বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৫, ২০২৬

২১ কার্তিক ১৪৩৩

সরকার অনুমোদিত অনলাইন গণমাধ্যম
BD.GOV.REG.NO-88

বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ৫, ২০২৬

২১ কার্তিক ১৪৩৩

সরকার অনুমোদিত অনলাইন গণমাধ্যম
BD.GOV.REG.NO-88
**সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ**

>> আজ খুলনা ও বাগেরহাট সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী

>> ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের পরিবর্তন চান ভোটাররা : ভ্যান্স

>> ৮ শতাধিক পর্যটক নিয়ে সেন্টমার্টিনে জাহাজ চলাচল শুরু

>> ইয়েমেনে সৌদির ব্যাপক হামলা, নিহত ২০

>> জুলাই হত্যা মামলায় গ্রেফতার ইকবাল সোবহান

>> জামায়াত নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামানের ছেলেকে ছুরিকাঘাত

>> মেট্রোরেলসহ তিন প্রকল্পে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়ন চায় বাংলাদেশ

>> একনেকে ৫৮ হাজার কোটি টাকার ১৩ প্রকল্প অনুমোদন

>> প্রমাণ মিলেছে যৌন হয়রানির রিপোর্ট কখনই প্রকাশ করবে না বিসিবি

>> মার্কিন ভোটাররা বিরক্ত হলে ইসরাইলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হবো: ট্রাম্প

আপনি পড়ছেন : মতামত

বাংলা ভাষার সংস্কৃতায়নের কারিগরেরা:

উপনিবেশিত মনের ‘মহাত্মা’ উইলিয়াম জোনস (২য়  পর্ব)


ফয়েজ আলম
DhakaReport24.com || 2022-05-21 19:08:00
উপনিবেশিত মনের ‘মহাত্মা’ উইলিয়াম জোনস (২য়  পর্ব)

জোনসের জন্ম লন্ডনে, ১৭৪৬ সালে। হ্যারো স্কুলে পড়াশোনার পর অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি কলেজ থেকে ১৭৬৮ সালে গ্র্যাজুয়েশন করেন। পরে আইন বিষয়ক পড়াশোনা করে ডিগ্রী গ্রহণ করেন এবং আইন ব্যবসায় নিয়োজিত হন। জোনসের সময়টা ছিলো প্রাচ্যবিদ্যা ও উপনিবেশ সম্পর্কিত জ্ঞানচর্চা ও আলাপআলোচনার সময়। তখন বৃটেন বিভিন্ন দেশে তার উপনিবেশ গড়ে তুলেছে। ভারতের বিরাট উপনিবেশ হয়ে উঠেছে তার মর্যাদার প্রতীক। ইংল্যান্ডের প্রতিটি সচেতন মানুষরেই এই মর্যাদাবোধের স্পর্শ পাওয়ার কথা এবং উপনিবেশ সম্পর্কে কমবেশি আগ্রহী হওয়ার উঠার কথা।

উইলিয়াম জোনসও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। ছাত্র অবস্থা থেকেই প্রাচ্য বিষয়ে পড়াশোনা বিশেষত ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের প্রতি গভীর আগ্রহ আগ্রহ দেখা দেয় তার মধ্যে। তিনি ভালোভাবে ফারসি ভাষা রপ্ত করার চেষ্টা করেন এবং বেশকিছু ফারসি রচনার অনুবাদ করেন। এর মধ্যে ফারসিতে লেখা সম্রাট নাদির শাহর জীবনীও ছিলো। ১৭৭১ সালে প্রকাশিত হয় তার ফারসি ভাষার ব্যাকরণ। এ সময় হাফিজ, সাদী, ফেরদৌসী প্রমুখকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি বলে মনে হয় তার এবং বিভিন্ন সুযোগে সেই মত প্রকাশও করেন।  এরপর প্রাক-ইসলামী যুগের কিছু আরবী কবিতা অনুবাদ করে প্রকাশ করেন জোনস। এইসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে ইংল্যান্ডে তিনি একজন প্রাচ্যবিদ্যাবিশারদ হিসাবে খ্যাতি পেয়ে যান, এমনকি ইউরোপের অন্যান্য দেশেও তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।

