রবিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬

৫ আশ্বিন ১৪৩৩

সরকার অনুমোদিত অনলাইন গণমাধ্যম
BD.GOV.REG.NO-88

রবিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬

৫ আশ্বিন ১৪৩৩

সরকার অনুমোদিত অনলাইন গণমাধ্যম
BD.GOV.REG.NO-88

আপনি পড়ছেন : মতামত

আমরা সবাই রাজা


অরূপশঙ্কর মৈত্র,পশ্চিমবঙ্গ
DhakaReport24.com || 2022-03-19 21:34:45
আমরা সবাই রাজা

এককালে সাগরের বুকে পলি পরে পরে গজিয়ে উঠছিল একের পর এক চর। কখনও এই চর ভেঙ্গে যায় তো কখনও ওই চর বড় হয়। কালে কালে চরাচর বড় হতে হতে মস্ত হয়ে উঠল। একদিন সাগর হারিয়ে গেল। জন্ম নিল তার অনেক সন্তান। ছোট বড় খাল বিল, নদ নদী নালা। তারপর প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়ে গেছে। আজ নদী নালার হিসেব রাখাই কঠিন। ছোট বাচ্চারা যেমন কিছুতেই স্থিতধী হতে পারেনা, এইসব সদ্যোজাত নদীও বড্ড বেয়াদপ। আজ এদিকে ছুটছে তো কাল ওইদিকে। নদীর একূল ভাঙ্গছে তো ওকূল গড়ে উঠছে। এটাই ওদের চুকিতকিত খেলা। যতই শাসন কর, এরসঙ্গে ওর, ওরসঙ্গে তার মারামারি, ঝগড়া, ভাব ভালোবাসা লেগেই আছে।  
  
হঠাৎ একদিন সেই মাঠে একদল দুষ্কৃতী এসে হাজির। তারা ওই চরে, খালে, নদীতে ঘড়া ঘড়া কেরোসিন ঢেলে দিয়ে ফিরে গেল। 

আবার কিছুদিন পর আর একদল এসে ঘড়া ঘড়া অ্যাসিড ঢেলে দিয়ে গেল। 
আবার আর একদল নিয়ে এল সায়ানাইড বিষ। 

এইরকমই চলতে লাগল। 

অবশেষে একদিন একদল প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা করতে করতে আন্দাজ পেল, এই চরের গভীরে অনেক হীরে জহরত লুকিয়ে আছে। 
শুরু হল খনন।

প্রথম স্তরে দেখা গেল শুধু সায়ানাইড বিষ জবজব করছে। 
দ্বিতীয় স্তরে অ্যাসিড+কেরোসিন।

তৃতীয় স্তরে অ্যাসিড+কেরোসিন+সায়ানাইড মিলেমিশে জগাখিচুড়ি।

আরও গভীরে, আরও আরও গভীরে গিয়ে আর অ্যাসিড, কেরোসিন, সায়ানাইড কিচ্ছু পাওয়া গেলনা। শুধু একটু গন্ধ।
আর একটু নিচে গেলে গন্ধও নেই।

