসলে চূড়ান্ত। তুঙ্গ পুলকজনিত।
এই ধ্বনি মৃদু-মৃদু, বাগর্থেরও অধিক উত্তরে,
আজকের রাত্রির সমস্ত অন্নময় ও ইলিশময়
জীবানন্দ কোষের অতীত।
আজ রজনীতে যারা জীব আছো, অবশিষ্ট হয়ে আছো,
ঘুমিয়ে পড়ছ ঝুপঝুপ করে একে একে
একটি বাতাস ছাড়া অন্যসব বাতাসেরা রাংতামুড়ি দিয়ে
বেরিয়ে পড়ছে ঝাঁকে, এই বদ্ধ জীব-সীমা পার হয়ে--
ছোট সৎবোনটিকে নির্জন বাড়িতে একা রেখে
যেমন বেড়াতে যায় বোনেরা, আহ্লাদসহ দূরে।
ছোট মেয়ে ভয়ে কাঁপে
ততোধিক কাঁপা-কাঁপা কুপির দীপন আগলে রেখে।
শূন্য
নিখিলের হঠাৎ-বিগড়ে-যাওয়া সে-কোন গোপন সংখ্যামেশিনের থেকে
অচেনা অসুখের মতো, অজ্ঞাত গজবের মতো গলগল করে
বেরিয়ে আসছে সব শূন্য।
সাধের মেশিন থেকে আশা ছিল বেরিয়ে আসবে কত-না বিচিত্র অঙ্ক আর সংখ্যা
আর ভরে যাবে এই দুখিনী দুনিয়া! তা নয়, কেবলই শূন্য।
তা-ও শূন্যগুলি সব দশমিকের ডানে বসা একটানা শূন্যের সিরিজ--
অর্থহীন উদ্বৃত্ত বন্ধ্যা ও হাহুতাশময়।
এক মহামেশিনের বিপুল ববিন থেকে, গোপন ও প্রকাশ্য সব স্লট থেকে
চিরতরে ছাড়া পাওয়া যেইমতো মাইল-মাইলব্যাপী সুতার বহর
সেইমতো এইসব খরস্রোতা শূন্যের নহর...
অন্য কোনো অঙ্ক নাই সংখ্যা নাই শুধু শূন্য উপচে উপচে আসা
লাফাংগার মতো লাফাতে লাফাতে আর গড়াতে গড়াতে আসা
বহরে বহরে পাতা আর পাতার বাহার করতে করতে আসা
ইঁদুর ও ভোঁদড়ের ভঙ্গি ধ’রে লীলা আর লাস্য করতে করতে আসা
চিকা আর চামচিকার মতো হাস্য ও রহস্য করতে করতেই
দিলমে চাক্কুমারা পাগলা ও ভোলাভালা হাক্কু ও হাহাকার করতে করতে আসা
দশমিকের ডানে-বসা কানে-ঠসা কালা-নুলা নেলাফেলা খাটাশ-খবিশ নষ্ট-ভ্রষ্ট
ডাশা-ডাশা যত শূন্যের দল ভয়াবহ শূন্যের কাফেলা............................
আর ওই যে বিকট বেঢপ অতিকায় এক শূন্য,
ওটাই পালের গোদা, আন্ধা-কালা কাফেলাসালার...
এসব কি স্রেফ বিগড়ে-যাওয়া সেই গূঢ় মেশিনের ঋতুবিভ্রাট?
‘দশমিক-পরবর্তী শূন্যের প্রবাহ হয়ে মহাশূন্য ভরে ফেলছে ক্রমে’
এমনিতেই জড়ের দুর্বহ দায়ভার
তদুপরি শূন্যের শাসন, অত্যাচার
কোথায় পালাবে তবে প্রাণ!
