৩০শে এপ্রিল, ১৯৫৪ শুক্রবার কলকাতার প্রভাতী সংবাদপত্রগুলো একটি ‘সুখবর' পরিবেশন করল যে, সেদিন অপরাহ্নে পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী জনাব আবুল কাশেম ফজলুল হক সাহেব ঢাকা থেকে কলকাতায় এসে পৌঁছবেন। সংবাদে আরও জানা গেল যে, পায়ে গুরুতর এক ধরনের ব্যথায় হক সাহেব বেশ কিছুদিন যাবত অত্যন্ত যন্ত্রণা ভােগ করছেন। হাঁটা-চলাফেরা করতে তার খুব কষ্ট হয়। এমন কি অনেক সময়ই তাকে ইনভ্যালিড চেয়ারে বসে চলা ফেরা করতে হয়। তিনি তাঁর পায়ের চিকিৎসার জন্য কলকাতায় আসছেন। তাঁর আযৌবন বন্ধু ও সহযােগী পশ্চিম বাঙলার মুখ্যমন্ত্রী ডঃ বিধান চন্দ্র রায়কে দিয়ে হক সাহেব তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করবেন। এমন কি প্রয়োজন বােধে একজন সার্জেনের সঙ্গেও তিনি পরামর্শ করবেন। তাঁর পায়ের যন্ত্রণার বিষয়ে হক সাহেব পরে কলকাতায় বক্তৃতা প্রসঙ্গে জানিয়েছিলেন যে, পূর্ব পাকিস্তানে খাজা নাজিমউদ্দিনের শাসন কালে বাঙলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বলে স্বীকৃতি দেবার আন্দোলন যখন পূর্ণোদ্যমে চলছিল, তখন শােভাযাত্রীদের ওপর বহুবার পুলিশ নির্দয়ভাবে লাঠি চালনা করে। এ ধরণের একটি শোভাযাত্রায় হক সাহেব নিজেও ছিলেন। তিনি পায়ে গুরুতর লাঠির আঘাত পান। হক সাহেব বলেন যে, তার পায়ের যন্ত্রণা এই আঘাত জনিতই।
বেলা সাড়ে তিনটা নাগাদ ওরিয়েন্ট এয়ারওয়েজের একটি বিমানে হক সাহেব সদলবলে দমদম বিমান বন্দরে উপনীত হলেন। সাথে তাঁর পত্নী ও দশ বছর বয়স্ক পুত্র আবুল কালাম ফায়েজুল হকও ছিলেন। এ প্রসঙ্গে উল্লেখযােগ্য যে, বাঙলার প্রিয় নেতা ফজলুল হক সাহেবকে অভ্যর্থনা জানানাের জন্য কলকাতায় একটি 'হক সম্বর্ধনা সমিতি' গঠিত হয়েছিল। এ সমিতির কার্যালয় ছিল ৭নং ওল্ড গেষ্ট হাউস ষ্ট্রীটে। বিমান বন্দরে হক সাহেবকে সম্বর্ধনা জ্ঞাপনের জন্য অপেক্ষা করছিলেন এক বিপুল জনতা। তারা পুলিশ বেষ্টনী ভেদ করে হক সাহেবকে স্বাগত জানানাের জন্য এগিয়ে যান। অনেকে তাঁর পদ স্পর্শ করে শ্রদ্ধা জানান। এ সময় হক সাহেবকে বেশ প্রফুল্ল দেখাচ্ছিল। এবং তিনি সমবেত ব্যক্তিদের মধ্যে তাঁর পূর্ব পরিচিত অনেককে চিনতে পারলেন। পূর্ব বাঙলায় দীর্ঘদিন কারা ভােগ করার পর সদ্য কারা মুক্ত শ্রী ধীরেন ভৌমিক হক সাহেবকে মাল্য দান করতে গেলে তিনি তাকে চিনতে পারেন। হক সাহেবের পায়ের যন্ত্রণার দরুন পাক ডেপুটি হাই কমিশনার জনাব নসরুল্লার গাড়ী বিমান বন্দরের অভ্যন্তরে নিয়ে যাওয়া হয় এবং হক সাহেব গাড়ী করে বিমান ঘাঁটির লাউঞ্জ পর্যন্ত আসেন। সেখানে তাকে অনেকে মাল্যভূষিত করেন এবং সমবেত সাংবাদিকরা তাকে ঘিরে ধরেন। হক সাহেব একটি চেয়ারে বসে সাংবাদিকদের নানা প্রশ্নের উত্তর দিলেন। দেশভাগের পরেও দুই বাংলাতেই ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে বাঙালিদের কাছে এরকম জনপ্রিয় ছিলেন অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক।
