সোমবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬

৬ আশ্বিন ১৪৩৩

সরকার অনুমোদিত অনলাইন গণমাধ্যম
BD.GOV.REG.NO-88

সোমবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬

৬ আশ্বিন ১৪৩৩

সরকার অনুমোদিত অনলাইন গণমাধ্যম
BD.GOV.REG.NO-88

আপনি পড়ছেন : মতামত

বিভাগোত্তর পূর্ব বাংলার রাজনীতি ও ফজলুল হক


ড. রামিজ রাজা
DhakaReport24.com || 2024-12-02
বিভাগোত্তর পূর্ব বাংলার রাজনীতি ও ফজলুল হক

দেশভাগের পূর্বে ফজলুল হক পশ্চিমবঙ্গেই অবস্থান করতেন। কলকাতা শহরেই ছিল তাঁর দুখানা বাড়ি। দেশভাগের পর পাকিস্তান মুসলিম লীগের বৈষম্যমূলক রাজনীতির বিরুদ্ধে হকসাহেবই সর্বপ্রথম আওয়াজ তুলেছিলেন। ১৯৪৭ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের বিরুদ্ধে বিবৃতি প্রদান করার মাধ্যমে। এই মুসলিম লীগ পূর্ববঙ্গের বাঙালি মুসলমানদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দেবে এই সারকথা শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক ছাড়া তৎকালীন কোন মুসলিম বাঙালি নেতা উপলব্ধি করতে পারেন নি। কিছুটা পেরেছিলেন মৌলানা আবুল কালাম আজাদ। আজাদ আগাগোড়া দেশভাগ বিরোধী ছিলেন।

অবিভক্ত ভারতে মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক ঘৃণার রাজনীতির বিরুদ্ধে হকসাহেবের নিজস্ব ব্র্যান্ডের অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল রাজনীতি সফল হয়েছিল। হকসাহেবের জনপ্রিয়তা হ্রাস করতে ১৯৪২-৪৩ সাল নাগাদ মুসলিম লীগ হকসাহেবের বিরুদ্ধে সাত মাসে ৫০০ খানা সভা করেছিল।‌ এই সভাগুলি থেকে হকসাহেবের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা ছড়ানো‌ হত। এখন যেমন ইউটিউব, ফেসবুক বা টিভি চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে ছড়ানো হয়। হিন্দু মহাসভা ও মুসলিম লীগ ব্রিটিশদের সাথে চক্রান্ত করে বছর দুই তিনেক হক সাহেবকে দমিয়ে রেখে দেশটা ভাগ করতে পেরেছিল কিন্তু আহত বাঘ শীঘ্রই ফিরে পান তাঁর চেনা ছন্দ। পূর্ববঙ্গের বাঙালিদের প্রতি পাকিস্তান মুসলিম লীগের বৈষম্যমূলক রাজনীতির বিরুদ্ধে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পতাকা সর্বপ্রথম তিনিই উড্ডয়ন করেছিলেন। 

বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্হাপন করার মাধ্যমে পূর্ববঙ্গের পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনের বীজ পুঁতেছিলেন শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক। মুসলিম লীগ ১৯৪৭ থেকে ১৯৫২ এই পাঁচ বছরেই পূর্ব বঙ্গকে শ্মশানে পরিণত করেছিল। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি থেকে সাধারণ মানুষের না খেতে পেয়ে মরা ছিল তখন নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। ১৯৪৭ সালে পূর্ববঙ্গের যে জিন্নাপন্হী বাঙালিরা কলকাতা থেকে পূর্ববঙ্গে ফেরত যাওয়া ফজলুল হককে কালো পতাকা দেখিয়েছিল তারাই ফের নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে হকসাহেবের সভায় ভিড় জমাতে শুরু করল। ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হয় পূর্ব বঙ্গে। পুরাতন হাইকোর্ট থেকে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে যে মিছিল বের হয় তাতে যোগ দিয়েছিলেন এ.কে. ফজলুল হক। তৎকালীন পূর্ববঙ্গের আইনসভায় ইংরেজি এবং উর্দু ভাষায় বক্তৃতা দেওয়ার নিয়ম ছিল। বাংলা ভাষায় বক্তৃতা দেওয়া যেত না। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী যে ভাষা আন্দোলন হয় সেই আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পাশে এসে দাঁড়ানো প্রথম রাজনৈতিক নেতা ছিলেন হকসাহেব। 

