(৩য় পর্ব )
সংস্কৃতির রূপান্তর
১৩১০ সালের ৪ঠা অগ্রহায়ন ‘মিহির ও সুধাকর’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় দীনেশচন্দ্র সেনের ‘মাতৃভাষা’ নামক একটি প্রবন্ধ। ওখানে দীনেশবাবু লিখেন: “মুসলমান হিন্দু সাহিত্য পাঠে--হিন্দু আচার-ব্যবহার শিক্ষায় ক্রমেই হিন্দু ভাবাপন্ন হইয়া পড়িবে; তাই বাঙ্গালা সাহিত্য সমন্ধে উদাসীন থাকা মুসলমানদের উচিত নহে।”১৪ অত্যন্ত মেধাবী, প্রকৃত দেশপ্রেমিক ও প্রাজ্ঞ মানুষ দীনেশবাবু প্রায় একশ কুড়ি বছর আগে লক্ষ্য করেছিলেন সাহিত্য তথা বইপত্রে ভিন্নতর সংস্কৃতি উপস্থাপন ও তা পাঠের মধ্য দিয়ে একটা জাতির সাংস্কৃতিক স্বভাব বদলে যেতে পারে, ধীরে ধীর মরে যেতে পারে তার নিজস্ব সংস্কৃতি। বহুবছর পর এ বিষয়ে সচেতন হয় বিভিন্ন উপনিবেশের মানুষেরা। বইপত্রে, শিক্ষাদীক্ষায় ভিন্ন ধারার জ্ঞান, মূল্যবোধ, ইতিহাস ও সংস্কৃতি উপস্থাপনের মাধ্যমে একটা জাতির মগজ দখল করার এই প্রক্রিয়াটাকেই বলা হয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। পৃথিবীর প্রাক্তন উপনিবেশগুলোয় এ কায়দাটাই প্রয়োগ করেছিল উপনিবেশী শক্তি। এ নিয়ে এখন বিস্তর লেখালেখি, তত্ত্ব দাড়িয়ে গেছে। তার বহু আগে দীনেশবাবু সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের এই চোরা স্রোতের দিকে ইঙ্গিত করে সতর্ক করেছিলেন সমকালীন মুসলমানদের। বাঙালি মুসলমানের সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানজগত যে অবস্থায় পৌঁছার পর দীনেশ বাবু সতর্কবাণী জারি করেন সেই মাত্রায় পতনেরও একটা ইতিহাস আছে। সেটি ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, বাংলা গদ্য এবং বিদ্যালয় ও বিদ্যালয়ের বাইরে পাঠ্য বইপত্রের সাথে শক্ত করে জড়ানো।
উনিশ শতকের আগ পর্যন্ত বাঙালির সাংস্কৃতিক চর্চার জগতে লিখিত বইপুস্তকের খুব একটা ভূমিকা ছিল না। মূলত চোখে দেখে শিখা ও আর মুরুব্বিদের কাছে শুনে শুনে জানার মধ্য দিয়ে সংস্কৃতির শিক্ষা সম্পন্ন হতো। খুব ছোটোবেলা থেকে পরিবারের বয়স্ক সদস্যরা, এরপর আশাপাশের মানুষ স্বাভাবিক জীবন যাপনের মধ্যেই সংস্কৃতির চিহ্নগুলো শিখিয়ে দিতেন নতুনদেরকে; তাও সংস্কৃতি নামে না, জীবনের আনন্দউল্লাস আচার-প্রথা হিসাবে। হাতে লেখা বই পড়ে শোনানোর একটা রেওয়াজ ছিল সে আমলে। যারা পড়ে শোনাতের তাদেরকে বলা হতো কথক। মাঝে মধ্যে কথকদের মুখে শোনা ঐসব কাহিনি সংস্কৃতি চর্চায় খুব একটা ছাপ ফেলতে পারতো বলে মনে হয় না। মোট কথা আজকের দিনে সংস্কৃতি পরিভাষায় যে বিস্তৃত পরিসরের চর্চার একটা বিষয় তৈরি হয়েছে তখন তার জায়গাটা ছিল অনেক ছোটো এবং জীবনযাপনের অংশ হিসাবেই তা রপ্ত হতো।
উনিশ শতকের শুরুতে ইংরেজের নির্দেশে পন্ডিতদের হাতে বাংলা গদ্য তৈয়ার হওয়ার পর বই পুস্তক লেখা ও ছাপা হতে থাকে। অচিরেই বাঙালির ছাপাখানাও বসে। নতুন কায়দায় স্কুল প্রতিষ্ঠা হয়, স্কুল বুক সোসাইটি এবং স্কুল সোসাইটি গড়ে উঠে। দুইতিন দশকের মধ্যে পড়াজানা বাঙালির জীবনের নতুন অনুসঙ্গ হয়ে উঠে ছাপার বই। বই থেকে শিখার ব্যাপারটা আগে ছিল কেবলই সংস্কৃত ব্যবসায়ী ব্রাহ্মণ ও মোল্লা মৌলভীদের মামলা। ছাপা বই হাতের কাছে আসার পর বইয়ের পাঠ থেকেও যে শিখা যায় এবং শিখতে হয় এই ধারণা জায়গা করে নেয় সাধারণ মানুষের মধ্যে। এবং এখান থেকেই বাঙালির সংস্কৃতিতে বইয়ের ভূমিকার সূচনা।
