গত কয়েক বছর ধরে রাষ্ট্রীয় পুরস্কারগুলো প্রবল সমালোচনার মুখোমুখি হচ্ছে। সমলোচনার মতো ঘটনা ঘটে তাই সমালোচনা হচ্ছে। সদ্য স্বাধীনতা পদক ঘোষণা হলো। সাহিত্যে আমীর হামজা নামক একজনকে পুরস্কার দেওয়া হলো। এ নিয়ে প্রবল সমালোচনা হচ্ছে।
মুক্তিযোদ্ধা আমীর হামজা কবি বা সাহিত্যক নন। তিনি একজন কবিয়াল, পালাকার। সাহিত্য ও সাংস্কৃতি এক সাথে উচ্চারিত হলেও দুইটি এক নয়। আমীর হামজাকে সাংস্কৃতিতে পুরস্কার দেওয়া যেত। তিনি সাংস্কৃতির মানুষ। পালাগান লিখেন, সুর করেন, গান করেন মঞ্চে। পালাগানের আসরে গানে গানে বাহাস করেন। তাৎক্ষনিক গান রচনা ও সুর করতে হয় পালাকারদের। তার রচিত গানের প্রথম বই প্রকাশ হয়েছে ২০১৮ সালে। শেষ বই প্রকাশ হয় ২০২১ সালে।সে হিসাবে তাকে সাংস্কৃতি বিভাগে স্বাধীনতা পুরস্কার দেওয়া যেত। তার একটি বইয়ের প্রতিটি গানই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা । আমীর হামজাকে সাংস্কৃতিতে রাষ্ট্রীয় পদক দিলেও কথা আছে, বিতর্ক আছে। খোলসা করে বলি।
শাহ আবদুল করিম এখনও স্বাধীনতা পুরস্কার পাননি। অথচ স্বাধীনতা, মুক্তি সংগ্রাম, স্বাধীনতার পরবর্তী সময়েও দেশ প্রেম, মুক্তিযুদ্ধ প্রেমের সাথে অবিচ্ছেদ্য ভাবে জড়িয়ে আছে শাহ আবদুল করিমের নাম। ৭৫ পরবর্তীতে যখন কেউ বঙ্গবন্ধুর নাম নিতে পারত না সেনা শাসকদের নির্মম নিষেধের কারণে তখনও শাহ আবদুল করিম যে কোন অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ, খুনীদের বিচার চাওয়ার পর সংগীত পরিবেশনা শুরু করতেন।
বঙ্গবন্ধুও ছিলেন শাহ আবদুল করিমের ভক্ত। যেমন ভালোবাসতেন শাহ আবদুল করিমকে তেমনি ভালোবাসতেন শাহ আবদুল করিমের গান ও তার দেশ প্রেমকেও।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম সুনামগঞ্জ যান ১৯৫৬ সালের ২৬ নভেম্বর। তখন তিনি মন্ত্রী। ঐ দিন বিকালের জন সভায় আবদুল করিম সমাবেশ মঞ্চে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তার রচিত গান পরিবেশন করেন।
"পূর্ণ চন্দ্রে উজ্জ্বল ধারা
চৌদিক নক্ষত্র ঘেরা
জনগনের নয়নতারা
শেখ মুজিবুর রহমান
জাগরে জাগরে মজুর-কৃষাণ"
১৯৫৭ সালের টাঙ্গাইলে অনুষ্ঠিত বিখ্যাত কাগমারী সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর আমন্ত্রণে শাহ আবদুল করিম টাঙ্গাইল যান ও ঐ সমাবেশে গান পরিবেশন করেন।
সিলেট, সুনামগঞ্জ, হাওড় এলাকায় যতবার বঙ্গবন্ধু গিয়েছেন ততবারই সঙ্গী ছিল শাহ আবদুল করিম। ১৯৬৯ সালে সুনামগঞ্জে জুবলী স্কুলে শাহ আবদুল করিমের সংগীতে আপ্লুত হয়ে বঙ্গবন্ধু মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে বলেন-
