শনিবার, নভেম্বর ৭, ২০২৬

২৩ কার্তিক ১৪৩৩

সরকার অনুমোদিত অনলাইন গণমাধ্যম
BD.GOV.REG.NO-88

শনিবার, নভেম্বর ৭, ২০২৬

২৩ কার্তিক ১৪৩৩

সরকার অনুমোদিত অনলাইন গণমাধ্যম
BD.GOV.REG.NO-88
**সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ**

>> চাঁদপুর জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি নাছির আটক

>> ইরানে হামলা না চালালে ইসরাইল পৃথিবীর মানচিত্র থেকে মুছে যেত: ট্রাম্প

>> ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের ভেতর বাসে আগুন

>> ইরানের ফের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র

>> পোশাকশ্রমিকদের নতুন মজুরি এখনো চূড়ান্ত হয়নি: বাণিজ্যমন্ত্রী

>> তাহসিফের মৃত্যু: রিমান্ডে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিলেন বান্ধবী দিশা

>> ৪ দেশের জন্য হরমুজের দরজা খুলে দিল ইরান

>> গোপালগঞ্জে সাবেক ৩ ইউপি চেয়ারম্যান কারাগারে

>> অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি শ্রমমন্ত্রী

>> যুক্তরাষ্ট্রে ৫৪৮ জনের মৃত্যুদণ্ড বাতিল করলেন ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর

আপনি পড়ছেন : মতামত

আরেক কালান্তরে: আহমদ রফিকের অবগাহন ও রবীন্দ্র ভাষাপ্রপঞ্চ


ডক্টর পাবলো শাহি
DhakaReport24.com || 2022-05-09 20:36:45
আরেক কালান্তরে: আহমদ রফিকের অবগাহন ও রবীন্দ্র ভাষাপ্রপঞ্চ

১৯২৯ সনে ব্রিটিশ ভারতে জন্ম নিয়ে আহমদ রফিক যে রাজনৈতিক উত্তাপের মধ্যে বড়ো হয়েছেন, সেই  উত্তাপ তাঁর লেখা ও ধ্বনির শরীরে চংক্রমিত গান হয়ে আছে।
প্রাবন্ধিক,কবি ও কলামিস্ট খ্যাত আহমদ রফিকের শেষ পরিচয় হয়েছিল রবীন্দ্র শব্দ-আশ্রিত কাকতালের ভেতর।

ব্রিটিশের রাষ্ট্রীয় বল প্রয়োগ ভারত তথা বাংলাকে আক্রান্ত ও অতিক্রান্ত করেছিল, বাংলাসাহিত্যে তার বড়ো প্রমাণ হয়ে আছেন কাজী নজরুল ইসলাম ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
এই দুই যুগদ্রষ্টা কবির একজনকে নিয়ে বয়ান 'আরেক কালান্তরে'।

 উপনিবেশি শাসন ও 'বাংলা' উইরোসেন্ট্রিক ভাষাতে রূপান্তরে উইলিআম ক্যেরির প্রচেষ্টা ও সাইলেন্স অফ কনস্প্রেসি এই কালখণ্ড জুড়ে।

উহ্যত, এই চংক্রমণে বাঙালির প্রধান ধর্মসত্ত্বা মুসলিম ও হিন্দু সম্পর্ক আর ব্রিটিশের শোষণ ও বাংলাখণ্ড জুড়ে রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের বিরোধী  আন্দোলনে নজরুল ছিলেন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী,  কার্যত সক্রিয় ভূমিকা না থাকলেও রবীন্দ্রনাথ সাংস্কৃতিক বৃত্তে রচনা করেছিলেন এর বিরুদ্ধে নানা প্রতিরোধের ভাষা।
আহমদ রফিক আটটি পর্বে আটটি প্রবন্ধে সেই হদিস উপ্ত করেছেন 'আরেক কালান্তরে'।

এই অভিসন্দ্বর্ভে আহমদ রফিক চেয়েছেন রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে নানা সময়ের বিতর্কের হাজির-জবাব দিতে। সে ক্ষেত্রে তিনি মাথায় রেখেছেন রবীন্দ্র বিরোধী ও পূজারীদের  ।
সেই বিতর্ক যেমন তাঁর(রবীন্দ্রনাথের) জীবদ্দশাতে ছিল, বাংলার মার্ক্সবাদী ইস্কুল থেকেও ছিল। অধিকন্তু, '৪৭ পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাবনার মধ্যেও ছিল।