আদি মধ্যযুগে মানুষের জানার পরিধি ছিল সীমিত। আধুনিকযুগে তা বহুবিস্তৃত। আধুনিক মানুষ ছাপা পৃষ্ঠার প্রতীক ও সংকেতের মধ্য দিয়ে অনেক কিছু জানতে পারে। সাধারণের সমাজে এ ধরনের জানার সূচনা হয় লেখা ছাপার কৌশল আবিষ্কৃত হওয়ার পর। ভারতে তার আরম্ভকাল আঠার শতকের শেষে। বাংলা বই ছাপা শুরু হয় একেবারে শেষদিকে। এই সুযোগে বাঙালি বই পড়ে দেখার জগতের বাইরে আরো বিচিত্র ভিন্ন ভিন্ন জগত ও জীবন কল্পনায় দেখতে পায়। পাঠের মাধ্যমে মনে মনে দেখা সেই জগতে মানুষ আছে, জীবন ও তার যাপন আছে। সেই জীবনেরও আচার প্রথা আছে, আনন্দ-উল্লাসের জন্য কিছু কিছু তৎপরতা আছে, সৃজনশীলতা আছে; যেগুলোকে আধুনিক কালে একত্রে সংস্কৃতি নামে ডাকা হয়, তার সবই সেখানে আছে। তাই নিজের জীবনের চচির্চত সংস্কৃতি আর পাঠের জগতের সংস্কৃতির তুলনা করার ও প্রয়োজনে পাঠের জগতকে অনুকরণের বাসনা দেখা দেয় তার মধ্যে। সংস্কৃতির বোধ গড়ে তোলা ও চর্চা করার কাজে লেখা-পাঠ তথা বইয়ের ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি হয়। উনিশ শতকের শুরু থেকেই নতুন বাংলায় লেখা নতুন ধরণের রচিত বইপত্রের মাধ্যমে উপস্থাপিত পাঠের জগতের নানা উপাদান বাঙালির জীবনে জায়গা করে নিতে থাকে, যা আসলে তার ঐতিহ্যিক সঞ্চয় নয়। এই পরিস্থিতির ব্যাপারেই বাঙালি মুসলমানদের সতর্ক করেছিলেন দীনেশচন্দ্র সেন। ততদিনের পার হয়ে গেছে সত্তর আশি বছরেরও বেশি সময়। বাঙালি মুসলমানের মনে, মননে ও জীবনচর্চায় যে-প্রভাব যতটুকু পড়ার কথা তা যথারীতি ঘটে গেছে। কি করে তা ঘটলো সে সম্পর্কে একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণ আমরা এখানে হাজির করতে চাই।
প্রজাদের কাছ থেকে নানা কায়দায় অর্থ সংগ্রহ করে নিজের হিস্যা রেখে নির্ধারিত অর্থ রাজকোষে পৌঁছে দেয়ার ঝামেলার কাজটা করতো রাজস্ব সংগ্রহে জড়িত কর্মচারী-সামন্ত-জমিদাররা।মুসলমান কর্মচারীদের অবিশ^স্ততার কারণে রাজস্ব আদায়ে হিন্দু কর্মচারীদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিলেন মুর্শিদ কুলি খান। এ ব্যবস্থা পরেও অব্যাহত থাকে। সিরাজ উদদৌলার সময় হিন্দুদের প্রাধান্য আরো বাড়ে। বৃটিশ দখলাদারিত্বের আগে আগে অর্থ ব্যবস্থা ও রাজস্ব ব্যবস্থার প্রায় পুরাটাই হিন্দু কর্মচারীদের হাতে উঠে গিয়েছিল। মুসলিম অভিজাত শ্রেণির অধিকাংশের আমিরানা চলতো মাসিক বেতন/বরাদ্দ/জায়গীর নানা তরফের উপহার উপটোকন ও অন্যান্য পাওয়া থেকে।
শাসন ক্ষমতা ইংরেজদের হাতে চলে যাওয়ার পর মুসলমানরা রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতার জায়গাগুলো হারাতে থাকে ইংরেজদের সচেতন উদ্যোগে। সে জায়গা দখল করে উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা। এটি ছিল খুবই স্বাভাবিক পরিণতি। মুসলমানদেরকে পরাজিত করে ক্ষমতা নেয়ার কারণে বৃটিশরা তাদেরকে বিশ্বাস করার কথা নয়। বর্ণ হিন্দু সমাজের প্রতিপত্তিশালী বেশ কিছু লোক পলাশির ষড়যন্ত্রের সহায়ক শক্তি হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে ইংরেজের বিশ্বাস অর্জন করে নিয়েছিল শুরুতেই। ক্ষমতা পেয়ে তাদেরকে সহযোগী হিসাবে বেছে নেয় ইংরেজরা। ধীরে ধীরে মুসলিম অভিজাত শ্রেণি অর্থ ও ক্ষমতা দুই-ই হারায়। তাদের উপর নির্ভরশীল মুসলিম কর্মচারী-প্রজার দলের ভাগ্যের পতন ঘটে একই কারণে। রাজভাষা ফারসি চালু থাকায় কিছু সংখ্যক মুসলিম কর্মচারী এখানে সেখানে জায়গা নিয়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছিল। ১৮০০ সাল নাগাদ অভিজাত মুসলমান ও সাধারণ মুসলিম প্রজা উভয় শ্রেণির বেশিরভাগ মানুষ রীতিমত দারিদ্রে পতিত হয়। শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চা এবং এর সাথে জড়িত অন্যান্য বিষয়গুলোয় ব্যাপক রদবদলের ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছিলো এই আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পটভুমিতে ।
