রবিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬

৫ আশ্বিন ১৪৩৩

সরকার অনুমোদিত অনলাইন গণমাধ্যম
BD.GOV.REG.NO-88

রবিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬

৫ আশ্বিন ১৪৩৩

সরকার অনুমোদিত অনলাইন গণমাধ্যম
BD.GOV.REG.NO-88

আপনি পড়ছেন : মতামত

স্থানীয় ধর্ম-সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন সম্রাট বাবর


চন্দ্রপ্রকাশ সরকার, মুর্শিদাবাদ, পশ্চিমবঙ্গ
DhakaReport24.com || 2022-01-16 19:08:45
স্থানীয় ধর্ম-সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন সম্রাট বাবর

"সিন্ধু নদের ধারে তিনবার সৈন্যচালনার পর আমরা সে পথ ছেড়ে ডেরাগাজি খাঁ-এর কাছে পীর কানুর সমাধি মন্দিরের দিকে এগিয়ে যাই। সমাধির কয়েকজন কর্মচারীকে আমার কয়েকজন সৈন্য আহত করায় তাদের একজনকে কঠিন শাস্তি দেওয়ার আদেশ দিই। দৃষ্টান্তস্বরূপ তাকে কেটে টুকরো টুকরো করা হয়। হিন্দুস্থানে এই সমাধির সম্মান অত্যন্ত বেশী।"

উপরোক্ত কথাগুলি মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা বীর যোদ্ধা সম্রাট বাবর স্বয়ং লিখেছেন তাঁর আত্মজীবনীতে। যুদ্ধ করে কোন অঞ্চল জয় করার পর বাবর সেই অঞ্চলের মানুষজনের মন জয় করার চেষ্টা করতেন। যুদ্ধে স্বামী হারানো বিধবা এবং তাদের অসহায় সন্তানদের সাহায্য করতেন। অর্থনৈতিক এই পদক্ষেপের পাশাপাশি স্থানীয় লোকসংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। কারণ প্রতিটি সুশাসকের মতো তিনিও বুঝতেন জনসাধারণের সন্তুষ্টি বিধানের উপরেই নির্ভর করে রাজ্য বা সাম্রাজ্যের স্থায়িত্ব। পীরের সমাধি মন্দির তথা মাজারে নিজ সৈন্যদের অবাঞ্ছিত আক্রমণ তাই ভালো চোখে দেখেননি সম্রাট বাবর।

ভারতে মুসলমান শাসনের সূচনা হয় ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে কুতুবউদ্দিন আইবকের হাত ধরে। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে পানিপথের প্রথম যুদ্ধে ইব্রাহিম লোদীকে পরাজিত করে সুলতানি শাসনের অবসান এবং মুঘল শাসনের গোড়াপত্তন করেন সম্রাট বাবর। ১২০৬  খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫২৬  খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত কালপর্বকে দিল্লি সালতানাত নামে অভিহিত করা হয়।

দিল্লিতে সুলতানি শাসন শুরু হওয়ার প্রায় ২০০ বছর আগে এ দেশে এসেছিলেন বিশ্বের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানীদের মধ্যে অন্যতম আবু রায়হান আলবেরুনি। তিনি এদেশে ১০১৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১০২৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত একটানা ১০ বছর অবস্থান করেন। ভারতীয় পন্ডিতদের সাথে মত বিনিময় করেন। এদেশের জ্ঞান-বিজ্ঞান, ভাষা-সাহিত্য চর্চা করেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। নিবিড় পরিচয় ঘটে জনজীবনের সাথে। গজনীতে ফিরে গিয়ে রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ 'কিতাবুল হিন্দ'। প্রাচীন ভারতের ধর্মীয় রীতিনীতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্য ইত্যাদি জানা এবং বোঝার ক্ষেত্রে গ্রন্থটি অপরিহার্য।  ভিন্ন পর্বে আলবেরুনি সম্পর্কে যথাসম্ভব বিস্তারিত আলোচনা করার ইচ্ছে পোষণ করি। এখানে শুধু বলার কথা এই যে, সুসভ্য ভারতীয় সমাজ তাঁকে এযাবৎকাল 'সংস্কৃতি সমন্বয়ের অগ্রদূত' হিসেবে সম্মানিত করে এসেছে।