খাজা নাজিমুদ্দিন এর ভাই খাজা শাহাবুদ্দীন কর্তৃক রবীন্দ্র বিরোধিতা সে ক্ষেত্রে নোতুন বেগ তৈরি করে '৬৯ -এ। 

কার্যত আহমদ রফিকের 'আরেক কালান্তরে'-    '৫২ থেকে ৬৯' এর মন্ত্র- 'খুন হয়েছে আমার ভাই / খুনি তোদের রক্ষা নাই' -এই উচ্চারণকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

 ২.
রবীন্দ্র গবেষণা আহমদ রফিকের আগ্রহের একটা অনুসন্ধিৎসা ছিল আমৃত্যু। উহ্যত, রবীন্দ্রনাথের রাষ্ট্রীচিন্তা ও বাংলাদেশ (১৯৮৭),  'ছোটগল্প: পদ্মাপর্বের রবীন্দ্রগল্প' (১৯৮৭), 'রবীন্দ্রনাথের চিত্রশিল্প' (১৯৯৬),  'রবীন্দ্রভুবনে পতিসর' (১৯৯৮), ' প্রসঙ্গ: বহুমাত্রিক রবীন্দ্রনাথ '  (২০০২),  ' রবীন্দ্র ভাবনায় গ্রাম: কৃষি ও কৃষক ' (২০০২) রফিকের এই অনুসন্ধিৎসা চলমান ছিল।

 রফিক দেখাতে চেয়েছেন এই অভিসন্দর্ভ কিতাবে এই যে- রবীন্দ্রনাথ কি ভাবচর্চা করতেন, কি তাঁর চৈতন্যধর্ম , রাজনৈতিক অনুধ্যান , জাতীয়তাবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ নিয়ে আপ্ত উপাত্ত।

 ফলত, 'আরেক কালান্তরে' আহমদ রফিকের এই প্রস্তাবনা , "কথা বলি আরেক ভাষার" ভাবপ্রপঞ্চ  হয়ে আছে।
অধিকন্তু, রবীন্দ্রাশ্রিত উইরোসেন্ট্রিক বাংলা ভাষাভাষী বিদ্বৎসমাজ নির্মাণে যারা ভূমিকা রেখেছেন কার্যত, আহমদ রফিক  হয়ে উঠেছেন তাঁদের একজন।

তাঁর প্রণীত এই কিতাব সহ সবগুলি গ্রন্হই এই পাঠ দ্বারা ইতোপূর্বে রক্ষিত।


 রফিকের সিনথিসিস হলো যে-   রবীন্দ্রনাথ, উপনিবেশী শাসনামলে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা বা কাজী নজরুল ইসলামের মতো সক্রিয় অংশগ্রহণ না করলেও; জাতীয়তাবাদী আন্দোলন, মুসলিম-হিন্দু মিলন সম্পর্ক এবং ব্রিটিশ শাসনের অবসান কল্পে -এই সবক্ষেত্রে ভাবচর্চা জারি রেখেছিলন।

 নজরুল যেমন সক্রিয় তাৎপর্য নির্মাণ করেছিলেন - 'এদেশ ছাড়বি কিনা বল/  নইলে তোদের কিলের চোটে হাঁড় করিবো জল'।
রবীন্দ্রনাথ সেখানে সুর প্রপঞ্চে বললেন -  'ও আমার দেশের মাটি /তোমার পরে ঠেকাই মাথা'।

 নজরুল তাই দ্রোহ চেতনায় অগ্নিবীণা'র মন্ত্রে বাঙালির উজ্জীবনের উৎসার আর রবীন্দ্রনাথ সেই ভাবের ঘরের সোপান।
 
রবীন্দ্রনাথের এই সোপান কিভাবে নির্মিত হয়েছে  'আরেক কালান্তরে' তাকে পাঠচোক্ষে খুলে দেখাবার আয়োজন করেছেন আহমদ রফিক।

ব্যক্তি রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যের বুঝাপড়া  নিয়ে তর্ক আছে বাঙালির মনে, কালান্তর জুড়ে সে সবের  অবসান ঘটেনি বা ঘটা সম্ভব নয় হয়তো?