স্থানীয়দের সাথে সম্পর্ক যোজনে ইংরেজরা অভিজাত মুসলমান এবং উচ্চ বর্ণের হিন্দুদেরই প্রাধান্য দেয়। মুসলিম অভিজাতদের বেশির ভাগ ছিল উত্তরভারতীয় বংশোদ্ভুত হিন্দী/উর্দুভাষী। কিন্তু অভিজাত হিন্দুরা ছিল বাঙালি, বাংলাভাষী। সাধারণ শ্রেণির যেসব মানুষের উদ্যোগে বাংলা ভাষায় সাহিত্য চর্চা, গদ্যের চর্চা চলে আসছিল কয়েকশ বছর ধরে তারা ছিলেন রাজদরবার অথবা বিভিন্ন জমিদার সামন্তদের পৃষ্ঠপোষকতার উপর নির্ভরশীল। শিক্ষার জন্য ছিল মক্তব, টোল ইত্যাদি। বৃটিশদের শাসনের কয়েক দশকের মধ্যে এ সমস্ত কেন্দ্রই ভেঙ্গেচুড়ে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। নতুন শাসন কেন্দ্র, রাজস্ব আদায় কেন্দ্র, ব্যবসাকেন্দ্র ইত্যাদি গড়ে উঠে ইংরেজদের হাতে। সেখানে প্রাধান্য পায় ইংরেজদের সহযোগী উচ্চ বর্ণের হিন্দুরা। যারা নবাবী আমল থেকে পদপদবি দখল করে বসেছিল তারা তো থাকেই, সঙ্গে যুক্ত হয় নয়া দোসরের দল। যারা বাংলা ভাষায় লেখতেন, সাহিত্য চর্চা করতেন বিদ্যালয় টোল মক্তব চালাতেন তারা মুছে যান দৃশ্যপট থেকে। এসব চলে যায় ইংরেজদের বেছে নেয়া নতুন বর্ণ হিন্দুদের দখলে। পরে এরাও যুক্ত হন কলিকাতাকেন্দ্রিক নয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণির কাফেলায়।
এর মধ্যে কোলব্রুকস, হ্যালহেড জোনস প্রমুখের ভুল অনুমান ও সেই অনুমান নির্ভর বিশ্লেষণের বদৌলতে বাঙলাসহ ভারতীয় অন্যান্য ভাষার মা-বাপ হিসাবে প্রতিষ্ঠা পায় সংস্কৃত ভাষা। তারা এও ঘোণা করেন যে আরবফারসি শব্দসহ যে ভাষা প্রচলিত আছে তা মুসলমানী ভাষার শব্দদোষে দুষ্ট। বাংলা ভাষার উন্নতি করতে হলে সংস্কৃতকে আদর্শ ধরে, সংস্কৃতকে অনুসরণ করেই তা করতে হবে। এর মধ্যে বাংলাভাষার সে-যাবত কালের লেখকরা দৃশ্যপট থেকে পুরাপুরি অন্তর্হিত। ইংরেজরা মুসলমান অভিজাত শ্রেণি বলতে চিনতো উত্তরাভারতীয় উর্দুভাষী মুসলমানদের। এ কারণে তাদের ধারণা জন্মে অভিজাত মুসলমান যেহেতু বাংলা জানে না তাই বাংলা শিক্ষার কাজে মুসলমানদের নিয়োগ দেয়ার প্রশ্নই আসে না। আদতে অভিজাত শ্রেণি নয়, সাধারণ মানুষের মধ্যেই যে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বাংলা সাহিত্যের সমৃদ্ধ ধারা চর্চিত হয়ে আসছিল সে খবর তারা জানতো না, জানার প্রয়োজনও বোধ করেনি। ইংরেজ উদ্যোক্তারা বাংলা গদ্য লেখা ও শিক্ষকতার কাজের জন্য ইতিমধ্যে নানাসুত্রে সম্পর্কিত পন্ডিতদের ডেকে আনে, যারা বাংলা ভাষার লেখকও না,পৃষ্ঠপোষকও না। এ প্রক্রিয়ায় বাংলা গদ্য রচনা ও পড়ানোর কাজ থেকে সাধারণ হিন্দু-মুসলমান পুরাই বাদ পড়ে। এবং পরবর্তী ৫০/৬০ বছর পর্যন্ত তারা এ প্রক্রিয়ার বাইরেই থেকে যায়। তাই সে কালে বাংলা পাঠ্য পুস্তক বলি, সাধারণের পাঠ্য বই বলি, সংবাদপত্র বলি প্রায় সবই বর্ণ হিন্দুদের কর্ম। যেসব সাধারণ মুসলমান ও হিন্দু কবি, কবিয়াল, পাঠক লেখক ছিল তারা জ্ঞান উৎপাদনের এ মহাযজ্ঞে কোনা জায়গা পায় নাই। ফলে বাঙালির সাংস্কৃতিক ও ভাব জগতের ঐতিহ্যিক চর্চা নয়ারীতির জ্ঞানচর্চা ও বইপত্রে জায়গা না পেয়ে ঐতিহ্যিক প্রকাশরীতিতেই অস্তিত্ব রক্ষা করে চলে। । দীর্ঘদিন মৌখিক রীতিতে টিকে থেকে পরে ধীরে ধীরে লেখার জগতে প্রবেশ করে বাঙালির সবচেয়ে সমৃদ্ধ সে ভাবফসল, তাও ‘লোক’ শব্দে নির্দেশিত ‘নিচু-মান’-এর মার্কা নিয়ে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ পূর্ব্ববঙ্গ গীতিকা।
মুদ্রিত লেখাকে কেন্দ্র করে জ্ঞানচর্চা ও সাহিত্যচর্চার এই ধারায় যারা নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেন তাদের সবাই টোলে পড়া সংস্কৃত পন্ডিত। বেদাদি, রামায়ন, মহাভারত, পুরাণ, উপনিষদ, সুক্ত নিরুক্ত ইত্যাদিতে মহা পন্ডিত একেকজন। আবার বাঙলা ঠিকঠাক মতো জানেন না। আবার ইংরেজ প্রভুরা বলছেন সংস্কৃত ভাষা সব ভাষার মা-বাপ। তারা তাই সংস্কৃতের আদলে বাংলাকে রূপান্তরিত করে নয়া বাংলা ভাষায় বইপত্র লেখা শুরু করলেন। রচনার বিষয়বস্তুতেও তাদের জানাবুঝার ছাপ পড়ে। ঐসব সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিতের জানাবুঝার জগত হলো সংস্কৃত ব্যাকরণ, রামায়ন মহাভারত, হিন্দু ধর্ম সংক্রান্ত বইপত্র, হিন্দু দেবদেবীর উপাখ্যান ইত্যাদি। তাই মাকাল গাছে আম ধরে না, মাকালই ধরে শেষপর্যন্ত; আগেও উল্লেখ করেছি পন্ডিতদের হাতে যেসব বই রচিত হয় তার প্রায় সবই আর্য পুরান কাহিনি, আর্য লোক আখ্যান, পুজার্চনা ইত্যাদি সম্পর্কিত। বাংলা সাহিত্য চর্চায় এই শ্রেণির সংস্কৃত পন্ডিতদেরই যে প্রাধান্য চলছিল অন্তত উনিশ শতকের প্রথম অর্ধেক পর্যন্ত সে খবর জানা যায় জেমস লঙের এই মন্তব্য থেকে: “বর্তমানে বাংলা সাহিত্যে যারা অগ্রণীর ভূমিকা পালন করছেন, যারা এখন বাংলা ভাষার ধারক ও বাহক, তারা হলেন ইংরেজি থেকে ভাবসম্পদ আহরণ করার মত পর্যাপ্ত জ্ঞানসম্পন্ন সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিতবর্গ।”১৫ এই সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিতবর্গের তৈরি মৃত্যুঞ্জয়ী বা সংস্কৃতানুযায়ী বাংলায় রচিত পাঠ্য পুস্তক বিদ্যালয়গুলোর মাধ্যমে সারা দেশের পড়–য়াদের বাধ্যতামূলকভাবে গেলানো হয়। সে তক বই পত্র বলতে হিন্দু ধর্মীয় বইপত্র, দেবদেবীদের আখ্যান, ধর্মীয় লোক আখ্যান, প্রাচীন হিন্দু রাজাদের বেডাগিরির কাহিনি, এবং প্রতাপাদিত্যের মতো আধাকাল্পনিক নায়ক চরিত্র নিয়ে লেখা বইপত্রই ছাপা হয়, পৌঁছে যায় বিদ্যালয়গুলোতে, পড়ায় আগ্রহী সাধারণ মানুষের হাতে হাতেও।
প্রথমে ইংরেজদের উদ্যোগে, পরে উচ্চশ্রেণীর হিন্দুদের সক্রিয় অংশগ্রহণে শিক্ষার যে ব্যবস্থা চালু হয় সেখানে ঐসব বইপত্রই পড়ানো হতো। এটি ছিল নামে সেকুলার, স্বভাবে বৃটিশ-আর্য শিক্ষা ব্যবস্থা। এসব কারণে মুসলমান বহুদিন সেই শিক্ষা প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরে ছিল। তাদের পড়াশোনার একমাত্র সুযোগ ছিল স্থানীয় মক্তব মাদ্রাসা হয়ে কলিকাতা মাদ্রাসায়। তা অনেকের সাধ্যের মধ্যে ছিল না। তা ছাড়া মাদ্রাসায় দেশজ শিক্ষার সুযোগও তখন কমে যায়। সে তুলনায় বিদ্যালয়গুলোতে পাঠ নেয়া সহজ ছিল। কিন্তু সেখানে ভিন্ন সংস্কৃতি অর্থাৎ উত্তর ভারতীয় আর্য সংস্কৃতি ও ভিন্ন ধর্মের চর্চা। এবং এর ভাষাও নতুন, রীতিমত কষ্ট করে শিখতে হয়। তাই বহুবছর এ শিক্ষা থেকে দূরেই সরে থাকে মুসলমানরা। এর ফলে আর্থিক সুবিধাদি ও সামাজিক ক্ষমতা কাঠামো থেকেও তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে এবং ক্রমশ পিছিয়েই পড়তে থাকে। এক পর্যায়ে এসে উপায়ান্তর না দেখে তাদের ছেলেমেয়েদেরকে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থাতেই অংশ নিতে পাঠায়।
শুধু বিদ্যালয় নয়, এর বাইরেও পড়ার মালমশলা বলতে ছিল মূলত ঐসব বইপত্র। বিভিন্ন সময়ে ছাপা বইয়ের মধ্যে হিন্দু ধর্ম ও পুরান দেবদেবীর আখ্যান ইত্যাদি বইয়ের প্রাধান্যের উল্লেখ করেছি আমরা একটু আগেই। ১৮২০ সালে ছাপা বইয়ের মধ্যে এ জাতীয় হিন্দু ধর্মাশ্রিত বইয়ের সংখ্যাই বেশি। নাম শুনলেই এসব বইয়ের বিষয়বস্তু ও অভিমুখ আন্দাজ করা যায়। যেমন: করুণা বিধান বিলাস, পদাঙ্ক দূত, বিশ্বমঙ্গল, নারদ সংবাদ, গীতগোবিন্দ (সবকটি কৃষ্ণ বিষয়ক), চন্ডী অন্নদামঙ্গল, গদা ভক্তি (শিব-গঙ্গা বিষয়ক), চৈতন্য চরিতামৃত, রসমঞ্জরী পাদবলী, রতিবিলাস, রতিকাল, তোতা ইতিহাস, বত্রিশ সিংহাসন (হিন্দু ধর্মীয় রাজার উপাখ্যান), চানক্য শ্লোক, হিতোপদেশ। এর বাইরে ব্যাকরণ, সঙ্গীত, জ্যোতিষবিদ্যা, চিকিৎিসাশাস্ত্র বিষয়ে অল্প কয়টা বই বের হয়। ১৬ ১৮২২ সাল থেকে ২৬ সালের মধ্যে প্রকাশিত ২৭টি বইয়ের নাম উল্লেখ করেছেন জেমস লঙ। এসব বইয়ের মধ্যে প্রায় সবই হিন্দু ধর্মাশ্রিত রচনা। যেমন দিন কৌমুদী: হিন্দু ধর্মমতে বিশেষ বিশেষ দিন পালন করার বিষয়ে, আনন্দ লহরী:হিন্দু ধর্মের দেবী দূর্গার মাহাত্ম্য বিষযক বিবরণ, তর্পণ: হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মৃত্যুর পর সৎকারের রীতিনীতি , রাধিকা মঙ্গল: রাধার গুণকীর্তন ও রূপ বিবরণ, গঙ্গাভক্তি তরঙ্গিণী: গঙ্গা বিষয়ে, পদাঙ্ক দূত: হিন্দু দেবতা শ্রীকৃষ্ণের পদচিহ্ন নিয়ে, বত্রিশ সিংহাসন: রাজা লোক উপাখ্যানের রাজা