ময়লা পোশাক- দেখলেই আমরা বুঝি। ডাস্টবিনের ময়লা দেখেই আমরা বুঝি- এখানে শহরের সব নোংরা জিনিসপত্র ফেলা হয়। কিন্তু মানুষ দেখলে কিভাবে শনাক্ত করবেন ইনি ভালো মানুষ ইনি মন্দ মানুষ? না, আমরা চেহারা দেখে তা শনাক্ত করতে পারি না কিন্তু আচরণ দেখে পারি। আচরণ প্রধানত প্রকাশ পায় আমাদের কথায়। মানুষ কথা দিয়ে মানুষের মন জয় যেমন করতে পারে তেমনি কথার কারণে উত্তেজিত হয়ে খুনও করতে পারে। একজন মানুষ কতোটা রুচিবোধ সম্পন্ন, কতোটা সভ্য তা তার কথার মধ্যেই প্রকাশ পায়। মানুষে মানুষে- সমাজ, সঙ্ঘ, সভ্যতা, রাজনৈতিক দল। এসব প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা, মান প্রকাশ পায় এর সমর্থক সমষ্টির আচরণে। আসলে ভাষার ব্যবহারই স্পষ্ট করে ওই জনগোষ্ঠি কতোটা সভ্য বা কতোটা অসভ্য।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর স্লোগান মন দিয়ে শুনলে যেকোন সভ্য মানুষ বিব্রত হতে বাধ্য। একজন সভ্য মানুষ হয়তো তার চরম শত্রুকেও এতোটা বাজে ভাষায় গালাগাল করে না।
'অমুকের চামড়া তুলে নেবো আমরা'
সব দলই এই স্লোগানটি তাদের প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যে দিয়ে থাকে। একজন মানুষের চামড়া খোলার দৃশ্যটি কল্পনা করুনতো...! কী বর্বর এই স্লোগান! এটা কি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গন্য করা যায় না? এই বর্বরতা যখন আপনার কথার মধ্যে লালন করেন তখন এটা নিশ্চিত যে এটা আপনার চিন্তায় আছে। অর্থাৎ আপনার বিরোধী রাজনৈতিক নেতা কর্মীদের নৃশংসভাবে হত্যা করার বিষয়টি আপনার চিন্তা এবং বাক্যে বিদ্দমান। কাজেই আপনি কোন রাজনৈতিক দল নয় একটি অসভ্য ঘাতক দলের সদস্য। রাজনীতির মাঠে নয় আপনার স্থান হওয়া উচিৎ জেল খানায় অথবা পাগলা গারদে।
'ছি ছি অমুক, লজ্জায় বাঁচি না'
যে আপনি রাজনীতি করেন রাষ্ট্রের উন্নয়ন বাজেট লুট করে খাওয়ার জন্য, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে চাঁদাবাজি করে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ার জন্য। হেন কোন অপরাধ নেই যার সাথে এদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের যোগ নেই, সেই নির্লজ্জ আপনি, কীভাবে এই স্লোগান দেন। অযোগ্য ফাতরা দলমালিক নেতা নেত্রীর পা চাটতে চাটতে নিজের জিহবা খুইয়ে ফেলেছেন! সেই আপনি!! একবারতো আয়নায় আপন বদন দেখা উচিৎ!
'অমুকের দুই গালে জুতা মারো তালে তালে'
একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী হিসেবে আপনি বিরোধী কোন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের দুই গালে তালে তালে জুতা মারার স্লোগান দিচ্ছেন। কী হাস্যকর! এটা কি মনে হয় না আপনি নিজের গালেও জুতা মারছেন তালে তালে! কেননা আপনিও কোন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী!
বলবেন- 'এতো কথার কথা! স্লোগান- সবাই দেয় আমরাও দেই।' একবারও কি মনে হয় না আপনার এই অর্থহীন ফেক স্লোগানের মতো আপনিও একজন ফেক রাজনৈতিক নেতাকর্মী! ভাবুনতো, আপনার মতো ফালতু লোকজনের দ্বারা দেশ পরিচালিত হলে এদেশে কোন দিন কি মানবিক সভ্যতা সৃষ্টি হওয়া সম্ভব?