জোনসের বিভিন্ন লেখার মন্তব্য ও চিঠিপত্র থেকে ধারণা হয় ফারসি ও আরবি ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে তার আগ্রহ ও কাজকর্মের একটা বৈষয়িক উদ্দেশ্যেও ছিলো। তা হলো, বৃটেনের কোনো উপনিবেশে একটা লাভজনক পদে চাকুরী পাওয়া। এ জন্য প্রাচ্যবিদ্যায় জ্ঞানর্জনের পাশাপাশি তদবিরও অব্যাহত থাকে। ১৭৭৭ সালে ভারতের সুপ্রীম কোর্টের একজন বিচারপতির মৃত্যু হলে জোনস তার স্থলে নিয়োগ পাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। সম্ভবত এর পিছনে তার প্রথম জীবনের উদারনৈতিক রাজনৈতিক মতবাদ বৈরি প্রভাব রেখে থাকবে। এসব কারণে তিনি তার রাজনৈতিক মতবাদেও সংশোধনী আনেন এবং ১৯৮৩ সালে লয়েড কেনিয়নের নিকট বিচারকের পদটির জন্য আবারো ধর্না দেন, সঙ্গে তার রাজনৈতিক মতবাদের একটা ব্যাখ্যাও দেন। এইবার কাজ হয়। সে বছর মার্চে তাকে ভারতে বিচারক হিসাবে নিয়োগ দেয়া হয়। সেপ্টেম্বরে তিনি সস্ত্রিক ভারতে পৌঁছান। 

লন্ডনে থাকতেই হ্যালহেডের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিলো জোনসের। Grammar of Bengal বইটি উইলিয়াম জোনসকে পাঠানো হয়েছিলো এবং জোনস সেটি ভালোভাবে পড়েছিলেন। রয়্যাল সোসাইটি অব বেঙ্গলের সভাপতির তৃতীয় বার্ষিক বক্তৃতায় সংস্কৃতের সাথে গ্রীক, লাতিন ইত্যাদি ভাষার মিল এবং এগুলো কোন একটা মূল ভাষা থেকে উদ্ভুত হওয়ার ব্যাপারে উইলিয়াম জোনস যা বলেছিলেন সেটিই তাকে ক্রমে বিখ্যাত করে। এমনকি অনেকে তাকে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠী এবং তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বের আবিষ্কারক বলে অভিহিত করেন। আদতে জোনস ঐ বহুপ্রচারিত ভাষনের মৌলিক মন্তব্যগুলোর বেশিরভাগই হ্যালহেড প্রমুখ অগ্রজ লেখকদের এর ওর কাছ থেকে নিয়ে তার প্রবন্ধে জুড়ে দিয়েছিলেন। সাথে যোগ করেছিলেন নিজের কিছু আজগুবি অনুমান। মহামতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত ’স্যার’ উইলিয়াম জোনসের বিষয়ে আজ এত বছর পর এ রকম সমালোচনা কানে বাজতে পারে। আমরা তাই মন্তব্য বাদ দিয়ে সরাসরি তথ্যভিত্তিক তুলনায় যাই। 

জোনসের আগে অনেক লেখকই সংস্কৃত ভাষার সাথে অন্যান্য ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষার অথবা ইউরোপীয় ভাষাগুলির পারস্পরিক সাদৃশ্যের বিষয়টি বুঝতে পারেন এবং তাদের লেখায় উল্লেখও করেন। এদের মধ্যে ইতালীয় ব্যবসায়ী-পর্যটক ফিলিপ্পো সাসেত্তি (১৫৪০-১৫৮৮), ইংলিশ ধর্মপ্রচারক-ভাষাতাত্ত্বিক থমাস  স্তেফান (১৫৪৯-১৬১৯), সুইডিশ ভাষাতাত্ত্বিক আঁদ্রে জ্যাগার (১৬৬০-১৭৩০), ইংলিশ ভাষাতাত্ত্বিক ন্যাথানিয়েল ব্র্যাসি হ্যালহেড (১৭৫১-১৮৩০) প্রমুখের নাম বলা যায়। এসব ভাষার একক একটি উৎসের কথা সবচেয়ে দৃঢ়ভাবে বলেন জ্যাগার, সেই ১৬৮৬ সালে: 

