পদ্মাসেতু আর স্বপ্নের মাঝে নেই। এখন স্বপ্নীল বাস্তবতা। নিশ্চয়ই এই কৃতিত্ব বাংলাদেশের জনগণ এবং শেখ হাসিনা সরকারের।
প্রাচীন কাল থেকেই বৃহত্তর ঢাকা ছিলো বাংলার অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক কেন্দ্র। আড়াই হাজার বছর আগের ওয়ারী বটেশ্বর, কখন সোনারগাঁও, কখনও সাভার, গাজীপুর, কখনও বিক্রমপুর ভাগ, আবার কখনও সুবে বাংলার মুঘল রাজধানী ঢাকা- যার প্রমাণ।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিলো রাজধানী ঢাকার সাথে সারা দেশের নিরবিচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ।
কিন্তু হাজার নদী পরিবেষ্টিত এই বাংলায় এটা ছিলো কঠিনতর কাজ।
পদ্মা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনার মতো পৃথিবীর বড় বড় খরস্রোতা নদীগুলো বয়ে চলছে এই ভূখণ্ডের বুক চিড়ে।
প্রথমে মেঘনা সেতুর মাধ্যমে দেশের পূর্বাঞ্চলের সাথে তথা সিলেট- চট্টগ্রাম- কুমিল্লা- নোয়াখালীর সাথে রাজাধানী ঢাকার নিরবিচ্ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ স্থাপন হয় নব্বই দশকের শুরুতে ।
অতঃপর, ব্রহ্মপুত্র এবং তিস্তা কন্যা- পাগলী নদী যমুনার বুকে বাংলাদেশ তৈরি করে বঙ্গবন্ধু বহুমুখী সেতু। রাজধানী ঢাকার সাথে যুক্ত হয় উত্তর বঙ্গের ষোল জেলা। সেই সাথে কুষ্টিয়ার লালান সেতুর মাধ্যমে দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলও কিছুটা সুফল ভোগ করে।
কিন্তু দেশের একতৃতীয়াংশ জেলা দক্ষিণ এবং দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে। রাজধানী থেকে বিচ্ছিন্ন। মাঝখানে বয়ে চলেছে পৃথিবীর ভয়াঙ্করতম খরস্রোতা নদী পদ্মা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃঢ় ইচ্ছা পোষণ করলেন এই প্রমত্ত পদ্মার উপর তৈরী করতে হবে পৃথিবীর অন্যতম দীর্ঘ এক সেতু। জনগণ খুসি হলো, আশায় বুক বাঁধলো। শুরু হলো কার্যক্রম, অর্থসংস্থানের কাজ। বিশ্বব্যাংকের সাথে সরকারের একটি ঋণ চুক্তি হলো। আলো পড়লো সম্ভাবনার দুয়ারে।
কিন্তু বিশ্ব ব্যাঙ্কের প্রভু সূলভ আচরণ, লুটেরা মনোবৃত্তি অচিরেই বিব্রতকর অবস্থায় ফেলে সরকারকে। সেই সাথে যুক্ত হয় দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্র। এক পয়সা না দিয়েই দূর্নীতির অভিযোগ তুলে ঋণ চুক্তি থেকে সটকে পড়ে বিশ্ব ব্যাংক। মাঝখানে হেনস্তা করে যায় সরকারের মন্ত্রী এবং উচ্চপদস্থ অনেক কর্মকর্তাদের আর বাংলাদেশের উপর রেখে যায় বেহুদা বদনাম।
দেশের সাধারণ মানুষ অপমানিত বোধ করে, ক্ষুব্ধ হয়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জনগনের সেই ক্ষোভ এবং ইচ্ছে বুঝতে পারেছিলেন। তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে নিজস্ব অর্থে পদ্মাসেতু নির্মাণের ঘোষণা করেন। জনসাধারণ খুসি হলেও বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী এবং নাগরিক সমাজের অধিকাংশের মধ্যে হাসির রোল পড়েযায়। পদ্মাসেতু আর হচ্ছেনা বলে বহুল প্রচারিত অনেক গণমাধ্যমে সংবাদ শিরোনাম হয়।
ঠিক এই সময় এগিয়ে এলেন একজন অর্থনীতিবিদ, অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত। তিনি গবেষণা করে দেখিয়ে দিলেন- অপ্রচলিত কিছু উৎসের উপর কর আরোপ করে চার বছরে চারটি পদ্মাসেতু তৈরী করাও বাংলাদেশের পক্ষে সম্ভব। জনগন এবং প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন যে বাস্তবায়ন যোগ্য তা একজন গবেষক সমকালি অর্থনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে গবেষণা করে মিডিয়ার সামনে উপস্থাপন করেন। জনমনে সাহস বাড়ে কিন্তু বিভিন্ন বিরূদ্ধ মহাল থেকে আসে নানারকম সমালোচনার ঝড়।
যদিও ড. বারকাত এবিষয়ে কোন কৃতিত্ব দাবি করতে নারাজ। তিনি মনে করেন এটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বাংলাদেশের জনগণের কৃতিত্ব।
সমস্ত বাধা ডিঙিয়ে পদ্মাসেতু আজ বাস্তব।
নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতুর বাস্তবায়ন বাঙালি জাতির আত্মবিশ্বাস এবং মনোবলকে নিশ্চয়ই আজ বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। আশা কারা যায় ভবিষ্যত প্রজন্ম মহাকাব্যিক এক উত্থানের শক্তি পাবে পদ্মা সেতু নামক স্মারক চিহ্ন থেকে।
- রাজু আহমেদ মামুন, সম্পাদক, ঢাকারিপোর্ট২৪.কম এবং সাপ্তাহিক ধাবমান।