“লাঙ্গল যার জমি তার, ঘাম যার দাম তার” এই শ্লোগান নিয়ে ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে নেমেছিলেন শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ও তাঁর কৃষক প্রজা পার্টি। এই শ্লোগানের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের কৃষকের স্বার্থ ও আশাআকাঙ্খা প্রথমবারের মত জায়গা করে নেয় দক্ষিণ এশিয়ার উপমহাদেশের রাজনীতিতে। এর আগে রাজনীতি ঘুরপাক খেয়েছে সামগ্রিক অর্থে স্বাধীনতার সাধারণ ধারণাকে কেন্দ্র করে, যা আবার শুরু থেকেই হিন্দু মুসলিম ধর্মীয় আবেগের চাপে তৈরি হওয়া একটা অস্পষ্ট ফাটল নিয়ে এগিয়েছে। আর এই ধারার চালকের ভূমিকায় ছিলো কলিকাতা কেন্দ্রিক ব্যবসায়ী শ্রেণী, উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী আর জমিদারদের শ্রেণি স্বার্থের সাথে লেগে থাকা ব্যক্তি স্বার্থও। ফলে জনতা বা জনগনের কোন কথা সেখানে শোনা যায় নাই।
তখনকার বাংলাদেশে সাধারণ জনতা বলতে প্রধানত জমিনির্ভর মানুষদেরই বুঝাতো। কারণ এদেশে তখনো তেমন শিল্প কলকারখানা গড়ে উঠে নাই। স্বল্পসংখ্যক চাকুরীজীবি আর আইন ব্যবসায়ীদের অনেকেই আবার বাপের দিক থেকে জমির সাথে সম্পর্কিত। ফলে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ বলতে কৃষক গোষ্ঠীকে বুঝানো হত। এই কৃষক গোষ্ঠীর মধ্যেও কিছু ভাগাভাগি ছিলো। যেমন জোতদার-তালুকদার, স্বচ্ছল সাধারণ রায়ত, বর্গারায়ত, কোর্ফা রায়ত, ধানকরারি রায়ত। রায়তেরা সারা বছর জীবজানোয়ারের মত কষ্ট করে চাষ করত। ফসলের একটা বড় অংশ তুলে দিতো জমিদারের গোলায়। এরপরও সারা বছর নানা ছুতার আবওয়াব, মাথট ইত্যাদি চাঁদাবাজী চলত। জোতদার তালুকদার ছাড়া বাকী সবাই ছিলো জমিদারী ব্যবস্থার প্রত্যক্ষ শোষনের শিকার। তালুকদার-জোতদাররা এক অর্থে এই ব্যবস্থার সহায়ক শক্তি হওয়া সত্ত্বেও তারা কৃষক শ্রেণিতেই অন্তর্ভুক্ত ছিলো। রাজনীতিতে এই বিপুল সংখ্যার সাধারণ জনতা বা আমজনতা ছিলো প্রায় অনুপস্থিত। ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনকে উসিলা করে শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হকের কণ্ঠের আশ্রয়ে কৃষকরা প্রথমবারের মত হাজির হলো রাজনীতির মাঠে।
এর আগে কৃষকরা যে তাদের দাবী দাওয়া নিয়ে আন্দোলন করে নাই এমন নয়। অনেক কৃষক আন্দোলন হয়েছে, বড় আকারের বিদ্রোহ হয়েছে। যমেন যেমন ফকির মজনু শাহর সশস্ত্র সংগ্রামে যুক্ত হয়েছিলো মনন্তর আর জমিদারী শোষণে নি:স্ব চাষীরাও। তিতুমীরের সংগ্রাম, নীল বিদ্রোহ, ফরায়েজী আন্দোলন, পাটচাষীদের আন্দোলনের মুল শক্তি ছিলো বাংলার চাষী, তাঁতী, কামার কুমার প্রভৃতি খেটে খাওয়া মানুষ। তবে কৃষকদের এসব আন্দোলন ছিলো নির্দিষ্ট দাবীদাওয়াভিত্তিক। দূরপ্রসারী কোন রাজনৈতিক লক্ষ্য সেগুলোতে ছিলো না। ফজলুল হক আর তার কৃষক প্রজা পার্টির দর্শনের মধ্যেই কৃষকদের রাজনৈতিক আকাঙ্খা মূর্ত হয়ে উঠে। ১৯৩৭ সালে তার প্রকাশ ঘটলেও শুরুটা হয় আরো আগে।
