ছাগাসুর
সে-রমণী, তাহাকে অল্পকাল চিনি। অশ্বেতর প্রাণীদিগের জন্য তাহার সে কী মায়া! প্রভাতে পুষ্পচয়নের পরিবর্তে ইহাদের জন্য শষ্প ও বিবিধ তৃণাহরণেই তাহার সকল মনোযোগ; হ্রেষার পরিবর্তে ইহাদের রহিয়াছে কেবল অলস-প্রহরের-গাঁড়ফাটানো রাসভনিনাদ। কাকস্য পরিবেদনার সহিত এই রাসভস্বর মিশাইয়া বারান্দায় বসিয়া বিবিধ ককটেল বানাই। তাহা পান করি। গলদেশ দিয়া নহে, কর্ণকুহরে ঢালিয়া।
রমণীকে দেখিয়া কাম জাগে। এ-বিষয়ে তাহার প্রভূত প্রশ্রয় আঁচ করি। তবে কাহারো তরফে কোনোরূপ বাক্যবিনিময় নাই।
ঈগলচঞ্চুর ন্যায় তাহার বক্র নাসাখানি তিলনিন্দিত। হাকালুকি হাওরের হাঁসিনীর গ্রীবার ন্যায় তাহার গ্রীবা। তদুপরি তাহার পাউটি লিপস। তাহাতে একখানি ডাঁশা জড়ুল। আর তাহার বগলে ঘাম। বগল ক্ষৌরহীন দেখিয়া সঙ্গত পুলক জাগে।
আমার বারান্দার গাঢ় লাল জবাটিকে দেখিবার অছিলায় তিনি ডাগর চক্ষু তুলিয়া তাকান। সেই চক্ষে অথির বিজুলি। তিনি শ্যামাঙ্গিনী। তাঁহার কম্বুগ্রীবাটি আহ্লাদে ঈষৎ কাত। এক্ষণে জবাফুলটি আরো গরিমাময়, আরো লাল হইল। হইলে হউক ! তাহাতে আমার কি! তাঁহার হস্তধৃত তৃণাদি মাতৃহারা খচ্চরশিশুটি খাইবে, সদা-ভ্যাঁ-ভ্যাঁ-করা বকরিদল খাইবে; খাইতে খাইতে ইহারা গুটলিময় নাদা ত্যাগ করিয়া ক্রমশ উঠান ভরিয়া তুলিবে। তাহাতেও রমণীর স্নেহ ও প্রশ্রয়।
ইহাদিগের মধ্যে একটি প্রাণিই কেবল ব্যতিক্রম। খাবারে ইহার মনোযোগ নাই। আঁচ করিলাম প্রাণিটির ইচ্ছা মদীয় ইচ্ছার নিকটতর। এই কথা কাহাকেও কদাপি বলা যাইবে না। আপনাদিগকেও নহে। কেননা লোকে আমাকে ভালো লোক বলিয়া মান্য করে। কেহ কেহ ‘কত্তা কত্তা’ বলিয়া ষাষ্টাঙ্গ প্রণামে উদ্যত। মান্য লোকদিগের অঙ্গ হষরিত হওয়া বোধ করি অনুচিত। অন্তত অস্থানে। লোকে এমত ভাবে।
সংসারে লোকের ভাবাভাবিকে মূল্য দিয়া চলিতে হয়। আমাকে এবং--- যিনি বুঝিয়াও না বুঝিবার ভাণ করিয়া খোঁপা বাঁধিবার ছলে কুচযুগ আন্দোলিত করিয়া আড়চোখে আমাপানে চাহেন——তাহাকেও। ইহাই রীতি। এই অতি শিষ্ট অণ্ডহীন, যোনিহীন মনুষ্যজঙ্গলে এইমত বিধান। এমত বিধানে যদিও এক মুষ্ঠি ধান্য ফলিবে না।
পাঁঠাটির সেই বালাই নাই। ইহা স্বাধীন। কেননা ইহা ছাগাসুর, তদুপরি তরুণ। আর ইহার বিশেষ অঙ্গটির সে কী গরিমা। কী তেজ! জিভ বাহির করিয়া, মুখে তপ্ত ফেনা তুলিয়া, সে চর্মঘেরা লোমশ খাপ হইতে দেমোক্লিতাসের তরবারিসদৃশ অঙ্গটি বাহির করিল। আচমকা। আর তাহা পেন্ডুলামবৎ দুলিতে থাকিল। লাল। এবং জবারও অধিক। সূর্যেরও অধিক। ইহার রঙ কেবল আসামদেশের কামরুপে ফলিত নাগা মরিচের রঙের সহিত তুলনীয়।