“দূর অতীতে ককেশাস পার্বত্য এলাকায় একটি প্রাচীন ভাষা কওয়া হতো যা ভাষাভাষীদের বিভিন্ন ধাপের স্থানান্তরের মাধ্যমে ইউরোপ ও এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। এখন আর সেই ভাষা কথা কওয়া হয় না, এমনকি তার কোন ভাষাতাত্ত্বিক প্রমাণচিহ্নও নাই। কিন্তু  সেই ভাষা ’মাতৃভাষা’ হিসাবে জন্ম দিয়ে গেছে অনেক ’কন্যাভাষা’। এইসব কন্যাভাষা অনেকগুলোই আবার নিজেরা মা হয়ে জন্ম দিয়েছে আরো কন্যার (কারণ ভাষা সবসময় উপভাষার জন্ম দেয় যেগুলো কালক্রমে স্বাধীন, পরস্পর দুর্বোধ্য ভাষায় রূপাšতরিত হয়)। এর মধ্যে আছে ফারসি, গ্রিক, ইতালীয় (তখন লাতিন পরে আধুনিক রোমানীয় ভাষাসমূহ) স্লাভীয়, কেলটিক, এবং সবশেষে গোথিক ও অন্যান্য জর্মন ভাষা।”৭

এখানে জ্যাগার ইউরোপে প্রচলিত ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগুলির উৎস হিসাবে একটি অতি প্রাচীন ভাষার কথা পরিষ্কার করে বলেন, এমনকি তিনি সেই ভাষিক অঞ্চলটিও নির্ভুলভাবে চিহ্নিত করেন। একই কথা বলেন হ্যালহেডও তার Bengal Grammar  বইয়ে। তিনি লেখেন, “ফারসি ও আরবী, এমনকি লাতিন ও গ্রীক শব্দরাজির সাথে সংস্কৃত ভাষার শব্দসমূহের মিল দেখে আমি বিসি¥ত। . . . এই অসাধারণ সংযোগ তো . . . এরই অকাট্য যুক্তি যে এ সকল ভাষাই একই উৎস থেকে সৃষ্ট।” ৮

বুঝাই যাচ্ছে জোনস সংস্কৃত, ফারসি, লাতিন, গ্রীক প্রভৃতি ভাষার মিল আর তাদের প্রাচীন একক উৎসের ধারণা এদের  লেখা থেকেই নেন, কিন্তু ঋণগ্রহণের কথাটি বেমালুম চেপে যান। আর তার নিজস্ব ধারণা যেখানে জাহির করেছেন সেখানে দেখা দিয়েছে ভয়ংকর বিপর্যয়। এমন কয়েকটি বড় বড় ভুলভাল তথ্যযুক্ত বক্তব্য আমরা এখানে উদ্ধৃত করবো। তৃতীয় বার্ষিক বক্তৃতার এক জায়গায় তিনি লেখেন: 

“হিন্দুদের বিষয়ে এই ঝড়ো পর্যবেক্ষণের ফলাফল এই যে (আমি মনে করি), বিস্মৃত দূর অতীতে হিন্দুদের সাথে ঘনিষ্ট আত্মীয়তা ছিলো পারসীয়, ইথোপীয়, মিশরীয়, ফিনিশীয়, টুসকান, স্কেথিয়ান, গোথে এন্ড কেল্টদের। চীনা, জাপানি ও পেরুভীয়রা যে ঐসব দেশের সাথে পারস্পরিক উপনিবেশের সম্পর্কে জড়িত ছিলো এমন বিশ্বাস করার কোন কারণ নাই। তাহলে বলতে হয় এরা সকলই একটি মূল দেশ থেকে উদ্ভুত হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে।৯

তার নয় নম্বর বার্ষিক বক্তৃতায় লেখেন: “এমন বিশ্বাস করা অমূলক হবে না যে, এদের (ভারতীয়দের) একটা দল পুবের দ্বীপগুলো থেকে মেক্সিকো এবং পেরুতে পাড়ি জমায়। ওখানে গণসাহিত্যের চিহ্ন মিলেছে এবং মিশর ও ভারতীয় মিথ আর সাহিত্যিক বিবরণের সাথে সাদৃশ্য পাওয়া গেছে।”১০

 . . .  পঞ্চম বক্তৃতায় তিনি বলেন:

“সতর্ক পর্যবেক্ষণ থেকে আমার মনে হয়েছে যে, ভারতীয় ও আরবীয় ভাষাগুলি যেমন একই উৎস থেকে আলাদা আলাদাভাবে বিকশিত হয়েছে; তেমনি তাতারি ভাষার ( মধ্যএশিয়ার অন্য সকল ভাষা) বংশ-পরিচয় খুঁজলেও দেখা যাবে ঐ একই উৎসেরই ভিন্ন এক ডাল থেকে এসেছে।”১১ 

অন্যত্র তিনি জোর দিয়ে বলেছেন মাদাস্কার, ফিলিপাইন, সুমাত্রা প্রভৃতি অঞ্চলের ভাষাগুলিও সংস্কৃতের কন্যা। আরেক জায়গার বলেছেন তিব্বতী ভাষা আসলে সংস্কৃত।১২ 
এশিযাটিক সোসাইটির সভায় জোনস প্রদত্ত বার্ষিক বক্তৃতাগুলো থেকে যেসব উদ্ধৃতি দেয়া হয়েছে তা মনোযোগের সাথে পড়লে একটা বিষয় ধরা পড়ে। তা হচ্ছে জোনস যেসব কথা অন্যের কাছ থেকে নিয়ে নিজের বলে চালিয়ে দিয়েছেন সেগুলোর কোনোটা কোনোটা কালের বিচারে টিকে আছে; আর নিজে যেসব ব্যাখ্যা ও সিদ্ধাšত হাজির করেছেন তার সবই আজগুবি, সম্পূর্ণ ভুল আন্দাজ। তিনি সংস্কৃত ভাষাকে সকল ভারতীয় ভাষার মা-বাপ বলেই থামেননি, সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিকভাবে সুমাত্রা অঞ্চলের অস্ট্রোলেশীয় ভাষাগুলোকেও সংস্কৃতের সšতানাদির অšতর্ভূক্ত করেছেন; চীনা ও জাপানিজ, পেরুভিয়ান, সেমেটিক ভাষার আরবী ও ইন্দোইউরোপীয় ভাষার সংস্কৃতকে একই গোত্রভুক্ত বলেছেন, মেক্সিকানসহ অনেক জাতি প্রাচীনকালে হিন্দু ছিলো বলে সিদ্ধাšত দিয়েছেন যার মধ্যে আছে ভারতীয়, পারসিক, ইথোপীয়, মিশরীয়, ফিনিশীয়, টুসকান, স্কেথিয়ান, গোথে ও কেল্ট। চীন, জাপান ও পেরু কোন কালে একই দেশ থেকে উদ্ভুত হয়েছে দাবী করেছেন। এবং লক্ষ্যণীয় যে এশিয়াটিক সোসাইটির তৃতীয় বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হয় ১৭৮৬ সালের ফেব্রুয়ারীতে। এর অর্থ হলো সংস্কৃত ও ভারত বিষয়ে বিপুল জ্ঞান তিনি অর্জন করেন ভারতে আসার মাত্র দুই বছর পাঁচমাসের মাথায়। আজ এত বছর পর তার বক্তৃতা পড়তে গিয়ে কেন জানি মজাই লাগছে। 
আশ্চর্যই লাগে উইলিয়াম জোনসের মত একজন অতি সম্মানিত মানুষ, যিনি হাইকোর্টের বিচারপতিও, গোপনে এর ওর বই থেকে ধার করা জ্ঞানের সাথে নিজের অনুমান মিলিয়ে বক্তৃতা করছেন আর সাদা ইংরেজ বা ভারতীয় নির্বিশেষে সকলেই তা নির্দ্বিধায় গিলছে আর বাহ্ বাহ্ করছে। আজ সোয়াদুইশ বছর পর দেখা যাচ্ছে তার বেশির ভাগই ভুল আন্দাজ; ভাষাবিজ্ঞানের মত একটা বিষয়ে এরকম ভুলভাল কথাবার্তাকে প্রায় কান্ডজ্ঞানহীন বাচালতার সামিল বললে বেশি বলা হয় মনে করি না।  

এ কালে কেউ জোনসের মত এমন আন্দাজী ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্তমূলক কথাবার্তা হাজির করলে তার কান্ডজ্ঞান সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করা হবে। কিন্তু জোনসের বিষয়ে কেউ সন্দেহ করেননি। এমনকি হ্যালহেডের রচনা হাতের কাছে থাকা সত্ত্বেও কেউ বলেনি জোনস হ্যালহেড থেকে মেরে দিয়েছেন। বরং পরবর্তী দুশো বছর ধরে তার আজগুবি জ্ঞানকে ভিত্তি ধরে বিকশিত হয়েছে আমাদের কোনো কোনো জ্ঞানভাষ্য। কোন কারণে? আমরা এখন সে বিশ্লেষণেই যাব। 