পাওয়া যেতে লাগল হীরে মানিক, জহরত।

সাগরের বুকে গজিয়ে ওঠা ওই সুবিশাল চর আসলে বাংলা। সাগর হারিয়ে গেলেও হারায় নি। আজও বড় নদী, খাল বিলকে অনেকে সাগর বলে। আসলে দক্ষিণে ঠিক কোন জায়গায় নদী শেষ আর সাগরের শুরু, বোঝাই দায়। মৈত্রমহাশয় তো তীর্থের জন্য সাগরসঙ্গমেই যাত্রা শুরু করেছিলেন। কুমিল্লায় পল্লীকবি গান ধরেছিলেন “সাগর কুলের নাইয়া, অপর বেলায় মাঝি কোথায়।“ অদ্ভুত প্রকৃতি ঘেরা এক পৃথিবী। পশ্চিমে ইন্ডিয়া প্লেটলেটের প্রান্তদেশের পাহাড়। রাঁচি থেকে রাজমহল। রাজমহলের পাশের সরু গিরিপথ দিয়ে উত্তর পশ্চিম থেকে বাংলায় আসার একমাত্র রাস্তা। দক্ষিণ পশ্চিমে মেদিনীপুর ওড়িশার সীমান্ত দিয়ে দক্ষিণ ভারত থেকে বাংলায় প্রবেশ পথ। পুবে ত্রিপুরা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত বর্মি প্লেটের পাহাড়ি এলাকা। মাঝে মাঝে ছোট ছোট গিরিখাদ। বর্মা, মনিপুর, নাগাল্যাণ্ড থেকে মঙ্গোলিয়দের পশ্চিমে বাংলায় প্রবেশ পথ। উত্তরে বিশাল হিমালয়। আর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগার। হ্যাঁ, এই চতুর্দিকে দুর্গম প্রকৃতি ঘেরা অসামান্য সমভূমিই বাংলা। ঠিকই, এলাকায় এখানে ওখানে কিছু ছোট ছোট পাহাড় উঁকি দিচ্ছে বটে কিন্তু সেগুলো তেমন কিছু নয়। পশ্চিমের পাহাড়ি এলাকা থেকে দামোদর, রূপনারায়ণরা দিনের পর দিন কাঁধে করে মাটি নিয়ে এসে ফেলছে বাংলার পশ্চিমে, পুবে ফেলছে মেঘনা ধলেশ্বরি। আর উত্তরে হিমালয় থেকে লরিকে লরি পলি এনে আজও ফেলে চলছে গঙ্গা, পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা। পল্লীগায়ক গাইছে “ও নদীরে একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে, বলো কোথায় তোমার দেশ, তোমার নাইকি চলার শেষ।“ এক নদী থেকে আর এক নদীর জন্ম হচ্ছে। এই নদী পুবে সরে যাচ্ছে তো ওই নদী পশ্চিমে। কেউ শুকিয়েই গেল তো কেউ ফুলে ফেঁপে ঢোল। এ যেন জলধারার এক পরিবার এক জায়গায় বাস করতে করতে পৃথকান্ন হয়ে গিয়ে একই গাঁয়ে অনেক পরিবার হয়ে গেল। কিন্তু যাই হোক, সূত্র একই। ১৭৮৭ সাল নাগাদ উত্তরে এক নতুন নদীর জন্ম হল। নাম “বাঙালি”। অনেকে আমরা জানিই না, বাঙালি নামে একটা নদী আছে। 

পৃথিবীর আদিমতম অর্থনৈতিক জাল হল বাণিজ্য। এই বাণিজ্যজালের সূত্রধর বণিক সম্প্রদায়। সত্যি কথা বলতে কি বণিকেরাই আজকের গড়ে ওঠা এই বৃহৎ মানব-পরিবারের মূল কারিগর। অর্থ মানে অর্থাৎ যার একটা অর্থ আছে। আবার অর্থ হল সম্পদ। অর্থ হল মুদ্রা। মুদ্রা হল রাক্ষস যা সবকিছু গিলে খেতে পারে। অর্থের অর্থ নিয়ে তাই চর্চা করা অনর্থক। মুদ্রা দিয়ে এক পণ্যের সঙ্গে অন্য পণ্যের লেনদেনের ব্যবস্থা সেই আদি যুগ থেকেই আছে। তাঁতির বোনা গামছা আর কামারের তৈরি কাস্তে, দুটোই মুদ্রার্থে ব্যবহার করা যায়। এককালে ব্যবহার হতোও। তারপর একদিন যখন বণিকের মানদণ্ড রাজদণ্ড হয়ে উঠল, তখন রাজা ব্যবস্থা করলেন বিনিময়ের মুদ্রা। তার স্বাক্ষর সেই মুদ্রাকে মর্যাদা দিল। সে স্বর্ণ্মুদ্রা হোক কিম্বা কাগজে রাষ্ট্রের ইজাব কবুল হোক। টাকা, রুপি, ডলার, রুবল, ফ্রা, ইয়েন। সম্প্রতি ডিজিট্যাল ক্রিপ্টোকারেন্সি “টুকিই” বলে আড়াল থেকে উঁকি দিচ্ছে। বাণিজ্যের খাতিরেই তার অর্থের নীতি প্রণয়ন হয়েছে। তাই পৃথিবীর প্রথম অর্থনীতির জন্ম বণিকের হাতে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ তত্ত্ব মুনাফার জন্ম বণিকের হাতে। মুনাফা সর্বজন স্বীকৃত নৈতিকতা। “হ্যাঁ-তো। ব্যবসা করছে, লাভ করবে না?”। ব্যবসা করে মাত্র বিশবছরে বিল গেটস, জেফ বেজোস কিম্বা আদানি আম্বানি যদি তাঁদের মূল্ধন লক্ষ লক্ষ কোটিগুণ বাড়িয়ে ফেলে, ফেলতেই পারে! আশ্চর্য হবার কী আছে! মুনাফা করাটাতো অন্যায় কিছু নয়! হ্যাঁ, রাজনীতি করে যদি কেউ একটা রোলস রয়েস গাড়ি করে ফেলে, সেটা নিশ্চয়ই জনগণের সঙ্গে তঞ্চকতা। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমরা মিছিল করব। কিন্তু ব্যবসায় মুনাফার বিরুদ্ধে? কক্ষনো না।
  
