রবিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬

৫ আশ্বিন ১৪৩৩

সরকার অনুমোদিত অনলাইন গণমাধ্যম
BD.GOV.REG.NO-88

রবিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬

৫ আশ্বিন ১৪৩৩

সরকার অনুমোদিত অনলাইন গণমাধ্যম
BD.GOV.REG.NO-88

আপনি পড়ছেন : মতামত

যেভাবে আলবেরুনির হাতে একাদশ শতকেই  অনুবাদ হলো সাংখ্য ও পাতঞ্জল দর্শন


চন্দ্রপ্রকাশ সরকার, মুর্শিদাবাদ, পশ্চিমবঙ্গ
DhakaReport24.com || 2022-01-26 15:47:45
যেভাবে আলবেরুনির হাতে একাদশ শতকেই  অনুবাদ হলো সাংখ্য ও পাতঞ্জল দর্শন

 ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী শাসকেরা ভারত বিজয়ের বহু পূর্বেই আরবের সাথে ভারতের বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ গড়ে ওঠে। এমনকি এই যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছিল প্রাক ইসলামিক যুগেই। আমৃত্যু সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সাধক ঋষিপ্রতিম অধ্যাপক রেজাউল করিম তাঁর 'সংস্কৃতি সমন্বয়ের অগ্রদূত -- আলবেরুনি' শীর্ষক এক অসাধারণ রচনায় লিখেছেন, "ইসলামের যুগেও বহু মুসলমান ভারতের দিকে দৃষ্টিপাত করিয়াছিলেন, রাজ্য বিজয়ের উদ্দেশ্যে নয়, এ দেশের সংস্কৃতি ও সভ্যতার সহিত পরিচিত হইবার উদ্দেশ্যে। দেশ-বিজয়ের বাসনা তাহার বহু পরে হয়। কিন্তু পৌত্তলিকতার বিরোধী মুসলমানগণ এদেশের পৌত্তলিকতার প্রভাব দেখিয়া আর অধিক দূর অগ্রসর হন নাই। তাঁহারা এ দেশের সংস্কৃতিকে অবহেলা করিতে লাগিলেন। প্রায় তিন শত বৎসর এইরূপ অবহেলার মধ্যে চলিল। তারপর সুলতান মাহমুদের সময় একজন অসাধারণ ধীশক্তি সম্পন্ন পন্ডিত ব্যক্তি সেই ছিন্ন তার যোজনা করিয়া আবার মোহন সুরে সংগীত আরম্ভ করিয়াছিলেন। ইনি মহামনীষী পন্ডিত আবু রায়হান আলবেরুনি।"