লজ্জাহেতু আমরা উভয়ে অন্য দিকে মুখ ঘোরাই। চকিতে তাহার মুখের একপাশ দেখিলাম। মনে হইল তিনি ঈষৎ বিব্রত; তথাপি আমোদিত। ফটকদরোজা দিয়া তিনি ঝটিতি ভেতরবাটীতে অন্তর্হিত। আর আমি ছাগাসুরের দিকে অসীম তিতিক্ষা লইয়া তাকাই।
পাঁঠাটির প্রতি আমার গোপন ঈর্ষা হইল। এমন সময় প্রতিবেশীর ট্রেসপাসার নচ্ছার হুলোবিড়ালটি কোথা হইতে আসিয়া আমার দিকে ‘আইবল টু আইবল’ তাকাইয়া কহিল ‘ম্যাঁও’।
গেরিলা
গোপনে ভাষার দুর্গে ঢুকে পড়ি গেরিলার মতো
মুহর্মুহু আক্রমণে কেঁপে ওঠে দুর্গ-সেনাপতি। তার
খসে পড়ে টুপি, শিরস্ত্রাণ
সৈন্যরা পালায় ভয়ে অস্ত্র ফেলে ট্রেঞ্চে, পরিখায়;
আর ওই অনেক উঁচুতে
স্তব্ধ-হিম শৈলকপাট থেকে ধীরে
নেমে আসা মাকড়ের জাল
এই দৃশ্য গ্রাসে নেয় পরম কৌতুকে!
লাবণ্যমুদ্রিত ফুলে
অজ্ঞাতবাসের দিন, মনে হয়, গাঢ় হয়ে এলো
নখের আঁচড়ে ক্ষত। কুড়ালের অবিচ্ছিন্ন ঘায়ে
শমীবৃক্ষ তার শেষ বাকল ঝরালো
থাক তবে, লাবণ্যমুদ্রিত ফুলে
গোপন হত্যার কিছু রক্ত লেগে থাক;
পিণ্ডদান শেষ হলে মাঝরাতে চিতা নিভে গেলে
শ্মশানসমীরে ধীরে কাকচক্ষু জলে ছায়া কাঁপে
ছাইগোলা কালি দিয়ে
পাঁজরের দাঁড়ে বসে কেউ একা আঁকবে ময়ূর;
তখন আশিরনখ কাম্য হবে মুমূর্ষুকে ঘিরে শুধু নাচ!
কাম্য আরো বহু কিছু; কম্বুগ্রীবার নিচে
ধ্বংসোন্মুখ নগরীর বিচূর্ণ আনন
কাম্য হবে শেষ উদ্ভাসন
সে চেয়েছে সংখ্যাহীন শব ঘিরে মরণের স্তব
অজ্ঞাতবাসের দিন গাঢ় হ'য়ে এলো
লাবণ্যমুদ্রিত ফুলে আরো কিছু রক্ত জমা হলো
তোমাকে খুঁজতে গিয়ে
কেওড়ার ডাল থেকে ঝুলে থাকা
হেঁটমুণ্ড বুড়া বাঁদরের
নিস্পৃহ দু-চোখ দেখে ভয় পাই;
সে-ভয় কাটাতে
সুবেহ সাদেকে আমি
ভোঁদরের সঙ্গে গান গা'ব
তোমাকে খুঁজতে গিয়ে খুঁজতে ভুলে যাব
ধুতুরাগোধূলি
এখন সকাল খুব লাল। তবু হৃদয়ে গোধূলি
আমি সদ্য বানানো নৌকার খোলের ভেতর শুয়ে; নৌকার একা-কারিগর
গাবের আঠার গন্ধে, তারপিনের গন্ধে আমার নাক ভরে আছে। একদিন ছুতোরের ছদ্মবেশে
ঢুকে পড়েছিলাম জেলেপাড়ায়। সেই থেকে তৈরি করে চলেছি নৌকা। উত্তল আর অবতল নৌকা
সমুদ্রের ছোবলে জেলেপাড়ার মরদেরা সব একে-একে চলে গেল ঢেউয়ের অতলে
এখন নৌকার মতো কাত হয়ে আছে জেলেপাড়া। সদ্যবিধবাদের সারি সারি ঝুপড়িঘর বিষণ্নতায় ঠাসা
এখানে ভোর আর বিকেলের একটাই নাম ------গোধূলি!