১৯১১ সালে এ.কে. ফজলুল হক সমবায় বিভাগের অ্যাসিস্টান্ট রেজিস্ট্রার পদে কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে রেজিস্ট্রারের পদ খালি হলেও ফজলুল হকের যোগ্যতার প্রতি অবিচার করে ব্রিটিশরা রায়বাহাদুর যামিনী কান্ত মিত্রকে সেই পদে বহাল করে। ফজলুল হক এই অন্যায় অবিচার সহ্য করার লোক ছিলেন না। স্যার সলিমুল্লাহ ফজলুল হককে চাকরি ছেড়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালানোর জন্য উদ্বুদ্ধ করলেন। খানবাহাদুর হাসেম আলী খানকে সঙ্গে করে হক সাহেব শ্রদ্ধেয় গুরু স্যার আশুতোষের সঙ্গে দেখা করতে কলকাতা এলেন। ফজলুল হককে দেখেই স্যার আশুতোষ বিরক্ত হয়ে বললেন, "তোমাকে বারবার বলেছি চাকরি ছাড়তে, তবু তোমার গোলামির মোহ গেল না?" ফজলুল হক বললেন, "একসঙ্গেই মাসের শেষে মাইনের টাকাটা পাই....।" জবাব শুনে স্যার আশুতোষ বললেন, "তুমি দেরি না করে হাইকোর্টে উকালতি শুরু করো, যতো দিন নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারো, আমি পকেট থেকে তোমাকে মাসে পাঁচ শ করে টাকা দেব।" ফজলুল হক চাকরি থেকে ইস্তফা দিলেন। কিন্তু সরকার তা গ্রহণ না করে দীর্ঘদিনের ছুটি মঞ্জুর করল এবং ছুটি শেষে তাঁকে ডায়মন্ডহারবারের এসডিও করে হুকুমনামা পাঠিয়ে দিল। কিন্তু ফজলুল হক এই চাকরি গ্রহণ না করে ১৯১১ সালেই কলকাতা হাইকোর্টে ওকালতি শুরু করে দিলেন এবং এক বছরের মধ্যেই হাইকোর্টের একজন সেরা উকিল বলে গণ্য হলেন। ফজলুল হককে আর স্যার আশুতোষের অর্থসাহায্য নিতে হয় নি। ওকালতিতে এত দ্রুত উন্নতির নজির খুব কমই পাওয়া যায়। হক সাহেবকে অকুণ্ঠ স্নেহ, উৎসাহ ও প্রেরণা দিয়েছিলেন স্যার আশুতোষ, মহাত্মা অশ্বিনীকুমার এবং স্যার সলিমুল্লাহ। এই তিন মহামানবের স্নেহ মমতা, সাহচর্য ও আশীর্বাদ লাভ করেই ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন বাংলার শার্দূল, অবিভক্ত বাংলার প্রথম প্রধানমন্ত্রী, শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক।
১৯১৩ সাল থেকে ফজলুল হক সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। বেঙ্গল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের ঢাকা বিভাগীয় কেন্দ্রের উপনির্বাচনে রায়বাহাদুর কুমার মহেন্দ্রনাথ মিত্রের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং জয়লাভ করেন। ফজলুল হকের অসাধারণ বাগ্মিতা ও আন্তরিকতায় নির্বাচকমণ্ডলী স্বাভাবিকভাবেই তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হয়। তিনি যেসব ভাষণ দেন তাতে তাঁর বাঙালি সত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। তাই মুসলমান হয়েও বর্ণ-হিন্দু অধ্যুষিত নির্বাচন কেন্দ্রে তিনি বর্ণ-হিন্দু প্রার্থীকে পরাজিত করতে সক্ষম হন। পরবর্তীকালে তিনি রাজনৈতিক অনেক পদে অধিষ্ঠান করেছেন তার মধ্যে বাংলার শিক্ষা ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী (১৯২৪), কলকাতার মেয়র (১৯৩৫), অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী (১৯৩৭ - ১৯৪৩) উল্লেখযোগ্য।
