রিজোয়ান মাহমুদ,কবি, প্রাবন্ধিক, গল্পকার ও সম্পাদক। শিক্ষাগত যোগ্যতা ; স্নাতকোত্তর, ব্যাংকার (অবসরপ্রাপ্ত)। জন্ম ২৫ জানুয়ারি, দক্ষিণ হালিশহর সল্টগোলা, চট্টগ্রাম। স্ত্রী রুবা মাহমুদ। ৩ সন্তান-তানজিনা মাহমুদ,আবির মাহমুদ ,ইবতিসাম মাহমুদ। লেখালেখি- আশির দশক থেকে।
প্রকাশনা - ১) উজানী নগরের কন্যারা (১৯ ৯৭), ২) কাঠ চেরাইয়ের শব্দ মাপছি দুপুরে ( ২০০৪), ৩) গগনহরকরা ডাকে ( ২০০৬) , ৪) নীরবপুর (২০১০), ৫) দুপুরলতা (২০১৭), ৬) মুদ্রিত কামনা থেকে, সনেটগুচ্ছ (২০২০), ৭) হাইকো চাঁদের ফ্রক।
সম্পাদনা - ১) একলব্য, ২) দুপুরলতা ( সম্পাদক) । জোড়াসাঁকো, প্রধান সম্পাদক। সবুজ আড্ডা, উপদেষ্টা সম্পাদক ।
পুরস্কার - ১)ক্যাম্ব্রিজ ইংল্যান্ডের ডিকশনারি অফ ইন্টারন্যাশনাল বায়োগ্রাফি ট্যুয়েন্টি সিক্স এডিশনে হু কতৃক নির্বাচিত ম্যান অব দি ইয়ার ১৯ ৯৮ সাল, ২) চিটাগাং স্কটিশ স্কুল সাহিত্য সম্মাননা ২০১২, ৩) কবি ওহীদুল আলম সাহিত্য সম্মাননা ২০১৪
বিষ পিঁপড়ের দল
দরজার খিল ভেঙে
ঘুম তুলে - দিলাম যাকে
কখনো দেখি নি তাকে
অপরিচিত ডহর ঢেউ
হাঙ্গরের হা
হাহাকার - শানেনজুল
ভাবছি, দু'পাতা খোলা
যেন বাজারের মাছ
চেয়ে থাকা শুধু
খুচরো যন্ত্রাংশে ঝাঁপ দিয়ে
শরীরে বাড়ানো বিষ
তবু আমি ঘুম বিক্রেতা নই
নতুন চোখ বিনিয়োগকারীও নই
অলিগলিতে যাদের ঘুপচি আঁধার
তাদের উদ্বৃত্ত ঘুম দিয়ে যাই
পিপাসিত চলিষ্ণু মানব
মদালসা খালের কিনারে প্রদাহ
বেচে খাই
দিন - দুপুর - রাতে
চোখে একদম আঁইশ নাই
নিশি পাওয়া বিকাল
বিষ পিঁপড়ের দল, দরোজাটা
ভেঙে আনে না সকাল।
দেখা না দেখার স্বরলিপি
একদিন কবিতা লিখতে লিখতে সময়
শেষ হয়ে এলে - ভাবছি কবিতাগুলো উল্টে দিয়ে যাব।
একটা-ই কারণ ; শব্দ যে পোড়ামুখী দ্রবীভূত জল।
যদি একটিও অনুপ্রাস উৎপাদন কাজে লাগে, যদি লক্ষ্যমাত্রা কখনো ছাড়িয়ে যায় মেঘের জিডিপি,
নির্ঘাত বর্ধিত হবে আয়ু
আসলে এমন ভাবি তা-ই রোজ পোড়ানো একটি কবিতার জন্য একমুখী রাস্তায় দাঁড়াই। শহীদ সম্মানে সবুজ কুর্নিশ করি। জুতো ব্যতীত দাঁড়িয়ে থাকি ঠাঁই সকাল - সন্ধ্যায়।
রাস্তাকে সম্মান করি দূরত্ব বুঝিয়ে নিতে । শূন্য থেকে মহাশূন্য কিলোমিটারে এখন ভয় নেই।
আমি পাদুকাহীন কবিতা বেপারি শব্দের সংগমে নিজেকে হরহামেশা পেটাই।
মানবগর্ভ তবু তো দেখা যায়। কবিতাগর্ভ স্বয়ং
কবিও দেখে না।
উল্টোচিত্র
মানব বন্ধনরত শিশুরা
সবাই উলঙ্গ দাঁড়ানো রাস্তায়
ঊর্ধ্বদৃষ্টি শূন্যের গোলাঘরে
সকাল বেলার আলো শিশুদের তনু দেহে
সম্মুখে শেরেবাংলা সংসদ ভবন
কুয়াশাচ্ছাদিত
পেছনে শীতকাল মোহাম্মদপুর বাজার
আহা! কেন এমন ঘুমস্বপ্ন - কেন ঘোলাটে ভবিষ্যৎ
নিয়ন্ত্রণহীন - খুব অগোছালো
কর্পূরের মতো উবে যায় দূর সীমানায়
মুহুর্তেই একটি সচল ক্যামেরা অচল হলো
লজ্জায়।
সেলাইমেশিন
সেলাই মেশিনে দেখি
নিজ দেহে কেউ সূঁই গেঁথে
এফোঁড় - ওফোঁড়
সেলাই করছে বহুবার
আমি আনাড়ি এক
হৃদপিণ্ড দেখিনা, সূঁই দেখি
লাল পানপাতা কীভাবে যায়
সুঁইয়ের দখলে এবার।
আমরা বিচ্ছিন্ন হই যদি
মহা দুর্যোগের অবিশ্রান্ত ঝড়ে
ভেবে নাও, সেলাইমেশিন জোড়া
দেবে, সূচ দেহপাতা নড়বড়ে।
হুম, হবোই তো আমরা
সেই পৃথিবীর জোড়া মানবী
অাধপোড়া দেহের সাক্ষী নিয়ে
দাঁড়াবো মহলে, দুর্যোগের আজনবি।
রাজত্ববাস
বাঘসভা হচ্ছে বনে
হরিণ সংগমে ছাড় দিতে হবে
প্রয়োজনে ; এ-ই সমস্ত কৌশল নিয়ে বাঘ
লাফ দেবে ২৪ ফুট - প্রকৃতির কাছে আবদার।
এদিকে কাঁদছে বনভূমি
হরিণের প্রজনন শূন্যের কোটায়, ভেবে
আতঙ্কিত বনের সুন্দর
বনাঞ্চলে শক্তিবাদের এজেণ্ডা নিয়ে
বাঘসভা শেষ হলে -
এ - বনে নতুন আধিপত্যবাদ নামে প্রতিদিন।
জেলেপাড়ার আনন্দতাবু
সমুদ্র বালিকা তুমি
বর্ষা এলে ফর্সা মুখে তোমাকে দেখতে চায়, যারা, নদীর সুনীল স্কুল থেকে বিদ্যুৎ ফাঁদ কিংবা
বেহুন্দি জালের বেড় ধরে নিয়ে আসে।
তুমি স্নান সেরে চুল শুকোবে এ সময় নেয়না তারা।
ও, বালিকা তোমার শরীর বেশ চাপা কিন্তু পুরো
মাথার উপরিতল পুরু ত্বকে ঢাকা।
সুনীল কোমল জলে রূপোলী রঙের ফ্রক পড়ে তুমি
নদী বিদ্যালয়ে নাচো।
নৃত্যরত ননীর পুতুল দেখে কারো রসনার টান আসতেই পারে।
তুমি পদ্মাবতী, মেঘাবতী, যমুবতী - ইরাবতী
তুমি ওঠে আসো কূলে যৌবনবতী হবার অাগে,
দস্যুতার টানে।
রামলালের পুত্তুর রাজ তুমি
কবি বুদ্ধদেবের জলের শস্য তুমি
মোহ নিদ্রা ভাঙার আগেই মুখে ওঠে হৈচৈ করো
ঠোঁটে চুমু খাও, জিহবার উত্তেজনা সহস্রগুণ বাড়িয়ে দাও - সিন্ধুসভ্যতার পাল্লু মাছি তুমি। আমাদের রুপোলী ইলিশ।
মাঝে-মাঝে তোমার অকাল মৃত্যু, আমরা অর্বুদ খাদকরা খাবার টেবিলে দুরুদে উল্লাস ক'রি।
আজ,
জেলেপাড়ার আনন্দতাবুতে কী উৎসব, পেশিবহুল একেকজন সংগমতাড়নায় ছটফট ক'রে
আমি কি নিজেও যুক্ত হই!