জোনসের সময় ভারত ও সংস্কৃত ভাষা সম্পর্কে বিশেষ আগ্রহ দেখা দেয় ইউরোপের অগ্রজ ও সমকালীন লেখকদের মধ্যে। এর দ্বারা বিশেষ প্রভাবিত হয়েছিলেন জোনস। তার কাছে ভারত ছিলো পেশাগত উন্নতির জায়গা। তিনি এ মনোভাব নিয়েই ভারতে কোন লাভজনক পদে নিয়োগ পাওয়ার চেষ্টা করে আসছিলেন অনেক আগে থেকে। আর এ কারণেই হয়তো ফারসি ভাষা ও সাহিত্যের প্রশংসা করে আসছিলেন। দীর্ঘ তদ্বিরের পর সুপ্রীম কোর্টের বিচারক হিসাবে নিয়োগ পান জোনস এবং ১৯৮৩ সালের সেপ্টে¤¦রে ভারতে পৌঁছেন। এখানে পৌছেই তিনি সংস্কৃত ভাষা, ভারতের প্রাচীন ইতিহাস, ধর্ম ইত্যাদির দিকে মনোযোগ নিবিষ্ট করেন। এবং প্রাচ্যতাত্ত্বিক হিসাবে আরো নাম কেনার জন্য অনেকটা অগ্রাসী হয়ে উঠেন। এখানে আসার আগেই তার জ্ঞানপিপাসু মন গড়ে উঠে একজন প্রাচ্যতাত্ত্বিকের মনোভঙ্গি নিয়ে। এটি তাকে ঠেলে দেয় প্রাচ্যতাত্ত্বিক চিন্তার দিকে। উপরের উদ্ধৃতিগুলো লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে তিনি ইউরোপের দেশগুলোকে এক দলে আর গোটা প্রায় দুনিয়াকে আরেক দলে ফেলে চিন্তা করেছেন। তাই ভারত, ভারতীয় ভাষা ও জনগোষ্ঠীর সাথে সাদৃশ্য আবিষ্কার করে ফেলেন চীন, জাপান, মিশর, এমনকি দূরদেশ মেক্সিকো ও পেরু পর্যন্ত। এই চিন্তা পরিস্কার একজন প্রাচ্যতাত্ত্বিকের যার চিন্তার কায়দাটা বিকশিতই হয়েছে ইউরোপকে কেন্দ্রে আর বাকী পৃথিবীকে কিনারায় রেখে। তাই পৃথিবীর প্রায় সবই তার কাছে ‘আন’ (আদার)। 

অন্যদিকে, এদেশে উপনিবেশ টিকিয়ে রাখা ও দীর্ঘায়িত করার পরিকল্পনা হিসাবে সদ্য ক্ষমতাচ্যুত মুসলমানদের প্রতিপক্ষ হিসাবে ক্ষমতাধর ব্রাহ্মণশ্রেণীকে হাতে নেয়ার চিšতা ছিলো ইংরেজদের। এজন্য তারা হিন্দুদেরকে প্রাধান্য দিতে থাকে ১৭৫৭ সালের পর থেকেই। হিন্দুদের ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্যের প্রশংসা করে তাদের হাতে রাখার কৌশল গ্রহণ করে ওরা। উপনিবেশী নীতির সাথে সাজুয্য রেখেই সংস্কৃতের অতিরিক্ত প্রশসংসায় পঞ্চমুখ হন হ্যালহেড-জোনস-কেরি। তাদের এরকম আন্দাজ ছিলো যে, এর মধ্য দিয়ে সামাজিক ও আর্থিক ক্ষমতাধর উচ্চবর্ণের হিন্দুদের যেমন মুঠোয় রাখা যাবে, তেমনি জাতি হিসাবে মুসলমানরাও মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়বে। 