বিক্রমাধিত্যের কাহিনি, নারদ সংবাদ: শ্রীকৃষ্ণ সংক্রান্ত শ্লোক নিয়ে রচিত। এই শেষ নয়। ন্যায় হিন্দু ধর্মদর্শন বিষয়ে রচিত বই। রাধার সহস্র নাম, ভগবতীর সহস্র নাম ও বিষ্ণুর সহস্র নাম বই তিনটি সংশ্লিষ্ট দেবদেবীর নাম মাহাত্ম্যের বিবরণ। দেবদেবীর সহস্ত্র নাম উল্লেখ করে বই লেখার ধারণা মাথায় আসে সম্ভবত মুসলমানদের আল্লাহ্র শত নামের উল্লেখ থেকে। নলদময়ন্তী: এ বইয়ের বিষবস্তু নল ও দময়ন্তীর প্রেম কাহিনি। কিন্তু সেই কাহিনির পুরোটা জুড়ে দেবতা ইন্দ্র, বরুন, অগ্নি, যম এদের উপস্থিতি। কলঙ্কভঞ্জন: এ বইটিও শ্রীকৃষ্ণকে নিয়ে লেখা।, প্রাণ তোষণ শিরোনামের এ বই হিন্দুদের প্রায়শ্চত্তি বিষয়ে রচিত। সঙ্গীত তরঙ্গিণী হিন্দু ধর্মীয় সঙ্গীত সংক্রান্ত। ২৭টি বইয়ের মধ্যে ১৫টিই সরাসরি হিন্দু ধর্ম বা দেবদেবী বা পুরাণ সংক্রান্ত। অন্য বইগুলোও হিন্দু ধর্মমতে জগত ও জীবন সম্পর্কিত নানা বিশ্বাস, বিদ্যা ইত্যাদি বিষয়ে রচিত। তিনটা বই বাদে সবই হিন্দু ধর্ম সম্পর্কিত। এই তিনের একটি ছিল পঞ্জিকা, আরেকটি সংস্কৃত অভিধান।১৭ জেমস লঙ লিখেছেন “১৮২০ সালে নিম্নোক্ত বিষয়ে ৩০টি বাংলা বই প্রকাশিত হয়েছিল। এর মধ্যে ৫টি কৃষ্ণ-বিষয়ক, ২টি বিষ্ণু -সম্পর্কিত, ৪টি দূর্গা-বিষয়ক, ৩টি উপাখ্যান, ৫টি আদিরসাত্মক, এবং একটি করে স্বপ্ন, সঙ্গীত, জ্যোতিষশাস্ত্র, চিকিৎসা-বিষয়ক গ্রন্থ, এবং রামমোহনের অনুবাদ ও পঞ্জিকাসমূহ ( পরিশিষ্ট ঘ দ্রষ্টব্য)। ১৮২২ সাল থেকে ২৬ সালের মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে ২৮টি গ্রন্থ। এদের মধ্যে তিনটেকে বাদ দিলে বাকী সবই পৌরিণিক কাহিনি অথবা উপন্যাস। এ ধারতেই পুস্তক প্রকাশনার কাজ এগিয়ে চলে ১৮৫০ সাল পর্যন্ত”।১৮ লঙ ১৮৫০ সালের কথা বললেও বাস্তবে বাংলা বইপত্র লেখা ও প্রকাশনায় হিন্দু ধর্মাশ্রিত ও পৌরাণিক কাহিনির প্রাধান্য ছিল আরা বহুদিন। ১৮৫৭ সালে বই প্রকাশিত হয় ৩২২টি। লঙের বিবরণ থেকে বোঝা যায় এর মধ্যে ৪০ শতাংশের বেশি হিন্দু ধর্মাশ্রিত রচনা। বাস্তবে আরো দুইতিন দশক এ অবস্থাই অব্যাহত থাকে, যে পর্যন্ত না মুসলমান লেখকরা মৃত্যুঞ্জয়ী সংস্কৃতায়িত বাংলা শিখে লিখতে শুরু করে।
তবে খানিকটা দেরিতে হলেও উনিশ শতকের সূচনাতেই লেখালেখিতে সম্পৃক্ত হয় বাঙালি মুসলমান। উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশকের পরের সময় থেকে মুসলমান লেখকদের বইপত্র প্রকাশিত হওয়া খবর জানতে পারি আমরা। এ সময়টা ছিল রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি সবক্ষেত্রে বড়সড়ো পরিবর্তন চলাকালীন মাঝ বরাবর এক যুগ। মুসলিম শাসনামলে যারা অর্থবিত্ত ও ক্ষমতার ধারক ছিলেন তাদের বেশিরভাগ ছিলেন উত্তরভারতীয় অবাঙালি মুসলমান। এরাই ছিলেন মুসলিম জনগোষ্ঠীর নেতা। অন্যদিকে, হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃস্থানীয় উচ্চবর্ণের হিন্দুরাও উত্তর ভারত থেকেই আসেন। বিশেষত সেন আমলে রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতায় বহু ব্রাহ্মণ পরিবার বাংলায় বসবাস করতে আসেন। এরপরও অনেক উচ্চবর্ণের হিন্দু বাংলাদেশে বসতি করেন। এরমধ্যে পার হয়ে গেছে কয়েক শতাব্দি। এই সময়ের মধ্যে তারা বাংলাদেশের জনসমাজ, প্রকৃতি ও আবহাওয়ার সাথে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন। সে তুলনায় মুসলিম উচ্চবিত্তরা ছিলেন এদেশে নবীন। কেউ কেউ মাত্র কয়েক পুরুষ আগে এদেশে এসেছেন। ভাষায়, আচারআচরণে জীবনযাপনের অভ্যাসে তারা তখনো উত্তরভারতীয় স্বভাব ধরে রাখতেই উৎসাহী। এরা তখন বাংলাদেশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে। স্থানীয় যেসব বাঙালি মুসলমান কিছুটা প্রভাব প্রতিপত্তির অধিকারী ছিলেন তারাও ঐসব উত্তর ভারতীয় মুসলমানদের চাপের মুখে নিজস্ব মতামত প্রকাশ ও প্রচারের খুব একটা সুযোগ পেতের না। উপনিবেশ কায়েম হওয়ার আগে আগে হিন্দু ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বের মধ্যে এই ফারাকাও পরবর্তীকালে শিক্ষা শিল্পসাহিত্যে মুসলিমদের পিছিয়ে থাকার অন্যতম কারণ।