১৯১৭ সালে সাম্রাজ্যবাদী ও স্বৈরাচারী ব্রিটিশ সরকার তৎকালীন ভারতের সংবাদপত্রগুলোর কণ্ঠরোধ করার উদ্দেশ্যে 'ভারতীয় প্রেস অ্যাক্ট' নামক একটি কুখ্যাত আইন পাস করে। ১৯১৭ সালের ডিসেম্বরে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ৩২তম অধিবেশনে সাংবাদিক বি জি হর্নিম্যান এই কুখ্যাত আইনটি বাতিলের দাবিতে প্রস্তাব আনেন। হর্নিম্যান সাহেব ছিলেন বোম্বাই ক্রনিক্যাল পত্রিকার সম্পাদক। শেরে বাংলা ফজলুল হক হর্নিম্যান সাহেবের এই প্রস্তাব সমর্থন করে উক্ত অধিবেশনে বজ্রকন্ঠে একটি গুরুগম্ভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ ভাষণ রেখেছিলেন। তিনি বলেন, "সম্মিলিত ভারতবর্ষের কোটি কোটি কন্ঠের বজ্র আওয়াজকে রুখতে পারে দুনিয়ার আজ পর্যন্ত তেমন কোন শক্তি জন্ম লাভ করেছে বলে আমি বিশ্বাস করি না। নির্যাতন ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা মানুষের স্বভাব। আমি আশা করছি ব্রিটিশ শাসকবর্গ সময় থাকতে সাবধান হবেন এবং অবিলম্বে আইনের পুস্তক থেকে এই দমন মূলক প্রেস অ্যাক্ট অপসারিত করবেন।" ১৯১৮ সালে শেরে বাংলা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হন। ১৯১৯ সালে শুরু হয় সত্যাগ্রহ আন্দোলন। এই আন্দোলনকে পদদলিত করার জন্য পাস করা হয় কুখ্যাত 'রাওলাট অ্যাক্ট'। ১৯১৯ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি এই কুখ্যাত আইনের বিরুদ্ধে কলকাতার কলেজ স্কোয়ারে একটি প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। এই সভায় সভাপতিত্ব করেন শেরে বাংলা এ.কে. ফজলুল হক। এই সভায় উপস্থিত ছিলেন ভারতের আরো বহু সংগ্রামী জননেতা। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন বিপিনচন্দ্র পাল, মুজিবর রহমান, জীবনকৃষ্ণ রায়, আবুল কাসেম প্রমুখ। এই বছরই জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ডের তদন্তের জন্য জাতীয় কংগ্রেসের পক্ষ থেকে এ. কে. ফজলুল হক, মহাত্মা গান্ধী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, পন্ডিত মতিলাল নেহরু এবং বদরুদ্দীন তায়েনমীকে নিয়ে গঠিত হয় একটি উচ্চপর্যয়ের তদন্ত কমিটি। শেরে বাংলা ফজলুল হক ছিলেন যে কোন রকমের অন্যায় অবিচার আর অত্যাচারের বিরুদ্ধে এবং যে কোন আন্দোলনের অগ্রনায়ক।
১৯৩০-৩১ সালে শেরেবাংলা লন্ডনে প্রথম গোল টেবিল বৈঠকে যোগ দেন। কংগ্রেস এই বৈঠক বয়কট করে ফলে এই গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান নিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে তাঁর মতবিরোধ ঘটে। তিনি কংগ্রেসের অনুমতি ছাড়াই বৈঠকে যান এবং ভাষণ দিতে গিয়ে বলেন, "আমাদের ধমনীতে গোলামের রক্ত প্রবাহিত হয় না।" শেরে বাংলার এই একটিমাত্র বক্তব্য থেকেই সেদিন বোঝা গেছিল ভারতবর্ষের স্বাধীনতার মূল কথা। ১৯৩৫ সালের মার্চ মাসে ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সম্রাট পঞ্চম জর্জের রজত জয়ন্তী। এই উপলক্ষে বাধ্যতামূলকভাবে উৎসব পালন করার নির্দেশ দেওয়া হয় সারা ভারত জুড়ে। সকল ধর্মের মানুষদের সর্বত্র মসজিদ, মন্দির এবং গির্জায় সম্রাটের দীর্ঘায়ু কামনা করে প্রার্থনা অনুষ্ঠান করতে আদেশ করা হয়। কিন্তু সেদিন সারা ভারতের মাত্র একটি মানুষই এই অন্যায় ও অবৈধ আদেশের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। শেরে বাংলা ফজলুল হক এই আদেশের প্রতিবাদ জানিয়ে এক জনসভায় ঘোষণা করেন কোন মুসলিম তার মসজিদে কোনো বিধর্মীর জন্য প্রার্থনা করতে পারবেন না। শেরে বাংলার এই ডাকে সাড়া দিয়ে সারা ভারতের