১৯৪৯ সালে ঢাকার আর্মানিটোলা ময়দানে মুসলিম লীগের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্ররা হকসাহেবকে সামনে রেখে একটি সভা আয়োজন করেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন ফজলুল হক। মুসলিম লীগের গুণ্ডাবাহিনী সভা পণ্ড করে দেয়। সেই বছরই জুন মাসে ৩০০ জন মুসলিম লীগ বিরোধী নেতা কর্মী ঢাকায় আরও একটি সভা করেন। ১৯৪৯ সালের ২৩শে জুন সেই সভায় একটি সংক্ষিপ্ত ভাষণে তিনি মুসলিম লীগ শাসনে জনগণের চরম দুর্ভোগ ও ব্যক্তি স্বাধীনতা পদদলিত হবার কথা তুলে ধরেন। বৃদ্ধ বাঘ হুঙ্কার দেন যে জনগণের স্বার্থ রক্ষায় তিনি এখনো প্রস্তুত আছেন। সেই সভায় মওলানা ভাসানীকে সভাপতি,  শামসুল হককে সম্পাদক ও শেখ মুজিবর রহমানকে যুগ্ম সম্পাদক করে আওয়ামী লিগ দল গঠন করা হয়। ঐ বছরই মুসলিম লীগ সরকার দমনমূলক বিশেষ ক্ষমতা আইনে কলকাতা থেকে প্রকাশিত হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর পত্রিকা দৈনিক ইত্তেহাদ ও আরো কয়েকটি ভারতীয় পত্রিকা পূর্ববঙ্গে প্রবেশ নিষিদ্ধ করলে ফজলুল হক ক্ষোভে ফেটে পড়েন। ১৯৪৯ সালের ১২ই আগস্ট ভিক্টোরিয়া পার্কে একটি বিশাল প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। সেই সভায় সভাপতিত্ব করেন হকসাহেব। সংবাদপত্রের কন্ঠরোধ ও ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণের বিরুদ্ধে তিনি জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে মুসলিম লীগ সরকারকে স্বৈরাচারী শাসনের অবসান করতে বলেন। ১৯৫০ সালে পশ্চিম পাকিস্তানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও পূর্ববঙ্গে পরাজয়ের ভয়ে নির্বাচন স্থগিত রাখা হয়। টালমাটাল এই রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে চারিদিকে রক্তাক্ষয়ী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। রটিয়ে দেওয়া হয় কলকাতা দাঙ্গায় ফজলুল হক পরিবার সমেত মারা গেছেন। ১৯৫১-৫২ সালে পূর্ববঙ্গে তীব্র খাদ্য সংকটও দেখা দেয়‌। ফজলুল হক নাজিমুদ্দিনকে ১৯৫৩ সালের মার্চ মাসে নির্বাচন অনুষ্ঠানের অনুরোধ জানান। সেই বছরই মাওলানা ভাসানীর মুক্তির দাবিতে আর্মানিটোলা ময়দানে একটি জনসভায় ফজলুল হক বক্তৃতা করেন। ১৯৫৩ সালের ২২শে মার্চ হক সাহেব তাঁর বাসভবনে একটি সর্বদলীয় সম্মেলন আহ্বান করেন। অতঃপর ১৯৫৩ সালের ২৭শে জুলাই কৃষক-প্রজা সমিতির কর্মীদের সম্মেলনে ডাকেন এবং প্রজা শব্দ বাদ দিয়ে কৃষক শ্রমিক পার্টি গঠন করেন। পার্টির সভাপতি হন এ.কে. ফজলুল হক। ৮০ বছর বয়সেও তিনি পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জেলায় ভাষণ দিতে ছুটে যান। তাঁর প্রত্যেকটি জনসভায় লক্ষ লক্ষ লোকের সমাবেশ হত। একটি আইনজীবী সম্মেলনে হকসাহেব বলেন, "পাকিস্তান হল, কিন্তু কেন্দ্র স্হাপিত হল বৃত্তের উপর।" যুক্তফ্রন্ট গঠনের মাধ্যমে সর্বসম্মতিক্রমে ফজলুল হককে ১৯৫৪ সালে পূর্ববঙ্গের নির্বাচিত সদস্যগণ দলীয় নেতা নির্বাচিত করেন। ফজলুল হক পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর পদ অলঙ্কৃত করেন। এখানে উল্লেখ্য যে ১৯৪৩ সালে বিভাগপূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রীত্ব ছাড়ার পরেই নেমে এসেছিল ভয়ঙ্কর দুর্ভিক্ষ। আর পূর্ববঙ্গের ১৯৫২ সালের আরেকটি ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের পরেই হকসাহেব পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন।