হিন্দু জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে থাকা উচ্চশ্রেণীর হিন্দুরা বাংলাভাষী হওয়ার কারণে বৃটিশদের বিশেষ আনুকূল্য পেয়ে যখন উৎসাহ উদ্দীপণা নিয়ে সংস্কৃতায়িত বাংলায় শিক্ষাগ্রহণ ও সাহিত্যচর্চায় মন দেয় তখন নিজেদের উর্দু ভাষা ও উত্তরভারতীয় মুসলিম সংস্কৃতিকে আঁকড়ে ধরে থাকে মুসলিম জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে থাকা অবাঙালি মুসলিম সমাজ। কারণ বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সাথে তাদের রক্তের টান ছিল না। তাছাড়া সদ্য ক্ষমতা হারানোয় ইংরেজদে প্রতি ক্ষোভ ও ঘৃণা বোধও ছিল বিচ্ছিন্নতার অন্যতম এক কারণ। এ অবস্থায় উপনিবেশের সূচনায় সাধারণ বাঙালি মুসলমান জনগোষ্ঠী ছিল প্রকৃত অর্থেই নেতৃত্বহীন, আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত। একদিকে হিন্দু ধর্মাবলম্বী বাঙালি জনগোষ্ঠী নতুন ধাঁচের বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে চাকরীবাকরি করছে আর নতুন ধরণের সংস্কৃতায়িত বাংলায় সাহিত্য চর্চা করছে, আর অন্যদিকে নেতৃত্বহীন, দ্বিধান্বিত মুসলিম ধর্মাবলম্বী বাঙালি জনগোষ্ঠী । উনিশ শতকের শুরুর দিকে জমিদারী, ব্যবসাবানিজ্য, রাজকীয় চাকরীবাকরী হারিয়ে তাদের নেতারাও পর্যুদস্ত। এ অবস্থায় সাধারণ বাঙালি মুসলমানরা অনেকটা পুরোনো ধারার জীবন যাপন করছিল। এদের বেশিরভাগই উপনবিশের কেন্দ্রগুলো থেকে দূরবর্তী অঞ্চলের মানুষ। উপনিবেশী ইংরেজদের উদ্যোগে বা উৎসাহে সূচিত নতুন ধরণের শিক্ষা ব্যবস্থা ও বিদ্যালয়গুলোর বেশির ভাগই কলিকাতা, শ্রীরামপুর, চুঁছরা প্রভৃতি উপনিবেশী কেন্দ্রগুলোর আশপাশে খোলা হয়। সাধারণ বাঙালি মুসলিম প্রজারা তখনো এই শিক্ষাব্যবস্থা ও বিদ্যালয়গুলির গন্ডির বাইরে। এইসব সাধারণ মুসলমানদের ঐতিহ্যপন্থী লেখকরা তখনো পুরানো ধারায় সাহিতচর্চা করছিলেন। তাদের ভাষা ছিল সাধারণ বাঙালির কথ্যভাষা, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী যেটাকে বলেছেন ‘বিষয়ী লোকের ভাষা’; যে ভাষায় আরবী ফারসি ও সংস্কৃত শব্দের ব্যবহার সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কিন্তু ততদিনে মৃতুঞ্জয়ী সংস্কৃতায়িত বাংলা কলিকাতার ভদ্রলোকদের মধ্যে প্রচলিত হয়ে যায়। কথ্য বাংলায় সংস্কৃতের পাশাপাশি আরবী ফারসি শব্দ থাকার কারণে তারা পরিকল্পিতভাবেই সে ভাষাকে নিশ্চিহ্ন করার সমস্ত কৌশলই প্রয়োগ করতে থাকে। এরই অংশ হিসাব কলিকাতার লেখিয়েরা কথ্যবাংলায় রচিত এই সব বইপত্রে আরবী ফারসি শব্দ ও বাগবিধির উপস্থিতির অজুহাতে এগুলোকে আরবী ফারসির দোষে দুষ্ট হিসাবে চিহ্নিত করে। পরে আসল কথ্য বাংলায় লেখা এ সব বইপত্রের ভাষাকে মুসলমানী বাংলা নাম দিয়ে একেবারেই আলাদা করে ফেলা হয়। এ কাজের যৌক্তিকতা তৈরি হয় দুই দিক থেকে। এক: এরইমধ্যে হিন্দু বাঙালিরা মধ্যযুগীয় রীতির লেখালেখি ছেড়ে ফোর্ট উইলিয়ামের সংস্কৃতায়িত বাংলায় লেখালেখিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠে; ফলে তাদের পুরোনো ধারার কাব্যচর্চার ইতি ঘটে। দুই: নতুন ধাঁচের পড়াশোনার বাইরে থাকায় এবং সংস্কৃতায়িত বাংলায় অনভ্যস্ত হওয়ার কারণে সাধারণ মুসলমানরা পুরানো ধারায় কিছু কিছু সাহিত্য চর্চা বজায় রেখে চলছিলা। উনিশ শতকের তৃতীয়ার্ধ্বের শেষ বা চতুর্থ দশকের শুরুতেই আমরা মুসলমান লেখকদের লেখা বইপত্রের খবর পাই। এসময় কাকতালীয়ভাবে, অনেক মুসলমান লেখক যেন বা জোর করে প্রচুর আরবী-ফারসি শব্দ ঢুকিয়ে এমন এক ভাষায় সাহিত্য চর্চা করতেন যাকে বাংলা ভাষা না বলে মিশ্র ভাষা বলাই যৌক্তিক। এ যেন মৃত্যুঞ্জয়ী বাংলার ঠিক