বুধবার, নভেম্বর ৪, ২০২৬

২০ কার্তিক ১৪৩৩

সরকার অনুমোদিত অনলাইন গণমাধ্যম
BD.GOV.REG.NO-88

বুধবার, নভেম্বর ৪, ২০২৬

২০ কার্তিক ১৪৩৩

সরকার অনুমোদিত অনলাইন গণমাধ্যম
BD.GOV.REG.NO-88
**সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ**

>> প্রমাণ মিলেছে যৌন হয়রানির, রিপোর্ট কখনই প্রকাশ করবে না বিসিবি

>> মার্কিন ভোটাররা বিরক্ত হলে ইসরাইলে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হবো: ট্রাম্প

>> নিজের পিস্তলের গুলিতে এসআইয়ের আত্মহত্যা

>> সাভারে পুলিশের গাড়িতে আগুন, ওসিসহ আহত ৫০

>> ডিসেম্বরের মধ্যে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ: মজুরি বোর্ড

>> প্রধানমন্ত্রীর স্লোগানকে হাদিসের সঙ্গে তুলনা, পদ হারালেন সেই কর্মকর্তা

>> পোশাক খাতে অস্থিরতা সৃষ্টির অভিযোগে ৩ শ্রমিক নেতা আটক

>> নতুন দায়িত্ব পেলেন ইশরাক

>> যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হলেন কেইশা ল্যান্স বোটমস

>> আমরা ট্রাম্পকে হত্যা করব: তেহরানে বিশাল বিলবোর্ডে নতুন হুমকি

আপনি পড়ছেন : মতামত

২৬ মার্চ,হিরন্ময় মূহুর্ত, যথাযোগ্য দহনে বাঙালির জ্বলে ওঠার দিন


ফয়েজ আলম
DhakaReport24.com || 2022-03-27 16:07:15
২৬ মার্চ,হিরন্ময় মূহুর্ত, যথাযোগ্য দহনে বাঙালির জ্বলে ওঠার দিন

২৬ মার্চ ছিলো যথাযোগ্য দহনে জ্বলে ওঠার দিন, সমস্ত বাধার দেয়ালকে চুরমার করে অসীম সম্ভাবনার পথে পা বাড়ানোর সেই হিরন্ময় মূহুর্ত- বাঙালি যার প্রতিক্ষা করেছে শত শত বছর।

দুনিয়া জুড়ে ছড়িয়ে থাকা নানান জাতির মেলবন্দী অস্তিত্বের সূচনা আর বিকাশ কোন পথে হলো সেটি ভাষা-সংস্কৃতি-নৃতত্ত্বের এলাকার লেখক, গবেষক ও পাঠকদের জোর আগ্রহের বিষয়। এই নিয়ে লেখালেখিও অনেক। দেখা যায় বসবাসের স্থান,  ভাষা ইত্যাদির মিলের উপর ভর করে জাতিগুলোর বিকাশ আরম্ভ হলেও একটা জনগোষ্ঠীর শক্তমেরুদন্ডের জাতি হিসাবে বিকশিত হওয়ার ক্ষেত্রে বিপর্যয়েরও যেন কোথাও একটা ভূমিকা আছে। বিপর্যয় বলতে বাইরের মানুষের দ্বারা দীর্ঘ শোষণ বঞ্চনা, দখলদারদের হামলা, যুদ্ধ, এইসব। ২৬শে মার্চকে আমি দেখি এই দেখনবিন্দু থেকে, বাঙালি জাতির বিস্তারের একটা পর্যায়ে বিপর্যস্ত সময় ফুঁড়ে সীমাহীন সম্ভাবনার দরজায় দাড়ানোর দিন হিসাবে, প্রত্যাশিত দহনে জ্বলে ওঠার দিন হিসেবে, যার প্রতিক্ষার সূচনা শতশত বছর ধরে।