ফজলুল হক ছিলেন বাংলার ঐতিহ্যের ধারক ও বাহক। কিন্তু বর্তমানে তাঁর নাম ইতিহাসে প্রায় বিস্মৃত। ইংরেজ আমলে বাংলার মানুষকে বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া পদদলিত বাঙালি সমাজকে শিক্ষিত করা ও কৃষক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য। সর্বভারতীয় রাজনীতির পাশাপাশি গ্রাম বাংলার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে তিনি নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। বাংলা ও বাঙালির সার্বিক উন্নতির জন্য তিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ও চেষ্টা ছিল বাঙালি তথা বাংলার মুসলিম সমাজের দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা, বেদনা দূর করা। তিনি সর্বোতভাবে সচেষ্ট ছিলেন বাংলার চাষীদের মুখে ভাষা ফোটাতে। বাংলার মানুষের মনে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত রচনা করেছিলেন তিনি। বাংলায় স্বাধীনতার স্বপ্ন বুনেছেন। ফজলুল হকের সাফল্য এবং ব্যর্থতা এখানেই যে তিনি চেয়েছিলেন বাঙালির প্রথম পরিচয় হিন্দু বা মুসলমান নয়, বাঙালিই হোক তার প্রথম পরিচয়। তাঁর মন্ত্রিসভায় হিন্দু, মুসলমান উভয় সম্প্রদায়েরই প্রতিনিধি ছিল। তিনি ভারতবর্ষের মূলশক্তি বহুত্ববাদকে প্রাধান্য দিতেন। তাই কট্টর হিন্দুত্ববাদী নেতা শ্যামাপ্রদাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গেও তাঁর হৃদ্যতা ছিল। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, নলিনী রঞ্জন সরকার, বিজয় প্রসাদ সিংহ রায়, মহারাজা শ্রীশ চন্দ্র নন্দী, প্রসন্ন দেব রায়কুট, মুকুন্দ বিহারী মল্লিক, স্যার খাজা নাজিমুদ্দিন, নবাব খাজা হাবিবুল্লাহ, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, নবাব মোশাররফ হোসেন এবং সৈয়দ নওশের আলী তাঁর মন্ত্রীসভায় অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। মুসলিম লিগের বিপরীতে দাঁড়িয়ে এক ভয়ংকর অশান্ত সময়ে প্রগতিশীল রাজনীতির চর্চা করেছিলেন। কিছুটা এগিয়েও ছিলেন। হয়তো হেরেও গিয়েছিলেন অবশেষে। কিন্তু জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে কথা বলে গিয়েছেন। ফজলুল হক দ্বিজাতি তত্ত্ব মানতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন বাঙালি একটিই জাতি। ফজলুল হকের অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীলতার পথই বাঙালির মুক্তি ও উত্তরণের পথ- একথা বর্তমান প্রজন্মকে জানতে হবে।


তথ্যসূত্রঃ

১. শেরে বাংলা, বি ডি হাবীবুল্লাহ

২. শের-ই-বাংলা এ.কে. ফজলুল হক, পশ্চিমবঙ্গ সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও বিত্ত নিগম

৩. বাঙালির ডাল-ভাতের নেতা শের-এ-বাংলা এ.কে. ফজলুল হক, ড. মইনুল হাসান


ড. রামিজ রাজা