উল্টোটা, হয়তো এর প্রতিক্রিয়াতেই সৃষ্ট। মৃত্যুঞ্জয়ী বাংলারীতিতে যেমন খুব বেশি সংস্কৃত শব্দের ব্যবহার, এ ভাষায়ও তেমনি মাত্রাতিরিক্ত আরবী-ফারসী শব্দের প্রয়োগ। কিন্তু পত্রপত্রিকা, স্কুল, পাঠ্যসূচী নির্ধারণের ক্ষমতা, মুদ্রণযন্ত্র ইত্যাদি হাতে থাকার কারণে কলকাতা কেন্দ্রিক হিন্দু বাঙালিরা মৃত্যুঞ্জয়ী সংস্কৃতায়িত বাংলাকেই আদর্শ বাংলা রীতি হিসাবে প্রতিষ্ঠত করতে সক্ষম হয়। মুসলমানদের সেই সুযোগ ও সক্ষমতা ছিল না। আবার মাত্রাতিরিক্ত আরবী ফারসি শব্দবহুল মিশ্র ভাষার সংখ্যাল্প কিছু রচনার বৈশিষ্ট চাপিয়ে দেয়া হয় সাধারণের কথ্য ভাষায় লেখা অন্যান্য রচনার উপর। ফলে মুসলমানদের সকল রচনাকেই ঢালাওভাবে আরবীফারসি দোষে দুষ্ট হিসাবে চিহ্নিত করে নিম্নরুচির সাহিত্য, বটতলার সাহিত্য ইত্যাদি মার্কা লাগিয়ে দেয়া সহজ হয়। এই কথ্যবাংলাকে বলা হয় মুসলমানী বাংলা, আর এভাষায় রচিত সাহিত্যকে বলা হয় মুসলমানী বাংলা সাহিত্য।
খুব সম্ভবত জেমস লঙ-ই প্রথম ব্যবহার করেন এ পরিভাষাটি। পরে দীনেশচন্দ্র সেন, সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায়, সুকুমার সেনও এই নামটিই ব্যবহার করেন। ক্রমশ তা চালু হয়ে যায়। বাঙালি মুসলমানদের রচিত এসব কাব্যসাহিত্যকে ‘পুঁথি সাহিত্য’, ‘দোভাষী সাহিত্য’, ‘বটতলার বই’ ইত্যাদি নামে আলাদাভাবে নিম্নমানে চিহ্নিত করার পেছনে যৌক্তিক ভিত্তি কতটুকু আমরা নমুনা সহকারে যাচাই করে দেখতে চাই। এক্ষেত্রে মৃত্যুঞ্জয়ী সংস্কৃতায়িত বাংলা তৈরির আগের বাংলাগদ্যের নমুনাকে মান ধরে দুই শ্রেণির রচনার তুলনা করা যেতে পারে। তবে এমন গদ্যের নমুনা নেয়া দরকার যার মধ্যে ধর্মীয় পরিপাশের্^র কোনো প্রভাব থাকার সম্ভাবনা না থাকে। যেমন বৈষ্ণব সহজিয়া সাধকদের গদ্যরচনা কিংবা হিন্দু বা ইসলমা ধর্ম সংক্রান্ত কোনো আলোচনার গদ্যে ধর্মীয় প্রভাব থাকা স্বাভাবিক। তেমনি আদালতের চিঠিপত্রে থাকতে পারে অতিরিক্ত ফারসির প্রভাব। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলেছেন হিন্দু ধর্মশাস্ত্র সম্পর্কি ব্যবসায়ী এবং আদালত আমির ওমরাহদের ভাষার বাইরে বিষয়ী লোকেরা একরকম ভাষা ব্যবহার করতেন, সেটিই সাধারণ মানুষের কথ্যবাংলা। তা কিন্তু কোনো নিদিষ্ট অঞ্চল বিশেষের ভাষা নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে কাজের গদ্য লেখার ও সাহিত্য চর্চার মধ্য দিয়ে তার একটা মান রূপ দেখা দেয়। সেই ভাষায় পরিমাণ মতো সংস্কৃত আরবী ফারসি মিশে সুললিত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ ভারসাম্যময় ভাষা হিসাবে বিকশিত হয়েছিল। আমরা এখানে সেরকম বিষয়ী লোকের পত্রের অংশ বিশেষ তুলে ধরবে। নারায়নপুরের আড়ঙ্গের গোমস্তা নালিশ জানিয়ে চিঠি লিখছে ঢাকার কুঠিকে:
আড়ঙ্গ নারায়নপুরের শ্রীবিন্দুমোহন তাঁতি নালিষ করিলেন জমীদার অন্যায় করিয়া পাট্টা বেসী খাজনা তাতির স্থানে লইতেছে (।) অতএব আরজ তাতি মজকুর আরজী সমেত জাইতেছে () জোনাবে পৌছিয়া আরজ করিবেক (।) তাহাতে গৌর ফরমাইতে হুকুম হইবেক (্) ইহা কদমে আরজ করিলাম। ইতি সন ১৯৯ সন ইং ১৭৯২ তারিখ ১৪ দিজস্বর--২ পৌষ ।১৯
চিঠির উদ্ধৃত মূল অংশটিতে ৩৫টি শব্দ আছে। এর মধ্যে শতকরা হিসাবে প্রায় ৫৫% বাংলা, ৩৪% আরবী ফারসি, ১২%-এর মতো সংস্কৃত বা সংস্কৃতজাত শব্দ।
এবার একটি ব্যক্তিগত চিঠি উদ্ধৃত করা যাক। চাকরি পাওয়ার জন্য তদবিরের চিঠি লিখেছেন কেউ একজন:
“ সন ১১৯৯ সাল (১৭৯২)।
আমী. . . তোমার নিকট জাইতেছিলাম (।) নদীর বন্যাতে পার হইতে পারিলাম না (।) জাইতে পারিলে সাক্ষাতে সকল কহিথাম (।) শ্রীযুত বাহড় খাঁএর ভাড় বেলপোড়া ইজারা হইয়াছে (।) প্রাণতুল্য দেবী প্রসাদ রায়ের খিদমৎ এক জায়গাতে কিম্বা মহুরির গিরি খাঁ মজকুরের নিকট করিয়া দিতে হইবেক (।) খাঁ মজকুর তোমার বষের মধ্যে বটেন, তোমার আমী পোষ্যের মধ্যে বটি (।) মহুরিরগিরি হয় এর এতমাম হয় ইহা করিয়া দিতে হইবেক...।”২০