শুধু আত্ম পরিচয় বা রাজনৈতিক পরিচয় নয় ,জনগোষ্ঠী হিসেবে বাঙালির ঠিক কবে  সূচনা? বলতে হয় ইতিহাসের সীমানারও আগে থেকে। ইতিহাসের রেখারও অন্যপারের সময়ে এই বাংলা বেসিনে বসবাসরত  মানুষেরা যখন নানা মিলের উপর নির্ভর করে একজন আরেকজনকে সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে বেঁধে নিয়েছিলো আর দিনে দিনে সেই বাঁধনের এলাকা বাড়ছিলো সেই কালেই এর সূচনা বলা যেতে পারে। আজ তার কাল নির্ধারণ বা বিস্তারের পথের বিবরণ আন্দাজ করার সুযোগ নাই। তবে এইটুকু আমরা জানি যে, দুই হাজার বছর আগের অনেক পুরানা বিবরণে অঞ্চল হিসাবে বঙ্গ কথাটা আছে। সেই সময়ের নানা ইঙ্গিত এবং আরো পরের বিবরণ থেকে পুরানা যুগের বঙ্গ নামে যে দেশটির কথা  জানতে পারি সেইটা জায়গার পরিমাণে ও সীমানায় আজকের বাংলাদেশের সাথে এক না। বঙ্গ বলতে বোঝানো হতো আজকের বৃহত্তর বরিশাল, ফরিদপুর, ঢাকা, ময়মনসিংহ, কুমিল্লার পশ্চিম দিকের অংশবিশেষ এবং খুব সম্ভবত সিলেটের  কিছু এলাকা।( বঙ্গের নিম্নাংশকে বলা হতো বঙ্গাল বা বঙ্গের বর্ধিত অংশ। বৃহত্তর যশোর,খুলনা এবং বরিশালের নিম্নাংশকে বলা হতো বঙ্গাল জনপদ।) 

 এই সীমানা আবার মাঝে মধ্যে সমতট নামের এলাকার সাথেও মিশেছে আর বিচ্ছিন্ন হয়েছে। এর দক্ষিণে সাগর, পশ্চিমে পুন্ড্র, তাম্রলিপ্তী, পুবে পট্টিকেরা আর হরিকেল, উত্তরে কামরূপ।সুলতানী আমলে  এই সবকয়টা জায়গা  বঙ্গ-এর সাথে মিশে গিয়ে বৃহত্তর বাংলা বেসিনে বাঙলা রাজ্য তৈরি করেছিলো আর এর মধ্য দিয়ে এ কালের ধারণায় জাতি বলতে যা বুঝায় সেই জাতি হিসাবে বিস্তারের পথ ধরেছিলো। বাঙালির জাতীয় জীবনে সে এক গুরুত্বপূর্ণ  ঘটনা।

তো, এই বঙ্গ আর বঙ্গালের বাসিন্দাদের সবচেয়ে বেশি মোকাবিলা করতে হয়েছে পশ্চিমের আর্যভাষী নরডিক জনগোষ্ঠীর লোভী নজর, অবিরাম হামলা, নির্যাতন। এই ধারায় আমাদের জানার মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য একটা সময় গেছে উত্তর ভারত থেকে আগত গুপ্তদের সামান্ত, পরে রাজা- শশাঙ্কের আমল। ইনি সাত শতকের শুরু থেকে প্রায় ৩২/৩৩ বছরের মত রাজত্ব করেন উত্তর পশ্চিম বাংলা তথা গৌড় জনপদে।  ইতিহাসে যেসব মানসিক রোগগ্রস্থ’ খুনির কথা জানতে পারি তাদের মধ্যে শশাঙ্ক অন্যতম। তার সময় নানা রকম লোকায়াত ধর্মাচারে অভ্যাস্ত বাঙালি জনগোষ্ঠীর একটা বিশেষ অংশ  বৌদ্ধ ধর্মানুসারী ছিলো। শশাঙ্ক নির্বিচারে বৌদ্ধদের হত্যা করতে শুরু করেন, কোনো কারণ  ছাড়া, কেবল ভিন্ন ধর্মালম্বী হওয়ার দরুণ। বাঙালির ধর্ম, সংস্কৃতি, ভাষা সব কিছুর উপর তার ছিলো প্রচন্ড বিতৃষ্ণা। গয়ার বোধিবৃক্ষ’’ কেটে নদীতে ফেলে দেন। আদেশ জারি করেন, নাগরিকদের যে কেউ বৌদ্ধদের দেখলে দেখা মাত্র খুন করতে হবে। না করলে, রাজার লোকেরা সেই নাগরিকেরই শিরোচ্ছেদ করবে। এইরকম বর্বর ভয়াবহ আদেশের ফল কি হয়েছিলো আন্দাজ করা যায়। এ অত্যাচারেই বৌদ্ধদের অনেকে দূর দেশে পাড়ি জমিয়ে থাকবেন। ফলে বাংলায় বৌদ্ধদের সংখ্যা কমে। কিছু হিন্দু জনগোষ্ঠী তৈরি হয়। শশাঙ্কের অত্যাচারের ফলে সমাজব্যবস্থা ভেতর থেকে ঝুরঝুরে হয়ে যায়। ফলে তার মৃত্যুর পর দেশে ভয়াবহ অরাজকতা দেখা দেয়। ইতিহাসে সেই সময়টাই মাৎসান্যায়ের যুগ হিসাবে কুখ্যাতি পেয়েছে। তবে এক শ বছর পরই এ অবস্থার অবসনা ঘটে যখন উত্তর পশ্চিমে বৌদ্ধ পাল এবং পূর্ব ও দক্ষীণে বৌদ্ধ চন্দ্র বংশ  বাংলার ক্ষমতায় আসে।