     এই আল-বেরুনীর জন্ম ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে মধ্য এশিয়ার খোয়ারিজাম বা খোরেজম নামক রাজ্যে। সুযোগ বুঝে ১০১৭ সালে মামুনি সুলতানের হাত থেকে রাজ্যটি দখল করে নেন গজনী মাহমুদ। তার আগে ১০০৬ সালে সুলতান মাহমুদ আবুল ফাতেহ দাউদকে পরাজিত করে জয় করেন মুলতান। এসব ঘটনার উল্লেখ এখানে না করলেও চলত, কিন্তু করতে হচ্ছে বিশেষ কারণে। একশ্রেণীর সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন ইতিহাসবিদ গজনী মাহমুদকে ইসলামের আদর্শ নেতা হিসেবে উপস্থাপিত করার চেষ্টা করেছেন। কারণ, তিনি একাদিক্রমে ১৭ বার ভারত আক্রমণকারী হিসেবে বিশ্বইতিহাসে কুখ্যাত হয়ে রয়েছেন। কিন্তু তিনি যে একাজ ধর্মের প্রেরণায় করেননি, এ কাজ করেছেন নিছকই ধন-সম্পদের লোভে সেকথা সুকৌশলে চেপে যাওয়া হয়! তিনি যে সময় বারংবার হিন্দুস্থান তথা ভারতে লুটতরাজ চালান, সে সময় এদেশের মন্দিরগুলি ছিল একেকটি রত্নাগার। রাজা-মহারাজারা নিজেদের রত্নসম্ভার মন্দিরে লুকিয়ে রাখতেন। আবার মন্দিরের মূর্তি বা বিগ্রহগুলিও ছিল মূল্যবান রত্ন-নির্মিত। স্বভাবতই সুলতান মাহমুদের আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু ছিল মন্দিরগুলি। সভ্যতা ও সংস্কৃতির স্মারকচিহ্ন স্বরূপ এই সমস্ত মন্দিরগুলির ক্ষতিসাধনকে ভালো চোখে দেখেননি সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ জ্ঞানসাধক  আলবেরুনি। তিনি ছিলেন একাধারে ঐতিহাসিক, বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও গবেষক। আরবি ছাড়াও ফার্সি,গ্রীক, হিব্রু ইত্যাদি ভাষায় সুপন্ডিত ছিলেন। ভারতীয় ধর্মগ্রন্থ, পুরাণ, জ্যোতির্বিদ্যা, জ্যোতিষ, গণিত ইত্যাদি সম্যকভাবে জানার জন্য অবিশ্বাস্য ধৈর্য্য ও নিষ্ঠার সাথে সংস্কৃত ভাষায় বুৎপত্তি অর্জন করেন। তিনি প্রায় দশ বছরকাল এদেশে ছিলেন। সুলতান মাহমুদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অত্যন্ত বেদনাহত হৃদয়ে তিনি লিখেছেন, "তিরিশ বৎসরের অধিককাল ধরে অভিযান চালিয়ে হিন্দুদের শস্যশ্যামল অঞ্চলগুলিকে মরুভূমিতে পরিণত করলেন এবং এমন সব আশ্চর্য কৃতিত্ব দেখালেন যার ফলে হিন্দুরা উৎক্ষিপ্ত ধূলিকণার মতো চতুর্দিকে উড়ে গেল।" সুলতান মাহমুদের ধ্বংসাত্মক কাজের জন্য আলবেরুনি আল্লাহর কাছে 'ক্ষমা ও করুণা ভিক্ষা' করেছেন।

    আল-বেরুনীর বিশ্বখ্যাত 'কিতাবুল হিন্দ' তথা ভারততত্ত্ব শীর্ষক মহাগ্রন্থের অনুবাদক আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ প্রথম প্রকাশের ভূমিকায় লিখেছেন, "গজনিতে তখন ভারতীয় হিন্দুদের যাওয়া-আসা ছিল, মাহমুদের সৈন্যদলে কয়েকজন হিন্দু সেনানায়কও ছিল, এবং হিন্দু ক্রীতদাস, ব্যবসায়ী ও ব্রাহ্মণ পণ্ডিত-পুরোহিত নিশ্চয়ই ছিল। আফগানিস্থানে এককালে হিন্দু রাজ্য ছিল, সেখানে প্রাচীন হিন্দু অধিবাসী থাকাও বিচিত্র নয়।"

