সেমিটিক ধর্মগুলোতে আছে, ঈশ্বর আদম ও ইভকে শাস্তি ভোগের জন্য পৃথিবীতে নিক্ষেপ করেছিলেন। শাস্তির জন্য ঈশ্বর নরকেই নিক্ষেপ করেন। তার মানে দুনিয়া একটা নরক।
মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতার ১৩৪৬-৪৭ সালে বাংলায় এসেছিলেন। তাঁর সফরনামার ‘বঙ্গালহ' অধ্যায়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা লিখেছেন তিনি, 'এই দেশ ভালো নয়, অন্ধকারময়। সম্পদপূর্ণ নরক। রুপার এক
দিনারে ৩৫০ কেজি চাউল পাওয়া যায়। সুন্দরী বাঁদীর দাম ১ সোনার দিনার। আমি একটি বাঁদী কিনেছিলাম। সে খুব সুন্দরী ছিল।'
বতুতা যা বললেন তাতে বোঝা গেল বিশ্বনরকের মধ্যে নিকৃষ্ট নরক হলো বাংলাদেশ।
মোগল আমলের আরেক পণ্ডিত (এখন নাম মনে পড়ছে না) লিখেছিলেন, 'বাংলায় ঢোকার রাস্তা অনেক, বের হওয়ার কোনো রাস্তা নেই।' তিনিও বাংলায় সম্পদের লোভে এসেছিলেন। তাঁর মতো অনেকেই লুট বা দখল করতে এসে আর ফিরে যাননি। সম্পদ থাকলে বাংলায় থাকার চেয়ে নিরাপদ ও আরামের জায়গা তখন বিশ্বে আর কোথাও ছিল না, তাঁর কথায় তা বোঝা যায়।
'ধনধান্যে পুস্পে ভরা' এ দেশ সম্পর্কে কবি দ্বিজেন্দ্রলাল রায় কী এই কারণেই বলেছিলেন, 'সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি?' রাজা সব দেশের হয়, সেখানে 'রানী' কেন? অবশ্য ব্রিটিশ রানীর মর্যাদার সাথে মিল রেখে তা বলে থাকতে পারেন। কিংবা সুক্ষ্ম বেদনাবোধ থেকে সুক্ষ্ম উপহাসের জায়গা থেকেও লিখতে পারেন। ভুলে যাচ্ছি না যে তিনি প্রহসন ও নাটক লেখায়ও পারদর্শী ছিলেন।
সম্পদ থাকলে বাংলা যে আরামের তা এখনও সত্য। আমরা গরিবেরা প্রতিদিন সেই সত্য প্রত্যক্ষ করি। তারপরও এখানে আমরা কেন থাকি? নিরুপায় বলে থাকি। পালাবার পথ নেই বলে থাকি। বিদেশে আরও কঠিন নরকে শ্রমিক বা দাস হয়ে আমাদের ভাইয়েরা টাকা পাঠায় দেশের স্বজনদের নরকবাসকে সহনীয় করে তুলতে। বোনেরা দেশেই দেশিদের দাস হয়ে সস্তা শ্রমের যোগান দিয়ে কাউকে কাউকে জগৎশেঠ বানায় পরিবারের সবার এই নরকবাস সহনীয় করতে। সবাই নিরুপায় হয়ে করে এসব।
হুমায়ুন আজাদ কবিতায় বলেছিলেন, 'সবকিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে।' সবকিছু যে নষ্টদের অধিকারে ছিল ও আছে তা তিনি ভালো করেই জানতেন। তারপরও 'অধিকারে যাবে' বললেন কেন? কারণ, 'গেছে' বললে তা কবিতা হতো না, 'যাবে' বলাতেই কবিতা হয়েছে। 'যাবে' বলাতেই আশাবাদীর জন্য আশা আর হতাশাবাদীর জন্য হতাশার দোলাচল তৈরি হয়েছে। এটাই কবিতার কারিকুরি, এটাই কবিতার জিলিপির নান্দনিক প্যাচের স্বাদের রহস্য।
আরেক হুমায়ুন, মানে হুমায়ুন আহমেদ কিন্তু তাঁর প্রথম উপন্যাসিকায় বলে দিয়েছিলেন 'নন্দিত নরক'। 'নন্দিত নরকের' পরিবার ও পরিস্থিতি তো বাংলাদেশেরই, তাই না?
তাহলে এখন এখানে আমরা যারা আছি তারা কী করি? এই নরকে এতকিছুর পরও কোনো আর্তচিৎকার বা আর্তকাঁপুনি ও গোঙানি ছাড়া সবকিছু সয়ে চুপচাপ কীভাবে থাকি, কেন থাকি? আমি কী করি, আমরা কী করি, কীভাবে বাঁচি এই নরকে? আমরাও নিরুপায় হয়ে এই নরকে। নিজেকে কাতুকুতু দিয়ে হলেও একটু আনন্দ খুঁজে নিয়ে সহনীয় করি প্রতিদিনের নরকযাপন।