এককালে পশুশিকার মানুষকে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় টেনে নিয়ে গেছে। কিন্তু তখনই সে এলাকা ছেড়ে যাচ্ছে যখন তার শিকার করার জন্য সেই এলাকায় পশুর অভাব শুরু হচ্ছে। পশু সন্তান প্রসব করে। আর মানুষ পশু শিকার করে। যখন মানুষের এই শিকার আর জানোয়ারের সন্তান জন্মের মধ্যে ভারসাম্যের অভাব তৈরি হতে শুরু করে, তখনই নতুন এলাকার খোঁজে বেরিয়ে পরতে হয়। তার অর্থ বসবাসের স্থায়ীত্ব সাময়িক হলেও পরিযায়ি হতে হতে কৌমগোষ্ঠীর কয়েক প্রজন্ম কেটে যায়। একই কথা পশুপালকদের ক্ষেত্রেও সত্যি। আর কৃষিতো মানুষকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করে দিল। গাঁ গঞ্জ থেকে নগর গড়ে উঠল। সভ্যতার জন্ম হল। মিশর, মেসোপোটেমিয়া, হরপ্পা, মায়া। বণিক সম্প্রদায়ের জন্ম কিন্তু সেই আদি পশু শিকারের যুগেই। সঙ্গে ভ্রুণাবস্থায় একদল অস্ত্রধারী লুটেরাও সেই আমলেই জন্ম নিয়েছিল। যাদের মার্শাল রেস বলা যায়। এই দুই দলই কিন্তু অবিরাম অস্থির। তারা সবসময় ছূটে বেড়াচ্ছে। ছুটে বেড়ানো তাঁদের পেশার শর্ত। এই আরবের পশ্চিম প্রান্ত থেকে পণ্য কিনে এনে ওই পুবে গিয়ে বেচা। বেচাকেনা বণিকদের অবিরাম ছুটিয়ে বেড়ায়। আবার ওই অস্ত্রধারী ঠগিরাও তাই। আক্রমণ করে লুট করা শুরু হলেই আক্রান্তরা পালিয়ে যাচ্ছে। অবিরাম শিকারের খোঁজে ছূটতে হচ্ছে ঠগিদের। একসময় এই ঠগি আর বণিকদের একটা জোটও গড়ে উঠল। 
বাংলা ছিল বণিকদের মৃগয়া ক্ষেত্র। কোথাও বিপূল পরিমাণ সস্তায় পণ্য পাওয়ার শর্তই হল প্রচুর উৎপাদন। অতিরিক্ত না হলে বিক্রি হবে কী করে? ঠগি এসে অস্ত্রের সাহায্যে লুট করতে পারে। কিন্তু সম্পর্ক মধুর রেখে নিয়মিত পণ্যক্রয় করাতো সবসময় অস্ত্র দিয়ে হয় না। তাতে সামাজিক যে অস্থিরতা সৃষ্টি হয় তা অসুবিধেজনক। তাই বাণিজ্যে এই বাংলায় লক্ষি (লক্ষ্মী নয়।) বসতি শুরু করল। সেই আদিকাল থেকেই। সবচেয়ে প্রবল চাহিদা ছিল বাংলার তাঁতের কাপড়ের। বাংলা ছিল সোনার খনি। এই তাঁতকে হত্যা করে ইংরেজরা আধুনিক যুগের প্রথম ইন্ডাস্ট্রি কটন মিল গড়ে তুলল ম্যাঞ্চেস্টারে। খাদ্যের পরেই মানুষের মৌলিক চাহিদা বস্ত্র। কতদিন আর উলঙ্গ থাকা যায়! 

