গত ২৯ শে জুলাই ২০২৫ দৈনিক আমার দেশ প্রত্রিকায় প্রকাশিত কাওসার আলমের 'মৌলবাদ তত্ত্বের নামে বারকাতের প্রোপাগান্ডা' শীর্ষক প্রতিবেদনটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এটি ড. আবুল বারকাতের গবেষণা ও মতামতের একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিকৃত উপস্থাপনা। এই প্রতিবেদনটি আসলে ড. বারকাতের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত আক্রমণ, মিথ্যাচার এবং রাজনৈতিক বিদ্বেষ ছড়ানোর একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা। ড. বারকাতের গবেষণার গভীরতা, সুদূরপ্রসারী প্রভাব এবং দেশের জন্য তার অবদানকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য কাওসার আলম যে যুক্তিতর্কহীন অভিযোগের আশ্রয় নিয়েছেন, তা কেবল দুর্ভাগ্যজনক নয়, বরং গবেষণার প্রতি এক ধরনের অসম্মান।
প্রতিবেদনটিতে
অধ্যাপক আবুল বারকাতের একাডেমিক কাজ এবং তার ব্যক্তিগত সততা নিয়ে যে বিদ্বেষপূর্ণ
আক্রমণ চালানো হয়েছে, তা কেবল কুরুচিপূর্ণ এবং স্থূল মস্তিষ্কের পরিচায়ক। এই তথাকথিত
'প্রতিবেদন' আসলে একটি নির্লজ্জ কুৎসার বেসাতী, যার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো ড. বারকাতের
দীর্ঘদিনের সাধনা, গবেষণা এবং তার প্রগতিশীল চিন্তাধারাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। কাওসার
আলমের এই প্রতিবেদনটি শুধুমাত্র বিদ্বেষপ্রসূত নয়, বরং এটি একটি নিছক রাজনৈতিক এজেন্ডা
বাস্তবায়নের নোংরা চক্রান্তের অংশ।
ভিত্তিহীন অভিযোগ ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আক্রমণ
কাওসার
আলমের মূল অভিযোগের সারমর্ম হলো, ড. বারকাত নাকি ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোকে 'জঙ্গি
সংগঠন' এবং শরিয়াহভিত্তিক অর্থনীতিকে 'মৌলবাদী অর্থনীতি' আখ্যা দিয়ে আওয়ামী লীগের
'রাজনৈতিক ফায়দা' হাসিলের জন্য প্রোপাগান্ডা চালিয়েছেন। এই অভিযোগ এতটাই স্থূল যে,
এর জবাব দিতেও বিতৃষ্ণা হয়। একজন গবেষক যখন সমাজের গভীরে প্রোথিত কোনো সমস্যা, যেমন
মৌলবাদ বা জঙ্গিবাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শিকড় নিয়ে অনুসন্ধান করেন, তখন তাকে একটি
নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের 'ফায়দা হাসিলকারী' হিসেবে চিত্রিত করা মূর্খতা। ড. বারকাতের
কাজ যদি কারো রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে মিলে যায়, তা তার গবেষণার মৌলিকত্ব বা সততাকে
বাতিল করে না। বরং এটি প্রমাণ করে যে, তার বিশ্লেষণ কতটা বস্তুনিষ্ঠ এবং সময়োপযোগী।
'নির্জলা মিথ্যা' আর 'চাতুরি'-র অভিযোগ তুলে কাওসার আলম নিজেই তার লেখনীর চরম অজ্ঞতা
ও বিদ্বেষের পরিচয় দিয়েছেন। একজন গবেষক যদি তার পূর্ববর্তী গবেষণাকে নতুন লেখার তথ্যসূত্র
হিসেবে ব্যবহার করেন, তবে তা অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং গবেষণার ধারাবাহিকতাকেই প্রমাণ
করে। একে 'নিজের বক্তব্যকেই তথ্যসূত্র' হিসেবে ব্যবহার বলে তুচ্ছ করা শুধুমাত্র একাডেমিক
অর্বাচীনতা।
একাডেমিক অবমূল্যায়ন ও ব্যক্তিগত চরিত্রহনন
ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. এম শহীদুজ্জামান ড. বারকাতকে 'ভারতীয় অনুচর' বা
'অখণ্ড ভারতে বিশ্বাসী' হিসেবে চিহ্নিত করা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
এ ধরনের ব্যক্তিগত আক্রমণ তার পেশাগত সম্মান ক্ষুণ্ণ করার একটি অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই
নয়। একজন গবেষক তার গবেষণায় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট এবং বৈশ্বিক প্রবণতাকে
অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন, যা তাকে কোনো নির্দিষ্ট দেশের অনুচর প্রমাণ করে না। ড. মাহবুব
উল্লাহর মন্তব্য যে বারকাতের তত্ত্ব অর্থনীতির সঙ্গে যায় না, তা একটি ব্যক্তিগত মতামতের
বাইরে কিছু নয়। অর্থনীতির মতো একটি গতিশীল শাস্ত্রে নতুন নতুন তত্ত্ব এবং বিশ্লেষণ
পদ্ধতির উন্মোচন হয়, যা প্রচলিত ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এই কারণে একটি তত্ত্বকে
সরাসরি 'উদ্ভট' আখ্যা দেওয়া সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক। নতুন তত্ত্বগুলো প্রায়শই
প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে এবং বিশ্লেষণের নতুন পথ খুলে দেয়।
ইতিহাসের বিকৃতি নয়, বিশ্লেষণ
জিয়াউর
রহমান সম্পর্কে ড. বারকাতের বক্তব্যকে 'বিষোদ্গার' বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে, যা রাজনৈতিকভাবে
উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। বাংলাদেশের সংবিধান থেকে 'ধর্মনিরপেক্ষতা' স্তম্ভটি বাদ দিয়ে 'আল্লাহর
উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস' সংযোজন করার বিষয়টি একটি ঐতিহাসিক সত্য এবং একটি বিতর্কিত
সাংবিধানিক পরিবর্তন। একজন গবেষক হিসেবে ড. বারকাত এই পরিবর্তনের রাজনৈতিক ও সামাজিক
প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষণ করতেই পারেন। তার এই বিশ্লেষণকে 'জঙ্গিবাদের মূল নেতা' হিসেবে
জিয়াউর রহমানকে তুলে ধরার চেষ্টা বলাটা হলো কাওসার আলমের অন্ধ দলীয় আনুগত্যের ফসল।
ঐতিহাসিক ঘটনাপ্রবাহ এবং এর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলা বা বিশ্লেষণ করা কখনোই 'বিষোদ্গার'
হতে পারে না, বরং এটি একটি সুস্থ বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার অংশ।
'মৌলবাদের অর্থনীতি' - একটি সাহসী পদক্ষেপ
ড.
