বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৫, ২০২৬

২১ কার্তিক ১৪৩৩

সরকার অনুমোদিত অনলাইন গণমাধ্যম
BD.GOV.REG.NO-88

বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৫, ২০২৬

২১ কার্তিক ১৪৩৩

সরকার অনুমোদিত অনলাইন গণমাধ্যম
BD.GOV.REG.NO-88
**সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ**

>> নতুন প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালাল উত্তর কোরিয়া

>> ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনে গত ২৪ ঘন্টায় ডিএমপির ২০৮৮ মামলা

>> ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ

>> রাজধানী থেকে ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা গ্রেপ্তার

>> ৫০০ টাকার মুচলেকায় জামিন পেলেন পরীমনি

>> আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো

>> বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম আরও বাড়ল

>> ক্ষমতাচ্যুতরা সীমান্তের ওপার থেকে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে: প্রধানমন্ত্রী

>> শেখ হাসিনাকে ট্রাভেল পাশ দেওয়া হবে না: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

>> আজ খুলনা ও বাগেরহাট সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

আপনি পড়ছেন : মতামত

নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু: কারা কী বলেছিলেন


ড. মতিউর রহমান
DhakaReport24.com || 2022-06-04 21:44:30
নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু: কারা কী বলেছিলেন

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি  বেশকিছু মেগাপ্রকল্প গ্রহণ করেন। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি হলো ‘পদ্মাসেতু নির্মাণ’ প্রকল্প। এটি বাংলাদেশীদের জন্য একটি স্বপ্ন হিসেবে চিত্রিত বা রূপায়িত হয়েছিল। আর এই স্বপ্নের রূপকার ছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের ফলে এবং তথাকথিত দুর্নীতির অভিযোগ তুলে বিশ্বব্যাংক যখন ২৯ জুন ২০১২ সালে পদ্মাসেতুর ঋণ চুক্তি বাতিল করে এবং অন্যান্য দাতাগোষ্ঠীও সরে দাঁড়ায় তখন ওই বছরই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নিমার্ণের দৃঢ় সংকল্প ব্যক্ত করেন। এ কথা অনস্বীকার্য যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুদৃঢ় মনোভাবের বাস্তব রূপায়নই আজকের স্বপ্নের পদ্মাসেতু। আমাদের মত আমজনতার এটা জানা নেই যে, তিনি কিসের ভিত্তিতে, কোন ভরসায় এরকম একটি বড় সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিলেন।

তবে এই ঘটনার পরপরই আমরা দেখতে পেয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর দেশজ উন্নয়ন দর্শনের একজন নিস্বার্থ ছাত্র ও স্বনামধন্য গবেষক অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত পদ্মাসেতু নিয়ে গভীর বিশ্লেষণধর্মী ও প্রায়োগিক একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন যা ওইসময় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগায়। বৃহৎ গবেষণাপত্রটির শিরোনাম ছিল “নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেত: জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সুযোগ”। 

গবেষণাপত্রটি বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি কর্তৃক আয়োজিত “নিজ অর্থে পদ্মাসেতু” শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে মূল প্রবন্ধ হিসেবে ১৯ জুলাই ২০১২ সালে ড. আবুল বারকাত কর্তৃক পঠিত হয়। ওই গবেষণাপত্রেই তিনি উল্লেখ করেন “বিশ্বব্যাংক কর্তৃক পদ্মা সেতুর ঋণ চুক্তি বাতিল অনৈতিক ও মহা অন্যায় তবে তা বাংলাদেশের জন্য এক মহা আশীর্বাদ (blessing  in disguise)”। বিস্তারিত হিসেব-পত্তর করে তিনি দেখান যে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সদিচ্ছা থাকলে নিজস্ব অর্থায়নেই পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব। তাও একটি নয় চার-চারটি। তাঁর এই গবেষণাপত্র উপস্থাপনের পরে দেশ-বিদেশের অনেক বিজ্ঞ ও পণ্ডিত ব্যক্তি তীব্র সমালোচনা করেন। এমনকি  সেসব সমালোচনায় অধ্যাপক বারকাতকে ব্যক্তিগতভাবেও আক্রমণ করা হয়। 

