নওগাঁর আত্রাই উপজেলার পাঁচুপুর ইউনিয়নের পাঁচুপুর গ্রামে অবস্থিত ঐতিহাসিক পুরাতন দ্বিতল কাছারি বাড়ি ভেঙে ফেলার ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, শতবর্ষী ঐতিহ্যের সাক্ষী এই দ্বিতল ভবনটি অবৈধভাবে ভেঙে ফেলার পাশাপাশি এর ভেতরের মূল্যবান লোহার রেল বিক্রি করা হয়েছে এবং ভবনের পুরনো ইট হরিলুট হয়েছে।
সরেজমিনে পাঁচুপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, এক সময়ের সুদৃশ্য ও ঐতিহ্যবাহী দ্বিতল কাছারি বাড়িটির অধিকাংশ অংশ ইতোমধ্যে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে ভাঙা ইট ও দেয়ালের ধ্বংসাবশেষ। ভবনের কিছু অংশ এখনও কোনোমতে দাঁড়িয়ে থাকলেও এর মূল অবয়ব ও সৌন্দর্য প্রায় বিলীন হয়ে গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ব্রিটিশ ও জমিদারি আমলের স্মৃতিবাহী এই কাছারি বাড়িটি দীর্ঘদিন ধরে এলাকার একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা হিসেবে পরিচিত ছিল। এক সময় এখান থেকেই জমিদারদের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো বলে লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে। পরবর্তীতে ভবনটির বিভিন্ন অংশে অন্তত তিনটি পরিবার বসবাস করত বলেও জানা গেছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, ভবনটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে এটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে উল্টো এটি ধ্বংস করা হয়েছে। যারা এই হীন কর্মের সাথে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এলাকার এক প্রবীণ বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এটি শুধু একটি ইটের ভবন ছিল না; এটি আমাদের এলাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জীবন্ত অংশ ছিল। ভবনটি সংরক্ষণ করা গেলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম এই অঞ্চলের অতীত সম্পর্কে অনেক কিছু জানতে পারত। এভাবে রাতের আঁধারে ঐতিহ্য ধ্বংস করা মেনে নেওয়া যায় না।
এ বিষয়ে উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, যে জমিতে কাছারি বাড়িটি অবস্থিত ছিল, সেই জায়গাটি সম্প্রতি লিজ (ইজারা) দেওয়া হয়েছে।
জানতে চাইলে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নূরে আলম সিদ্দিক বলেন, ওই জায়গাটা লিজ দেওয়া হয়েছে এটা সত্য। তবে লিজ দেওয়া হলেও সেখানে যদি কোনো সরকারি বা ঐতিহাসিক স্থাপনা থাকে, সেটি কেউ ভাঙতে পারবে না। এ বিষয়ে যদি কেউ কোনো লিখিত অভিযোগ দেয়, তাহলে আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখব।
লিজগ্রহীতার নাম জানতে চাইলে তিনি বলেন, কারো ব্যক্তিগত তথ্য সরাসরি দেওয়া যাবে না। তথ্য জানতে চাইলে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করতে হবে।
এদিকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিরুজ্জামান বিষয়টিকে বেআইনি উল্লেখ করে বলেন, কোনো সরকারি স্থাপনা অনুমতি ছাড়া কেউ ভাঙতে পারে না। বিষয়টি জানার পর আমি তাৎক্ষণিকভাবে এসিল্যান্ডকে (ভূমি) অবগত করেছি। এমন কোনো ঘটনা ঘটে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষ জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা সাবেক আত্রাই উপজেলা চেয়ারম্যান বিথীন্দ্রনাথ সাহা বলেন, সরকারি বা ঐতিহাসিক স্থাপনা কেউ ইচ্ছা করলেই এভাবে ভেঙে ফেলতে পারে না। এটি আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
রহস্যজনকভাবে এই ভাঙচুরের বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেছেন ৪ নং পাঁচুপুর ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। এমনকি সে জায়গাটি লিজ হয়েছে কিনা, তাও আমি জানি না।
অন্যদিকে, ঘটনার সাথে জড়িত থাকার বিষয়ে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট মসজিদ কমিটির সদস্য মাজেদ বলেন, এ বিষয়ে আমরা কমিটির সভাপতি ও সেক্রেটারির সঙ্গে আলোচনা করে আপনাদের বিস্তারিত জানাবো। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মসজিদ কমিটির শীর্ষ কোনো কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি হারিয়ে যাওয়ায় পাঁচুপুর এলাকার সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র হতাশা বিরাজ করছে। সচেতন নাগরিকদের দাবি, স্থাপনাটি যদি সরকারি সম্পত্তি হয়ে থাকে, তবে কীভাবে এটি ভেঙে ফেলা হলো এবং ভবনের মূল্যবান সামগ্রী ও রেলিং কোথায় গেল-তা উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে উদঘাটন করা হোক। এখন প্রশাসনের তদন্ত ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন এলাকাবাসী।
ঢাকারিপোর্ট২৪.কম/জাক/আরএএম