বাংলায় এই বাণিজ্যের সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন ধারা ছিল। একদল বণিকের যাতায়াত ছিল সমুদ্র পথে। তারা চাঁদ সদাগর। নদীপথে সাগরে দিয়ে আরব কিম্বা দক্ষিণ পুর্ব এশিয়া। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা। বিশাল নৌকা। মাঝি, মাল্লা, হাল, পাল, জাল। মূলত এই বণিকদের কর্মক্ষেত্র ছিল দক্ষিণ আর দক্ষিণপুর্ব বাংলায়। চট্টগ্রাম, মোংলা বন্দর। আবার আর একদল বণিকের বাণিজ্যযাত্রা ছিল স্থলপথে। উত্তর পশ্চিম ভারতের মধ্যে দিয়ে খাইবার গিরিপথ হয়ে পশ্চিমে অথবা নেপালের পথ ধরে সুদূর উত্তরে চিন মঙ্গোলিয়া। বাংলার বিখ্যাত রেশমী কাপড়ের চাহিদা আর তাঁর বাণিজ্যের কারণে এই যাত্রাপথগুলি সিল্ক রুট নামে চিহ্নিত হয়ে আছে। বিখ্যাত বাণিজ্যকেন্দ্রগুলি ছিল সাতগাঁ, তমলুক। এই বন্দরগুলো থেকে স্থলপথে বাণিজ্য হলেও এইগুলোই ছিল এই দুই বাণিজ্যধারার মিলনকেন্দ্র। স্থানীয় বণিকেরা নদীপথে নৌকায় পণ্য পরিবহন করে নিয়ে আসত। স্থলপথের বণিকেরা সেই মাল কিনে নিয়ে রওয়ানা হত, খাইবার কিম্বা নেপালের অভিমূখে। অথবা সুদূর আরব, ইওরোপের দিকে। আবার আরব পারস্যের বণিকেরা সমুদ্রপথে এসে স্থানীয় বণিকদের সঙ্গে ব্যবসা করত। চট্টগ্রামে কিম্বা মোংলায়। এই স্থলপথি আর জলপথি বণিকদের আচার আচরণ, ভাষা ভাবনা, রীতিনীতির বিস্তর পার্থক্য ছিল । চাঁদ সদাগরদের আরাধ্য ছিল স্থানীয় দেবদেবী যারা প্রাকৃতিক বিপর্যয়, বান, কিম্বা বাজ, ঝড়, সাপ, কুমির, বাঘেদের থেকে রক্ষা করবে। তাঁদের আরাধ্যও তেমনই হত। শ’তিনেক বছর আগেও, পুব বাংলার নাবিক-বণিকেরা নৌকা করে সুন্দরবন পেরিয়ে সাগর পথে আজকের কলকাতার দক্ষিণের গঙ্গার পাশে গিয়ে বিদেশি বণিকদের কাছে কেনাবেচা করত। সেখানে এক সাহেব বণিক ছিল খুবই নির্মম। যখন তখন নৌকা আটকে খাজনার নামে লুট করত। সেই বন্দর এলাকার নামই হয়ে গেল সেই সাহেবের নামে। টলি সাহেব থেকে টলীগঞ্জ।  টালীগঞ্জ মেট্রোর নাম মহানায়ক উত্তমকুমার করায়, টালীগঞ্জের মোড়ে উত্তমকুমারের মূর্তি বসানোয় বহু বিদগ্ধজন বিরক্ত হয়েছেন। কেননা, তাঁদের কাছে উত্তমকুমার উত্তম নহেন। (টলিসাহেব উত্তম কিনা জানা হয় নাই।) দুর্ভাগ্যবশতঃ এই রচনাকারও টালীগঞ্জ নিবাসি। হেহে। 
কিন্তু সেই কেরোসিন অ্যাসিড, সায়ানাইডের কী হল? 
হ্যাঁ। এবার সেই খনন কার্য শুরু করা যাক।

