রবিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬

৫ আশ্বিন ১৪৩৩

সরকার অনুমোদিত অনলাইন গণমাধ্যম
BD.GOV.REG.NO-88

রবিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬

৫ আশ্বিন ১৪৩৩

সরকার অনুমোদিত অনলাইন গণমাধ্যম
BD.GOV.REG.NO-88

আপনি পড়ছেন : মতামত

ড. আবুল বারকাতের ৭২তম জন্মবার্ষিকীর শ্রদ্ধার্ঘ্য এবং কিছু কথা


ড. মতিউর রহমান
DhakaReport24.com || 2025-09-27
 ড. আবুল বারকাতের ৭২তম জন্মবার্ষিকীর শ্রদ্ধার্ঘ্য এবং কিছু কথা

অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত—এই নামটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চিন্তাধারার ইতিহাসে এক অনন্য স্থান দখল করে আছে । তিনি কেবল একজন প্রথাবিরোধী অর্থনীতিবিদ নন, বরং একজন সমাজবিশ্লেষক, রাষ্ট্রচিন্তাবিদ, এবং গণমানুষের অধিকারের পক্ষে আজীবন সোচ্চার এক বুদ্ধিজীবী । তাঁর সমগ্র জীবন, কর্ম এবং মনন আবর্তিত হয়েছে মা, মাটি ও মানুষের কল্যাণে । প্রচলিত কাঠামোর বাইরে গিয়ে তিনি সমাজের গভীরতম সমস্যাগুলোকে সামনে এনেছেন এবং সেগুলোর মৌলিক বিশ্লেষণ করেছেন । তাঁর কর্মজীবনের প্রতিটি অধ্যায় প্রমাণ করে, তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ, যাঁর কাছে তত্ত্ব ও বাস্তবতা ছিল অবিচ্ছেদ্য ।

অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত ১৯৫৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়া শহরে জন্মগ্রহণ করেন । তাঁর বাবা ডা. আবুল কাশেম এবং মা নূরুন নাহার । একটি স্বাধীন ও প্রগতিশীল পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা, এবং তাঁর শৈশবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময় তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে । এই অভিজ্ঞতা তাঁর পরবর্তী জীবনের আদর্শিক ভিত্তি স্থাপন করে । তিনি ১৯৭০ সালে কুষ্টিয়া জিলা স্কুল থেকে এসএসসি এবং ১৯৭৩ সালে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন । পড়াশোনায় তাঁর মেধা ছিল অসাধারণ, এবং ওই বছরই তিনি বাংলাদেশ সরকারের মেধা বৃত্তি নিয়ে উচ্চ শিক্ষার জন্য তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে পাড়ি জমান । 

সোভিয়েত ইউনিয়নে অবস্থানকালে তিনি অর্থনীতি বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন । ১৯৭৮ সালে মস্কো ইন্সটিটিউট অব ন্যাশনাল ইকোনমি ( এখন , প্লেখানভ রাশিয়ান ইউনিভার্সিটি অফ ইকোনমিক্স) থেকে তিনি অর্থনীতিতে এমএসসি এবং ১৯৮২ সালে উন্নয়নের রাজনৈতিক-অর্থনীতি বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন । সোভিয়েত ইউনিয়নে অধ্যয়নকালে তিনি মার্ক্সবাদী দর্শন ও সমাজতন্ত্রের গভীর জ্ঞান লাভ করেন, যা তাঁর অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষণের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে । এই শিক্ষা তাঁকে প্রচলিত পুঁজিবাদের সীমাবদ্ধতা ও বিকল্প সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সম্ভাবনা নিয়ে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে ।

দেশে ফিরে আসার পর ড. আবুল বারকাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন । তিনি অতি দ্রুতই তাঁর মেধা, জ্ঞান এবং প্রগতিশীল চিন্তাধারার জন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন । তিনি শুধু শিক্ষার্থীদের পড়াতেন না, বরং তাঁদের মধ্যে সমাজ সচেতনতা এবং সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতেন । পরবর্তীতে তিনি এই বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন এবং বিভাগটিকে একটি গবেষণা-কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন । 