এ উদ্ধৃতিতে শতকরা হিসাবে প্রায় ৭৯% বাংলা, ৯% সংস্কৃত, ১৩ % আরবী ফারসি। দুই উদ্ধৃতির গড় করলে দাড়ায়: ৬৯% বাংলা, আরবি-ফারসি ২১%, ১০% সংস্কৃত বা সংস্কৃতজাত।
এবার সংস্কৃতায়িত বাংলা থেকে উদাহরণ দেয়া যাক:
এইরূপে, আমি, সর্বক্ষণ, তোমার অদ্ভুত মনোহর মূর্ত্তি ও নিরতিশয় প্রীতিপ্রদ অনুষ্ঠান সকল অবিকল প্রত্যক্ষ করিতেছি; কেবল, তোমায় কোলে লইয়া , তোমার লাবন্যময় কোমল কলেবর পরিস্পর্শে, শরীর অমৃতরসে অভিসিক্ত করিতে পারিতেছি না। দৈবযোগে, একদিন, দিবাভাগে আমার নিদ্রাবেশ ঘটিয়াছিল। কেবল, সেই দিন, সেই সময়ে, ক্ষণকালের জন্য, তোমায় পাইয়াছিলাম। ২১
এখানে বাংলা ৬৫%, ৩৫% সংস্কৃত বা সংস্কৃতজাত, আরবী ফারসি ০%।
“সায়াহ্নকাল উপস্থিত, পশ্চিমগগনে অস্তাচলগত দিনমণির ম্লান কিরণে যে সকল মেঘ কাঞ্চণকান্তি ধারণ করিয়াছিল, তৎসহিত নীলাম্বরপ্রতিবিম্ব স্রোত্বতীজলমধ্যে কম্পিত হইতেছিল; নদী পাড়স্থিত উচ্চ অট্টালিকা এবং দীর্ঘ তুরুবর সকল বিমলাকাশপটে চিত্রবৎ দেখাইতেছিল; দূর্গমধ্যে ময়ূর সারসাদি কলনাদী পক্ষিগণ প্রফুল্লচিত্তে রব করিতেছিল; কোথাও রজনীর উদয়ে নীড়ান্বেষনে ব্যস্ত বিহঙ্গম নীলাম্বরতলে বিনা শব্দে উড়িতেছিল”।২২
এ উদ্ধৃতিতে বাংলা শব্দ খুঁজেপেতে বের করতে হয়। প্রায়ই সবই সংস্কৃত বা তদ্ভব দশব্দ।
এবার আমরা ‘দোভাষী কাব্য’, ‘মিশ্রভাষার কাব্য’, ‘পুঁথি সাহিত্য’, ‘মুসলমানী বাঙলা’ ইত্যাদি নামে অস্পৃশ্য করে রাখা সাহিত্য থেকে নমুনা তুলে দেই:
কেতাব করিল মর্দ্দ ফারসি জবানে।
ফারসি লোক যারা তার খুশি হাল শুনে॥
বাঙ্গালার লোক সবে নাহি জানে ভেদ।
যে কেহ শুনিল তার দেলে করে খেদ॥
এ খাতেরে ফকিরে হইল সওক।
আফছোছ না করে যেন বাঙ্গালার লোক॥
চলিত বাঙ্গালায় কিচ্ছা করিনু তৈয়ার।
সকলে বুঝিবে ভাই কারণে ইহার॥
আসল বাঙ্গালা সবে বুঝিতে না পারে।
এ খাতেরে না লিখিলাম সোন বেরাদরে॥
এখানে আরবি ফারসি শব্দ মোটের ২৩% প্রায়, সংস্কৃত ২%, বাকী ৭৫% বাঙলা শব্দ। আমরা একটু আগে মৃত্যুঞ্জয়ী সংস্কৃতায়িত বাংলা তৈয়ারের আগের বাংলা গদ্যকে মান ধরে যে হিসাব পেয়েছিলাম তাতে আরবী ফারসির পরিমাণ ছিল ২১%। এখানে ২% বেড়ে হয়েছে ২৩%। সংস্কৃত শব্দ ছিল ১০%-এর মত। এখানে সংস্কৃত শব্দ মাত্র ২%, কমেছে ৮%। বাংলা শব্দ ৬৯% থেকে বেড়ে দাড়িয়েছি ৭৫%-এ।
অন্যদিকে, মৃত্যুঞ্জয়ী বাংলায় সংস্কৃত শব্দ ৩৫%, অর্থাৎ উপনিবেশ-পূর্ব মান বাংলা গদ্যের তুলনায় ২৫% সংস্কৃত শব্দ বেড়েছে। আর আরবী ফারসি শব্দ সর্ম্পূণ অন্তর্হিত।
চোখ রাখুন শেষ পর্বে...
বাংলা ভাষার রূপবদল: ইতিহাসের বিকৃতি, সংস্কৃতির রূপান্তর (১ম পর্ব)
বাংলা ভাষার রূপবদল: ইতিহাসের বিকৃতি, সংস্কৃতির রূপান্তর (২য় পর্ব)
তথ্যসূত্র:
১৪. ডক্টর ওয়াকিল আহমদ, উনিশ শতকে বাঙালি মুসলমানের চিন্তা-চেতনার ধারা, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, ১৯৮৩; পৃষ্ঠা-৩৫০।
১৫. জেমস লঙ, আদিপর্বে বাংলা প্রকাশনা ও সাংবাদিকতা, অনুবাদ: মুহম্মদ হাবিবুর রশিদ, বাংলা একাডেমী, ঢাকা; ১৯৮৮; পৃষ্ঠা-৫৫।
১৬. পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা-১০২।
১৭. পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা-১০৩।
১৮. পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা-৭।
১৯. আনিসুজ্জামান, পুরোনো বাংলা গদ্য, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা, ১৯৮৪; পৃষ্ঠা ৮৩।
২০. ভক্তিমাধব চট্টোপাধ্যায়, বাংলা গদ্যের আদিপর্ব, নয়া প্রকাশ, কলিকাতা, ১৯৮৮; পৃষ্ঠা ৯১।
২১. শ্রীপ্রমথনাথ বিশী ও বিজিতকুমার দত্ত, বাংলা গদ্যের পদাঙ্ক, মিত্র ও ঘোষ, কলিকাতা; পৃষ্ঠা ৫১।
২২. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ‘দূর্গেশনন্দিনী’, বঙ্কিম রচনাবলী উপন্যাস সমগ্র, তুলি কলম, কলিকাতা,২০০১; পৃষ্ঠা ৯।