উনিশ শতকের শেষের অর্ধেক থেকে বাংলার কৃষকদের মধ্যে জমিদার-বিরোধী অসন্তোষ তীব্র হতে থাকে যার প্রকাশ ঘটে ফরায়েজী আন্দোলন, নীল বিদ্রোহ, পাটচাষীদের আন্দোলন ইত্যাদির মধ্য দিয়ে। চাষীদের ক্ষোভ প্রশমন এবং অধিকার নিশ্চিত করার জন্য জারী হয় বঙ্গীয় প্রজাসত্ত্ব আইন ১৮৮৫। এ আইনে সাধারণ রায়তদের অধিকার কিছুটা নির্দিষ্ট হলেও নিচের দিকের কোর্ফা, বর্গা, ধানকরারী, নানকার প্রভৃতি রায়তদের অধিকার নির্দিষ্ট হয় নাই। ফলে তাদের অসন্তোষেরও স্থায়ী নিরসন হয় নাই। শতকের শেষের দিকে আরো সব রাজনৈতিক ঘটনা এর সাথে যুক্ত হতে থাকে। একই সময়ে বৃটিশরা উপলব্ধি করতে থাকে যে উপনিবেশি শাসনের সূচনা হতেই ইংরেজ সরকার ভারতের মুসলমানদেরকে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত করে আসার কারণে মুসলমান জনগোষ্ঠী যেমন দুর্বল আর্থ-সামাজিক অবস্থানে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে তেমনি তাদের মধ্যে বৃটিশ শাসনের প্রতি প্রচন্ড ক্ষোভও জমা হয়েছে। এই ক্ষতি পুরণের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে বৃটিশ সরকার। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ পদেক্ষপ ছিলো ১৯০৫ সালে বাংলাদেশ থেকে হিন্দু-প্রধান কিছু এলাকা আলাদা রেখে বাকী অংশের সাথে আসামকে যুক্ত করে একটি আলাদা প্রদেশ গঠন। বাংলাদেশে জমিদারী ও অন্যান্য স্বার্থসংশ্লিষ্ট হিন্দুরা একে ‘বঙ্গভঙ্গ’ হিসাবে আখ্যায়িত করে এবং এর বিরোধিতায় ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলে। ফজলুল হকের উত্থান এইরকম টালামাটাল সময়ে। এ সময় ১৮৯৭ সালে এলএলবি পাশ করে কলিকাতায় আশুতোশ মুখার্জির সহকারী হিসাবে পেশাগত জীবন শুরু করেন তিনি। কিছুদিন পর নিজেই স্বাধীনভাবে আইন ব্যবসা শুরু আরম্ভ।
১৯০১ সালে চলে আসেন বরিশালে। ওখানে ১৯০৩-৪ সালে সরাসির ভোটে বরিশাল বার এসোসিয়েশনের সহকারী সম্পাদক নির্বাচিত হন। অসাধারণ মেধাবী আর তুখোড় বক্তা ফজলুল হকের খ্যাতি এরই মধ্যে ইংরেজ প্রশাসকদের নিকটও পৌঁছে গিয়ে থাকবে। হয়ত সে জন্যই ১৯০৬ সালে বাংলার গভর্ণর ব্যোমফিল্ড ফুলার তাকে ডেকে নিয়ে ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট হিসাবে নিয়োগ দেন। এর কিছুদিন পরই তাকে এসডিওর দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয় জামালপুর। এখানেই ধর্মীয় উন্মাদনার ভয়ংকর রূপ দেখতে পান ফজলুল হক। নবগঠিত বাংলা প্রদেশ বাতিলের জন্য হিন্দুরা বিভিন্ন জায়গায় সহিংস আন্দোলন শুরু করে। জামালপুরে দেখা দেয় ভয়ংকর হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা। ফজলুল হকের আন্তরিক প্রচেষ্টায় দাঙ্গা থামে। চাকুরী উপলক্ষে তিনি দরিদ্র প্রজাদের উপর হিন্দু জমিদার তালুকদার ইজারাদার মহাজনদের নির্যাতনের ভয়ংকর রূপ প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পান। তিনি দেখেন বাংলাদেশের ৭০ ভাগ মানুষই মুসলমান হওয়ায়, প্রধানত মুসলমান প্রজারাই হিন্দু জমিদার-মহাজনদের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