কৃষিজীবী, কারিগর বসবাস স্থানীক হয়। তার দেশ সীমাবদ্ধ। তাই বুড়োদাদা যখন জানতে চান “তর দ্যাশ কো?” তখন তিনি আসলে জানতে চান আমার বাসার কথা। বাসা। বাংলাদেশ বা ভারত কিম্বা চিন নয়। “দুটি পাখি দুটি তীরে, মাঝে নদী বহে ধীরে। একই তরুশাখা পরে ছিল বাসা…”। বাসা। যে কোনও সময়ে অজানা ঝড়ে ভেঙ্গে পড়তে পারে। হ্যাঁ বাড়িকে বাসা বলে বাঙালরা। আমরা ছোটবেলায় বাবা ঠাকুরদার মুখে বাসা শব্দটা বার বার শুনেছি। পদ্মাপারে কোথায় যেন আমাদের বাসা আছিল! না। ভুল। বাঙালরা বাড়িও বলে, বাড়ি হোম অর্থে। আর বাসা রেসিডেন্স অর্থে। বেটার শেল্টার। আশ্রয়। শেল্টার টেম্পোরারি হয়। এখানে বাসাও টেম্পোরারি। ওই যে দেখা যাচ্ছে দূরে, মরা নদীর পাশে ছোট্ট একটা কুঁড়ে। ওটা আমাদের বাসা। একটা ভালো বাসার খোঁজেই তো সারাজীবন ছোটা। ভালোবাসা। এখান থেকেই লাভ বা প্রেম অর্থে ভালোবাসে এসেছে। বাংলার প্রকৃতি কিছুতেই এই ভালোবাসা স্থায়ী হতে দেয় না। বাসা ভেঙে যায়, ভালোবাসা হারিয়ে যায়! আবার নতুন করে অন্য জায়গায় গিয়ে বসতি স্থাপন করতে হয়, বাসা বাঁধতে হয়। যেহেতু নৈরাজ্যবাদী শ্রমজীবী বাঙালি ভালোবাসা খুঁজে বেড়াত, তাই উনিশ শতকে ভালোবাসা শব্দটাই অশ্লীল ছিল বিদগ্ধজনদের কাছে। ভূপ্রকৃতির এই নৈরাজ্যই আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে। আমরা জানি এই কিচিরমিচির পাখির দলের জীবনের নিশ্চিন্ত স্থায়ী ঠিকানা, আশ্রয়, বাসা সম্ভব নয়। আর স্থায়িত্ব না থাকলে রাজ্য হয়না। আমাদের পল্লীগীতির মধ্যে বারবার এই ভাবনাটা ফুটে উঠেছে। “লোকে বলে বলেরে, ঘরবাড়ি ভালা নাই আমার। কি ঘর বানাইমু আমি শূন্যেরও মাঝার!”

এবার বাঙালির মাথা ফাটিয়ে ভিতরের ঘিলুর দিকে একটু উঁকি মারা যাক। বাংলা এককালে ছিল কারিগর আর চাষাভুষোদের এলাকা। একজন কারিগর বা চাষি বংশানুক্রমে শুধু একটি ওই বিশেষ পেশাতেই যুক্ত থাকে তাই নয়, একটি বিশেষ এলাকারই বাসিন্দা হয়। বাসা বদলে যায়, বাড়ি বদলায় না। হোম একই থাকে, শেল্টার বদল হয়। তার বিশ্ব তাই সীমাবদ্ধ হয়। দেশ হয়ে যায় টাঙাইল কিম্বা মেদিনীপুর। এরফলে এই বিভিন্ন “দেশে”র বৌদ্ধিক জগতও ভিন্ন ভিন্ন হয়। ভাষার জগতেও নানা বৈচিত্র এসে যায়। মালদার আমের চারা নিয়ে বহুদূরে কেরালায় গিয়ে মাটিতে পুঁতলে শখানেক বছর পরে সেই আমের স্বাদ বদলে যেতে বাধ্য। মালদার শেরশাহ-আবাদি ভাষা আর চট্টগ্রামের চাটগাঁইয়া ভাষা যে একই মাতৃগর্ভজাত বুঝতে কষ্ট হয়। ঢাকার নিচে নানা নদীর উৎস খুঁজলে তার অরিজিন বুঝে ওঠা শক্ত। ঠিক সেই কারণেই বাঙালির ধর্ম রিলিজিয়ন নয়। বাঙালির ধর্ম লোকালাইজড, স্থানীক চরিত্র অর্থে। প্রপার্টি অর্থে। হ্যাঁ, সম্পত্তিও বটে। শেতলা বা বনবিবি, কালুরায়, মানিকপির, ঢেলাইচণ্ডী, রণচণ্ডী, মাকাল ঠাকুর। অসংখ্য মেলা মোচ্ছব। পৃথিবীর আর কোথাও এত মেলা এত বিচিত্র লোকগান আছে কিনা সন্দেহ। এগুলো মিলিতভাবে কোনও কেন্দ্রীয় ধর্ম নয়। হেটারোজিনিয়াস, ডিসেন্ট্রালাইজড, বিকেন্দ্রিভূত লোকধর্ম। এক অদ্ভুত নৈরাজ্য। 