মুসলিমরা সেদিন একসঙ্গে রুখে দাঁড়িয়েছিল এবং সারা ভারতবর্ষের কোনও মসজিদে ব্রিটিশ সম্রাটের জন্য প্রার্থনা অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়নি। ১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর নেতৃত্বে কলকাতায় হলওয়েল মনুমেন্ট অপসারণের আন্দোলন শুরু হয়। এই আন্দোলনেরও প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন শেরে বাংলা। শুধু সমর্থন নয় তিনি শ্রদ্ধানন্দ পার্কে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় বক্তৃতা করা কালীন এই মনুমেন্ট ভেঙে ফেলার আদেশ দেন। ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনেও শেরে বাংলা অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছিলেন।
শেরে বাংলা ছিলেন একজন সাহসী যোদ্ধা। তিনি অত্যাচারী ইংরেজদের বিরোধিতা করে নিপীড়িত বঞ্চিত বাঙালিদের নানা অধিকার ও মর্যাদা আদায়ের জন্য আজীবন লড়াই করেছিলেন। নিজের জীবনের কখনো পরোয়া করেননি। জীবন বাজি রেখে তিনি দেশের স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। এক ব্রিটিশ সিভিলিয়ান শেরে বাংলার কাজের সমালোচনা করলে অসম সাহসী শেরে বাংলা তাকে বলেছিলেন, "তোমার চরিত্র সংশোধন কর তা নাহলে তোমাকে তল্পিতল্পাসহ এদেশ থেকে বের করে দেবো।" ১৯২১ সালে কলকাতা পুলিশ কমিশনার স্যার রেজিনল্ড ক্লার্কের নির্দেশে নাখোদা মসজিদের সামনে মেশিন গান স্থাপন করা হলে শেরে বাংলা বাঘের গর্জনে বলেন, "আমাকে খুন না করে তোমরা অন্য কোন মুসলমানকে স্পর্শ করতে পারবে না।" সুভাষ বসু ও শরৎ বসুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন শেরে বাংলা ফজলুল হক। ১৯৪১ সালে নেতাজি দেশ ত্যাগ করেন এবং এর পিছনে শেরে বাংলার পরোক্ষ হাত ছিল বলে অনেকে মনে করেন। নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজকে তিনি চুড়ান্তভাবে সমর্থন করেছিলেন। তিনি ছিলেন ব্রিটিশদের নির্যাতনের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর।
১৯৪৩ সালে জাপানি আক্রমণের আশঙ্কায় ভীত হয়ে ব্রিটিশ সরকার জাপানিদের অগ্রগতির পথে বাধা সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে 'পোড়ামাটির নীতি' অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যার ফলে ধান, চাল, নৌকা এবং যাবতীয় যানবাহন গঙ্গার এপারে কলকাতার পশ্চিমে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব করে। ফজলুল হক দেখলেন 'পোড়ামাটির নীতি' কার্যকর করলে ব্রিটিশদের সুবিধা হলেও না খেতে পেয়ে বাংলার লাখ লাখ মানুষ মারা যাবেন। অতএব সরকারের সর্বনাশা পোড়ামাটি নীতির সঙ্গে শেরে বাংলা কিছুতেই একমাত্র হতে পারলেন না। ফলে গভর্নর হার্বার্টের সাথে তাঁর মতবিরোধ দেখা দিল। পরাধীন আইন পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও বড়লাটের ইচ্ছের বিরুদ্ধে মন্ত্রী থাকা যায় না। অতএব পোড়ামাটির নীতি চালিয়ে লাখ লাখ লোকের প্রাণনাশের ষড়যন্ত্র করার চেয়ে শেরে বাংলা মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করা শ্রেয় মনে করলেন। এছাড়াও মেদিনীপুরে পুলিশি নির্যাতনের তদন্ত করতে উদ্যত হলে ইংরেজ গভর্নর হার্বার্টের সাথে তাঁর মতবিরোধ আরো তীব্র আকার ধারণ করে। অবশেষে ১৯৪৩ সালের ২৮ শে মার্চ তিনি অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
