তীব্র দাবদাহ আর ভ্যাপসা গরমে পুড়ছে নওগাঁর আত্রাই উপজেলা। এরই মধ্যে মরার ওপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে লোহমর্ষক বিদ্যুৎ বিভ্রাট। দিন-রাত মিলিয়ে কতবার বিদ্যুৎ যায়-আসে, তার কোনো হিসাব নেই স্থানীয়দের কাছে। বিদ্যুতের এই বিরক্তিকর লুকোচুরিকে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ এখন রসিকতা করে বলছেন ‘মিসকল’। একদিকে প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে বিদ্যুতের এমন আচরণে আত্রাইবাসীর জনজীবন পুরোপুরি হাঁপিয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই চরম ভোগান্তির পেছনে নওগাঁ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির অব্যবস্থাপনাই মূলত দায়ী। তবে বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ বলছে, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ অর্ধেকেরও কম পাওয়া এবং সঞ্চালন লাইনের ত্রুটির কারণেই এই লোডশেডিং হচ্ছে।
উপজেলার বিভিন্ন স্তরের মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন আত্রাইয়ের প্রধান জাতীয় সমস্যায় পরিণত হয়েছে। শুধু যে বিদ্যুৎ থাকছে না তা-ই নয়, তীব্র লো-ভোল্টেজের কারণে ফ্রিজ, টিভি, এসি-সহ দামি ইলেকট্রনিক সামগ্রী নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। একটু বৃষ্টি হলেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ গায়েব হয়ে যাওয়া এখানে নিত্যদিনের নিয়ম।
স্থানীয় বাসিন্দা নাসির উদ্দিন চঞ্চল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাট বর্তমানে উপজেলায় জাতীয় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে বাচ্চাদের পড়াশোনা সবই মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। এই নরকযন্ত্রণা থেকে মুক্তির উপায় কী?
আরেক ভুক্তভোগী ফারুক হোসেন বলেন, দিনে-রাতে কতবার বিদ্যুৎ যায় তার কোনো হিসাব নেই। আর যখন আসে, তখন এত কম সময় থাকে যে মটর ছেড়ে পানি পর্যন্ত উঠানো যায় না। সব মিলিয়ে খুব বাজে একটা অবস্থায় আছি আমরা।
পল্লী বিদ্যুতের কর্মকর্তাদের আচরণ নিয়েও ক্ষোভ কম নয়। এলাকার সচেতন নাগরিক গোলাম মুর্শেদ সরাসরি অভিযোগ করে বলেন, "আত্রাই বিদ্যুৎ অফিসের প্রধান তো খুবই ক্ষমতাধর মানুষ! তিনি ধরাকে সরাজ্ঞান ভাবেন। বিদ্যুৎ সেবায় বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে আত্রাইয়ের মানুষকে বেশি অবহেলিত করে রাখা হয়েছে।
বিদ্যুতের এই আসা-যাওয়ার খেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। অন্ধকারে দোকানপাট বন্ধ রাখতে হচ্ছে, গরমে ক্রেতারা দোকানে আসছেন না।
কাপড় ব্যবসায়ী রজত কুমার বলেন, কয়েক দিন ধরে খুব গরম পড়েছে। এর মধ্যে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায় এবং দীর্ঘ সময় আর দেখা মেলে না। বিদ্যুৎ অফিসে বারবার ফোন দিলেও কেউ কল রিসিভ করে না। আমাদের কষ্টের কোনো সীমা নেই।
একই সুর উপজেলার মিল ব্যবসায়ী বিমল চন্দ্রের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, মিনিটে মিনিটে বিদ্যুৎ মিসকল দেয়। দোকানদাররা ঠিকমতো ব্যবসা করতে পারছেন না। বিদ্যুৎ চলে গেলেই দোকান অন্ধকার, গরমে বসে থাকা যায় না। ধান, চাল ও মসলা ভাঙানোর মেশিনগুলো বারবার বন্ধ হয়ে যায়। এতে কাজের ক্ষতি তো হচ্ছেই, পাশাপাশি মূল্যবান যন্ত্রাংশও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এই তীব্র গরমে বিদ্যুৎ সমস্যার কবে সমাধান হবে, কে জানে?
গ্রীষ্মের এই ভ্যাপসা গরমে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পোহাচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা। ঘরে ঘরে ডায়রিয়া, জ্বরসহ গরমজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিচ্ছে। এছাড়া বিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্পগুলো সময়মতো চালানো না যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে কৃষি কাজও।
বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে আত্রাই পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এজিএম মো. রাজু হোসেন জাতীয় এই সংকটকে স্বীকার করে বলেন, বিদ্যুৎ বিভ্রাট বর্তমানে সারা বাংলাদেশেরই সমস্যা। আত্রাইয়ে এনএলডিসি (ন্যাশনাল লোড ডেসপাস সেন্টার) থেকে আমাদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে মাত্র ৬ মেগাওয়াট, যা আমাদের মোট চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম। এই বিশাল ঘাটতির কারণেই মূলত বাধ্য হয়ে ব্যাপক লোডশেডিং করতে হচ্ছে। এছাড়া সঞ্চালন লাইনে কিছু ত্রুটির কারণেও মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে।
এদিকে, গ্রাহকদের ফোন রিসিভ না করা এবং স্থানীয়দের নানা অভিযোগের বিষয়ে জানতে আত্রাই পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির ডিজিএম মো. জসিম উদ্দিনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
বিদ্যুতের এই মরণকামড় থেকে বাঁচতে এবং দ্রুত আত্রাইয়ে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ বরাদ্দের দাবিতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছেন ভুক্তভোগী আত্রাই উপজেলাবাসী।
ঢাকারিপোর্ট২৪.কম/জাক/আরএএম