কিন্তু বণিকদের এমন হলে মুশকিল। তাদের কারবার বিশাল এলাকা জুড়ে। তারা ধর্মে কারবারি। তাদের বিশ্বচেতনাও তাই ভিন্ন ধরনের। প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগে যে আর্যধর্ম উত্তর ভারতের আর্যাবর্তে এসে পৌছেছিল, তারা ছিল যাযাবর পশুপালক এবং লুটেরা। তারা অবশ্য নিজেরাই নিজেদের আর্য বলত, বাকিদের সব এক গোয়ালে ঢুকিয়ে দিয়ে নামকরণ করেছে অনার্য। তাদের সনাতন ধর্ম লৌকিক ছিলনা। তারা লুটেরা ছিল। বাংলার ভাটি এলাকা ছিল তাদের কাছে ব্রাত্য। এখানে মেয়েরা ব্রত উৎযাপন করত। মেয়েদের এত সাহস তারা কিনা পুজো করে! তাদের চোখে বাংলায় থাকতো সরু সরু ঠ্যাংওয়ালা পক্ষির দল। কিচিরমিচির করে পাখির ভাষায় কথা বলে। নিষিদ্ধ এলাকা। এই বাংলা ছিল ইতর অসভ্য-বর্বর অসুর, ডাকাতদের এলাকা। এমন ভয়ঙ্কর দুর্গম জল কাদা নদী-খাল-বিল-দহ-সাগরে মানুষ থাকতে পারে? পাছে কেউ ভুল করে চলে যায় তাই বলা হতো ওখানে গেলে পতিত হয়ে যেতে হবে। ফিরে আসতে হলে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। তাদের কথা রবীন্দ্রনাথ গানে বলেছেন চলো নিয়ম-মতে। দূরে তাকিয়ো নাকো, ঘাড় বাঁকিয়ো নাকো, চলো সমান পথে। ‘হেরো অরণ্য ওই, হোথা শৃঙ্খলা কই? পাগল ঝর্নাগুলো দক্ষিণপর্বতে।’ ও দিক চেয়ো না, চেয়ো না, যেয়ো না, যেয়ো না, চলো সমান পথে। শকুন টুকুন ভাবত বোধহয়। নাকি? হাড়গিলে? 

কিন্তু তাদেরই একাংশ যখন বণিক হয়ে উঠল, বাংলায় যেতে শুরু করল, প্রমাদ গুনল এই সনাতন ধর্ম। শুরু হল সনাতন ধর্মের সংস্কার। কেননা, নিজেদের প্রভুত্ব কায়েম করতে যে বর্ণব্যবস্থা আর অশৌচের বন্দোবস্ত, তাতে আর যাই হোক, ব্যবসা করা যায় না। তাই “সবারে বাসলে ভালো নইলে মনের কালো ঘুচবে নারে।“ তত্ত্বের চর্চা শুরু হল। শুরু হল প্রথম ধর্মসংস্কার আন্দোলন। বৌদ্ধ ধর্মের জন্ম হল। বৌদ্ধ শ্রমণদের বড় অংশই ছিল ব্রাহ্মণ। স্তুপ বা বিহার তৈরি হতে শুরু করল। খেয়াল করলেই দেখা যাবে বৌদ্ধ বিহারগুলির অবস্থান স্থলপথে ঠিক বাণিজ্যের রুট বরাবর। বণিকেরা ওই বিহারে আশ্রয় নিত। বাংলার মহাস্থানগড় থেকে বিহারের বৈশালি হয়ে উত্তরপ্রদেশের সারনাথ, শ্রাবস্তি হয়ে নেপালের লুম্বিনি হয়ে হিমাচল প্রদেশের ধর্মশালা হয়ে কাশ্মীরের লাদাখ। এই ধর্ম বণিকদের মানসিক শান্তি দিল। শূদ্র অচ্ছুৎদের সঙ্গে ব্যবসা করলে জাত যায় না। এই ধর্ম রাজার প্রশ্রয় পেল। কেননা, রাজাকে বণিকদের ওপরেই ভরসা করে চলতে হয়। বণিকই সেই যুগে রাজকোষাগার পুর্ণ করে। তখনও কৃষির খাজনা তেমন আদায় হয় না। তাই অশোক থেকে পাল সব রাজাই বুদ্ধিস্টদের আশ্রয় প্রশ্রয় দিয়েছে। হ্যাঁ, গুপ্তযুগে, সেন যুগে আদি ব্রাহ্মণ্যধর্মের সঙ্গে ঝামেলা ঝঞ্ঝাট হয়েছে কিন্তু যাহোক মানিয়ে গুনিয়েই চলেছে। বাংলায় নাকি একেবারে তৃণমূল স্তরে বৌদ্ধধর্ম বজ্রযান হয়ে তন্ত্রমন্ত্রে সহজিয়া হয়ে স্থায়ী আসন নিয়েছিল। বাজে কথা। বাংলায় সহজিয়া বরাবরই ছিল। বৌদ্ধধর্মই বরং এখানে এসে সহজিয়া হয়ে যায়। এটাই ছিল বাংলার ওপর প্রথম কেরোসিন। হুম। 