১৯৪০ সালের ২৩ মার্চ বিতর্কিত লাহোর প্রস্তাব উপস্থাপন করানো হয় এ. কে. ফজলুল হককে দিয়ে। কিন্তু ফজলুল হক দ্বিজাতি তত্ত্ব মানতেন না। ১৯৫৪ সালের ৩০শে এপ্রিল ফজলুল হক কলকাতায় নেতাজি ভবনে এক ভাষণে বলেন, " বাঙালি এক অখণ্ড জাতি। তাঁহারা একই ভাষায় কথা বলেন এবং একই সুসংহত দেশে বাস করে। তাঁহাদের আদর্শ এক এবং জীবন ধারণের প্রণালীও এক। বাংলা অনেক বিষয়ে সারা ভারতকে পথপ্রদর্শক করিয়াছে এবং দেশ বিভাগ সত্ত্বেও জনসাধারণ তথাকথিত নেতৃবৃন্দের ঊর্ধ্বে থাকিয়া কাজ করিতে পারে।... আজ আমাকে ভারতের ভবিষ্যৎ ইতিহাস গঠনে অংশগ্রহণ করিতে হইতেছে। আশা করি 'ভারত' কথাটির ব্যবহার করায় আপনারা আমাকে ক্ষমা করিবেন। আমি উহার দ্বারা পাকিস্তান ও ভারত উভয়কেই বুঝাইয়াছি। এই বিভাগকে কৃত্রিম বিভাগ বলিয়াই আমি মনে করিব। আমি ভারতের সেবা করিব।" হক সাহেব আরো বলেন, "একটি দেশের রাজনৈতিক বিভাগে আমি বিশ্বাস করিনা। প্রকৃতপক্ষে ‘হিন্দুস্থান’ ও ‘পাকিস্তান’ এ দুটি বিভেদার্থক শব্দের সাথে আমি এখনও পর্যন্ত সুপরিচিত হতে পারিনি। ভারত বলতে আমি এখনও হিন্দুস্থান ও পাকিস্তান উভয় অংশকেই বুঝি। যারা আমাদের এ সােনার দেশকে দু'ভাগ করেছে তারা বাঙলার ও বাঙালীর দুশমন। আমার মতে পাকিস্তান বলতে কিছুই বুঝায় না। এ শব্দটি বিভ্রান্তি সূচক ও স্বার্থ সিদ্ধির একটা পন্থা মাত্র।"
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় আবুল মনসুর আহমদের সাথে আলাপচারিতায় বলেছিলেন "ফজলুল হক মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি বাঙালি। সেই সঙ্গে ফজলুল হক মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত খাঁটি মুসলমান। খাঁটি বাঙালি আর খাঁটি মুসলমানের এমন অপূর্ব সমন্বয় আমি আর দেখি নাই। ফজলুল হক আমার ছাত্র বলে ঐ কথা বলছি না। সত্য বলেই এ কথা বলছি। খাঁটি বাঙালিত্ব আর খাঁটি মুসলমানত্বের সমন্বয়ই ভবিষ্যৎ বাঙালির জাতীয়তা। ফজলুল হক ঐ সমন্বয়ের প্রতীক। ঐ প্রতীক তোমরা ভেঙো না। ফজলুল হকের অমর্যাদা তোমরা করো না। আমি বলছি, বাঙালি যদি ফজলুল হকের মর্যাদা না দেয়, তবে বাঙালির বরাতে দুঃখ আছে।"
অসমাপ্ত আত্মজীবনীতে শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন, "অনেক সময় আব্বা আমার সাথে রাজনৈতিক আলোচনা করতেন। আমাকে প্রশ্ন করতেন, কেন পাকিস্তান চাই? আমি আব্বার কথার উত্তর দিতাম। একদিনের কথা মনে আছে, আব্বা ও আমি রাত দুইটা পর্যন্ত রাজনীতির আলোচনা করি। আব্বা আমার আলোচনা শুনে খুশি হলেন। শুধু বললেন, শেরে বাংলা এ.কে.