তাঁর গবেষণা ও শিক্ষাদান কেবল অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাপানিজ স্টাডিজ বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন, যা তাঁর বহুমুখী জ্ঞানের আরেকটি দৃষ্টান্ত । তাঁর নেতৃত্বে এই বিভাগটি স্বল্প সময়েই একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা কেন্দ্রে পরিণত হয় । তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত মানবতাবাদী এবং তাঁর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল মানব কল্যাণ, উন্নয়ন ও প্রান্তিক মানুষ ।

অধ্যাপক ড. আবুল বারকাতের গবেষণা কর্ম তাঁকে বাংলাদেশের অন্যসব অর্থনীতিবিদের থেকে আলাদা করেছে । তাঁর মৌলিকত্বে অনন্য গবেষণাগুলোর মধ্যে ছিল রাজনীতি ও অর্থনীতির দুর্বৃত্তায়ন , যেখানে তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে রেন্ট সিকিং, লুণ্ঠন ও পরজীবী বৃত্তি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিকে এক দুষ্টচক্রে আবদ্ধ করেছে । তিনি প্রমাণ করেছেন যে, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে সম্পদ ও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নত হচ্ছে না । তিনি দারিদ্র্যকে কেবল আর্থিক পরিমাপক দিয়ে বিশ্লেষণ করেননি, বরং এর পেছনে থাকা রাজনৈতিক, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক কারণগুলো তুলে ধরেছেন । তাঁর মতে, দারিদ্র্য হচ্ছে একটি পদ্ধতিগত শোষণ প্রক্রিয়ার ফল । কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কার নিয়ে তাঁর কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । তিনি ভূমি মামলা, জাল দলিল এবং ভূমি দখলের রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে গভীর গবেষণা করেছেন, যা ভূমিহীন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে একটি শক্তিশালী তাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করেছে ।

তিনি নারীর ক্ষমতায়ন এবং আদিবাসী ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে ব্যাপক কাজ করেছেন । তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে এই জনগোষ্ঠীর মানুষরা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে শোষিত ও বঞ্চিত হচ্ছে । পাকিস্তান আমলে এবং স্বাধীনতার পরেও কীভাবে অর্পিত সম্পত্তি আইনকে ব্যবহার করে সংখ্যালঘুদের জমি দখল করা হয়েছে, তা নিয়ে তাঁর গবেষণা একটি যুগান্তকারী কাজ, যেখানে তিনি এই প্রক্রিয়ার পেছনে থাকা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের বিশ্লেষণ করেছেন । মাদ্রাসা শিক্ষার প্রসারের পেছনে থাকা অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যগুলো উন্মোচন করেছেন এবং প্রমাণ করেছেন যে, মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের উত্থান কেবল আদর্শিক নয়, বরং এর পেছনে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামো রয়েছে, যা অর্থায়ন ও লজিস্টিক সমর্থন যোগায় ।

জনস্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনা, স্থানীয় শাসনের দুর্বলতা এবং সুশীল সমাজের রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়েও তাঁর গবেষণা অত্যন্ত মূল্যবান, যেখানে তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে এই ক্ষেত্রগুলোতে জনগণের অংশগ্রহণ ও অধিকার নিশ্চিত করা যায় । পদ্মা সেতুর মতো একটি বৃহৎ অবকাঠামো নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণের পক্ষে তিনি জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেন এবং এই বিষয়ে একটি গবেষণা গ্রন্থও প্রকাশ করেন ।

এই গবেষণাগুলোর মাধ্যমে তিনি অর্থনীতিশাস্ত্রে দর্শনের দারিদ্র্য নিয়ে তাঁর তত্ত্ব প্রমাণ করেছেন । তিনি দেখিয়েছেন যে, শুধু গাণিতিক মডেল বা প্রবৃদ্ধির সংখ্যা দিয়ে একটি দেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে বোঝা সম্ভব নয় । বরং এর পেছনে থাকা সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটকে বুঝতে হবে । তাঁর প্রবন্ধ, গবেষণা প্রতিবেদন এবং সৃজনশীল নিবন্ধের সংখ্যা হাজারেরও বেশি ।