তৃতীয়ত, ভারতে জোনস ছিলেন সর্বোচ্চ বিচারালয়ের বিচারক, এশিয়াটিক সোসাইটির প্রেসিডেন্ট, ইংল্যান্ডে প্রাচ্যতাত্ত্বিক হিসাবে কমবেশি খ্যাতিমান। এসব কারণে তার বক্তৃতা ভারতে বসবাসকারী ইংরেজদের নিকট প্রশ্নাতীতভাবেই জ্ঞানগর্ভ কথা বলে মনে হবে বৈকি। মোটকথা, উইলিয়াম জোনস এসব কথা বলেন ভারতে উপনিবেশী বিন্যাসের সর্বোচ্চ চূড়ায় দাড়িয়ে, সেই চূড়ায় তার আশপাশে ক্ষমতাধর ইংরেজ উপনিবেশকরা, তার নিচে ভারত-প্রবাসী সাধারণ ইংরেজ উপনিবেশক কর্মচারী, তারও নিচে উত্তমরূপে উপনিবেশিত ও অনুগত উচ্চশ্রেণীর হিন্দু প্রজার দল। তাই তাঁর কথা তখন ইংরেজদের নিকট জ্ঞানী মানুষের পর্যবেক্ষণপ্রসূত বক্তব্য, আর, অনুগত সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিতদের কাছে প্রভুর বানী হিসাবে পরিগণিত হওয়ারই কথা। পণ্ডিতদের উপনিবেশিত মনে উইলিয়াম জোনসকে তখন এক মহাত্মা মনে হওয়াই স্বাভাবিক যিনি তাদের দেবতাদের ভাষা সংস্কৃতকে সকল ভাষার উপর স্থান দিয়েছেন। বা¯তবে হয়েছেও তাই। আর, যারা বাংলা ভাষার রূপ বদলে প্রত্যক্ষভাবে কাজে জড়িত ছিলেন অর্থাৎ সংস্কৃতজ্ঞ ব্রাহ্মণ পন্ডিতরা, তারাও প্রতিবাদ করলেন না। কারণ সংস্কৃত ভাষাকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে বসালে তাদের মনের গোপন কোণে দীর্ঘদিন ধরে লালিত সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষও অনেকটা প্রশমিত হওয়ার সুযোগ পায়। এভাবে ইংরেজের উপনিবেশী শাসন-শোষণের আকাঙ্খা আর সংস্কৃতজ্ঞ ব্রাহ্মণ পণ্ডিতদের সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এক বিন্দুতে মিলে যাওয়ার ফলে হ্যালহেড-জোনসের ভুলভাল বক্তব্যই টিকে যায়, যা ২০০ বছর ধরে আমাদের ভাষাচর্চাকে এবং সেইসূত্রে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জগতকে শাসন করে আসছে। 


তথ্যসূত্র:

৭। Metcalf, G. J., “The Indo-European Hypothesis in the Sixteenth and Seventeenth Centuries”, Studies in the history of linguistics: traditions and paradigms, D. Hymes (ed.), Bloomington: Indiana U.P., 1974, p-233.-এ উদ্ধৃত। Original citation: An ancient language once spoken in the distant past in the area of the caucasus mountains and spreading by waves of migration throughout Europe and Asia, had itself ceased to be spoken and had left no linguistic monuments behind, but as “mother” generated a host of “daughter languages”, many of which in turn had become “mothers” to further “daughters”. (For a language tends to develop dialects, and this dialects in the ourse of time become independent, mutually unintelligible languages.) Decendants of the ancestral languages include Persian, Greek, Italic (whence Latin and in time mordern Romance tongue) , the Slovonic languages, Celtic, and finally Gothic and the other German tongues.
৮। Nathenial Brassy Halhed, A Grammer of the Bengal Language, Hoogly, India, 1778,  Preface iii-iv. Original citation: I have been astonished to find this similtude of Shanscrit words with those of Persian and Arabic, and even of Latin and Greek; . . . This extraordinary mode of combination . . . is a forcible argument that they are all derived from the same source.। 
 ৯। Lyle Campbell, “ Why Sir William Jones got It All wrong, or Jones’ Role in How to Establish Language Families”, Studies in Basque and historical linguistics in memory of R.L. Trask, Joseba A. Lakarra, José Ignacio Hualde (eds.), Guipuzkoa Provincial Council, San Sebastian, Spain, 2006, pp-249-.এ উদ্ধৃত। 
১০। পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা- ২৪৯-এ উদ্ধৃত।
১১। পূর্বোক্ত, পৃষ্ঠা- ২৫০-এ উদ্ধৃত।
১২। দ্র: পূর্বোক্ত।