তবে সমালোচনার পাশাপাশি অধ্যাপক বারকাতের ওই গবেষণাকর্মটি যে কতটা প্রায়োগিক, যুক্তিপূর্ণ ও সময়োপযোগী ছিল সে সম্পর্কে পরবর্তীতে দেশের অনেক বিদ্বজ্জন মন্তব্য করেছেন; অধ্যাপক বারকাতের জ্ঞান ও সাহসের প্রশংসা করেছেন এবং ২০১৪ সালে প্রকাশিত “গণমানুষের অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত” শীর্ষক গ্রন্থে তাদের লেখার মাধ্যমে তা প্রকাশ করেছেন। তাদের অনেকেই নামকরা শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, পেশাজীবী, সমাজ ও উন্নয়নকর্মী, মানবাধিকার কর্মী, সংস্কৃতিকর্মী, গবেষক এবং মুক্ত ও প্রগতিশীল চিন্তা-চেতনার মানুষ। বিজ্ঞ পাঠকদের জ্ঞাতার্থে তাদের কয়েকজনের মন্তব্য এখানে সংক্ষিপ্তাকারে তুলে ধরলে একদিকে যেমন বিষয়টি আরো পরিষ্কার হবে আর অন্যদিকে এ বিষয়ে জ্ঞানজাগতিক ইতিহাস স্পষ্ট হবে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক মন্তব্য করেছেন “জটিল অর্থনীতির বিষয়গুলো অধ্যাপক বারকাত এমন সহজ-সরল প্রাঞ্জল ভাষায় উপস্থাপন করেন যা সাধারণ মানুষের পক্ষেও বোধগম্য।...নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু, দারিদ্র্য, অর্পিত সম্পত্তি, জঙ্গিবাদ, মৌলবাদের অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয়ে তার বিশ্লেষণধর্মী বক্তব্য শোনার সুযোগ আমার হয়েছে।...একটি সমন্বিত অর্থনীতির বাস্তব চেহারা আবুল বারকাত স্বচ্ছতার সাথে সবার সামনে তুলে ধরেন”। 

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ উম্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ কায়েস উদ্দিন উল্লেখ করেছেন,“পদ্মা-সেতুসহ জনগুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বিনির্মাণ যে আমাদের নিজস্ব অর্থায়নে সম্ভব, তথ্য-উপাত্তসহ তিনিই (অধ্যাপক আবুল বারকাত) প্রথম তা তাঁর বিশ্লেষণধর্মী গবেষণার মাধ্যমে দেখিয়েছেন”।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও কবি আবু বকর সিদ্দিক মন্তব্য করেছিলেন,“যারা বলছেন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করা সম্ভব নয় অথবা পদ্মা সেতুর জন্য বাজেটে বরাদ্দ রাখায় সামাজিক খাতে ব্যয় কমবে, তাঁরা ঠিক বলছেন না। তাঁরা বিশ্বব্যাংকের দালাল”।

প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ ও লেখক পঙ্কজ ভট্রাচার্য বলেছেন,“...তার আর একটা গভীর গবেষণা হলো পদ্মা সেতুসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নিজস্ব অর্থায়নে নির্মাণ সম্ভবপর এই সত্যটি”। মুক্তিযোদ্ধা, লক্ষীপুর জেলা পরিষদ এর সাবেক প্রশাসক ও প্রাক্তন বিমান মন্ত্রী এ.কে.এম. শাহজাহান কামাল উল্লেখ করেছেন,“অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাতই প্রথম এবং সম্ভবত একমাত্র ব্যক্তি যিনি প্রথম গভীর বিশ্লেষণপূর্বক দেখিয়েছেন যে, বিশ্বব্যাংকের ঋণ ছাড়াই পদ্মাসেতুসহ অনেক জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণ নিজস্ব অর্থায়নেই সম্ভব”।

জনতা ব্যাংক লিমিটেডের তৎকালীন প্রধান নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, এস এম আমিনুর রহমান মন্তব্য করেছেন,“পদ্মা সেতু কিভাবে হবে, নিজস্ব অর্থায়নে আদৌ করা সম্ভব কিনা, এই নিয়ে যখন সবাই উদ্বিগ্ন-চিন্তিত, তখন ড. বারকাত এগিয়ে এলেন সমাধান নিয়ে। জাতির কাছে তুলে ধরলেন ‘নিজ অর্থে পদ্মা সেতু নিমার্ণ’ সম্ভাবনার পথ। আমরা খুঁজে পেলাম আশার আলো”। 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এর অতিরিক্ত কমিশনার অব কাস্টম, মো. মতিউর রহমান উল্লেখ করেছেন, “... অধ্যাপক ড. আবুল বারকাত কতটা উঁচুমানের অর্থনীতিবিদ তার প্রমাণ তিনি সম্প্রতি আবার দিয়েছেন। ...সবাই যখন বলছে, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ছাড়া পদ্মা সেতুর মতো এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব নয়– সে সময় বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ড. আবুল বারকাত রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব। এজন্য তিনি জাতির সামনে কিছু প্রস্তাব উত্থাপন করলেন”। 

বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের প্রাক্তন চেয়ারম্যান খন্দকার রাশিদুল হক নবা লিখেছেন, “সবাই যখন বলছে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ছাড়া পদ্মাসেতু নির্মাণ সম্ভব নয় তখন এই বারকাতই তার দীর্ঘ ৪০ পৃষ্ঠার গভীর গবেষণায় হিসেব-পত্তরসহ জাতির সামনে প্রমান করলো “নিজ অর্থে পদ্মা সেতু বিনির্মাণ সম্ভব”- সবাই সম্ভবত তার হিসেব পত্রের সাথে এখন একমত”।

অর্থনীতি বিশ্লেষক, কবি ও তৎকালীন একটি রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকের কর্মকর্তা ফেরদৌস সালাম লিখেছিলেন,“এই অর্থনীতিবিদ সুনির্দিষ্টভাবে বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব। এবং এর মাধ্যমে একটি জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সুযোগ গ্রহণ করা যেতে পারে।...এদেশের মাটি ও মানুষের হৃদয়ঘনিষ্ঠ অর্থনীতিবিদ বলেই তিনি এই গবেষণায় সর্বোচ্চ মনোযোগ নিবেদন করেছেন। সরকারের উচিত পদ্মাসেতু নিয়ে ড. আবুল  বারকাত-এর গবেষণার আলোকে বাস্তব পদক্ষেপ নেয়া।... এটি ঘটলে বাংলাদেশ–জাতি হিসেবেই বিশ্বে সফলতায় উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হবে এবং সম্মানিত হবে কোন সন্দেহ নেই। সেই সাথে দেশের অর্থনৈতিক মুক্তির দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ সম্পন্ন সম্ভব হবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায়।” 

একুশে বইমেলা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. জাকির হোসেন মন্তব্য করেছেন,“...দেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ড. আবুল বারকাত মন্তব্য করলেন, পদ্মাসেতুর অর্থায়ন দেশের ভেতর থেকে করা সম্ভব। অর্থাৎ আমাদের সীমিত সম্পদের যথাযথ ব্যবহার ঘটিয়ে এবং দেশের বিভিন্ন উৎপাদন মাধ্যম থেকে অর্থায়ন সম্ভব: কেবল তখনই যেন আমরা নড়েচড়ে বসলাম। কিছুটা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। বাস্তবিকই আমাদের অবস্থাটা মানসিকভাবে যেন খুবই পরনির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। আমরা নিজেদের সামর্থ-ইত্যাদি নিয়ে এখনো যেন খুব বেশি সচেতন হয়ে উঠতে পারিনি। আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি রয়েছে।.. অতএব অর্থনীতিকে গণমানুষের অর্থনীতিতে পরিণত করার নতুন স্বপ্নদ্রষ্টা ড. আবুল বারকাতকে আন্তরিক সাধুবাদ জানাই, যে অন্তত তিনি সাহস করে ভাবতে পেরেছেন, সামষ্টিক অর্থায়নের পথ বেয়ে, দেশের অর্থায়নে পদ্মাসেতুর নির্মাণ সম্ভব।” 