একা এক ঘেয়ো কুকুরের কান্নায় ভরে আছে আমার দু'কান
যে ঝুপড়িতেই আমি ঢুকতে চেয়েছি, বাধা হ'য়ে দাঁড়িয়েছে প্রকাণ্ড এক মাকড়জাল
মাকড়েরা আমাকে না দিয়েছে একাকিত্ব ঘোচাতে
না দিয়েছে জেলেপাড়ার নম্র বিধবাদের বিষণ্নতার গাদ সরাতে
প্রতিবারই নিষেধের লাল তর্জনী
এবার রাগী বেড়ালের মতো নিজের ভেতরের মাকড়জাল ছিঁড়ে ফেলতে চাইছি আমি
ফরসা হয়ে উঠছে আমার চোখ
বিধবাদের কামনাতুর দেহে জ্বলে উঠছে ফসফরাস;
সমুদ্র ঝিলকে উঠছে মাছের পেটির মতো
আমার পা টলছে ধুতুরার নেশায়। একটি একক মুহূর্তকে আমি সকাল ও গোধূলি বানিয়ে
ধরে আছি দু'হাতের মুঠোতে। এ-খেলা আমি অসংখ্য একা-আমিকে দেখাই বারবার
একটা সরু দড়ির উপর দিয়ে একা-পিঁপড়ে হয়ে হেঁটে চলেছি
ধোঁয়ায় মোড়ানো কোনো আবছায়া বাড়ির দিকে
আমার সঙ্গে নতমুখ হেঁটে চলেছে ২০ বছরের পেনিলোপিহীন নৈশাঘাতে বিবর্ণ এক
একা-ইউলিসিস। ছিন্নবস্ত্র ভিখিরির বেশে। শূকরপালক, ছাগপালকের অবজ্ঞার ভেতর দিয়ে
---একবার সে আমার ছায়ার ভেতর ঢুকে পড়ছে। পরক্ষণে আমি তার ছায়ার ভেতরে।
লাল সকালের ভেতর দিয়ে আমরা বয়ে নিয়ে চলেছি গোধূলি
সব বিষণ্ন লাল সকালই সব একা-মানুষের গোধূলি
তবু সামান্য ভাতপচানো মদ আর ধুতুরার ভেতর থেকে এবার উঁকি দিচ্ছে
সদ্যবিধবাদের স্পর্শ ও চুম্বন । ধূসরতার ভেতর রাংতার ঝিলিক
ওই তো মরীচিকার ভেতরে পেখম তুলছে বিধবাদের ময়ূর
ওই তো হঠাৎ হেসে উঠছে, গান গেয়ে উঠছে একা-একা মানুষেরা
তাদের তীব্র স্বমেহনের ভেতর ফেটে পড়ছে শত-শত অসহ্য কামারশালা
মাকড়জাল সরিয়ে কামনাতুর বিধবারা আমাকে ডাকছে
তারা ময়ূর ছেড়ে দিয়েছে বৃষ্টিতে ..
.
একা-মাছ লাফিয়ে উঠছে শূন্যে
একা-মাছ ঝিলকে উঠছে শূন্যে
একা-মাছ পার হচ্ছে মরীচিকা
একা-মাছ সওয়ার হচ্ছে ঢেউয়ের ওপর