জনজাতি বলতে কৌম অথবা ট্রাইব বোঝায়। বহুযুগ আগে থেকেই ভারতের নানা প্রান্তে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জনজাতি আস্তানা করেছিল। শোনা যায় ৬৫ হাজার বছর আগে আদি জনজাতির হদিসও দক্ষিণ ভারতে নাকি পাওয়া গেছে। এরা মূলত হান্টার গ্যাদারার ছিল। যারা ধীরে ধীরে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায় যায় খাদ্যের সন্ধানে। হয়ত কয়েক হাজার বছরে। ধীরে ধীরে এদেশে নানা প্রান্তে এসে বসবাস শুরু করে। বসবাস দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কয়েকশো বছরে এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায়। পরিযায়ী। একই রকম ভাবে ইওরোপের সেন্ট্রাল স্টেপস থেকে অন্য আর একদল হান্টার গ্যাদারার জনজাতি কয়েকশ বছরে ইরান হয়ে হিন্দুকুশ পেরিয়ে উত্তর পশ্চিম ভারতে এসে বসবাস শুরু করে। এরাও আসার পথে নানা জায়গায় আস্তানা করেছিল। মাঝে ইরান প্রভাবিত আর একটি জনবসতি গড়ে উঠেছিল সিন্ধু তীরে। এরা হান্টার গ্যাদারার থেকে কৃষিজীবী এবং কারিগর বণিক হয়ে উঠে একটা উন্নত সভ্যতা গড়ে তুলেছিল। সিন্ধু সভ্যতা। খুব সম্ভব প্রাকৃতিক কারণে সেই সভ্যতা বিলুপ্ত হয়। তবে মানুষগুলো বিলুপ্ত হয়নি। তারা নানা দিকে ছড়িয়ে পড়ে।
ঋগ্বেদে ভারত নামে একটি জনজাতির উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে। সেই জনজাতি ওই স্টেপস থেকে আসা কোনও এক শক্তিশালী ট্রাইবের হবার সম্ভাবনাই প্রবল। এই ট্রাইবই কালে কালে আর্যাবর্তে মুখ্য হয়ে ওঠে বলেই ভারত নামের জন্ম। মহাভারত মহাকাব্যের নাম কিন্তু গোড়ায় মহাভারত ছিল না। আদি নাম ছিল জয় সংহিতা। মহাভারত নাম কবে হল? খুব সম্ভব গুপ্ত যুগে। ২০০বিসিইর আগে কিছু লেখা পাওয়া যায়নি। সব শ্রুতি ছিল। দীর্ঘ দিনের বৌদ্ধ বিদ্রোহ কাটিয়ে উঠে ব্রাহ্মণ্যবাদের পুনরুত্থানের পর। এরপর বেদ উপনিষদ ইত্যাদি সব পুনর্লিখিত হল। জয় সংহিতা নাম বদলে মহাভারত নাম হল। কাহিনীতে গীতার অনুপ্রবেশ হল। শ্রুতি ধীরে ধীরে উঠে গেল। ঠিক যেভাবে আজ হিন্দত্ববাদিরা ইতিহাস ভূগোল সব সম্পাদনা করে সনাতনি বক্তব্য ঢোকাচ্ছে, তেমনি করেই গুপ্ত যুগে সব বৈদিক সাহিত্যই বদলে দেওয়া হল। ধরা পড়ার ভয় নেই। কেননা এতদিন সব শ্রুতি ছিল। কোনো রেকর্ডার ছিল না। মুখে মুখে পরিবর্তন হয়ে যায়। এবার কি করে দেশের নাম ভারতবর্ষ হল? যে কোন অঞ্চলের নামকরণ বহিরাগতরাই করে। গ্রিক থেকে আরাবিয়ান, ইন্দিয়া, ইন্ডিয়া, ইন্দ, ইন্দু, হিন্দু ইত্যাদি নানা উচ্চারণ বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে ১২০০ সাল নাগাদ হিন্দুস্তান নামটাই পাকাপাকিভাবে প্রশাসনিক হল। ব্রাহ্মণ্যবাদীরা মনে মনে সেটা মানতে পারে নি। বৃটিশ যুগে এসে তারা হঠাৎ ভারতবর্ষ নামের ওপর জোর দিতে শুরু করল। অবশেষে " India that is bharata" হয়ে গেল। ইতিহাসে অজস্র স্ববিরোধী তথ্য পাওয়া যায়। শুধু রামায়ণ মহাভারত নিয়ে গবেষণা করতে গেলেই কয়েক লক্ষ পাতা খুটিয়ে পড়তে হবে। এমনকি চিনেও নাকি ১৯০৬সালে একগাদা তালপাতা পাওয়া গেছে,তাতেও মহাভারতের কিছু রেফারেন্স আছে। ভরসা তাই পাণ্ডিত্য নয়। কাণ্ডজ্ঞান। এ শুধু আমার কাণ্ডজ্ঞানের কেলেঙ্কারি।
অরূপশঙ্কর মৈত্র,নাট্যকার, নাট্য পরিচালক ও লেখক। নিবাস: দক্ষিণ কলকাতা