বারকাতের 'মৌলবাদের অর্থনীতি' তত্ত্বকে 'অদ্ভুত' এবং 'আগে কখনো কেউ শোনেনি' বলে অবজ্ঞা
করা হয়েছে। কিন্তু জ্ঞানের জগতে নতুন ধারণা এবং তত্ত্বের উন্মোচন সব সময়ই একটি সাহসী
পদক্ষেপ। প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে নতুন কিছু ভাবা এবং তা জনসমক্ষে তুলে ধরা নিঃসন্দেহে
গুরুত্বের দাবি রাখে। গবেষণালব্ধ ফলাফল কে, কিভাবে ব্যবহার করবেন সেটা প্রেক্ষিত ও
সময়ের উপর নির্ভর করে । এর জন্য গবেষক দায়ী হতে পারেন না। ইসলামী ব্যাংক দখলের ঘটনাকে
তার তত্ত্বের 'ধারাবাহিকতা' হিসেবে দেখিয়ে তাকে একটি বৃহত্তর চক্রান্তের মূল হোতা
হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করাটা স্রেফ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন।
বিদ্বেষপূর্ণ সমালোচনার অন্তঃসারশূন্যতা
বিশ্বব্যাংকের
সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মন্তব্যকে উদ্ধৃত করে ড. বারকাতের বক্তব্যকে
'রাজনৈতিক বক্তব্য বৈ কিছুই নয়' বলে দাবি করা হয়েছে। এটি শুধুমাত্র বিদ্বেষপূর্ণ
সমালোচনার একটি সস্তা উদাহরণ। একাডেমিক গবেষণা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণের মধ্যে একটি
অনিবার্য সম্পর্ক রয়েছে, কারণ সমাজ এবং অর্থনীতি অবিচ্ছিন্নভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।
অধ্যাপক আবদুল মান্নানের 'ওপেন চ্যালেঞ্জ' এবং সেই চ্যালেঞ্জের মাধ্যমে ড. বারকাতের
প্রমাণ দিতে না পারার দাবি হলো সস্তা সাংবাদিকতা, যা একাডেমিক বিতর্কের সূক্ষ্মতা বোঝে
না।
সবচেয়ে
জঘন্য হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধ্যাপকের মন্তব্য, যেখানে ড.
বারকাতকে 'স্ট্যান্ডবাজ' বা তার জ্ঞান 'প্রাথমিক স্তরেও ছিল না' বলে আক্রমণ করা হয়েছে।
এ ধরনের মন্তব্য ব্যক্তিগত বিদ্বেষ এবং কুরুচির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। একজন শিক্ষাবিদ
ও গবেষকের কাজের মূল্যায়ন হয় তার প্রকাশনা, তার গবেষণার গভীরতা এবং তার বুদ্ধিবৃত্তিক
অবদান দিয়ে, ব্যক্তিগত কুৎসা রটনা বা চরিত্রহনন দিয়ে নয়। অর্থনীতি সমিতির 'গৌরব
ম্লান' হওয়া বা 'ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাওয়া'র অভিযোগ হাস্যকর এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
একটি প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব পরিবর্তন বা নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় ভিন্ন মতাদর্শের
আগমনকে 'ধ্বংস' বলে আখ্যায়িত করা হলো সংকীর্ণ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক।
সংক্ষেপে,
কাওসার আলমের এই প্রতিবেদনটি ড. আবুল বারকাতের সুবিশাল গবেষণাকর্ম এবং তার বুদ্ধিবৃত্তিক
অবদানকে খাটো করার একটি সুপরিকল্পিত এবং বিদ্বেষপূর্ণ চক্রান্ত। এটি যুক্তি, তথ্য এবং
একাডেমিক সততার পরিবর্তে ব্যক্তিগত আক্রমণ, মিথ্যাচার এবং রাজনৈতিক হীন লাভালাভের অপচেষ্টা।
ড. বারকাতের মতো একজন প্রাজ্ঞ গবেষককে এই ধরনের সস্তা আক্রমণের শিকার হতে দেখাটা বাংলাদেশের
বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে নেমে আসা চরম অবক্ষয়ের ইঙ্গিত। এটি একটি নতুন ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত,
যা প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়কে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার একটি সুদূরপ্রসারী
নীল নকশার অংশ।