অধ্যাপক ড. আবুল বারকাতের গবেষণা ও সমাজচিন্তার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল বাংলাদেশের খেটে খাওয়া প্রান্তিক মানুষ । কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর এবং সমাজের সবচেয়ে দুর্বল অংশকে তিনি কেবল অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের অংশ হিসেবে দেখেননি, বরং তাদের জীবন ও সংগ্রামের বাস্তবতাকে গভীর মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন । তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ছিল ভূমিহীনতা ও ভূমি দখলের রাজনৈতিক অর্থনীতি নিয়ে । তিনি দেখিয়েছেন যে, বাংলাদেশের কৃষকেরা কীভাবে জমির মালিকানা হারায় এবং ভূমিহীনে পরিণত হয় । তিনি জাল দলিল, ভূমি মামলা, এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে ভূমি দখলের যে চক্রটি কাজ করে, তার বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেন । তাঁর গবেষণায় প্রমাণিত হয়, এই ভূমি দখল চক্রটি কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি সুসংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি, যা কৃষকদের অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেয় । তিনি ভূমি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা এবং ভূমিহীন কৃষকদের জন্য ভূমি অধিকার নিশ্চিত করার পক্ষে জোরালো সওয়াল করেন ।

শ্রমজীবী মানুষের অধিকার নিয়েও তাঁর গবেষণা ছিল অত্যন্ত মৌলিক । তিনি দেখিয়েছেন যে, কীভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের অবদান সবচেয়ে বেশি হলেও তারা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয় । তিনি অপ্রচলিত খাত, যেমন দিনমজুর এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিকদের মজুরির বৈষম্য ও শোষণের চিত্র তুলে ধরেছেন । তাঁর মতে, শ্রমিকের কম মজুরি এবং দুর্বল কর্মপরিবেশ কেবল অর্থনীতির সমস্যা নয়, বরং এটি একটি গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের প্রতিফলন । তিনি শোষিত শ্রমিকদের পক্ষে কথা বলেছেন এবং তাদের জন্য ন্যায়সঙ্গত মজুরি ও কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য নীতিনির্ধারকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ।

অধ্যাপক বারকাত দারিদ্র্যকে কেবল আয়ের স্বল্পতা হিসেবে দেখেননি, বরং এটিকে রাজনীতি, সংস্কৃতি ও ক্ষমতার কাঠামোর ফল হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন । তিনি দেখিয়েছেন যে, খেটে খাওয়া মানুষ তাদের পরিশ্রমের ফল না পেয়ে কীভাবে আরও দরিদ্র হয় । তিনি দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য শুধু আর্থিক সহায়তা নয়, বরং রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সম্পদের পুনঃবণ্টনের ওপর জোর দিয়েছেন । তিনি বারবার বলেছেন, 'উন্নয়ন মানেই প্রবৃদ্ধি নয়, উন্নয়ন মানে হলো মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা' । তিনি দেখিয়েছেন যে, দেশের উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলো কৃষকদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করা এবং সমাজের দুর্বলতম অংশের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী গড়ে তোলা ।

অধ্যাপক বারকাত বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি হিসেবে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন । তাঁর নেতৃত্বে এই সমিতি পেশাদার অর্থনীতিবিদদের একটি নিষ্ক্রিয় সংগঠন না থেকে, সমাজের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ ও নীতি-নির্ধারণী বিতর্ক তৈরির কেন্দ্রে পরিণত হয় । তাঁর সভাপতিত্বকালে সমিতি একাধিক যুগান্তকারী গবেষণা প্রকাশ করে । এছাড়াও, তিনি জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন । এই দায়িত্ব পালনকালে তিনি ব্যাংকটির প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনকল্যাণমুখী ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করেন । তিনি মনে করতেন, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল মুনাফা অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার ।