পিকাসো ও মুদিদোকান
পিকাসো তুমিও একদম আমার মতোন
সেবার স্পেনের গৃহ যুদ্বের বিরুদ্ধে গোয়ের্নিকা
এঁকেছিলে -
তার - কিছু আগে রমণীর ছিন্ন - বিচ্ছিন্ন গোঙানি এঁকেছি অামিও
আমাদের যাদুঘর আমাকে নেয়নি কখনোই।
তুমি প্রোটো - কিউবিস্ট
আমি মুদিদোকবিদ
মুদি দোকানের পাল্লা দিয়ে মাপি মানুষের
মনের ওজন।
একদিন পাখিও পোকারা জেগে না ওঠার অাগে
তোমার বিছানা ছেড়ে খোখলোভা আমার দোকানে
এসেছিল, বলেছি তোমরা সুখী হবেনা কোনোদিন
কারণ সুখের সংজ্ঞা সর্বদা সঙ্গম পর্যন্ত সীমাবদ্ধ
সে কিছুটা সঙ্গম সওদা করে দুপুরের সূর্যটা পশ্চিমে
হেলে না পড়ার আগেই পালিয়ে বাঁচতে চেয়েছে
ওরিয়েন্টালরা এখনো জানে নি।
অন্য কেউ বোঝেনি
সে দিন মা'কে ডাক্তার
ওষুধ না দিয়ে
একটি শাদা টাওয়াল দিয়েছিল -
সে দিন বুঝেছি ফেরেস্তাবেশে কারোর
দস্তখৎ - প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত।
মা' জানতো
এটি রিলিজ অর্ডার এবং হাসপাতালমুখো
না ' হওয়ার,,,
স্ট্রেচারে শায়িত লাজুক মা ' তাকানোর
ভঙ্গিটা সমর্পণের -
শেষ লোলিত অঙ্কটি, শুধু
আমি ছাড়া আমাদের পরিবারের
অন্য কেউ তেমন বোঝেনি!
মঙ্গলনসন্ধ্যায়
মেয়েকে বলেছি চল,
এবার মঙ্গলগীত গাই
মেয়ে যখন ঝুমকো পায়ে উঠোনের কোণে
তখন জল থৈ থৈ উঠোন
মেয়ের মা' বলে,আনন্দ হবেনা আর
মঙ্গল শুধুই গ্রহ - বৈজ্ঞানিকদের ধর্ম
লালমাটিও যেন মহারাজার খুন।
সর্বত্র ফেরিক অক্সাইডের কারণে আমাদের রুহু রক্তাবরণ। গবেষণা লাগবে আরও একশো বছর। মানুষের ঠিকানা মানুষ খুঁজে নেবে।
মঙ্গল যা অনুভবের তা মসজিদ মন্দিরের পোড়া ভস্মাধার - কল্যাণের যোগ নেই এতে
আমাদের চালচুলোহীন সংসারে
কিছু হাড়ি পাতিল বাসন আচার বৈয়াম
নিত্য দিন এসবের ব্যবহার হয়-ই না
কখনো সখনো আমের আচার বানিয়ে রাখলে
বৈয়াম সুভর্তি থাকে
বাপ বেটিতে আমরা চুরি করে খাই
বোদ ও ছায়ায় নেমে গেলে দিন
মেয়ে বলে বাবা ধরো পুরনো দিনের গান
আমাদের গান আছে - স্বরলিপি নাই
তবু মঙ্গল সন্ধ্যায় চর্চা করি কারো হাতের দু'খান
বালা যদি নেচে উঠে
তুমি দক্ষিণের কোণ থেকে কোনো একদিন
শুনবে বৃষ্টির শব্দ।
রোদের কড়া নড়া
তোমাকে দাঁড়াতে বলেছি, ঠিকই
দাঁড়ি-কে দাঁড়াতে বলিনি তখন ;
বুঝি নাই একটা দাঁড়ির জন্য কেন
আহাজারি, গাড়ি চলিষ্ণু যখন।
রেললাইন ছুটেছে এঁকেবেঁকে পথে
স্লিপার ঘর্ষনে বুঝেছি লোহার কান্না
যন্ত্রণার উপাখ্যান অংশত চিনেছে
পথের বৈষ্ণব - দাঁড়ানো বেদান্ত কন্যা।