 এই সবকিছু আহমদ রফিক দেখেছেন তাঁর বিশ্লেষিত মন ও নানা বৌদ্ধিক চিন্তা থেকে। কাজেই রবীন্দ্র বিরোধিতা ও গুণকীর্তন তিনি হজম করেছেন নানা ঔদর্যের ওছিলায়।


আমার পারিবারিক লাইব্রেরিতে (নানার লাইব্রেরিতে) রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, জীবনানন্দ দাশ অপাঠ্য ছিল; বুর্জোয়া কবি সাহিত্যিক বলে। 
সোভিয়েত প্রগতি,রাগুদা আর চীনা লাল বইয়ের সঙ্গে হাতে পেয়েছিলাম কেবলমাত্র নজরুল, সুকান্ত,মাণিককে আরো পরে সুভাষ মুখোপাধ্যায় তারপর বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। 
আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান ও শঙ্খ ঘোষ পড়েছি কলেজ পর্বে।

মার্ক্সবাদী ঘরে এভাবে পাঠ হতো। চল্লিশের দশক থেকে মার্ক্সবাদীরা রবীন্দ্রনাথকে অছ্যুত জ্ঞান করেছিলেন। তাঁদের বিবেচনায় এই প্রতিক্রিয়া ও পাঠ বাছাই সাহিত্যকেন্দ্রীক বৌদ্ধিক জগতকে সীমাবদ্ধ করেছিল বিবেচনা করি?


এই হিংসা ও শব্দআগুনে বিদ্ধ হয়েছিলেন কবি হুমায়ুন কবীর।কবি আহমেদ নকীবের ঘরের সামনে তাঁকে মার্ক্সবাদী লেনিনবাদী ছুরির নিচে প্রাণ দিতে হয়েছিল, জীবনানন্দ দাশের মতো বুর্জোয়া কবিকে নিয়ে PH D অভিসন্দর্ভ রচনার জন্য।


ফলে নানা ব্লাক আর্ট ও সংশয় আর প্রপঞ্চ-চংক্রমণ আছড়ে পড়ে রবীন্দ্র সাহিত্য বা রবীন্দ্র ভাবমানস বিচার। এর সঙ্গে যুক্ত হলো পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী ও পূর্ব বাংলার সাহিত্য সংস্কৃতির রক্ষণশীল অ‍ংশ।

পরে অবশ্য গণতন্ত্রী ও প্রগতিশীল সংস্কৃতিচর্চার এস্টাবলিশমেন্ট বিরোধী অংশে রবীন্দ্রনাথ হাজির হতে থাকেন।


ভেতর চাপা পড়ে থাকে- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তপ্রাপ্ত ফড়িয়া জমিদারী আর ১৯৪৭ পরবর্তী এইসব আর্যত্বের অবসান হয়তো অন্য জমিদার-নন্দনের মতো রবীন্দ্রনাথকেও সংশয়ী করেছিল?


 কার্যত, ১৯৩০ পরবর্তী সময়ে তাঁর লেখা ও মানসলোকে সেই দোলাচল প্রকট হয়ে ওঠে? কেননা, উইরোসেন্ট্রিক ঘরনার ধর্ম 'বাহ্ম' -এর পারিবারিকভাবে অনুসারী হয়েও ;  হয়তো তাঁর সংশয়ী মন  হিন্দু সেজে থাকার ঘোষণা দিয়েছে বারবার?

 

 এখানেই একথার শেষ নয় । অধিকন্তু-  আমাদের বিচার্য এই যে, রবীন্দ্রনাথ মূলত কবি এই বিবেচনা মাথায় রেখে;  ভাষা ও সংস্কৃতির নানা উদ্ধরণ প্রকল্পে রবীন্দ্র উদ্ভাসকে সঙ্গে নিয়েই অভিনোতুন চাবিশব্দের সন্ধান করতে হবে আমাদের।

ক্লেদজোকুসুম নিয়ে মানুষ-রবীন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্র মানবমহত্ত্ব দুটিই হাজির থেকেছে রবীন্দ্রসাহিত্য-কল্পনালতায়। এই কথা ও পাল্টাকথার সূত্রমূখ ধরে অর্থাৎ তাঁকে বিচার করতে গিয়ে আমাদের সংস্কৃতির বাছবিচার অনেকটা এগিয়ে যেতে  পারে। কার্যত রবীন্দ্র পূজা ও বিরোধীতার মাঝখানে আমাদের সড়ক।