অর্থাৎ ভারতে মুসলিম শাসনের অনেক আগে থেকেই সাংস্কৃতিক আদান প্রদান শুরু হয়। ইসলাম ধর্ম প্রবর্তনের অব্যবহিত পরেই খ্রিস্টীয় সপ্তম শতাব্দীর প্রথমার্ধে যে সমস্ত আরবীয় বণিক এদেশে বাণিজ্য করতে আসতেন তাদের মাধ্যমে ইসলাম ধর্মীয় ধ্যান-ধারণা এদেশে আসে। উচ্চ-নীচ বর্ণভেদে দীর্ণ হিন্দুসমাজে বিশেষত চিরউপেক্ষিত শূদ্রদের মধ্যে শান্তির বাণী সমন্বিত ভেদাভেদহীন ইসলাম ধর্ম যথেষ্ট আকর্ষণ সৃষ্টি করে। পরবর্তীকালে (১২৯৭ খ্রিস্টাব্দে) শাহ জালালের নেতৃত্বে একদল সুফি সন্ত সৌদি আরব থেকে দিল্লিতে আসেন ইসলাম ধর্ম প্রচারের লক্ষ্যে। তাদের একটি শাখা পৌঁছে যায় বাংলায়। ব্রাহ্মণ্যবাদী নিপীড়নে অতিষ্ঠ শূদ্র বর্ণের হিন্দু এবং বৌদ্ধরা স্বেচ্ছায় দলে দলে ধর্মান্তরিত হতে থাকেন। একই মাতার গর্ভজাত এক সন্তান হয়ত ধর্মান্তরিত হলেন, আরেকজন হলেন না। কিন্তু অলৌকিকত্বে বিশ্বাস থেকে দুজনেই পীরের দরগায় চাদর চড়ালেন! ধর্মে আলাদা হলেও সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান চলতেই থাকে। সত্যনারায়ণ হয়ে যান সত্যপীর। সত্যনারায়ণ হিন্দুর দেবতা হলেও সত্যপীরকে সম্মান করেন হিন্দু-মুসলমান উভয়েই। সত্যপীরের সিন্নি ভাগ করে খেতে কারও রুচিতে বাধে না। হিন্দু-মুসলমান উভয়েই একসাথে বনবিবির পুজো দিয়ে সুন্দরবনের গহীন অরণ্যে যাত্রা করেন জীবিকার সন্ধানে। ভারতীয় সমাজের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ভারততীর্থ কবিতায় বিশ্বকবি যথার্থই বলেছেন :
"দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে, যাবে না ফিরে -- এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে।"
     "ইসলামের আবির্ভাবের বহু পূর্ব হতেই ভারতের সহিত আরব জগতের একটা সম্পর্ক ছিল। সে যুগের সমসাময়িক আরবি সাহিত্য থেকে এই সম্পর্কের পরিচয় পাওয়া যাবে। হজরত মুহাম্মদ (সা:) ভারতবর্ষ সম্পর্কে কতিপয় মূল্যবান উক্তি করেন। চতুর্থ খলিফা হজরত আলি বলেছিলেন যে ভারতবর্ষ একটা পবিত্র ও সুগন্ধিপূর্ণ দেশ। তাঁর মতে পৃথিবীর প্রথম মানুষ হজরত আদম স্বর্গ থেকে এই ভারতবর্ষে অবতীর্ণ হন। এদেশের বৃক্ষরাজি স্বর্গের সুরভিপূর্ণ।"(সমন্বয়ের সন্ধানে - রেজাউল করীম, প্রকাশক: সূত্রধর) অতি প্রাচীনকাল থেকেই বিশ্ববাণিজ্যের কেন্দ্রে ছিল ভারতের অবস্থান। সুপ্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থ ঋকবেদে অর্ণবপোত, বাণিজ্য ও বণিকদের সমুদ্রযাত্রার প্রসঙ্গ রয়েছে। ভারতীয় বণিকরা যেমন নৌ-বাণিজ্যে বিশেষ কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছিলেন, তেমনি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বণিকেরাও বাণিজ্যিক স্বার্থে ভারতে যাতায়াত করতেন। শিক্ষা-বিস্তার ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সুযোগ্য সহযোদ্ধা অক্ষয়কুমার দত্ত তাঁর 'প্রাচীন হিন্দুদিগের সমুদ্রযাত্রা ও বাণিজ্য বিস্তার' শীর্ষক এক  দীর্ঘ অসামান্য রচনার এক জায়গায় লিখেছেন - "প্রাচীনকাল হইতেই আরবীয় বণিকেরা যে হিন্দুদিগের(হিন্দু শব্দটি সেসময় ভৌগোলিক এলাকা বা স্থানবাচক শব্দ ছিল, ধর্মবাচক নয়। সেসময় ইসলাম ধর্ম প্রবর্তিতই হয়নি।) নিকট হইতে বিবিধ প্রকার পণ্যদ্রব্য ক্রয় করিয়া মিশরদেশে বিক্রয়ার্থ লইয়া যাইত, তাহা স্পষ্টই বোধ হইতেছে। যদিও হিন্দুদিগের ন্যূনাধিক দুই সহস্র বৎসর পূর্বে মিশরদেশে গমনাগমন করিবার ইতিহাস আছে; এবং এক আরবীয় গ্রন্থকর্তার প্রামাণিক লিপি অনুসারে, দ্বাদশ শত শক পর্যন্তও হিন্দুরা সমুদ্রপথে আরবদেশে উত্তীর্ণ হইয়া পরে স্থলপথে মিশরদেশে গমন করিতেন।"