বাঙালির উপর দ্বিতীয় ধাক্কাটা আসে এগারো শতকের মাঝামাঝি যখন বাঙালি পাল রাজাদের এক বহিরাগত সামন্ত- বাংলাদেশ দখল করে সেন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে। এই পরিবারের বল্লাল সেন ক্ষমতায় এসে আবার বাংলাদেশে হিন্দু সমাজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। এর আগে এ দেশ ছিলো লোকায়াত ধর্ম এবং বৌদ্ধদের, হিন্দুরা ছিলো নবাগত,জনসংখ্যার ছোটো একটা অংশ। সেনেরা ক্ষমতা পেয়ে বিদেশ থেকে ব্রাহ্মণ আমদানি করে বিভিন্ন জায়গায় ভূমি দান করে  বসিয়ে দেন। এ ছাড়াও কিছু আর্য  হিন্দুরা বাইরে থেকে বাংলায় আসতে থাকে। প্রায় হাজার দেড়েক বছরের চেষ্টায় যে-আর্যরা বাংলায় ঢুকতে পারেনি এবার তাদের প্রতিনিধি সেনদের মাধ্যমে বাংলায় প্রবেশের খোলা রাস্তা পেয়ে যায় । এটি ছিলো আর্যদের কাছে বাঙালির প্রথম বড় ধরণের পরাজয়।

সেনরা বৌদ্ধদের উপর অত্যাচার অব্যাহত রাখে, কাজের ধরনের ভিত্তিতে হিন্দু সমাজকে নানা শ্রেণীতে ভেঙ্গে খন্ড খন্ড করে, যার প্রভাব পড়ে অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যেও। এরকম ২৩৬ খন্ডের কথা আমরা শুনে থাকি। মানুষের পরিচয় ও মর্যাদা ঠিক হয় তার জন্মপরিচয়ের ভিত্তিতে। আর যথারীতি অব্যাহত থাকে বৌদ্ধদের উপর নির্যাতন। এ যুগেও প্রচুর বৌদ্ধ নেপালে পাড়ি জমায়।

আরেকটা সুদূরপ্রসারী কাজ করে সেনেরা। এদেশে সংস্কৃত ভাষা ও ধর্মীয় সাহিত্য চর্চার উদ্যোগ নেয়া হয়। পশ্চিম থেকে পণ্ডিত এনে ধর্ম ও সংস্কৃত চর্চায় নিয়োজিত করা হয় ভূমি দান করে। এর ফলে দেশী ভাষার চর্চা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে বাংলা ভাষায় সাহিত্য ও চিন্তা চর্চার যে ধারা গড়ে উঠেছিলো তার দারুণ এক নজির চর্যাপদ। সেনদের জাতপাতভিত্তিক নির্যাতন আর বৌদ্ধদের প্রতি বিতৃষ্ণা এবং সংস্কৃতের প্রসারে সরকারী উদ্যোগের কারণে দেশী ভাষার চর্চা প্রায় থেমে যায়। বহু বাঙালি বরং সংস্কৃত চর্চা শুরু করে । এ সময় থেকে পরবর্তী প্রায় শ’দেড়েক বছর বাংলা ভাষার কোনো রচনা পাওয়া যায় না। হয় তখন কেউ দেশী ভাষায় লেখেনি অথবা লেখলেও সামাজিক অবহেলার শিকার হয়ে তা ধ্বংস হয়েছে।

 প্রায় দেড়শ বছর বাংলার উপর আধিপত্য করেছিলো সেনবংশ। এই দেড়শ বছরে তারা একদিকে বাঙালি সমাজকে জাতপাতের বেড়িতে বেঁধে সমাজিক শক্তিকে খণ্ড খণ্ড করে ফেলে, একের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেয় অন্যের ঘৃণা আর অসন্তোষ, অন্যদিকে, দেশী ভাষার চর্চা প্রায় থামিয়ে দিয়ে যায়। এ ছিলো বাংলা ভাষার উপর এক রাহুর থাবা, যা তৈরি করে দিয়ে গেছে পরবর্তী দেড়শ বছরের সাদা পৃষ্ঠা।