প্রাণী সব করে রব, ভয়ে--
বদ্ধ ও তটস্থ প্রাণিকুল
ফাজা আলাহুম কা’স ফিমমাকুল।
ইতিমধ্যেই যে শূন্যস্থানগুলি তৈরি হয়ে আছে
সেগুলো তো পূরণ হচ্ছেই না, বরং তৈরি হচ্ছে নতুন-নতুন শূন্যস্থান
মহাশূন্য আরো মহা শূন্য হচ্ছে।
অবশেষে একসময় শূন্যস্থান দিয়েই, যাহ্, পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে
খসখসে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা, দিনদুনিয়ার।
পাণ্ডবদের দেশে
পাণ্ডববর্জিত, ব্রাত্যজন-অধ্যুষিত জলাজংলা প্রদেশের এক নিরীহ নামাজি
অদ্ভুত বিপাকে পড়ে গেছে আজান দিতে এসে এক অচেনা মুলুকে,
নির্ধারিত মুয়াজ্জিনের অনুপস্থিতিতে।
পায় না কেবলা খুঁজে, পেয়েও হারায় বারবার।
আর দ্যাখে, এই দেশে, এইসব বেগানা প্রদেশে
প্রচুর পাণ্ডব, পালোয়ান। এত যে পাণ্ডব, কিন্তু কেমন যে তারা
জামাত-যৌথতা জানে না, আওয়াজ-কালাম মানে না,
নিয়তের ঠিক নাই, খালি-খালি কলহ করে, বাঁধায় তাণ্ডব
তদুপরি পাদ মারে, পিক ফেলে, নষ্ট করে ওজু ও ইমান।
আরো আছে হরেক কুতুব, কুতুবের অন্ত নাই,
তারা উল্টাপাল্টা ফতোয়া দেয়, এলোপাথাড়ি মছলা-মাছায়েলা ঝাড়ে,
আর শুধু হেদায়েত দেয়, ওয়াজ-নসিয়ত করে
তাতে বাতেনি কথাই বেশি, জাহেরি কম-কম
সিরাতুল মোস্তাকিম বোঝে না, ঘোরানো পথ বোঝে...
নিরীহ মুয়াজ্জিনের এমনিতেই জলাবিলা দশা,
তার ওপর ফের পাণ্ডবেরা, কুতুবেরা হল্লা করে কেবলই টালাতে থাকে নিরীহকে।
মন-খারাপ-করা হাওয়া বয়।
মুয়াজ্জিনের মন! একটু একটু করে তুষারের মতো ঝরে।
ঘোরানো সিঁড়ির ঘুর-স্বভাব মাড়িয়ে তবু আস্তে-আস্তে সে উঠে যায় মিনারচূড়ায়।
সাক্ষাৎ
আবার তোমার সঙ্গে দেখা হবে বহুদিন পর।
মন যেন আজ হাবল-পূর্ববর্তী উপদ্রবহীন
তারাঘন মায়াময় রাতের আকাশ--
নিরিবিলি নীরব নিঝুম।
বহুকাল পর আজ দেখা হবে তোমার সহিত।
জোনাকি-ফুটিয়ে-তোলা রাতের আকাশ ঝেঁপে নেমে আসবে
বিলের পানিতে। ফুটে উঠবে অগণন তারামাছ।
ধ্রুবকের মতো জ্বলবে তাদের প্রতিটি কৌণবিন্দু।
কতদিন হলো তুমি নেই এই দেশে।
উঠানে বরইয়ের গাছে চুপচাপ
ঘনিয়ে-জড়িয়ে-থাকা স্বর্ণলতাগুলি
এতদিনে বদলে গেছে জং-ধরা তামার তন্তুতে।
মৌমাছিরা সেই কবে উড়ে গেছে দূরের পাহাড়ে
ফাঁকা-ফাঁকা স্মৃতিকোষ হয়ে ঝুলে আছে
এখনো মৌচাক, কৃষ্ণচূড়া গাছে।
গুঞ্জনের রেশ, মধু ও মোমের অবশেষ, কিচ্ছু নেই কোনোখানে।
অভিমান করে নদী সরে গেছে দূরে
নাইয়র-নিতে-আসা নৌকাসহ।
তবুও এখনো
সংসারে-হাঁপিয়ে-ওঠা, ক্রমশ-ফুরাতে-থাকা
নাম-না-জানা কোনো গৃহবধূ
বিরহবিলাপ সুরে খুনখুনিয়ে গেয়ে যাচ্ছে অস্ফুট কাকুতিগান--
“ঘাটে লাগাইয়া ডিঙা পান খাইয়া যাও বাঁশি আল্লা’র দোহাই
এ-পরানের বিনিময়ে তোমার পরান দিয়ো হাসি আল্লা’র দোহাই”
ডাকাতি
সাহাদের বাড়িতে ডাকাত পড়েছে। মাথায় মারণকল ঠেকিয়ে বাড়ির লোকজনদের বেঁধে রেখে ডাকাতি করছে ডাকাতের দল। সেই বিভীষিকার মধ্যে কোনো এক ফাঁকে সাহাদের আদর-কাড়া হোঁদলকুতকুতে ছোট্ট ছেলেটি আতঙ্কিত হয়ে হামাগুড়ি দিয়ে এসে উঠে পড়েছে ভীষণদর্শন এক ডাকাতের কোলে। আঙুল চুষতে চুষতে ঘুমিয়েও পড়েছে একসময়।
পাড়ায় শোর পড়েছে, ভোর হয়ে আসছে, পুলিশ এসে পড়ছে... এদিকে ভ্যাবাচ্যাকা-খাওয়া ডাকাতটি ঘুমন্ত শিশু-কোলে বসেই রয়েছে নির্বোধের মতো... সাঙ্গাতরা সব পালিয়ে গেছে সেই কখন...
