পলাশী এবং চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পরের সময় বাজার দখল, সম্পদ দখল, উপনিবেশের অভয় হাত মাথায় নিয়ে দেশের কারিগর ব্যবস্থা উচ্ছেদ করে দখলদারি সামরিক-কর্পোরেট কেন্দ্রিভূত উতপাদন ব্যবস্থা থানা গাড়তে শুরু করল প্রথমে বাংলায় তারপরে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে। এই ব্যবস্থা চালাবার জন্যে সাম্রাজ্যের কর্তারা চেয়েছিলেন তাদের মতই ফর্সা ফর্সা, তাদের খিদমতে আজানুলম্বিত, বিনা প্রশ্নে উপনিবেশিক কাঠামো মেনে নেওয়া দেশিয় মানুষজনের সামাহার। চৈতনের সময় থেকে মুসলমান ফোবিয়ায় ভোগা, রাষ্ট্র ব্যবস্থায় দুই তিন নম্বর অবস্থানে থেকেও ক্ষমতাকে নিজেদের মত করে চালনা করতে না পারার ক্ষোভওয়ালা বাঙালি উচ্চবিত্ত, ব্রাহ্মণ, কায়স্থ আর বৈদ্যরা, নবাবি আমল শেষে নতুন উপনিবেশিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কৃষ্টি কাঠামোর অংশিদার হল সানন্দে।
১৮০০র শুরুতে লর্ড লেকের দিল্লি দখল সম্পূর্ণ হওয়ার পর থেকে বোঝা গেল ব্রিটিশ শাসন স্থায়ীত্ব পাওয়ার অবস্থায় চলে এসেছে। সেই সময় থেকেই উপনিবেশিক লুঠেরা খুনি গণহত্যাকারী রাষ্ট্র ব্যবস্থা বিকাশে কোলাবরেটর ভূমিকা অসীম হয়ে দাঁড়ায়। এতবড় দেশে উপনিবেশিক জাতিরাষ্ট্র ব্যবস্থার ক্ষমতার শেকড় ছড়িয়ে দিতে, পলাশীর পরের বাংলা লুঠ আর ইওরোপ আমেরিকায় আফ্রিকিয় শ্রম লুঠের অর্থে চলা ব্রিটেনের নানান সাম্রাজ্যবাদী ভদ্রবিত্তীয় কাঠামোয় সাম্রাজ্য চালানো মানুষজন মেট্রোপলিটন থেকে পরিচালক পাঠাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সে জানে গ্রাম পর্যন্ত উপনিবেশের শেকড় ছড়িয়ে, প্রশাসনের মাঝারিও নয়, নিচুস্তরে কাজ করে সম্পদ জ্ঞান দক্ষতা লুঠ করার জন্যে শিক্ষিত জনসম্পদ প্রয়োজন। তাই প্রয়োজন বাংলায় উপনিবেশিক আধুনিকতার কাঠামো তৈরি করা। উদ্দেশ্য কলোনিয়াল মডার্নিটি, উপনিবেশিক আধুনিকতাকে বাংলার কাবাব শ্রেণীর কাছে উপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে ফেরি করা। ভদ্রবিত্তদের হাত দিয়ে মেকলিয়পন্থায় উপনিবেশিক কাঠামো তৈরি করতে ইন্ডিয়ান রিফর্মস এসোসিয়েসন গঠন হয়েছে, কোলাবরেটর তৈরি করতে ইংরেজি বিদ্যালয় তৈরি হয়েছে, সাম্রাজ্যমুখী সংবাদপত্র স্থাপন হয়েছে এবং তৈরি হয়েছে দাতব্য সংগঠনও। সাম্রাজ্য জানত ভদ্রবিত্তদের স্বার্থ রক্ষাই হল সাম্রাজ্য স্বার্থ পূরণ; রামমোহন, বিদ্যাসাগর, দ্বারকানাথ অন্য ইয়ং বেঙ্গলী স্পষ্ট বুঝতেন, বোঝাতেন তাঁরা কেন সাম্রাজ্য পক্ষে রয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় সহায়তায় ইংরেজি শিক্ষা পাওয়ার জন্যে অমুসলমান ভদ্রবিত্ত সমাজকে নিজের হাতে গড়েপিটে তৈরি করল উপনিবশিক কাঠামো। সমাজ পিরামিডের ওপর তলায় থাকা এই মানুষজনেরা, গ্রাম ভিত্তিক পলাশীপূর্ব সময়ের স্থানীয় উতপাদন ব্যবস্থা কাঠামো নির্ভর উতপাদন ব্যবস্থা ধ্বংস করে সীমাবদ্ধ নতুন উপনিবেশ গঠন করার মেকলিয় পড়াশোনার কাঠামোর সুযোগ নিল। ব্রিটিশ জেন্টলমেনএর অনুসরণে এদের নাম হল ভদ্রলোক। বাঙালি হিন্দু সমাজের তিনটে উচ্চবর্ণ ব্রাহ্মণ, বৈদ্য এবং কায়স্থ। তারাই সব থেকে বেশি সুযোগ পেল। ১৭৫৭র পরে বাংলা ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে আসার পর পরের দিকে আমরা যাদের ভদ্রলোক হিসেবে চিহ্নিত করব, তাদের বাবা অথবা ঠাকুর্দারা কলকাতা নির্ভর ব্রিটিশ বাণিজ্যিক, আর্থিক ও প্রশাসনিক সংস্থা থেকে তারা বিপুল অর্থনৈতিক সুবিধা লাভ করল।