 তের শতকের একেবারে গোড়ায় সেই পশ্চিম থেকেই আসে তুর্কী শক্তি, সেনদের হটিয়ে দেশ দখল করে নেয়। এবার তারা আরো ভিতরে ঢুকে ঘাঁটি গাড়ে খোদ বঙ্গের পশ্চিম প্রান্তে, বর্তমান বগুড়ায়। পরবর্তী একশ বছরের মধ্যে মূল বঙ্গসহ আশপাশের আরো এলাকাকে বঙ্গের অধিকার ভুক্ত করে নেয়। তাদের শাসনের সূত্রে বাংলায় দলে দলে প্রবেশ করতে থাকে তুর্কী, আফগান, আরবীয়, ইরানী, মধ্যএশীয় সাধারণ মুসলমানও। এদের কেউ যোদ্ধা, কেউ শিক্ষক, কেউ পীর কেউ বা ব্যবসায়ী অথবা নিতান্তই ভাগ্যান্বেষী হিসাবে বাংলায় বসতি করেন। সেনদের আমলে ব্রাহ্মণরা যেমন বাংলায় স্থায়ীভাবে থেকে যায়, এরাও তেমনি বাংলাকে নিজেদের দেশ বানিয়ে নেয়। (যদিও বাংলায় ইসলাম ধর্মের উপস্থিতি টের পাওয়া যায় সেই সপ্তম শতক থেকে। সে হয়তো ছিলো দূরাগত বনিকদের এবং দক্ষিণ বাংলার মানুষের ধর্ম।)

এ সত্ত্বেও এই দুই শ্রেণীর মধ্যে একটা মৌলিক পার্থক্য আছে। তা হলো, সেনদের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়রা বাঙালি সমাজকে জাতপাতের বিভেদে খন্ড খন্ড করেছিলো। আর তুর্কী-আফগান-আরবীয়-ইরানী-মধ্যএশীয় আগতরা ইসলামের সাম্যের নীতিতে সমাজকে আবার বেঁধে নিয়েছিলো এক সুতায়। এ ছিলো এক বিরাট ঐতিহাসিক পরিবর্তনের প্রস্তুতিস্বরূপ, ইতিহাসের পরের বাঁকে যার বিপুল ফসল ফলে উঠেছিলো বাংলার ভৌগোলিক বিস্তার ও শাসন ব্যবস্থায় আর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে।

সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবর্তন দীর্ঘ সময় নেয়, তার প্রস্তুতি লাগে। সেজন্য কোনো নির্দিষ্ট একটা তারিখ ধরে তার বিচার করা উচিত না। তবু সময়ের প্রবাহে তাকে চিহ্নিত করার প্রয়োজনে আমরা দিন তারিখকে দাগিয়ে রাখি। সেই বিচারে ১৩৩৮ খ্রিস্টাব্দকে ইতিহাসের সেই বাঁক রূপে দাগ দিতে চাই যেদিন জাতি হিসাবে বাঙালির বিকাশের একটা বীজ রোপিত হয়েছিলো ফখরুদ্দীন মোবারক শাহের স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে। ফখরুদ্দিনের রাজধানী ছিলো সোনারগাঁওয়ে। পরে তিনি কুমিল্লা, নোয়াখালি, চট্টগ্রামও বঙ্গের অন্তর্ভুক্ত করেন। তার সময় ইবনে বতুতা বাংলাদেশ ভ্রমণে এসে ফখরুদ্দিনের শাসনের খুব প্রশংসা করেন। মধ্যযুগে এ ছিলো স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে বঙ্গের বিকাশের সূচনা।

