যতদিন বিটিভিতে আমাদের সংস্কৃতিঘন নাটকগুলো হতো; ততদিন আমরা বাঙালি ছিলাম। রমনার বটমূলে বৈশাখের গান শুনতে যেতাম; মঙ্গলশোভাযাত্রায় হেঁটে বোশেখের আনন্দ নিংড়ে নিতাম। পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে স্বল্প দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র দেখতে যেতাম।
এরমধ্যে একটু একটু করে হিন্দি চলচ্চিত্র আর নাটক এসে হানা দিয়েছে আমাদের সাংস্কৃতিক মনোজগতে। হিন্দি চলচ্চিত্রকে অন্ধ অনুকরণ করতে গিয়ে বাংলা চলচ্চিত্র রুচিতে ধস নামলো। বিকল্প ধারার চলচ্চিত্র দিয়ে ঠেকানো গেলো না। হিন্দি টিভি সোপগুলোর অন্ধ অনুসরণে আমাদের প্যাকেজ নাটকে বদলে গেলো ড্রইং রুমের আসবাব, নায়িকার পোশাক।
চলচ্চিত্র আর টিভি নাটকে আমার সংস্কৃতির অপভ্রংশ রুপ দেখে; তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে আমরা ভিডিও ক্যাসেটে হলিউডের চলচ্চিত্র আর টিভিতে ইংরেজি টিভি সোপ দেখতে শুরু করলাম।
আমাদের দেশে প্রতিটি শিশুর জন্য শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত নয় । বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের সাম্য-মানবিক মর্যাদা-সামাজিক ন্যায়বিচার যেহেতু উপেক্ষিত; দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কিশোরেরা মাদ্রাসায় সামান্য পড়ালেখা করেই ছুটলো, ট্যাকা দ্যান দুবাই যামু মিছিলে। কারণ দেশে সে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে উপেক্ষার জীবন যাপন করছে। রেমিট্যান্স আসবে বলে সরকারগুলোও তাদের উতসাহিত করলো। কারণ জিডিপি বাড়িয়ে দ্রুত সিঙ্গাপুর-সুইটযারল্যান্ড হতে হবে যে।
মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করতে যাওয়া শ্রমিকেরা রমনার বটমূলের ছায়ানটের গানও শোনেনি; মঙ্গলশোভাযাত্রাও দেখেনি। টিভিতে দেখেছে সবাই সমস্বরে টেকা-টেকা করছে। ফলে সে জীবনে প্রথম সংস্কৃতির দেখা পায় আরব দেশে। তার কাছে ওটাই সংস্কৃতি তখন। দেশে বেড়াতে এসে টাকা থাকায় সমাজে তার বিশেষ গুরুত্ব। সে তার শাড়ি পরা মা-বোনকে আরবীয় হিজাব পরায়। আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে গড়ে ওঠে সেটা। আরবীয় সংস্কৃতির এই আধিপত্যের সঙ্গে অর্থনীতির যোগাযোগ খুব ঘনিষ্ট। দ্রুত ধনী দেশ হবার জন্য মাথা খারাপ হলে; আর দেশের শিশুদের শিক্ষা সুযোগ-ভাতের অধিকার উপেক্ষা করে; সরকারে চেয়ার চেয়ার খেললে এই হয়।
টাকাই খোদা, টাকাই ভগবান; এই চিন্তা যে সমাজকে তাড়িত করে; তার আবার সংস্কৃতি কী! সিঙ্গাপুর-থাইল্যান্ড-এমেরিকার কী কোন নিজস্ব সংস্কৃতি আছে।
এমেরিকায় যারা রেমিট্যান্স উপার্জন করে; তাদের অনেকে এমেরিকান সংস্কৃতি নিয়ে আসে দেশে। শাড়ির পরিবর্তে টি শার্ট জিনস পরতে শেখায়। আভিজাত্যের প্রতীক হিসেবে গড়ে ওঠে সেটা।
রেমিট্যান্স নেবেন আর সংস্কৃতির রেমিট্যান্স নেবেন না; তাই কী হয়! ফুল নিলে, কাঁটার আঘাতও নিতে হবে।
আর বাঙালি সংস্কৃতি রুচির পুরোহিত হয়ে যে লোকগুলো টিভিতে এসে মনগড়া বয়ান দেয়; তাদের ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েছে। সেটল করেছে পশ্চিমে। মাদ্রাসায় পড়া দরিদ্র শিশুদের সঙ্গে এদের পার্থক্য হচ্ছে; ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া এই অবস্থাপন্ন শিশুদের চয়েস। কেউ বাধ্য করেনি। কিন্তু প্রান্তিক শিশুরা দুটো ভাতের বিনিময়ে মাদ্রাসা শিক্ষার সুযোগ পায়। ওটা তাদের চয়েস নয়। নিয়তি তাকে ওখানে পাঠিয়েছে। কতো নিউটন-আইনস্টাইনের মৃত্যু হয় দারিদ্র্যের অগমে দুর্গমে; তার খোঁজ কেউ রাখে না।
মাদ্রাসার দরিদ্র শিশুদের ব্রেনওয়াশ করে তাদের জঙ্গী বানায় একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী। আরেকটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী বাংলা মিডিয়ামের শিশুদের ব্রেনওয়াশ করে সন্ত্রাসী বানায়। দুটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর নেতাদের সমঝোতা হয়; শোকরানা মেহেফিল হয়; নজরানা বিতরণ হয়। কিন্তু ব্রেনওয়াশড ফুট সোলজারেরা পরস্পর সংঘর্ষে প্রাণ হারায়।
যে ধর্মীয় ওয়াজ-মেহেফিল সমাজে শান্তি বারতা দেবার কথা; তা ব্যবহৃত হয় একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আধিপত্য বিস্তারের কাজে। যে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড সত্য ও সুন্দরের বারতা দেবার কথা; তা ব্যবহৃত হয় একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর আধিপত্য ধরে রাখার কাজে।
ফলে সাধারণ মানুষের যে একান্ত ধর্ম ও সংস্কৃতি তা ছিনতাই হয়ে গেছে। দুটি কট্টর সম্প্রদায় ক্ষমতার লড়াই লড়ছে। সাম্প্রদায়িক পিশাচ যদি বলতেই হয়, দুটোই সাম্প্রদায়িক পিশাচ; চিরস্থায়ী বিভেদের দেয়াল তুলে যারা ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে আমাদের সাংস্কৃতিক ভূগোল।
মাসকাওয়াথ আহসান, লেখক , সাংবাদিক এবং শিক্ষক