'একটা দুইটা অমুক ধরো সকাল বিকেল নাস্তা করো'
একটা দুইটা অমুক তমুক বিরোধী পক্ষের লোক ধরে কি করবেন? হত্যা করবেন? লুট করে নাস্তা করবেন? আপনি কি ডাকাত দলের সদস্য? ভাই আপনার মতো অপরাধী কেনো রাজনৈতিক অঙ্গনে? আপনারতো জঙ্গলে কিংবা জেলে থাকার কথা! নিশ্চয়ই সাধারণ মানুষ এসব অপরাধীদের কাছে তাদের অধিকারের বিষয় নিয়ে আসতে রাজি নয়। ডাকাতকে কেই আশ্রয় হিসেবে নির্বাচন করে না।
'অমুকের ফাঁসি চাই, আর কোন দাবী নাই'
একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর কাছে সাধারণ মানুষ আশ্রয় গ্রহণ করে। তাদের মধ্যে দয়ামায়া, মানবিক মূল্যবোধ থাকবে এটাই প্রত্যাশা। কিন্তু বিরোধী কেউ হলেই কেনো তার ফাঁসি চান? যদি সে গণহত্যার নায়ক বা দেশদ্রোহী না-হয়?
একজন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী হিসেবে আপনার কি মনে হয় না এটা আপনাদের আচরণগত অসুখ?
'জ্বালো জ্বালো আগুন জ্বালো'
একটা কিছু হলেই মিছিলের প্রধান স্লোগান হয়ে যায় 'জ্বালো জ্বালো আগুন জ্বালো'। কোথায় আগুন জ্বালবেন? নিশ্চয়ই দেশের জনগণের কোন গাড়িতে, কোন বাড়িতে? অথবা রাষ্ট্রীয় কোন সম্পদ? এছাড়া আর কোথায়? এমনটাইতো দেখে এসেছি! আপনি কি গণশত্রু নন? রাজনৈতিক দল হিসেবে আপনার দলের নিবন্ধন কি খারিজ হওয়া উচিৎ নয়? অথবা একজন অপরাধী হিসেবে আপনার জন্য শাস্তি নির্ধারণ করা কি কোন সভ্য সমাজের দায়িত্ব নয়?
এবিষয়ে বিএনপির সাবেক মহাসচিব মান্নান ভূইয়া বলেছিলেন- বৃটিশ আমলে একটা প্রবাদ ছিলো 'সরকারি মাল দরিয়ায় ঢাল কিন্তু এখনতো স্বাধীন দেশ'।
সে ছিলো ঔপনিবেশিক শাসন আমল। বিদেশি শাসকের সম্পদ ধ্বংস করে দেশ স্বাধীন করার সংগ্রাম। কিন্তু এখন? আপনি একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক। আপনার দেশ- জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র। রাষ্ট্রীয় সম্পদটি আপনার ট্যাক্সের পয়শায়ই কেনা, ওটি নষ্ট হলে আপনারই ক্ষতি! অথচ সেটাই ধ্বংস করছেন! কারণ? লুটপাটের জন্য আপনার হাতে রাষ্ট্র ক্ষমতা চাই!
'একশান একশান ডাইরেক্ট একশান'
এই স্লোগানটি সম্ভবত ১৯৪৬ সালে দেশ ভাগের আগে পাকিস্তান প্রস্তাবের পক্ষে মিছিলের স্লোগান। সেই ডাইরেক্ট একশান ডে, রক্তাক্ত দাঙ্গা! পাকিস্তান হাসিল, পাকিস্তান শেষ কিন্তু ডাইরেক্ট একশানের স্লোগান এখনও বিদ্দমান! কেনো আজও আক্রমণের হুঙ্কার হয়ে আছে এই স্লোগান। কাকে আক্রমণ করবেন, কেনো আক্রমণ করবেন আর আপনার স্বার্থপরতার জন্য এই স্লোগান আদৌ কি উপযুক্ত!
এমন অনেক অযৌক্তিক, অমার্জিত স্লোগান আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো দিয়ে থাকে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট সকল মহলের ভাবা উচিৎ। কেননা আগামী প্রজন্ম আপনাদের আচরণ এবং তৎপরতা থেকে এই সব অসভ্যতার চর্চা করছে এবং শিখছে।