মুক্তিযোদ্ধা, বিশিষ্ট লেখক ও সাংবাদিক হারুন হাবীব উল্লেখ করেছেন,“তিনিই প্রথম গভীর বিশ্লেষণ করে দেখাতে পেরেছেন যে পদ্মা সেতুসহ অনেক জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো বিনির্মাণ নিজস্ব অর্থায়নেই সম্ভব”। সাংবাদিক শাহানা আফরোজ শিশির উল্লেখ করেছেন,“ বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে পদ্মা সেতু প্রকল্প নিয়ে যখন আন্তর্জাতিক বিতর্ক, তখন ড. আবুল বারকাত বললেন নিজস্ব অর্থায়নে একটি নয় ৪টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব। অর্থনীতিবিদ ড. বারকাত অর্থের উৎস থেকে শুরু করে বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করেছেন কিভাবে এই কাজটি করতে হবে”। চট্রগ্রাম প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি আবু সুফিয়ান মন্তব্য করেছেন,“পদ্মা সেতুর অর্থ সংস্থান নিয়ে তাঁর দিকনির্দেশনা চোখ খুলে দিয়েছে সবার। তাঁর মেধা আর প্রজ্ঞার পরিচয় পাওয়া যায় এখানেই”। 

‘অর্থ সংবাদ’ এর নির্বাহী সম্পাদক ইয়াসমিন আক্তার মন্তব্য করেন,“বাংলাদেশের মানুষের মন মানসিকতা থেকে দাসত্ব বোধের চিন্তা দূর করে নিজেদেরকে আত্মনির্ভরশীল করে গড়ে তোলার জন্য তিনি তার মেধাশক্তি, জ্ঞান, গবেষণা ও চেষ্টা দিয়ে আজও যুদ্ধ করে যাচ্ছেন। তার এই আত্মনির্ভরশীল চিন্তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ‘নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের’ কথা। কারণ হঠাৎ করে বিশ্বব্যাংক কর্তৃক পদ্মা সেতুর জন্য ঋণ চুক্তি বাতিলে পুরো দেশ হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং পিলে চমকানোর মতই সবার স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়। ঠিক এমনই নিরাশ জাতিকে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের সম্ভাবনার যে বিশ্লেষণ তিনি করেছেন তা কিছুটা হলেও হতাশ জাতিকে আত্মনির্ভরশীল হওয়ার চিন্তা করতে শিখিয়েছে”। 

‘অর্থ কথা’ এর সম্পাদক সৈয়দ রানা মুস্তফী লিখেছেন, “ড. আবুল বারকাত একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক অর্থনীতিবিদ। তিনি রীতিমতো গবেষণা করে, পরিশ্রম করে বের করেছেন যে, দেশীয় অর্থেই পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণের। দেশের বরেণ্য এই অর্থনীতিবিদ হিসাব করে দেখিয়েছেন যদি নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করা হয় সে ক্ষেত্রে এ ধরনের ২টি সেতু নির্মাণ করা সম্ভব।”

চিকিৎসক শেখ বাহারুল আলম তার লেখায় উল্লেখ করেছেন,“পদ্মাসেতু প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক ঋণ বরাদ্দ দেবার নামে যে ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছে তাতে আমাদের বিশাল জনগোষ্ঠীর আকাঙ্ক্ষার এ প্রকল্প যথাসময়ে শুরু করা যায়নি। আবুল বারকাত এ সময়ে বিশ্বব্যাংক ঋণ নির্ভরতার বিরুদ্ধে প্রচন্ডভাবে প্রতিবাদী হয়ে উঠেন এবং  বলার চেষ্টা করেন যে, নিজস্ব অর্থায়নে এ সেতু হওয়া সম্ভব, সরকার যেন বিশ্বব্যাংকের নির্ভরশীলতা পরিহার করে এবং সমগ্র জাতীয়, আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীকে প্রমাণ দিয়ে বলেন বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর মত চারটি সেতু করার ক্ষমতা রাখে। অর্থনৈতিকভাবে পরনির্ভরশীলতা কাটিয়ে রাষ্ট্র যেন আত্মনির্ভর মর্যাদাশীল হয়ে উঠে। এর ফলে শেষ পর্যন্ত সরকার ২০১৩-২০১৪ অর্থ বছরের বাজেটে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার উদ্যোগ গ্রহণ করে”।

উন্নয়নকর্মী ও সমাজ গবেষক সৈকত বিশ্বাস লিখেছেন,“...নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার অর্থ সংস্থানের পদ্ধতি আবিষ্কারের ওপর নিবিড় গবেষণা শুরু করেন অধ্যাপক বারকাত। বাস্তব তথ্য ও গাণিতিক বিশ্লেষণ এর মাধ্যমে দেশজ ও বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের সম্ভাবনা প্রক্ষেপণ করে তিনি দেখিয়েছেন ছোট দেশ হলেও এমন বিশাল উদ্যোগ দেশীয়ভাবেই সম্ভব”।