উনবিংশ শতাব্দের শুরুর সময় থেকে বাঙালি হিন্দুদের সঙ্গে ব্রিটিশ প্রশাসকদের একটা গাঁটছড়া তৈরি হল। ব্লুমফিল্ডের বর্ণনায় ভদ্রলোকেরা হলেন, সামাজিক মর্যাদার দিক থেকে অন্যদের তুলনায় মহত্তর বলে স্বীকৃতি চাওয়া একদল সাম্রাজ্যমুখী ইংরেজি শিক্ষিত মানুষজন। এরাই ভদ্রলোক, আক্ষরিক অর্থে সম্মানিত ব্যক্তি, ভদ্রবিত্ত। চরিত্রগতভাবে তারা নিজেদেরকে একটা ছাঁচে ঢেলে নিলেন, তাদের গ্রাম থেকে কলকাতা অভিবাসন, কথা বলার তরিকা, তাদের বাড়িঘরদোর, খাদ্যাভ্যাস, চাকরিদালালি, বন্ধুবান্ধব সঙ্গীসাথী – বলা ভাল তাদের কৃষ্টি নৈতিকতা, সামাজিক অধিকারবোধ আলাদা হয়েগেল। সব থেকে বড় ব্যাপার হল শারীরিক শ্রমকে ঘৃণা করা, শ্রম নির্ভর যে কোনও পেশা থেকে নিজের সমাজকে বিচ্যুত করে মূলত চাকরি, দালালি আর উমোদোরিতে নিজেকে সাজিয়ে নেওয়া। শিক্ষা, বিশেষ করে উপনিবেশিক আধুনিক ইংরেজি শিক্ষা ছিল।
ভদ্র এবং অভদ্র অর্থাৎ ছোট এবং বড়র মধ্যে মৌল পার্থক্যটি তৈরি হল শারীরিক শ্রমযুক্ত কাজকে সুস্থ-সবল-ভদ্রলোকিয় কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া না দেওয়ার মধ্যে থেকেই৩। শারীরিক শ্রমের অস্বীকৃতি এতই গভীর হয়ে ভদ্রবিত্ত সমাজে ছড়িয়ে পড়ল যে ভদ্রলোকের সঙ্গে উচ্চজাতির অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল কয়েক দশকের মধ্যে। চিকিৎসা বিদ্যায় শারীরিক শ্রমকে ঘেন্না করার বিষয়টি খুব একটা আসে নি, তা সত্ত্বেও দেখব চিকিৎসাবিদ্যার ছাত্রদের অধিকাংশ কলকাতার ভদ্রলোক সমাজের এই উচ্চবর্ণের অংশ থেকেই এসেছে শুধু নয়, শুধু চিকিতসাবিদ্যায় নয়, ব্রিটিশ পদ্ধতিতে শিক্ষা নেওয়া এবং এই শিক্ষা পাওয়ার গর্ব তাদের একচেটিয়া হয়ে গেল। উনবিংশ শতকের শেষ দশকে ব্রিটিশ ইংরেজি শিক্ষা পাওয়াই কলকাতার বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং কলেজ স্থান আর সাদা কলারের চাকরি পাওয়ার পাওয়ার অন্যতম যোগ্যতা হয়ে উঠল এবং প্রায় প্রতিটি ভদ্রলোক পরিবার এই লক্ষে কোমর বাঁধল নতুন করে। প্রখ্যাত ভদ্রবিত্তীয় উপনিবেশকে সেবা করা পরিবার তাদের সন্তানদের পাঠাতে শুরু করল উপনিবেশে প্রেসিডেন্সি কলেজে, বা লন্ডনে ব্রিটিশ ইউনিভার্সিটিতে যাতে তারা উপনিবেশিক প্রশাসনিক সেবা, ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসে উচ্চপদ লাভ করতে পারে বা কলকাতা হাই আর সুপ্রিম কোর্টের বারে প্রবেশ করতে পারে। ১৯২৮এর সরকারি সমীক্ষাপত্রে স্পষ্ট বলা হল ভদ্রবিত্ত সমাজে প্রবেশ করার প্রাথমিক ছাড়পত্র হল বিদ্যালয় ব্যবস্থা থেকে কৃতকার্য হওয়ার শংসাপত্র ধারণ করা।