এই রকম সময়ে নবাব সলিমুল্লাহর চেষ্টায় ঢাকায় অল ইন্ডিয়া মুসলিম এডুকেশন কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয় । ফজলুল হক কনফারেন্স যোগদেন এবং এ সংক্রান্ত কমিটির যুগ্মসাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এ কনফারেন্সের সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠিত হয়। সরকারী চাকুরির কারণে ফজলুল হকের মুসলিম লীগে যোগদান করার সুযোগ ছিলো না। কিন্তু মুসলিম লীগ গঠনে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নাই।
১৯০৮ সালে প্রশাসনের চাকুরী ছেড়ে সমবায়ের সহকারী রেজিষ্ট্রারের চাকুরী নেন ফজলুল হক। এ সুবাদেও গ্রাম বাংলার মুসলমান কৃষকদের দুর্দশা প্রত্যক্ষ করার সুযোগ হয় তার। এর সাথে যুক্ত হয় ১৯১১ সালে বাংলা প্রদেশ বাতিল করে বাংলাদেশের মানুষকে পুনরায় কলিকাতার আয়ত্তাধীন করার মর্মান্তিক ঘটনা। এ কয় বছরের অভিজ্ঞতা ফজলুল হকের রাজনৈতিক লক্ষ্য নির্ধারণে বিশেষ প্রভাব ফেলে থাকবে। কারণ আমরা দেখি সে বছরই তিনি চাকুরী ছেড়ে দেন এবং রাজনীতে অংশ গ্রহণ করার উদ্দেশ্যে কলিকাতায় গিয়ে হাজির হন। তার এ সিদ্ধান্তের কারণ খুঁজতে গেলে এমন অনুমান করা ভুল হবে না যে, সাধারণ মুসলিম প্রজাদের দুর্দশ লাঘবের মহত উদ্দেশ্য তার পিছনে সক্রিয় ছিলো। কারণ আমরা দেখি এরপর থেকেই মুসলিম কৃষকদের স্বার্থ রক্ষার দূরপ্রসারী চিন্তা তার রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতিকে একটা নির্দিষ্ট দিকে পরিচালিত করছে। যাইহোক, কলিকাতার মুসলিম নেতৃবৃন্দ বিপুল সম্বর্ধনার সাথে বরণ করে নেয়। এ সময় প্রধানত নবাব সলিমুল্লাহ এবং নওয়াব আলী চৌধুরীর কাছে রাজনীতির পয়লা সবক নেন ফজলুল হক।
১৯১২ সালে মুসলিম লীগে যোগদান করেন শের-ই-বাংলা। ১৯১৩ সালে খাজা সলিমুল্লাহ এবং নওয়াব আলী চৌধুরীর উৎসাহ ও প্রত্যক্ষ মদদে ঢাকা বিভাগের শক্তিশালী প্রতিদ্বন্ধী ইংরেজের রায় বাহাদুর মহেন্দ্র নাথকে পরাজিত করে বঙ্গীয় আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। তখন তার বয়স ৩৯ বছর। আইন পরিষদের সদস্য হিসাবে মুসলমানদের শিক্ষা বিস্তারের জন্য জোর চেষ্টা চালান শের-ই-বাংলা। এদেশের কোন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বা সামাজিক ব্যক্তিত্বকে কোনো ইংরেজ চরিত্রের সাথে তুলনা করে তাকে সম্মানিত করা রেওয়াজ ছিলো তখন। শিক্ষা বিষয়ে ফজলুল হকের অক্লান্ত চেষ্টা ও আন্তরিকতা দেখে তাকে ‘বাংলার বেন্থাম’ উপাধি দেয়া হয়।
মুসলিম লীগে যোগ দিলেও সাংগঠনিক নানা বিষয়ে তার সাথে মতবিরোধ দেখা দেয় দলের অন্য কয়েকজন নেতার সাথে। এ অবস্থায় ১৯১৪ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসে যোগদান করেন তিনি। ফজলুল হক তখন বাংলাদেশসহ ভারতের রাজনীতিতে ধীরে ধীরে জনপ্রিয় হয়ে উঠছেন। তিনি প্রথমে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সম্পাদক, পরে ১৯১৬-২১ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগের সভাপতি, এরই মধ্যে এক সময় জাতীয় কংগ্রেসের সেক্রেটারী জেনারেলসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯২০ সালে কংগ্রেসের অসহযোগ আন্দোলনে বৃটিশ পণ্য বর্জনের ডাকে সমর্থন দিলেও ছাত্রদের স্কুল কলেজের পাঠ বর্জনের সিদ্ধান্তের সাথে একমত হতে পারেননি শের-ই-বাংলা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর ছেলের যখন ক্ষতি কাটিয়ে উঠার জন্য ব্যাপক হারে স্কুল কলেজে যাচ্ছে তখন পাঠ বর্জনের সিদ্ধান্ত মুসলমানদেরকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এই নিয়ে মতদ্বন্ধে কংগ্রেস ছাড়েন তিনি।