ভারতীয় ইতিহাসে মধ্যযুগকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে মুসলমান শাসনামল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সেই যুগেও ভারতীয়দের বহির্বাণিজ্য অব্যাহত ছিল। সম্রাট বাবর তার আত্মজীবনীতে এক জায়গায় লিখেছেন - "আমরা যখন কিলাতে পৌঁছাই, হিন্দুস্থানের বণিকরা বাণিজ্যের পসরা নিয়ে ঐ দিক দিয়েই আসছিল। সৈন্যরা তাদের পথে আচমকা এসে পড়ায় তারা আর পালাবার সুযোগ পেল না। সাধারণভাবে এই মতবাদেরই প্রাধান্য দেখা গেল যে বর্তমানের মতো গোলমেলে সময়ে পরদেশ থেকে যেসব জিনিসপত্র এসে পড়েছে সেগুলো লুট করে নেওয়াই উচিত। কিন্তু আমি এই মতবাদে সায় দিইনি।" "আমি বললাম - এই বিদেশী বণিকদের অপরাধ কি? যদি ঈশ্বরের ওপর আস্থা রেখে এই সব তুচ্ছ জিনিস লুটতরাজ করে আত্মসাৎ করতে বিরত হই, তা'হলে ঈশ্বর একদিন না একদিন এর প্রতিদানে আমাদের ওপর অপার করুণা বর্ষণ করবেন।"(বাবরের আত্মকথা, অনুবাদ: শচীন্দ্রলাল রায়, প্রকাশক: মিত্র ও ঘোষ, আশ্বিন ১৩৭১, পৃষ্ঠা- ১৪৮) ঘটনাটি ১৫০৭ খ্রিস্টাব্দের, অর্থাৎ বাবরের দিল্লি বিজয়ের প্রায় বিশ বছর আগের এই ঘটনা।