ফাইন আর্ট
তোমার সহিংসতাটুকু আমিই তোমার হয়ে
সেরে আসি বাইরে গিয়ে। তবেই-না তুমি
সম্পূর্ণ অহিংসরূপে দিবানিদ্রা যাও।
সন্ধ্যাবেলা জেগে উঠে বলো-- বাহ্! করেছ কী কাণ্ড!
বাইরে কী অপরূপ রক্তবিকিরণ!
স্প্রাং রিদমের তালে-তালে জম্বি ছন্দে চলছে যজ্ঞ মনুমেধ--
ওই যে থ্যাঁতলানো দেহ-- প্রতীকপ্রতিম, ছিটকে-পড়া ঘিলু-- রূপকসমান,
পোড়ানো হাত-পা মুখ-মাথা-- উপমেয়হারা উপমান,
কাটা মুণ্ড, ফাটা জিভ, বিমূর্ত চিত্রের মতো নাড়িভুঁড়ি, অনুপ্রাস,
থকথকে কূটাভাস, চকচকে চিৎকার, সত্রশিখা, উগ্র আগ্নেয় তুফান...
থেকে-থেকে যজ্ঞপটে জেগে ওঠে ভৌতিক জবান।
যোজনগন্ধার গন্ধকাহিনির মতো চমৎকার
রক্তের সুবাস ভেসে আসছে জানালায়।
সেইসঙ্গে এও বলো--
জীবাণুনাশক দিয়ে মুছে ফেলো সব আর্ট, তাড়াতাড়ি।
বিমূর্ত চিত্রের রূপ-- মূর্ত তো থাকে না বেশিক্ষণ।
পচে। গলতে থাকে। চণ্ড গন্ধ হয়। জীবাণু ছড়ায়...
ব্যাপন
গোয়ালিনীটির ছোট্ট মেয়ে,
মনের আনন্দে
একটু একটু করে পানি মিশিয়ে চলেছে
সারি-সারি দুগ্ধভাণ্ডে, অলক্ষে সবার।
আহা, কী যে অনাবিল দুধে-জল-মেশানোর সুখ!
খিলখিল-হাসি-মেশানো, স্নিগ্ধ ফাঁকি-মেশানো
ঊনঘনত্বের ওই দুধ মুগ্ধমনে যাবে মদিনায়, মথুরায়, উরুবিল্ব, নিশাপুর...
ছলকে ছলকে দেশ-কাল-পাত্র-পরিস্থিতি পেরিয়ে অনাবিষ্কৃত উপমহাদেশে,
বিচিত্র অচেনা পাত্রে, অজানা পরিস্থিতিতে
নানারূপ তঞ্চন-মন্থনশেষে পৌঁছে যাবে ননিচোরের ননি ও মাখনে,
সুজাতার পরমান্নে, দরগার শিরনিতে, ঠাকুরের প্রসাদে,
বেদুইন পশুচারকের গামছায় বাঁধা কাঁচা-কাঁচা ক্ষীরশায়,
ঠা-ঠা রোদ্দুরের মধ্যে হঠাৎ গায়েবি দৈবাদেশ থেকে বিকীর্ণ হাওয়াই কিছু
সন্দেশে, সংশয়ে...