কিন্তু অচিরেই- সাতগাঁ অর্থাৎ বঙ্গাল জনপদ থেকে উত্থান হয় সুলতান শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহের।  ফখরুদ্দিন মারা যাবার পর ১৩৫২ সালের দিকে শামুসদ্দিন ইলিয়াস শাহ বঙ্গ দখল করে নেন। অতপর সাতগাঁও, লখনৌতি ও বঙ্গ একসাথে করে এই অঞ্চলের নাম দেন বাঙালাহ্ এবং নিজেকে ঘোষণা করেন শাহ-ই-বাঙালাহ্ বা বাংলার বাদশাহ। জাতি হিসাবে বাঙালি ধারণাটার বিকাশের সূচনা এইখানে, শামসুদ্দিন ইলিয়াস শাহর উদ্যোগে। তিনিই প্রথম এদেশের মানুষকে বাঙালি পরিচয়ে একত্রিত করেন। ইলিয়াস শাহর রাজ্য সম্প্রসারণের সূত্রেই বঙ্গবাসী আদি বাঙালিদের সাথে এসে যুক্ত হয় বর্তমান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, উড়িষ্যার অংশ বিশেষ, আসামের একাংশের জনগোষ্ঠী। এরা নয়া বাঙালি হলেও রাজনৈতিক ও ভাষিক-সাংস্কৃতিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে অচিরেই মূল বাঙালি স্রোতধারার সাথে এক হয়ে যায়। পরবর্তী প্রায় দুশো বছর ধরে দিল্লীর সময় সময় হামলা প্রতিরোধ করতে গিয়ে  এদেশের মানুষ বাঙালি পরিচয়ে আরো এক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী হয়ে উঠে। রাজনৈতিকভাবে যেমন, তেমনি ভাষা ও সাহিত্যের দিক থেকেও এই ঐক্য দানা বাঁধে।
যদি এ সময় সেই দেশটির নাম  কামরুপ দেশ হতো বা সমতট দেশ হতো কিংবা পুন্ড্র দেশ বা মগধ দেশ হতো তবে আজ হয়তো সমগ্র অঞ্চলের নাম বাংলা হতো না। যাইহোক, স্বাধীন সুলতানি বাংলার দুই’শ বছরে বাঙ্গালা ও বাঙালি পরিচয় আরো সংহত হয়।
 
মুসলিম শাসনের এ সময়টাতে অনেক জ্ঞানীগুণি মানুষ বঙ্গে অথবা বৃহত্তর বাংলায় বসতি করেন। এরা কেউ খানকাহ্, কেউ মাদ্রাসা, মক্তব সাধারন শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করে এদেশের মানুষদের মধ্যে জ্ঞানবিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ গড়ে তোলেন। এদের মধ্যে শেখ আখী সিরাজুদ্দিন, শেখ আলাউল, নুর কুতুব আলম, সৈয়দ আশরাফ সিমনানী, জাফর খান গাজী, তাপসী রওশন আরা, শেখ আনোয়ার, বদরউদ্দিন শাহ মাদার, দরবেশ বাহরাম সাক্কা, শাহ আলী বাগদাদী, মাওলানা আতা, শাহ জালাল, শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা, শরফুদ্দিন এহিয়া মানেরীর নাম সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়েছিলো। জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার  এই অনুকূল পরিবেশের মধ্যে বাংলার স্বাধীন সুলতানদের সহায়তায় বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পূর্ণরূপে বিকাশের সুযোগ পায়। চর্যাপদের পর প্রথম বাংলা কাব্য ইউসুফ জোলেখা রচনা করেন শাহ মুহম্মদ সগীর। এমনকি, মহাভারত ও রামায়নের মতো ধর্মীয় সাহিত্যও রচিত হয় সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায়। বস্তুত এটি ছিলো বাংলা সাহিত্যের এক উর্বর সময় । একদিকে স্বাধীন সুলতানী শাসনের উদারনৈতিক পরিবেশ, অন্যদিকে বিপুল জ্ঞানীগুণি ব্যক্তির নিবিড় জ্ঞানচর্চার প্রবাহমান ধারা এই দুই কারণে বাংলা সাহিত্য বিশেষ সমৃদ্ধি লাভ করে। পরবর্তীতে মুঘলরা ক্ষমতায় আসার পরও এই বিকাশের ধারা অব্যাহত ছিলো।

বাঙালি জাতি এবং বাংলা ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি বিকাশের এই স্রোত প্রথম ব্যাহত হয় উপনিবেশের আমলে। ইংরেজদের ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পৃষ্ঠপোষকতায় উচ্চশ্রেণীর একদল ব্রাহ্মণ সংস্কৃতজ্ঞ পন্ডিত বাংলা ভাষার বিকাশের ৫০০ বছরের ধারা ও রূপ অগ্রাহ্য করে সংস্কৃত ব্যাকরিণক নিয়মের অনুকরণে এবং প্রচুর সংস্কৃত শব্দ আমদানি তৈরি করে এক নতুন বাংলা ভাষা। এর ফলে বদলে যায় আমাদের সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাসের রূপও। সেই থেকে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি এখনো সংস্কৃত ভাষা আর আর্য সংস্কৃতির উপনিবেশত্ব ধরে রেখেছে। সেই ইতিহাস আমাদের সবার জানা।