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক তৌফিক আহমদ চৌধুরী উল্লেখ করেছিলেন, “ড. বারকাতের নেতৃত্বে এবং তারই গবেষণালব্ধ ফলাফলের ভিত্তিতে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতিই প্রথম নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের কারিগরি ও আর্থিক যোগ্যতা সম্বলিত জোরালো প্রস্তাব জাতির সামনে তুলে ধরে”। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের তৎকালীন পরিচালক ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির তৎকালীন কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য অধ্যাপক হান্নানা বেগম তার লেখায় উল্লেখ করেছেন,“পদ্মা সেতুর অর্থায়ন নিয়ে মহাবিতর্ক চলছে দেশব্যাপী। কদিন আগে আমাদের সমিতি থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে সমিতি নিজস্ব অর্থায়নে সেতু করার পক্ষে মতামত দেবে। হাতে সময় খুব কম। সেমিনারের চার-পাঁচদিন বাকি। বারকাত আক্রান্ত হলেন ডেঙ্গু জ্বরে। অসুস্থ হওয়াতে দেখতে গেলাম। বলল- “আপা, ডেঙ্গুটা হয়েছিল বলে রক্ষা। না হয়, এ পেপার আমি শেষ করতে পারতাম না। ডেঙ্গুর দোহাইয়ে আমি পড়ার সময় পেয়েছি ভাল।” এই ডেঙ্গু জ্বরের মধ্যে বারকাত প্রবন্ধ লিখলেন, উপস্থাপনা করলেন কয়েক ঘন্টা”।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো: মোয়াজ্জেম হোসেন খান লিখেছেন,“ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ আজ এক বাস্তবতা। এটা তারই চিন্তার ফসল বলে আমি মনে করি। একই সময়ে আমি ধিক্কার দেই সে সকল দালাল, পরজীবী ও দরিদ্র মস্তিষ্কের অর্থনীতিবিদ, আমলা ও রাজনীতিবিদকে যারা ধরেই নেয় যে, বিদেশি সাহায্য ছাড়া শুধু পদ্মা সেতু কেন, কোনও উন্নয়য়নই সম্ভব নয়”। 

বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সেসময়ের কার্যনির্বাহক কমিটির সদস্য মীর হাসান মো. জাহিদ লিখেছেন, “সম্প্রতি পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্ব ব্যাংকের ঋণ প্রদান সংক্রান্ত সৃষ্ট জটিলতার প্রেক্ষিতে ড. আবুল বারকাত বলেছেন দেশীয় অর্থায়নেই ১টি নয় চারটি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব। এ বিষয়ে তিনি একটি গভীর বিশেষণধর্মী প্রস্তাবনাও উপস্থাপন করেছেন”। ...দেশীয় অর্থে পদ্মা সেতু বিনির্মাণ সম্ভাবনার যৌক্তিক অর্থায়ন উৎসগুলো ড. বারকাত সুনির্দিষ্ট করে দেখিয়েছেন যা নিয়ে এ পর্যন্ত কেউই দ্বিমত পোষণ করেননি”। 

মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির জীবন সদস্য জয়নাল আবেদীন মন্তব্য করেছেন,“বর্তমান সরকারের আমলে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় পদ্মাসেতুর অর্থায়নে বিশ্বব্যাংকের ঋণ চুক্তি বাতিল। বিশ্বব্যাংকের এ সিদ্ধান্তকে ড. আবুল বারকাত বলেছেন “জাতির জন্য আশীর্বাদ।” গত ১৯ জুলাই ২০১২ বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি আয়োজিত “নিজ অর্থে পদ্মা সেতু” শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে ড. আবুল বারকাত মূল প্রবন্ধ “নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু: জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ সুযোগ-” উপস্থাপন করেন। এ প্রবন্ধে তিনি উন্নয়নশীল দেশে ঋণের নামে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ কিভাবে শোষণ চালিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করে তা তুলে ধরেছেন। তিনি নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার পক্ষে সকল তথ্য, উপাত্ত তুলে ধরেছেন এ প্রবন্ধে। পদ্মা সেতু করার অর্থের উৎসসহ কয়টি নাট-বল্টুর প্রয়োজন হবে তারও হিসাব দিয়েছেন দক্ষ প্রকৌশলীর ন্যায়। তাঁর এ প্রবন্ধ সাম্রাজ্যবাদের গালে চপেটাঘাততুল্য ”। 