অধ্যাপক ড. আবুল বারকাতের জীবনের বর্তমান অধ্যায়টি অত্যন্ত বিতর্কিত এবং বেদনাদায়ক । ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তাঁর বিরুদ্ধে একটি মামলা করে । অভিযোগ ছিল, জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকাকালীন তিনি আনানটেক্স গ্রুপকে ২৯৭ কোটি টাকার অস্বাভাবিক ঋণ প্রদানে ভূমিকা রেখেছেন । এ অভিযোগের ভিত্তিতে এ বছরে ১০ই জুলাই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়, যা সমাজে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে । বর্তমানে তিনি কারগারে রয়েছেন । 

তাঁর শুভানুধায়ী ও সমর্থকেরা এই গ্রেপ্তারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করেন । তাঁদের মতে, একজন প্রগতিশীল ও নির্ভীক অর্থনীতিবিদ যিনি আজীবন দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে এমন একটি অভিযোগ আনা অত্যন্ত সন্দেহজনক । অনেকেই বলছেন, এই গ্রেপ্তারের মাধ্যমে তাঁর কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছে । তবে তাঁর জীবনের সামগ্রিক দিক বিবেচনা করলে দেখা যায়, তিনি সর্বদা মানুষের পক্ষে কথা বলেছেন এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন । এই গ্রেপ্তার তাঁর জীবন ও কর্মের ওপর একটি কালো দাগ ফেলার অপচেষ্টা হতে পারে, কিন্তু তাঁর গবেষণা এবং চিন্তাগুলো বাংলাদেশের মানুষের মনে চিরকাল বেঁচে থাকবে ।

তাঁর গ্রন্থ ‘অ-জনগণকরণের রাজনৈতিক অর্থনীতি’, ‘অর্থনীতিশাস্ত্রে দর্শনের দারিদ্র্য’, ‘উৎপাদন পদ্ধতি’, ‘বড় পর্দায় সমাজ-অর্থনীতি-রাষ্ট্র’, ‘মৌলবাদের অর্থনীতি’, ‘অর্পিত সম্পত্তি বা শত্রু সম্পত্তি আইন’ এবং ‘কৃষি-ভূমি-জলা সংস্কার’ সহ অন্যান্য কাজগুলো বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক গবেষণায় নতুন দিকনির্দেশনা দিয়েছে । তিনি আমাদের শিখিয়েছেন যে, জ্ঞান কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সমাজের উন্নয়নে প্রয়োগ করতে হয় । তিনি প্রমাণ করেছেন যে, একজন অর্থনীতিবিদ কেবল প্রবৃদ্ধির হার বা বাজারের নিয়ম নিয়ে কথা বলবেন না, বরং মানুষের মর্যাদা, ন্যায়বিচার এবং সমতা নিয়েও তাঁকে সোচ্চার হতে হবে । তিনি আমাদের কাছে কেবল একজন শিক্ষক বা গবেষক নন, তিনি হলেন একটি প্রজন্মের বিবেক, যিনি প্রমাণ করেছেন জ্ঞান আর নৈতিকতার মিলনেই গড়ে ওঠে একজন সত্যিকারের মানুষ । বাংলাদেশের ইতিহাসে অধ্যাপক ড. আবুল বারকাতের নাম চিরকালই থাকবে এক আলোকবর্তিকা হিসেবে ।

তাঁর মতো একজন নিবেদিতপ্রাণ গবেষক ও বুদ্ধিজীবীকে কারান্তরীণ রাখা কেবল তাঁর ব্যক্তিগত মর্যাদার ওপর আঘাত নয়, বরং এটি দেশের মুক্তচিন্তা ও জ্ঞানচর্চার জন্য এক গভীর সংকট । যে অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে । সমাজের বহু মানুষ এটিকে তাঁর সাহসী কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার একটি অপপ্রয়াস হিসেবে দেখছেন । এমন পরিস্থিতিতে, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে, একজন প্রাজ্ঞ অধ্যাপককে এবং গণমানুষের অর্থনীতিবিদকে দ্রুত মুক্তি দিয়ে তাঁর সম্মান ও মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব । তাঁর মুক্তি কেবল একজন ব্যক্তির মুক্তি নয়, বরং তা বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থার প্রতীক । 

৭২তম জন্মদিনে এই জ্ঞানতাপসকে জানাই আমাদের গভীরতম শ্রদ্ধাঞ্জলি।


লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী