মানুষের জন্মের আগে যেখানে আত্মারা থাকে সেই স্টক হাউজে হঠাৎ গন্ডগোল শুরু হয়ে গেলো। সেপাই এঞ্জেলরা সুপারিন্টেন্ডেন্ট এঞ্জেলের কাছে গিয়ে নালিশ জানালো- 'একটা আত্মা বারবার জন্মের অর্ডার বাতিল করে শুধু পেছনে যাচ্ছে, জন্মের আগেই দুষ্টুমি শুরু করেছে। কি করা যায় বলুনতো!'
এবার সুপার গিয়ে দুষ্ট আত্মার কাছে জিজ্ঞেস করলো- কি হে! কি সমস্যা তোমার? অর্ডার শুনছো না কেনো?
আত্মা বলল- আমি মানুষ হয়ে জন্মাতে চাই না।
সুপারঃ সে কি? মানুষ হয়ে জন্মাবে এর চেয়ে আনন্দের কী আছে! ত্যাড়ামি করো না, যাও ধনাঢ্য পরিবারে জন্মের ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
আত্মাঃ সে তুমি যতই প্রলোভন দেখাও জন্ম আমি নেবো না।
সুপারঃ মানে! কি করতে চাও তুমি?
আত্মাঃ জন্ম যদি নিতেই হয় তবে আমি শয়তান হয়ে জন্মাতে চাই।
সুপারঃ ওহ গড! এটা জন্মের আগেই শয়তান হতে চায়!
সেপাই এঞ্জেলরা সুপারকে বলল- স্যার, জন্মের আগেতো একে শাস্তিও দেওয়া যাবে না। গুরুতর সমস্যা। বরং কেসটা মহামান্য গডের কাছে নিয়ে যান।
সুপার এঞ্জেল ভাবলো- হা, সেটাই করা উচিৎ। যেই ভাবা সেই কাজ। গডের পার্সোনাল সেক্রেটারির সাথে গিয়ে বললÑ খুব জরুরী, মহামান্য গডের সাথে এখনই দেখা করা দরকার। সেক্রেটারি বলল- স্যারতো কার্যালয়ে নেই, দুপুরে ভাত খেতে বাসভবনে গেছেন, তা আপনি একটু বসুন আমি খবর দিচ্ছি।
ওদিকে দুনিয়া থেকে ক'জন বাবুর্চি মারা গেছে। তারা পূন্যবান, কাজেই স্বর্গ লাভ করেছে। স্বর্গে এসে সদ্য তারা গডের বাসভবনে বাবুর্চির চাকরিও নিয়েছে। আজ প্রথম দিন, বরিশালের বালাম চালের ভাত, ইলিশ মাছ সাথে নানান রকম ভর্তা ভাজি, কাঁচা আমের ডাল কত কি রান্না করেছে! বগুড়ার দই দিয়ে গড মিয়া খাওয়া শেষ করেছেন। একখিলি পান মুখে পুরে দিয়েছেন গডেস বিবি। হুক্কাও তৈরি করে দিয়ে গেছে খানসামা। পান চিবুতে চিবুতে হুক্কায় কেবল দম দিবেন, এমন সময় কাশতে কাশতে অন্দর মহলে ছুটে এলো সেক্রেটারি।
সেক্রেটারিঃ স্যার আত্মার স্টক হাউজের সুপারিন্টেন্ডেন্ট আসছে, সেখানে কি না কি গন্ডগোল হচ্ছে, তা আপনার সাথে জরুরি কথা বলা দরকার, যদি দয়া করে কার্যালয়ে এসে সিংহাসনে বসেন!
গড একটু বিরক্ত হয়ে বলল- ধুর মিয়া, অনেক দিন পর ইলিশ মাছ দিয়া পেট ভইরা কয়টা ভাত খাইলাম, ভাবছি হুক্কা টাইনা একটু ভাতঘুম দিমু, অসময়ে আইছো নতুন ঝামেলা লইয়া, যাও আইতাছি...
চারদিকে প্যাঁপুঁ বাঁশি বেজে উঠলো, সময় মতো গডমিয়া এসে সিংহাসনে বসলেন। চারটা চাকর সাথে সাথে হুক্কা নিয়ে হাজির। হুক্কায় দম দিতে দিতে গডমিয়া বললেন- কি সুপারিন্টেন্ডেন্ট, একটা নির্ঝঞ্ঝাট দপ্তর চালাইতে পারো না, কেমনে চাকরি করবা?
একটু কাচুমাচু করে সুপারিন্টেন্ডেন্ট এঞ্জেল পুরো ঘটনাই খুলে বলল। সাথে এও বললো যে- স্যার স্বর্গীয় আইনের ৪২০ ধারা মোতাবেক একেতো শাস্তিও দেওয়া সম্ভব নয়।
চমকে গেলেন গড মিয়া। নির্দেশ দিলেন আত্মাটিকে নিয়ে আসার জন্য। মহূর্তেই নির্দেশ তামিল হলো। এবার দুষ্ট আত্মাকে গড বললো- কি হে! মানুষ হয়ে জন্মাবা এর চেয়ে ভালো কি? জাননা, শয়তান আমার নির্দেশ অমান্য করায় তাকে নরকে যাইতে হবে!
আত্মাঃ জানি জানি, ও সব তোমার চালাকি, আদতে শয়তানকে তুমি পরীক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়েছো, সে আসলে হবে নরকের সুপারিন্টেন্ডেন্ট। আমিও নরকের সুপারিন্টেন্ডেন্ট হতে চাই। সাফ কথা।
এবার একটু চিন্তিত হয়ে পড়লেন গড মিয়া, সুপারকে বললেন- এটা এমন কেনো! এর ম্যানুফাক্সারিং কার্ডটা বাইর করোতো...
সুপার ম্যানুফাক্সারিং কার্ডটা বের করে বললেন- স্যার, ম্যানুফাক্সারিংয়ের সব উপাদানই ঠিকঠাক আছে, তবে শয়তানকে যখন তাড়িয়ে দিচ্ছিলেন তখন শয়তান মানবাত্মার দিকে যে থুথু ছুঁড়েছিলো তা পড়েছিলো এই আত্মাটার উপর, যথা সময় ওয়াশ করাও হয়েছিলো, তারপরও সন্দেহ হয়- সেই প্রভাব বোধ করি কিছু রয়ে গেছে।
বিচলিত গড মিয়া, দুষ্ট আত্মার দিকে চেয়ে বললেন- শোনো আত্মা, শয়তান জন্ম তোমার হবে না, তবে চাইলে আমি শয়তানের চেয়েও বড়ো মানে তোমাকে শয়তানের গুরুর জন্ম দিতে পারি, আবার দুনিয়াতে বেশ কটা নরক আছে তার যে কোন একটির সুপারিন্টেন্ডেন্টও হতে পারবা বেশ কিছু দিন।
আত্মাঃ কী বলো গড! শয়তানের চেয়েও বড়ো... মানে শয়তানের গুরুর জন্ম! তা কি করে সম্ভব!
গডঃ তবে শোনো, বেশ কিছুকাল আগে শয়তান এসে আমার কাছে মাফ চেয়েছে। কারন মানুষের মধ্যে এমন কিছু মানুষ আছে যারা শয়তানের চেয়েও বহুগুণ বড়ো শয়তান। শয়তানের শয়তানি যেখানে শেষ হয় এদের শয়তানির শুরু হয় সেখান থেকে। ইদানিং এদের কাছ থেকেই উচ্চতর শয়তানির শিক্ষা নিচ্ছে শয়তান।
আত্মাঃ ভারি মজার বিষয়, তা কেমনে শ্রেষ্ঠ! একটু নমুনা শুনি!
গডঃ ধরো শয়তান একবারে কেবল একটা রূপই ধরতে পারে, যখন সে খাটাশের রূপ ধরবে তখন সে খাটাশ, যখন সে সাপের রূপ ধরবে তখন সে সাপ, যখন সুন্দরী নারীর রূপ ধরবে তখন সে নারী। কিন্তু এই সব গুরু লোকেরা এক সাথে চার চারটি রূপ ধারণ করতে পারে। যা আমার পক্ষেও অসম্ভব!
আত্মাঃ বলো কি! আশ্চর্য! তা কেমন শুনি!
গড মিয়াঃ ধরো, সে সমাজে পরিচয় দেবে দেশ দরদী রাজনৈতিক নেতা, ঘুরে বেড়াবে ধর্ম প্রচারকের মতো, ভক্ত জনতার কাছে সে পরিচিত হয় ধর্মের রক্ষক, একজন ধর্মাবতার হিসেবে, আবার একটু চালক চতুর মানুষের কাছে ধরা দেয় ব্যাবসায়ী হিসেবে কিন্তু আসলে সে একটা ডাকাত।
আত্মাঃ কী আশ্চর্য! কী আশ্চর্য! তা গড প্রভু, এরা কেনো এসব করে? দুনিয়ায় কোথায় বসে করে?
গড মিয়াঃ দুনিয়াতে বেশ কিছু দেশ রয়েছে, যেগুলোকে এরা নরক বানিয়ে রেখেছে। ধর্মানুভুতি নামক একধরনের আফিম আছে যা খাইয়ে জনগণকে নির্বোধ-নরকের কিট বানিয়ে রাখা যায়। একজনকে দিয়ে অন্যকে খুন করানো যায়। এমন কি ভক্তদের অন্যপ্রানীর গু পর্যন্ত খাওয়ানো যায় এবং তা গায়ে মেখে আনন্দের সাথেই খাবে। তো, এসব দেশগুলো যদি নরক না হয় তবে শয়তানের গুরুরা নরকের সুপারিন্টেন্ডেন্ট মানে রাষ্ট্র নেতা হবে কেমন করে! আর তাই যদি না হয় তবেতো দর্পের সাথে নির্ঝঞ্ঝাট ডাকাতিও করতে পারবে না।
আত্মাঃ আচ্ছা, আচ্ছা, তা একটু নরকের বর্ণনা শুনিতো গড প্রভু!
গড মিয়াঃ যেমন ধরো দক্ষিণ এশিয়া নামক একটা অঞ্চল আছে, সেখানে রয়েছে বেশ কটা নরক। এই ধরো বঙ নরক, এটা একটা মোসলমান নরক, তার পাশে রয়েছে বর্মা নরক, সেটা একটা বৌদ্ধ নরক, সবচেয়ে বড় নরকটার নাম শ্রীখণ্ড, এটা হলো হিন্দু নরক। শ্রীখন্ডের পাশে রয়েছে পাকি নরক, সে এক মহা নরক আর তার পরে নরক শ্রেষ্ঠ- নরকেস্থান।
আত্মাঃ তা গডপ্রভু, এখানকার শয়তানের গুরুরা কিভাবে সুপারিন্টেন্ডেন্ট হয়?
গডঃ ধরো হিন্দু নরক শ্রীখণ্ডের গুরুরা প্রচার করবে শ্রীখণ্ডে হিন্দুরা বিপদে আছে, এখানকার মুসলমানদের মারতে হবে আবার ভয় দেখাবেÑ পাকনরকের লোকেরা তাদের নরক দখল করতে পারে, ফলে হিন্দুরা ক্ষিপ্ত হবে মুসলমানদের উপর।
আত্মাঃ আচ্ছা...
গডঃ ধরা যাক দেশের সুপারিন্টেন্ডেন্ট নির্বাচনের সময় এসে গেলো, শ্রীখণ্ডের সৈন্যদের বহারে তাদের নিজ শয়তানের গুরুরা চক্রান্ত করে বোমা ফাটালো, দোষ দেয়া হবে পাক নরকের, জনগণ এটা খাবে। আবার ধরো বঙ নরকের দালালদের দিয়ে সেখানকার হিন্দুদের উপর কিছু হামলা করানো হবে- বেশ, এবার কেবল প্রচারণা, জমে যাবে শ্রীখণ্ডের নির্বাচন, শয়তানের গুরুরাই হবে প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি।
আত্মাঃ আচ্ছা...
গডঃ আবার ধরো বঙ নরকে নির্বাচন হবে, তো হিন্দু বিদ্বেষ, শ্রীখণ্ড বিদ্বেষ বাড়িয়ে তোলো; তো জমে যাবে! পাক নরকেও তাই, সেখানে অবশ্য হিন্দু আছে কেবল মিউজিয়ামে গুটি কয়, তাতে খেলা জমে না, ফলে সেখানে শুরু হয় শিয়া সুন্নি গেইম। আবার নরকেস্তান তো এ সবের উর্ধ্বে। সেখানে হিন্দু মুসলমান, শিয়া সুন্নি দ্বন্দ্বের চেয়েও সুক্ষ সব হাইব্রিড দ্বন্দ্ব নামানো হয়। সেখানে পড়াশোনার জন্য শয়তানও ভয়ে যেতে চায় না।
আত্মাঃ বাহ, দারুণতো...
গডঃ হুম, আবার এই ডাকাতদের মধ্যে তলে তলে কিন্তু একটা সেটিং থাকে, জনগণ লাফায়, মারে মরে, আর মওকা লোটে শয়তানের গুরুরা।
আত্মাঃ আচ্ছা গড, এই সব দেশে কি মানবাধিকার, বাঁচার অধিকার এসব নেই?
গডঃ আহা- থাকবে না কেনো! আছে, ভুরি ভুরি আছে, তবে তা কেবল কাগজপত্রে, সংবিধানে। এসবকে নস্যি বানিয়ে তবেইতো গুরু পর্যায়ের খেলা হয়, সাধে কি আর গুরু! অন্যের মুখের খাবার কেড়ে খাওয়া, ডাকাতি করা কি এতো সহজ!
আত্মাঃ হা গডপ্রভু আমি শয়তানের গুরুর জন্মে রাজি।
এবার গড আত্মার হাউজের সুপারিন্টেন্ডেন্টকে নির্দেশ দিলেন আত্মাটিকে দক্ষিণ এশিয়ায় জন্মানোর সুযোগ দিতে।
[বিঃদ্রঃ 'আত্মা' বিষয়টি প্রকৃতি বিজ্ঞান কিংবা সমাজ বিজ্ঞান দ্বারা প্রমানিত বা স্বীকৃত নয়। এটি আদিম মানুষের ধারণা। গল্পের প্রয়োজনে এর ব্যবহার করেছি। কাজেই কুসংস্কার আচ্ছন্ন হওয়া থেকে নিজ দায়িত্বে বিরত থাকবেন।]
-রাজু আহমেদ মামুন, কবি ও সাংবাদিক।