শেখ মুজিবুর রহমান বেঁচে থাকলে করিম ভাইও বেঁচে থাকবেন।
করিম ভাই যেখানে শেখ মুজিবও সেখানে।
১৯৭০ এর নির্বাচনে হাওড় এলাকায় আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রচারণায় শাহ আবদুল করিম ছিলেন সক্রিয় প্রচারকারী।
শেখ মুজিবুর রহমান গায়েন, পালাকার, বাউল শাহ আবদুল করিমকে ভালবাসতেন, শ্রদ্ধা করতেন তার দেশ প্রেম ও তার সৃষ্টির জন্য। আজও বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানে শাহ আবদুল করিমের গান পরিবেশন করেন নবীন প্রবীন শিল্পীরা। সাহিত্য, সাংস্কৃতি প্রেমি, সাহিত্য বোদ্ধা বঙ্গবন্ধুকে স্পর্শ করতো শাহ করিমের গান ও সুর। তিনি বুঝতেন শাহ আবদুল করিমের গানের গভীরতা। যা আজও বাঙালিকে স্পর্শ করে যাচ্ছে।
সেই শাহ আবদুল করিম স্বাধীনতা পাননি এবারও।
এবার সাহিত্যে স্বাধীনতা পুরস্কার পাওয়া আমীর হামজার পুত্র এক জন আমলা। উপসচিব মর্যাদায় তিনি খুলনা জেলা পরিষদের সচিব। আমীর হামজা যদি আমলার পিতা না হতেন তবে কি এবার পুরস্কার পেতেন? এ প্রশ্ন করার যথাযথ কারণ আছে নিকট অতীতের উদাহরণ থেকে। গত ক'বছরে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার ঘোষনার পর কারো কারো পুরুস্কার বাতিল হয়েছে। ২/১ জন অবশ্য পুরস্কার বাড়ি নিতে পেরেছেন। পুরুস্কার বাতিল হওয়া বা বিতর্কে পড়া প্রত্যেকের সাথে "আমলা/কতৃপক্ষ" শব্দ উচ্চারিত হয়েছে। কেউ নিজে প্রাক্তন আমলা, কেউ আবার বাংলা একাডেমীর ডিজির মেয়ের লেখা পড়ায় সহোযোগিতা, নিরাপত্তা, লোকাল অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেছেন বৃটেন। এসব ক্ষেত্রে সাহিত্য মানের কোন বিচার নাই। তাই আমীর হামজার বিষয়েও প্রশ্ন আসেই। আসতেই থাকবে। তিনি যদি আমলার পিতা না হতেন তবে কি তিনি শাহ আবদুল করিমের চেয়ে বেশি মেধাবী, যোগ্য হিসাবে স্বীকৃতি পেতেন?
আমীর হামজার কোন গান শুনিনি। যদিও আমি প্রচুর পালা, মরমী, পল্লী, বাউল গান শুনি। কিন্তু আমীর হামজার গান শুনিনি। প্রকাশিত বইও পড়িনি। আমার ফেইসবুকে প্রচুর কবি, সাহিত্যিক, সাংস্কৃতিক ব্যাক্তিত্ব, সাহিত্য বোদ্ধা আছেন। আমীর হামজা পুরস্কার পাওয়ার পর তাদের কেউ কেউ আমীর হামজার সৃষ্টি যোগাড় করে পড়েছেন। তাদের মতামত দেখে ধারণা করলাম আমীর হামজা যোগ্য না পুরস্কার পাওয়ার মতো। এখন প্রশ্ন আসে আমীর হামজাকে যারা পুরস্কারের জন্য নির্বাচন করেছেন তারা কারা? তারা কিসের ভিত্তিতে পুরস্কার নির্ধারণ করেন? তাদের যোগ্যতা কি?
------ জহিরুল হক বাপি (লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা)।