এই পর্বে বিভিন্ন সময়ে সর্বভারতীয় রাজনীতিতে অংশ নিলেও শের-ই-বাংলা ফজলুল হকের দৃষ্টি নিবন্ধ ছিলো বাংলায় এবং বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাক্সক্ষা ঘিরেই সামনে আগাচ্ছিলেন তিনি। উপনিবেশি আমলের প্রথম দিকে বৃটিশ বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হিন্দু পুনর্জাগরণের সময় ধারণা করা হত বাংলাদেশে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। ১৮৭২ এবং ১৮৯১ সালের আদমশুমারিতে উঠে আসে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। দেখা যায় বাংলাদেশে মুসলমান জনসংখ্যার হার প্রায় ৭০ শতাংশ। পেশার বিচারে গ্রামাঞ্চলের খুচরা ব্যবসাবানিজ্য, দোকানদারী, কামারীকুমারী, জেলে, মালি, প্রভৃতি পেশায় হিন্দুরা বেশি ছিলো। ফলে ৭০ ভাগ মুসলমানের বেশিরভাগই ছিলো কৃষিকাজের সাথে জড়িত অর্থাৎ জমিদারের নানা শ্রেণির রায়ত। ফলে জমিদার জোতদারদের নির্যাতনের শিকার হত এরাই। ফজলুল এক তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনাতেই এই বিষয়টা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি এও উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, বাঙালি মুসলমান জনগোষ্ঠীকে প্রধানত হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ জমিদার-মহাজন-জোতদারদের শোষন-নির্যাতন থেকে মুক্ত করে স্বাধীন আর্থ-সামাজিক বিকাশের পথে এগিয়ে দিতে হলে জমির উপর কৃষকদের আইনগত মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে। আর বাংলার কৃষকদের আর্থ-সামাজিক মুক্তির মধ্য দিয়েই সূচিত হতে পারে বাঙালি মুসলমানের সার্বিক মুক্তির পথচলা। ফলে ফজলুল হকের রাজনৈতিক চিন্তা এ পথেই এগুতে থাকে।
১৯২৪ সালে খুলনা অঞ্চল থেকে আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। পাশাপাশি কৃষকদের অধিকার আদায়ের বিষয় নিয়ে কাজ করতে থাকেন। শেষ পর্যন্ত কৃষকদের আশা-আকাক্সক্ষার রাজনৈতিক রূপ দেয়ার সুযোগ আসে ১৯২৯ সালে। সে বছর জুলাইয়ের ৪ তারিখে বঙ্গীয় আইন পরিষদের ২৫ জন মুসলিম সদস্য কলিকাতায় সম্মেলন করে গঠন করেন নিখিলবঙ্গ প্রজা সমিতি। স্যার আবদুর রহিম সভাপতি এবং ফজলুল হক আরো চারজনের সাথে সহসভাপতি হন। মূলত কৃষকদের উন্নয়নের জন্যই এ দল গঠন করা হয়। ১৯৩৪ সালে আবদুর রহিম দলত্যাগ করার পর সভাপতির পদ নিয়ে মতানৈক্যের কারণে শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক প্রজা সমিতি থেকে বেরিয়ে এসে গঠন করেন কৃষক প্রজা পার্টি। সভাপতি ফজলুল হক নিজে। এবার তার দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন পুরণের পথে হাঁটার সুযোগ আসে।