জাগিয়েছি শিশুটিকে যে জাগতে চায়
তাকে বাঁধি কোন বাহুড়োরে অনর্থক
দাঁড়ি দিয়ে ঢেউ কি কখনো বাঁধা যায়
স্রোতের বিপক্ষে যাবে কোন সে লুব্ধক।
পাঁজর হাড়ের কান্না কেউ -কেউ বা শোনেন
মরমি মাদুলি ঝুলিয়ে সন্যাসে যান যারা
দেহবতী ঘুম থেকে ওঠে দ্যাখে কথামালা
সাজানো দুগালে রোদতাপ শুধু কড়ানড়া।
যদি আকাশ নামতে থাকে প্রীতির ঘূর্ণনে
মেঘের ঘুঙুর দিয়ে রচি স্বপ্ন নিজেরই খুনে।
ঢেউফুল
তোমার কোমল সাম্পানে যেদিন থেকে
আমার দরিদ্র নাম - ভাসমান
সেদিন থেকেই আমি ভবঘুরে
বেলা আর ছায়া কুড়িয়ে ফিরেছি
এঘাট - ওঘাট।
মানুষ দেখেছি পরমের কথা বলে,
আমি বহুতোয়া শরমের ফুল ছুঁয়ে দিই।
প্রকৃতির অবারিত ছায়ায় ফুলেরা
পাপড়ি মেলেছে।
রাতের যুগল ছায়া দিকভ্রান্ত জড়িয়ে - ভিড়িয়ে ধরে
একবারও মনে হয় নি ঠোঁটের দূরত্বে আছ তুমি -
যৌথঘূর্ণি ঝড়ে
ঢেউফুলে ভেসে গেছি বহুদূর...
একজন কাল্পনিক অতিথি
জীবনানন্দের ল্যান্স ডাউন বাড়িতে গিয়ে দেখি সেদিন সম্পূর্ণ
নিরাভরণ একটি ঘর দুপুরের নির্জনতায় খাঁ খাঁ করছে খুব
কোথাও যেনবা একটা তক্তপোষ একেবারে অতি সামান্য শয্যা
এককোণে কুঁজোভর্তি জল। এককোণে শতছিন্ন একগাদা খবরের কাগজ, ঘরের সাথে একটি বারান্দা ; আমি তারস্বরে ডাকলাম তাঁকে
জীবনানন্দ ও জীবনানন্দ ক্ষেত থেকে নারিশাক এনেছি,কলার থোড় আর লাল টমেটো সবুজ বড় কমলালেবু। ঘর সুগন্ধের জন্য
আগরবাতিও ধোঁয়া এনেছি পাশের বাড়ি থেকে। বনলতা, সুজাতা
এমনকি তোমার সে কাকাবাবু অতুলানন্দের মেয়ে শোভানা ব্যতিত
ঘর ভরছে না। নন্দ তুমি এসে দ্যাখো, মন্দিরের ধূপ নিয়ে মনিরাও
এসেছে দেখ নি তুমি।
সকল লোকের মাঝে নিজমূদ্রা দোষে তুমি একা হলেও লাবণ্যগুপ্ত
তোমাকে কখনো হাতছাড়া করে নি বুঝেছ?
তোমার আঁধার ছিল অনেক মহৎ এবং দরাজ। কিছু
দুর্বল আঁধার
আমাদের ঘিরে ধরেছে পৌষের এই শীতের সকালে।
স্বাধীনতা যেভাবে শুরু
স্বাধীনতা যদি হয় সর্বশেষ বিন্দু - নাকফুল
সতীত্ব ও সকালের রঙ বেঁচে থাকে বিলকুল।
বিধবা অক্ষরে অমোচন কালোদাগ খুব মানো
উদজান বোমা মা'র , তবুও আমাকে পাশে টানো।
সে - দিনও স্বরচিত নাম মেশিন মর্টারে ঘুরেছিল
ঘুমঘোরে তোমাকে জড়িয়ে অন্ধকার শুয়েছিল।
তুমি কী অশাস্য নিয়তিবাদী সে -আমি কিছু জানি
আমি নিরাকারবাদী প্রকৃতির উপাসনা কিছু মানি।
তুমি ব্যতীত উপাস্য নাই উল্লম্ব আমার মন্দির
আমি ছায়াসুর দেহের দরুদ আহা! পৃথিবী অস্থির।