এবার অ্যাসিড। আরব পারস্যের বণিকদের হাত ধরেই বাংলায় প্রথম ইসলাম এসে পৌঁছয়। আরবে যখন হজরত মহম্মদ ইসলাম ধর্ম প্রচার শুরু করছেন, তখন আরবের মুখ্য অর্থনৈতিক ক্ষমতা আরবীয় বণিকদের হাতে। কালে কালে তারাই ইসলামের প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে। এই ধর্মেও একরকম বিশ্বচেতনা আছে। ওই “সবারে বাসলে ভালো নইলে মনের কালো ঘুচবে নারে।“ কিছু সামান্য তফাৎ থাকেই। আছেও। পরে যখন পীর দরবেশের হাত ধরে ইসলাম বাংলায় এসে পৌঁছল, ততদিনে বাংলা কৃষি সভ্যতার অন্যতম পীঠস্থান হয়ে উঠেছে। কৃষির খাজনায় এখন বাজনা অনেক বেশি। ভুঁইয়াদের রমরমা চলছে। এখানেও ইসলাম পৌঁছে শেষ পর্যন্ত আউলিয়া বাউলিয়া ফকিরি হয়ে গেল। কার্যত সহজিয়া। আরব পারস্য আফগান থেকে আসা অনেকেই মৌলবাদী শরিফ থেকে গেল ঠিকই, কিন্তু আশরফি বাংলার চরিত্র নয়। বাংলা বাংলাই। বাংলা আতরাফ। মুসলিমান থেকে বাংলা মুসলমান। ওই ওলাবিবি, গোরাচাঁদ, মাজার, দরগা, আটেশ্বর, শাহ জঙ্গলি, দক্ষিণ রায়। অ্যাসিড লঘু হতে হতে মিলিয়েই গেল। 

অবশেষে এল সায়ানাইড। ইওরোপের নানা দেশের ইস্ট ইণ্ডিয়া বণিক কোম্পানিগুলোর হাত ধরে খৃষ্টান ধর্ম। পাদ্রী, ফাদার, পোপ, বিশপ ইত্যাদি। কিন্তু সেই ধর্মও কি মুখ থুবড়ে পরেনি? দাগ কি কাটতে পেরেছে? নিবেদিতা টু টেরেসা, ফাদার অ্যান্টনি ভাজ থেকে উইলিয়াম কেরি, সবাইকেই বাংলা ভক্তি শ্রদ্ধা করলেও তারা সমাজ সংস্কারক, ধর্মগুরু হতে পারেন নি। এইযে সনাতন ব্রাহ্মণ্যবাদ, বুদ্ধিজিম, ইসলাম, খ্রিস্টানিটি থেকে সাম্প্রতিক মার্কসবাদ, এগুলো কোনটাই ওই প্রথম এক দুই তিন স্তরের নিচে নামতে পারেনি। গভীরে বাঙালির নিজস্ব হীরে জহরত মণিমানিক্য আজও লুকিয়ে আছে। আমরা যারা চরের ওপরে ঘুরে বেড়াই, আমরা যারা বিদগ্ধজন, আমাদের শিক্ষার শাবল প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় স্তরের নিচে নামতে পারে না। আমরা ব্রাহ্মণ্য যুগে, বৌদ্ধ যুগে বাংলায় কি ছিল, ইসলাম যুগে বাংলায় কি হল, কবে কোন যুগে কি হয়েছে, মার্ক্সবাদ আমাদের কি উপকার কিম্বা অপকার করেছে কিনা, এর বাইরে ভাবতেই পারি না।

তবে সাহস করে বেশি গভীরে নামবেন না। তাহলে মেঘালয়ে যেমন অবৈধ খনিতে গভীরে নেমে কয়লা অনুসন্ধানকারী ১৫ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়ে তাদের মৃত্যুও চাপা পড়ে গেছে, আপনিও তেমনি ডুবে যাবেন। তার চেয়ে বরং ওই দ্বিতীয় স্তর তৃতীয় স্তরে বুদ্ধিজিম, ইসলাম, চার্চের গসপেল, মার্ক্সবাদ, বামপন্থা আমাদের উপর কিভাবে কতটা প্রভাব ফেলছে সে নিয়ে গবেষণা করুন। কেমব্রিজ কিংবা এমআইটিতে চলে যান। পিএইচডি করে ফিরে আসার পর কলকাতার শতবার্ষিকী হলে কিম্বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আপনেরে আমরা শোহরাত করে খিলাত দিব, ভেঁপু বাজিয়ে সম্বর্ধনা দেব।