   খোরজেম রাজ্য জয়ের পর গজনী মাহমুদ বিজিত মামুনি সুলতানের পুত্র,পাত্র-মিত্র-সভাসদদের সাথে সাথে নেতৃস্থানীয় পন্ডিতদেরও বন্দী করে ভারতে নির্বাসিত করেন। সেই নির্বাসিতদের মধ্যে অন্যতম হলেন আলবেরুনি। এই নির্বাসনদণ্ড তাঁর কাছে শাপে বর হল। প্রবাদ আছে, সব খারাপেরই ভালো একটা দিক থাকে। তা ধ্বংসাত্মক সুলতান মাহমুদের অপকর্মের সুফল স্বরূপ মহাজ্ঞানী আল-বেরুনীর ভারতে আবির্ভাব। জ্ঞানতাপস অধ্যাপক রেজাউল করিম লিখেছেন, "তাঁহার আগমনের বহু পূর্বে ভারতে জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে উন্নত অবস্থা ছিল তাঁহার সময় তাহার সেরূপ অবস্থায় ছিল না। আলবেরুনি গ্রিক দর্শনে গভীর জ্ঞান লাভ করিয়াছিলেন। গ্রিকদের উদার প্রণালী ও দার্শনিক যুক্তি তিনি বেশ ভালোভাবে আয়ত্ত করেছিলেন। তাহার প্রমাণ ইহাতেই পাওয়া যাইবে যে, তিনি মুসলমানের পবিত্র গ্রন্থ কোরান ও হদীস-এর প্রচলিত ব্যাখ্যা সর্বত্র গ্রহণ করিতে প্রস্তুত হন নাই; নিজের বিবেকসম্মত ব্যাখ্যাই তিনি স্বীকার করিতেন। ভারতীয় দর্শন শাস্ত্র পাঠ করিয়া তিনি দেখলেন যে, উহার সহিত ইসলামিক দর্শন বিশেষত সুফি মতবাদের বিশেষ পার্থক্য নাই; অন্তত মূলগত আদর্শ বিষয়ে।"

    কিতাবুল হিন্দ তথা ভারততত্ত্বের মতো বিশ্বখ্যাত জ্ঞানকোষ রচনার আগে আলবেরুনী ব্রহ্ম সিদ্ধান্ত, বৃহৎসংহিতা, খন্ডখাদ্যক, বরাহমিহিরের লঘুজাত কর্ম ইত্যাদি আরো অন্তত কুড়িটি ভারতীয় গ্রন্থ সংস্কৃত থেকে আরবিতে অনুবাদ করেন। সব আগে তিনি ভারতীয় প্রাচীন ষড়দর্শনের অন্যতম সাংখ্য এবং পাতঞ্জল অনুবাদ করেন সংস্কৃত থেকে আরবি ভাষায়। প্রথমটিতে সৃষ্টিতত্ত্ব ও বস্তুজগতের বর্ণনা রয়েছে। দ্বিতীয় দর্শনে রয়েছে দেহের সাথে আত্মার সম্বন্ধ বা আত্মার মুক্তি বিষয়ে আলোচনা। আল-বেরুনীর নিজের কথায় - "এই পুস্তিকার দুটিতে হিন্দু ধর্মবিশ্বাসের অধিকাংশ সূত্র পাওয়া যাবে, কেবল ওদের শাস্ত্রবিধির নিয়মগুলো তাতে নেই।"(ভারততত্ত্ব, অনুবাদ: আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ, পৃষ্ঠা- ৪)