ফজলুল হক সাহেবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যাক্তিগত আক্রমণ না করতে। একদিন আমার মা’ও আমাকে বলেছিলেন, ‘বাবা যাহাই কর, হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছুই বলিও না’। শেরে বাংলা মিছামিছিই ‘শেরে বাংলা’ হন নাই। বাংলার মাটিও তাঁকে ভালবেসে ফেলেছিল। যখনই হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছু বলতে গেছি, তখনই বাধা পেয়েছি। একদিন আমার মনে আছে একটা সভা করছিলাম আমার নিজের ইউনিয়নে, হক সাহেব কেন লীগ ত্যাগ করলেন, কেন পাকিস্তান চান না এখন? কেন তিনি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির সাথে মিলে মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন? এই সমস্ত আলোচনা করছিলাম, হঠাৎ একজন বৃদ্ধ লোক যিনি আমার দাদার খুব ভক্ত, আমাদের বাড়িতে সকল সময়ই আসতেন, আমাদের বংশের সকলকে খুব শ্রদ্ধা করতেন, দাঁড়িয়ে বললেন, ‘যাহা কিছু বলার বলেন, হক সাহেবের বিরুদ্ধে কিছুই বলবেন না। তিনি যদি পাকিস্তান না চান, আমরাও চাই না। জিন্নাহ কে ? তার নামও তো শুনি নাই। আমাদের গরিবের বন্ধু হক সাহেব’। এ কথার পর আমি অন্যভাবে বক্তৃতা দিতে শুরু করলাম। সোজাসুজিভাবে আর হক সাহেবকে দোষ দিতে চেষ্টা করলাম না। কেন পাকিস্তান আমাদের প্রতিষ্টা করতে হবে তাই বুঝালাম। শুধু এইটুকু না, যখনই হক সাহেবের বিরুদ্ধে কালো পতাকা দেখাতে গিয়েছি, তখনই জনসাধারণ আমাদের মারপিট করেছে। অনেক সময় ছাত্রদের নিয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছি মার খেয়ে। কয়েকবার মার খাওয়ার পরে আমাদের বক্তৃতার মোড় ঘুরিয়ে দিলাম। পূর্বে আমার দোষ ছিল, সোজাসুজি আক্রমণ করে বক্তৃতা করতাম। তার ফল বেশি ভাল হত না। উপকার করার চেয়ে অপকারই বেশি হত। জনসাধারণ দুঃখ পেতে পারে ভেবে দাবিটা পরিষ্কার করে বুঝিয়ে দিতে চেষ্টা করতাম।"
ইতিহাস লিখিয়েদের অনেকেই হকসাহেব এর স্ববিরোধী স্বভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। ওনার ছাত্রজীবন, অধ্যাপকের চাকরি গ্রহণ, সরকারি চাকরিতে বহাল ও ইস্তফা, লীগ প্রতিষ্ঠা করা, কংগ্রেস-লীগ মিলনের প্রয়াস, আইন ব্যবসা করতে গিয়ে রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ, বিধানসভায় নির্বাচন এবং সর্বোপরি একদিকে নিপীড়িত বাঙালি মুসলমান সমাজের দাবি পেশ করা এবং অপরদিকে বাঙালি হিন্দু সমাজের সঙ্গে অচ্ছেদ্য বন্ধুত্ব রাখবার আপ্রাণ চেষ্টা- এই সমস্ত প্রবণতা ও কর্ম প্রয়াস লক্ষ করলে কেন তিনি 'man of contradictions' হতে বাধ্য হয়েছিলেন তা বোঝা যায়। ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল এ. কে. ফজলুক হক ৮৮ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তাঁকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। আজ এই মহান বাঙালি নেতাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অবদান আজকের প্রজন্ম ভুলতে বসেছে। তাই শেরে বাংলার অসাম্প্রদায়িক আদর্শ এবং নিপীড়িত ও পরাধীন ভারতবাসীর জন্য অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের গাথা চর্চা এখন সময়ের দাবি।
তথ্যসূত্রঃ
১. শেরে বাংলা, বি ডি হাবীবুল্লাহ
২. পাকিস্তান প্রস্তাব ও ফজলুল হক, অমলেন্দু দে
৩. আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর, আবুল মনসুর আহমদ
৪. শের-ই-বাংলা আগুনপাখি, মৃণালকান্তি দাস
৫. বাংলার বাঘ এ.কে. ফজলুল হক, হেলাল উদ্দিন
৬. অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান
৭. যুক্ত বাংলার শেষ অধ্যায়, কালীপদ বিশ্বাস
৮. শতাব্দীর কন্ঠস্বর আবুল কাশেম ফজলুল হক, এস. এম. আজিজুল হক শাজাহান