১৯৩৭ সালের প্রাদিশেক পরিষদ নির্বাচনের সময় জমিদারী প্রথা উচ্ছেদ করে কৃষকদেরকে জমির মালিক বানানো, কৃষকদের ঋণ মওকুফ, কৃষকদের জন্য যথেষ্ট ঋণের ব্যবস্থা করে মহাজনী শোষণ থেকে রক্ষা করা, সর্বত্র খাল খননের মাধ্যমে সেচ সুবিধা সৃষ্টি করা, অবৈতন প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা ইত্যাদি দাবীতে মাঠে নামেন শের-ই-বাংলা তার ও নবগঠিত দল কৃষক প্রজা পার্টি। মুসলমান হিন্দু নির্বিশেষ বাংলাদেশের সকল কৃষক ফজলুল হককে সমর্থন জানান। প্রজা পার্টি ৩৫টি আসনে জয়লাভ করে তৃতীয় হয়েও মুসলিম লীগের সাথে সমঝোতায় গিয়ে মন্ত্রীসভা গঠন করতে সমর্থ হয়। মুখ্যমন্ত্রী হন ফজলুল হক।
ক্ষমতায় এসেই অন্তর্বিদ্রোহের মুখে পড়েন শের-ই-বাংলা। এ সত্ত্বেও কৃষদের জন্য কাজ চলতে থাকে। ফজলুল হকের প্রচেষ্টায় বিনা ক্ষতিপুরণে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদের উপায় বের করার জন্য ১৯৩৮ সালে গঠিত হয় ফ্লাউড কমিশন। সে বছরই পাশ হয় বঙ্গীয় প্রজাসত্ত্ব সংশোধনী আইন । ১৯৩৯ সালে গৃহীত হয় বঙ্গীয় নিয়োগ বিধি আইন যেখানে মুসলমানদের জন্য ৫০% কোটা নিশ্চিত করা হয়।
প্রকৃত অর্থে শেরে বাংলা মুখ্য মন্ত্রী হওয়ার পরই পিছিয়ে পড়া বাঙালি মুসলমান জনগোষ্ঠী সময়ের ক্ষতি কাটিয়ে সামনে আগানোর সুযোগ পায়। প্রজা পার্টির অন্তর্কলহ, পরে বিশ্বযুদ্ধ ইত্যাদি কারণে জমিদারী প্রথা উচ্ছেদে বিলম্ব হলেও পাকিস্তান হওয়ার পর ১৯৫০ সালে জমিদারী চিরতরে বিলোপ হয়, জমির মালিক হয় বাংলাদেশের কৃষক। শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হক যে সংগ্রাম শুরু করেছিলেন কুড়ি শতকের সূচনায় প্রায় ৪০ বছর পর সে স্বপ্ন বাস্তবায়িত করেন। বাংলার কৃষক সত্যি সত্যি জমির মালিক হয়।
পাকিস্তানের রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন ফজলুল হক। বাংলাদেশের মুখ্যমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্তী, গভর্ণর প্রভৃতি দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু বাঙালি জাতির জন্য তার মূল অবদান কৃষককে জমির মালিক হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা।
শের-ই-বাংলা ফজলুল হকের পর অনেক যুগ চলে গেছে। ১৯৭১ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। আর্থ-সামাজিক উন্নতির পথে এগিয়ে চলেছে বাংলাদেশ। আজ এত বছর যদি বলি এই পথ চলার সূচনা করে দিয়ে গিয়েছিলেন শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল তাহলে অত্যুক্তি হবে না আশা করি।
কুড়ির শতকের শেষ থেকে মানব সভ্যতায় এত এত পরিবর্তন এত দ্রুত ঘটে চলেছে যে, আমাদের স্মৃতিশক্তিকে রীতিমত যুদ্ধ করতে হচ্ছে অতীতকে নির্বিচারে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা ঠেকাতে। আমরা কি বাংলার কৃষকের মুক্তির অগ্রদূত, বাঙালি জাতির স্বাধীনতামুখি পথচলার দিশারী শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হকের কথা ভুলতে চলেছি? আমাদের ছেলে মেয়েরা কি জানে শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল কে? আজ তার ১৫০তম জন্মবার্ষিকীতে এ কথাগুলোই বেশি করে মনে পড়ছে।
ফয়েজ আলম, লেখক এবং গবেষক