বৃটিশ উপনিবেশ অবসানের সময় সাম্প্রদায়িক আবেগের কারণে বাংলাদেশ তার অনেক এলাকা হারায়। বর্তমান বাংলাদেশের সীমানা নিয়ে পাকিস্তানের অংশ হিসাবে স্বাধীনতা লাভ করে এদেশ, যা কখনোই প্রকৃত স্বাধীনতা ছিলো না।

১৯৫২ সালে ভাষা নিয়ে যে আন্দোলন শুরু হয় সেটিও জাতি হিসাবে বাঙালির হাজার বছরের বিকাশ ধারারই বিস্তার মাত্র। বাঙালি যেমন আর্যদের রুখে দিয়েছে, বারবার দিল্লীর আধিপত্য অস্বীকার করেছে, তেমনি ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান ধারণাও প্রত্যাখান করেছে। এই প্রত্যাখ্যানই এদেশের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের নেতৃত্বে বাঙালি জাতিকে আবার লড়াইয়ে ঐক্যবদ্ধ করে। বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাঙালির খাঁটি প্রতিনিধি, মূল বঙ্গ অঞ্চলভুক্ত ফরিদপুরের মানুষ, বঙ্গের আদি বাঙালি জনগোষ্ঠীর উত্তর প্রজন্মের নেতা। বাঙালি রাজনৈতিক স্বাধিকার, ভাষা ও সংস্কৃতির স্বাতন্ত্রবোধ নিয়ে নিজেদের মতো বিকশিত হওয়ার প্রবল ইচ্ছা প্রকাশের পথ খুঁজে পেয়েছিলো তাঁর রাজনৈতিক অভিপ্সার মধ্য দিয়ে।  তাঁর ৭ই মার্চের ভাষনের মধ্যেও এই জাতির ভাষাগত স্বাতন্ত্রিক পরিচয় উৎকীর্ণ হয়ে আছে। ১৯৭১ সালের মার্চে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী হত্যাযজ্ঞ শুরু করার পর বাঙালি তার হাজার বছরের স্বাতন্ত্রিক বিকাশ আর স্বাধীনতার আকাঙ্খায় আবার জ্বলে উঠেছিলো অন্তর্গত নিজস্ব আগুন নিয়ে।

আজ অনেক বিষয়েই বিতর্ক হয়, কতটা স্বাধীনতা পেয়েছি, মানুষে মানুষে বৈষম্য কতটা কমেছে, নাগরিক অধিকার কতটুকু নিশ্চিত হয়েছে। এসব বিতর্ক চলতেই পারে। সব কিছুর উর্ধ্বে যে বাস্তবতা তা হলো আমাদের ব্যক্তি-স্বাধীনতা, অধিকার, সাম্য প্রতিষ্ঠার অপার সম্ভাবনা এখন আমাদের নিজেদের হাতে। ২৬ মার্চ ছিলো যথাযোগ্য দহনে জ্বলে ওঠার দিন, সমস্ত বাধার দেয়ালকে চুরমার করে অসীম সম্ভাবনার পথে পা বাড়ানোর সেই হিরন্ময় মূহুর্ত- বাঙালি যার প্রতিক্ষা করেছে শত শত বছর।

আমরা এখনো যা পাইনি তা পাওয়ার সম্ভাবনা তো আমাদের হাতেই রয়েছে। একটা সুষ্ঠ রাজনৈতিক আর সামাজিক ব্যবস্থার জন্য নিষ্ঠার সাথে কাজ করে গেলে ধীরে ধীরে প্রকৃত বৈষম্যহীন এক বাঙালি সমাজের দিকে এগিয়ে যেতে পারব। আমার মনে হয় এর সূচনাও হয়েছে। এদেশের আর্থ-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের ধারায় এক অসীম সম্ভাবনার দরোজা ২৬শে মার্চ, অনেক ত্যাগের মধ্য দিয়ে আমরা যা পার হয়ে দাঁড়িয়েছি অনাগত মহাকালের মুখোমুখি। আমরা কোনদিকে যাব তা নির্ধারণের ক্ষমতা ও দায় এখন আমাদেরই।

------------
ফয়েজ আলম, লেখক ও গবেষক