সংশ্লেষ
সাহারা যদি হয় এক ধূসর থিসিস,
কঙ্গোর বৃষ্টিবন তবে তার এক অনবদ্য অ্যান্টিথিসিস।
ধূসর ও সবুজের এমন দাউদাউ সংশ্লেষের নামই আফ্রিকা।
বস্তুত পৃথিবীটাই এরকম বালু ও বাষ্পের,
রাগ ও স্নেহের দুর্দান্ত সিনথিসিস।
কোথায়ই-বা যাবে তুমি? কোথাও পাবে না এই কূটাভাস, একসঙ্গে মধু আর বিষ
যেখানেই যাও, বুধে বা মঙ্গলে, সবখানে একটানা ঊষর থিসিস।
শুধু এক মহাজাগতিক জ্যোৎস্না, মানে
অশ্রুত অলীক সুর, টিপটিপ ঝরতে থাকবে সবখানে।
সেই জ্যোৎস্না, অলীক স্পন্দন-- মৃদু, স্নিগ্ধ, আকস্মিক
কিন্তু না-তারা পার্থিব, না বৌধিক, কিংবা মাঙ্গলিক...
বহুদিন পর আবার প্রেমের কবিতা
মেঘ থেকে মেঘে লাফ দেবার সময়
তুরীয় আহ্লাদে দ্রুত কেঁপে-বেঁকে
একটানে একাকার যখন বিজলিসূত্র, ওই ঊর্ধ্বতন
মেঘের আসনে এক ঝলক দেখা গেল তাকে
আলোকিত ঘনকের আকারে।
তাকে ডাক দেব-দেব, আহা কী বলে যে ডাক দেই!
জন্ম এক রুদ্ধভাষ জাতিতে আমার--
মুহূর্তে মিলিয়ে গেল অপর আকারে।
দূর মহাকাশে
ছড়িয়ে ছিটিয়ে ফুটে আছে কত ফুয়েল-স্টেশন--
সেইসব এলোমেলো নৈশ নকশার মধ্যে তাকে, প্রিয় তোমাকেই,
ঘোর মধ্যরাতে
এইভাবে দেখে ফেলি আমিও প্রথম।
সর্ববায়ু আমার সুস্থির হয়ে যায়।
যেই দেখি আর ডাক দিতে যাই প্রিয়, অমনি
তোমার সমস্ত আলো, সকল উদ্ভাস
হঠাৎ নিভিয়ে নিয়ে চুপচাপ অন্ধকার হয়ে যাও।
আবার উদ্ভাস দাও ক্ষণকাল পরে--
এইরূপে খেলা করো, লুকোচুরি, আমার সহিত।
আমি থাকি সুদূর রূপতরঙ্গ গাঁয়, আর তোমার সহিত
তোমারই সাহিত্যে আহা এভাবে আমার বেলা বয়ে যায়।
এরপর থেকে একে একে এক উচ্চতর জীবের বিবেক
প্রথমে প্রয়োগ করে দেখি,
মিলিয়ে যাচ্ছেন তিনি আকারে ও নিরাকারে।
এক অতিকায় জট-পাকানো যন্ত্রের
আগ্রহ সাধন করে দেখি,
তা-ও তিনি ছড়িয়ে পড়েন সেই আকারে নিরাকার;
আকাশে আকাশে মেলে রাখা তার কী ব্যাপক কর্মাচার,
একটির পর একটি গ্রহ আর জ্বালানি-জংশন সব
অতর্কিতে নিভিয়ে নিভিয়ে প্রবাহিত হন তিনি।
একদা মণ্ডলাকার ছিলে জানি
আজ দেখি দৈবাৎ ধর্মান্তরিত, ঘনকের রূপে!