এই হল বাবর-চরিত্র। ঈশ্বরের অপার করুণা লাভের প্রত্যাশায় হিন্দুস্থানী বণিকদের জিনিসপত্র লুটতরাজ থেকে বিরত হচ্ছেন! হিন্দুস্থানে পীরের সমাধির 'সম্মান অত্যন্ত বেশী' বলে সমাধিস্থলের কর্মচারীকে আহত করার অপরাধে নিজ সৈন্যকে কেটে টুকরো টুকরো করে 'দৃষ্টান্তস্বরূপ' শাস্তি দিচ্ছেন! এমন একজন মানুষের পক্ষে হিন্দু মন্দির ধ্বংস করে মসজিদ নির্মাণ কি সম্ভব ? রাজনৈতিক হিন্দুত্ববাদের অপপ্রচারে সবই সম্ভব! তারা চায় যেনতেন প্রকারেন মানুষের মধ্যে ধর্মীয় বিভেদ-বিদ্বেষ ও জিঘাংসা জাগিয়ে তুলতে। তারা দেশবাসীর জন্য 'আচ্ছে দিন' এনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। আর ক্ষমতায় এসে একদিকে কর্পোরেট-কর্তাদের স্বার্থ রক্ষায় সমস্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করছেন, অন্যদিকে জাতি দাঙ্গায় দেশবাসীকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার ফন্দি কষছেন! একদা জার্মানিতে ইহুদি বিদ্বেষের আগুন জ্বেলে ঠিক এই কাজটিই করেছিলেন ইতিহাসে কুখ্যাত এডলফ হিটলার! সেই ফ্যাসিবাদী হিটলারের ঘোষিত সমর্থকদের উত্তরসূরিরাই আজ এদেশের শাসন-ক্ষমতায়। তবে কিছু মানুষকে কিছুদিনের জন্য তারা বিপথগামী করতে পারলেও চিরদিনের জন্য যে পারবেন না সে কথা জোর দিয়েই বলা যায়। আউল-বাউল-পীর-ফকিরের এই দেশে জাতিগত ঘৃণার চেয়ে জাতিগত সম্প্রীতির শেকড় অনেক গভীরে। এ বাবদে একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে আজকের মত কথা শেষ করব।

পীরের নাম হজরত শামসের গাজী। কবে জন্মেছিলেন, কবে সমাধিস্থ হয়েছেন কেউ জানেন না। কিন্তু গ্রামের প্রান্তে রয়ে গেছে পীরের দরগা বা পীরবাবার মাজারটি। স্থান হুগলী জেলার পান্ডুয়ার গোপালনগর গ্রাম। গ্রামে একটিও মুসলিম পরিবার নেই। একসময় অযত্ন-অবহেলার শিকার হয়ে পড়েছিল ওই দরগাটি। গ্রামের হিন্দুরাই দরগা-চত্বরের আগাছা সাফ করেন। পীরের মাজারে শান বাঁধিয়ে, লালসালু চড়িয়ে এলাকাটির ভোল পাল্টে দেন। প্রতি বছর মাঘ মাসের পূর্ণিমায় উরস উৎসবের আয়োজন করেন হিন্দুরাই। অনুষ্ঠানে পৌরোহিত্য করতে আসেন পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে জয়নাল নামে এক খাদেম। হাজার হাজার ভক্ত-সমাগমে গমগম করে মাজার-চত্বর। রীতিমতো মেলা বসে যায়। হিন্দু-মুসলমানের মিলনমেলা। উভয় ধর্মের বিশ্বাসী মানুষরাই ছোট ছোট পোড়া মাটির ঘোড়া মানত দেন পীর-দরগার গাছের গোড়ায়। ঘোড়া জমতে জমতে গাছের গোড়ায় রীতিমতো ঢিবি তৈরি হয়ে গেছে!  প্রয়াত পীরবাবাকে হিন্দুরা বলেন, 'বুড়ো ব্যাটা।' সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাণ্ডটি হলো, বাৎসরিক অনুষ্ঠানে হিন্দুরা সেখানে হরিনাম সংকীর্তন করেন। অর্থাৎ ধর্মীয় কোন সংকীর্ণতার স্থান সেখানে নেই।