আপাতত অ্যাসিড কেরোসিন সায়ানাইড আক্রান্ত উপরের স্তরের অগভীর মাটিকেই বাংলা বাঙালি বলে চালিয়ে যান। সমর্থন পাবেন বহু বিদেশি গবেষকের এবং আমার এখানকার বিশাল মাপের পণ্ডিতদের আশীর্বাদ। মনে রাখবেন, বাংলার গভীরে যাওয়া কিন্তু খনিতে অবৈধ অনুপ্রবেশ।

সব শেষে একটু খাজুরে কথা বলি। গালাগাল খাবার সম্ভাবনা নিয়েই। বাংলার কথা শুরু করেছি সেই আদি বৈদিক যুগ থেকে। এই উপমহাদেশে কি তার আগে কোনও সভ্যতা ছিল না? হ্যাঁ, ছিল। সিন্ধু সভ্যতা। সমসময়ের সুমেরিয়, চৈনিক, মিশরীয় সভ্যতার চেয়ে অনেক উন্নত। বাণিজ্য এবং কৃষি উভয়তই অগ্রগণ্য। বিশাল অঞ্চল জুড়ে তার বিস্তৃতি ছিল। প্রায় সাড়ে চারহাজার বছর আগে প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুরু হয়। নদীগুলো শুকিয়ে যেতে থাকে। হঠাৎ ভুমিকম্পে নদীর গতিপথ বদলে যায়। মরশুমি বৃষ্টিও প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। ওখান থেকে মানুষ ক্রমশঃ পুবে, পরে দক্ষিণে সরতে শুরু করে। এই সরণ প্রায় একহাজার বছর ধরে চলেছিল। অতুল সুরের ধারণা ওই মনুষ্যগোষ্ঠীর একাংশ বাংলাতেও এসে হাজির হয়েছিল। যদিও তা প্রমাণ সাপেক্ষ। 

একই সঙ্গে এক অদ্ভুত ঘটনাও লক্ষ্য করা গেছে। একমাত্র সিন্ধু সভ্যতা, একমাত্র সিন্ধু সভ্যতাতেই কোনও যুদ্ধের প্রত্নতাত্ত্বিক নমুনা পাওয়া যায় নি। অর্থাৎ সেখানে কোনও যুদ্ধ হয়নি। কোনও সম্রাট বা রাজার বিশাল রাজপ্রাসাদ পাওয়া যায় নি। কোনও বিরাট মাপের ধর্মক্ষেত্র পাওয়া যায় নি। যা কিনা সমসাময়িক অন্য সমস্ত সভ্যতায় পাওয়া গেছে। সিন্ধুসভ্যতা দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়েছিল। কেউ বলে দেড়হাজার বছর, কেউ বলে তিন হাজার। সেই সুদূর মিশর থেকে মেসোপোটেমিয়া পর্যন্ত তার বাণিজ্য সম্পর্ক ছিল। অথচ, কোনও রাজপ্রাসাদ নেই, বিশাল ধর্মক্ষেত্রও নেই! কেন? সমাজটা কি বিকন্দ্রীভূত ছিল? রাজা ছিলনা? তাই রাজপুরোহিতও ছিলনা! “আমরা সবাই রাজা আমাদের রাজার রাজত্বে?”
আমার ধারণা, ওই সভ্যতা থেকে আদি যুগে যে মানুষগুলো এই বাংলায় এসে হাজির হয়েছিল, তারা তাঁদের অনেক রীতিনীতি, বিশ্বাস, আচরণের সঙ্গে এই নেই-রাজার কনসেপ্টও নিয়ে এসেছিল। আর এই নৈরাজ্যের সঙ্গে বারবার ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র, বুদ্ধিজিম, ইসলাম, খৃষ্টিয়ানিটি এমনকি মার্ক্সবাদেরও সংঘাত হয়েছে। শেষ পর্যন্ত নৈরাজ্য বাংলার গভীরেই আজও লুকিয়ে আছে। 
নৈরাজ্য বাঙালির দোষ নয়, গুণ। হেহে।   
 

অরূপশঙ্কর মৈত্র,নাট্যকার, নাট্য পরিচালক ও লেখক। নিবাস: দক্ষিণ কলকাতা।