ঘনক তো গোলকেরই এক দুরারোগ্য সম্প্রসার।
তবুও তো ধর্ম রক্ষা পায়। রক্ষিত, সাধিত হয় তবু।
গোলকত্ব পরম আকার
গোলকতা যথা এক অপূর্ব বিহেভিয়ার,
প্রায়-নিরাকারসম এক নিখুঁত আকার।
শৈশবের কালে, এক আশ্চর্য মশলা-সুরভিত
গুহার গবাক্ষপথে আচম্বিতে ভেসে উঠেছিল মেঘ,
যার বাষ্পে বাষ্পে কূটাভাস।
কিছুতেই পড়তে পারি নাই সেই মেঘ
আমরা তখন।
বিব্রত বাতাস তাকে, মেঘে মেঘে সংগঠিত ক্ষণ-ক্ষণ-আকৃতিকে,
ধাক্কাতে ধাক্কাতে নিয়ে যাচ্ছে কত বিভিন্ন প্রদেশে।
নিরাকৃত হতে হতে প্রায়, ওই তো ব্যক্ত হচ্ছেন ফের আকারে আকারে।
ধর্মচ্যুত হতে হতে প্রায়, ফের প্রচারিত হন ধর্মে ধর্মে।
আহা, ধর্ম হারালে কী আর থাকে তবে এ ভুবনে!
ঘনক যে গোলকেরই এক নিদারুণ তাপিত প্রসার।
বৃহৎ, অকল্পনীয় এক জড়সংকলন। বড় বালিপুস্তকের মতো--
তারই মধ্যে অকস্মাৎ একটু প্রাণের আভা। মাত্র তার একটি পৃষ্ঠায়।
এই সংকলনের ভূমিকাপত্রটিও নেই। ছিন্ন। সেই প্রধান সংঘর্ষে।
নিষ্ক্রান্তিদিবসে, অতঃপর, ওই গুহামুখে পড়ে থাকে
এ বিপুল জড়সংকলনের ছেঁড়া ভূমিকাপৃষ্ঠাটি,
অর্থাৎ সেই যে প্রথম ক্যাজুয়াল্টি, নিখিলের--
ওই গুহাপথে, নিষ্ক্রমণকালে।
একবার মাত্র দেখা হয়েছিল কায়ারূপে
ঝাপসা, ছায়া-ছায়া!
তা-ও বিজলির দিনে, তা-ও মেঘের ওপরে
উল্লম্ফকালীন।
এরপর থেকে শুধু ভাবমূর্তি...
যেদিকে তাকানো যায়
কেবলই, উপর্যুপরি ভাবমূর্তি ঝলকায়।
মাঠে মাঠে স্প্রিং স্ক্রু আর নাটবোল্ট ফলেছে এবার সব জং-ধরা।
সে-সব ভূমিতে হাঁটু গেড়ে গলবস্ত্র হয়ে পরিপূর্ণ দুই হাত তুলে
যাচ্ঞামগ্ন সারি সারি সম্প্রদায়-- তারা অসবর্ণ, তারা
লঘিষ্ঠ-- কলহরত বিড়ালের আধো-আলো-আঁধারি বাচন ও কণ্ঠস্বর
কেড়ে নিয়ে দ্রুত নিজ কণ্ঠে কণ্ঠে গুঁজে দিয়ে সারিতে দাঁড়িয়ে যায় তারা।
তেজের অধিক তেজ
বাক্-এর অধিক বাকস্ফূর্তি তুমি,
গোলকে স্ফুরিত হয়ে এসো পুনর্বার
পূর্বধর্ম ধারণ করে সরাসরি উত্তম পুরুষে।
আর
কত অর্থ যে নিহিত করে রাখো বীজাকারে
সেইসব ভাসমান বাক্যের অন্তরে,
দৃশ্যত যা অর্থহীন অতি-অর্বাচীনদের কাছে।
সংকটে সংকটে, সর্ব-আকারবিনাশী
দহন দলন আর দমনের দিনে
আদিগন্ত কুয়াশা-মোড়ানো সেই তৎকালীন রৌদ্রের মধ্যেই
চতুর্দিক থেকে একসঙ্গে আর
বৃক্ষে বৃক্ষে আর দ্রব্যে দ্রব্যে আর ভূতে ভূতে সর্বভূতে
মুহুর্মুহু উদ্ভাস তোমার, এক অবধানপূর্ব রহিমের রূপে।
ঘনক তো গোলকেরই এক অপূর্ব অপিনিহিতি।
এইরূপে লীলা করো, লুকোচুরি, আমার সহিত।
আমি থাকি দূরের রূপতরঙ্গ গাঁয়, আর তোমার সহিত
তোমার সাহিত্যে দ্যাখো এভাবে আমার বেলা বয়ে যায়।