   ভারততত্ত্ব গ্রন্থটির বিষয়সুচির দিকে একটিবার দৃষ্টিপাত করলেই বোঝা যায় কী অসাধারণ অধ্যবসায় ও প্রজ্ঞার সাথে ভারতীয় ধর্ম ও সংস্কৃতি সম্পর্কে সুনিবিড় চর্চা করেছিলেন মহাজ্ঞানী আলবেরুনি। দৃষ্টান্ত স্বরূপ কয়েকটি এখানে উল্লেখ করা যাক। ১) ভাব ও ইন্দ্রিয়জগৎ সম্বন্ধে হিন্দুদের ধারণা, ২) কার্যকারণ-আত্মার সঙ্গে জড়পদার্থের সম্বন্ধ, ৩) মোক্ষলাভের প্রকৃতি ও পন্থা, ৪) মূর্তিপূজার সূচনা ও বিগ্রহসমূহের বিবরণ, ৫) বেদ পুরাণাদির ধর্মগ্রন্থসমূহ, ৬) হিন্দুদের ব্যাকরণ ও ছন্দশাস্ত্র, ৭) ভারতীয় পরিমাণবিজ্ঞান, ৮) স্মৃতি ও শ্রুতি অনুযায়ী স্বর্গ ও মর্তের বিবরণ, ৯) ভারতবর্ষের নদ-নদী, তাদের উৎস ও প্রবাহ, ১০) ভারতীয় জ্যোতিষী মতে আকাশ ও পৃথিবীর আকার,১১) ব্রহ্মার পরমায়ু অপেক্ষা দীর্ঘতর কালের পরিমাণ, ১২) চতুর্যুগের যুগ বিভাগ ও তৎসংক্রান্ত বিভিন্ন মতামত,১৩) মন্বন্তরসমূহ, ১৪) নারায়ণ ও তার বিভিন্ন অবতারের নাম,১৫) গ্রহাদির মধ্যক স্থান নির্ণয়, ১৬) ব্রাহ্মণ ও তার যাবজ্জীবন পালনীয় কর্তব্য, ১৭) অব্রাহ্মণদের আজীবন পালনীয় কর্তব্যকর্মাদি,১৮) তীর্থদর্শন ও পুণ্যক্ষেত্র ভ্রমণ,১৯) ব্রত ও উপবাস পালনের দিন,২০) পার্বণ ও উৎসবাদি ইত্যাদি ৮০ টি অধ্যায় রয়েছে গ্রন্থটিতে।

   গ্রন্থটির দ্বাদশ অধ্যায়ে বেদ পুরাণাদির ধর্মগ্রন্থসমূহ শীর্ষক রচনায় আলবেরুনি লিখেছেন, "ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়কে বেদ শিক্ষা দিতে পারে, কিন্তু ক্ষত্রিয়ের কাউকে বেদ শিক্ষা দেবার অধিকার নাই, এমনকি ব্রাহ্মণকেও নয়। বৈশ্য ও শূদ্রের বেদমন্ত্র উচ্চারণ বা পাঠ করা তো দূরের কথা, শ্রবণাধিকারও নাই। এদের কারুর বিরুদ্ধে যদি এমন কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয় তাহলে ব্রাহ্মণ তাকে রাজার কাছে ধরে নিয়ে গিয়ে তার জিহ্বাছেদন করে তাকে শাস্তি দেওয়াবে।" তিনি আরো লিখেছেন, "বেদে নানারূপ বিধিনিষেধ ও হিতকর্মে উৎসাহদান ও অহিত কর্ম থেকে নিরস্ত করার উদ্দেশ্যে পুরস্কার ও শাস্তির বিস্তারিত বিবরণ আছে। তবে বেদের অধিকাংশই স্তোত্র ও অসংখ্য প্রকারের কঠিন যজ্ঞের বর্ণনাতে পূর্ণ। বেদ লিপিবদ্ধ করা নিষেধ, কারণ বেদমন্ত্র কতকগুলো বিশেষ সুরে গাওয়া নিয়ম।... এই নিয়মের ফলে হিন্দুরা অনেকবার বেদ হারিয়ে ফেলেছিল।"

    অধ্যাপক রেজাউল করিমের লেখার একটি অংশ উদ্ধৃত করে এই পর্বের ইতি টানবো। তিনি লিখেছেন, "আলবেরুনি অনেকগুলি সংস্কৃত গ্রন্থ আরবিতে অনুবাদ করেন, কতকগুলিকে শৃংখলাবদ্ধ করেন, শ্রেণীবিভাগ করেন। আবার কতকগুলির লিপি উদ্ধারও করিয়াছিলেন; এবং তিনি অনেক গ্রন্থকে অবজ্ঞা ও বিস্মৃতির গহ্বর হইতে উদ্ধার করিয়া লোক-লোচনের সম্মুখে তুলিয়া ধরেন। বহুদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলস্বরূপ যে অমর কীর্তি তিনি রাখিয়া গিয়াছেন, তাহা দশম শতাব্দীর ভারতের এক উজ্জ্বল ইতিহাস।"