জনতা ব্যাংক লিমিটেডের রিসার্চ এন্ড প্ল্যানিং ডিভিশনের তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক আফজালুল বাসার তার লেখায় তুলে ধরেছেন,“সম্প্রতি পদ্মা সেতু নির্মাণ নিয়ে বাঙালি এমন এক বিতর্কে নেমেছিল যা ইতিহাসে বহুকাল যৌথভয় ও যৌথসাহসের দৃষ্টান্ত হিসেবে অভিহিত হবে বলে আমি মনে করি। একদল বলেছেন, বিদেশের ঋণ গ্রহণ ব্যতিত এই সেতু নির্মাণ সম্ভব নয়, আর একদল বলেছেন সম্ভব। আর কিছু মানুষ মাঝখানে মজা দেখার মতো অবস্থান করেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ যে পরিমাণ বিদেশী ঋণ ভোগ করছে তার ৪৮ ভাগ বিশ্বব্যাংকের, কাজেই বিশ্বব্যাংকের ব্যাপারে একটু সমঝে চলার বা সমঝে কথা বলার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। অনেকে  বারবার বলেছেন, বিদেশী টাকা ছাড়া যদি দেশীয় টাকায় আমরা সেতুটি বানাই তবে অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন খাতে অনুন্নয়ন বৃদ্ধি পাবে। এইসব আমলা এবং মন্ত্রী এবং বিশ্বব্যাংকের চাকুরে কি আত্মহারা হন? মানুষ হিসেবে বাঙালির যে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সর্বৈব অধিকার এবং সক্ষমতা রয়েছে তা তারা মানতে নারাজ? তারা হয়তো ভয় পান সাহায্য হারাবার। নিজেদের সক্ষমতা ও আত্মনির্ভরতা বিষয়ক মূল্যবোধে ফাঁক ফোকরও থাকতে পারে। অন্যদিকে ড. আবুল বারকাত জোর গলায় এবং জোর যুক্তিতে দেখিয়েছেন একটি নয় নিজেদের অর্থায়নে ৪টি পদ্মাসেতু নির্মাণ সম্ভব”। 

ড. আবুল বারকাত এর গবেষণাকে কেউই অস্বীকার করতে পারেননি এবং স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন যে, যদি ড. আবুল বারকাত এর প্রস্তাবনা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হয় তবে এটি সম্ভব। শেষ পর্যন্ত সরকারও এই প্রস্তাবনা অনুযায়ী উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। আর এটি ঘটলে এটি হবে মুক্তিযুদ্ধের মতোই অন্যরকম একটি বিজয়- আর সেটি হচ্ছে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে উদ্যোগ নিলে আর পরমুখাপেক্ষী থাকার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন নেই বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছে নিজেদের স্বাধীনতাকে ভুলুন্ঠিত করে তাদের অন্যায় প্রস্তাবের কাছে মাথা নোয়ানোর”। 

পরিশেষে বলা যায়, দেশি-বিদেশি সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে, কুচক্রী মহলের সমালোচনা ব্যর্থ প্রমাণ করে ও তীর্যক মন্তব্য উপেক্ষা করে পদ্মা সেতু আজ দৃশ্যমান বাস্তবতা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অসীম সাহসিকতা ও সুদৃঢ় প্রত্যয়ের সোনালী স্বপ্ন, সতেরো কোটি বাঙালির অহংকার পদ্মাসেতু আগামী ২৫ জুন উদ্বোধন হতে যাচ্ছে। দেশের আপামর জনগণ তাদের টাকায় প্রমত্তা পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত এই সেতুর ওপর দিয়ে চলাচলের অপেক্ষায় এখন অধীর আগ্রহে প্রহর গুনছে। ‘নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ সম্ভব’ অধ্যাপক আবুল বারকাতের গবেষণা কর্মটি সত্যে পরিণত হয়েছে। সেই সাথে যারা তার এই গবেষণা কাজের স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, অনুধাবন করেছিলেন এবং অধ্যাপক বারকাতকে তাদের লেখার মাধ্যমে উৎসাহ দিয়েছিলেন তাদের ভাবনাও সত্যে পরিণত হওয়ায় তাদের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

লেখক: গবেষক ও উন্নয়নকর্মী