কুমার চক্রবর্তীর জন্ম ২ চৈত্র ১৩৭১ বঙ্গাব্দ, কুমিল্লা, বাংলাদেশ।
তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থগুলো হলো――
কবিতা : লগপুস্তকের পাতা (১৯৯৮), আয়না ও প্রতিবিম্ব (২০০৩), সমুদ্র, বিষণ্নতা ও অলীক বাতিঘর (২০০৭), পাখিদের নির্মিত সাঁকো (২০১০), হারানো ফোনোগ্রাফের গান (২০১২), তবে এসো, হে হাওয়া হে হর্ষনাদ (২০১৪), অধিবিদ্যা সিরিজ (২০১৬), কবিতাসংগ্রহ (২০১৯), শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০২২), আমার শীতের মদ (২০২৩); প্রবন্ধ: ভাবনাবিন্দু (২০০২), ভাবনা ও নির্মিতি (২০০৪), অস্তিত্ব ও আত্মহত্যা (২০০৫, ২০০৬, ২০১২, ২০১৬), মৃতদের সমান অভিজ্ঞ (২০০৯/ ২০২৩), শূন্যপ্রতীক্ষার ওতপ্রোতে আছি আমি আছে ইউলিসিস (২০০৯), কবিতার অন্ধনন্দন (২০১০), ঈশ্বরবিষয়ক বিপ্রতীপচিন্তা (২০১১), নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০১৫), আত্মধ্বনি (২০১৬), উৎসব (২০১৮), পথিকমন (২০২২); অনুবাদ: আমি শূন্য নই, আমি উন্মুক্ত: টোমাস ট্রান্সট্র্যোমারের কবিতা (১৯৯৬, ২০০২, ২০১২), নির্বাচিত কবিতা: ইহুদা আমিহাই (২০০৫, ২০১৩), মেঘ বৃক্ষ আর নৈঃশব্দ্যের কবিতা: চেসোয়াভ মিউশ (২০১৪), বহু হও ব্রহ্মাণ্ডের মতো: ফের্নান্দো পেসোয়ার কবিতা (২০১৬), জর্জ সেফেরিস: কবিতা সাক্ষাৎকার প্রবন্ধ (২০১৯)।
তিনি কবিতায় লোক এবং হুমায়ুন আজাদ পুরস্কার পেয়েছেন।
মে মে ন্তো মো রি
‘মনে রেখো, মৃত্যুই নিয়তি,’ দিয়োনিসুস,
শীতকাল জুড়ে জমা হওয়া মদ শেষ হলে
মনে রেখো, যা তোমাকে ঘিরে রাখে―
তার অর্ধেক বিস্ময় আর বাকিটা নৈঃশব্দ্য।
হাহাকার ফুটেছিল তোমার আয়নায়, লীলা, লাস্য,
চিরবিশ্রামের পথে ক্ষীণ ছিল সমগ্রের ছায়া, ছিল
মারাত্মক বিসুবিয়ুস, আর শৈল্যবিদের গান,
তোমার স্মৃতির হাত ধরে―যে চেয়েছে
স্পর্শের সৌন্দর্য, কোনোকিছু বাড়াবাড়ি নয়
তোমাকে তো ঘিরে আছে শুকনো কাঠের ঋজুরেখ।
ঘোড়াগুলো উচ্চৈঃস্বরে করে গেল আত্মপ্রতারণা
কেবল তারাই পারে চিনে নিতে পথের নির্লিপ্তি
চরিতার্থতার কথা তুমি জানো, দিয়োনিসুস,
কেননা তুমিই বলো পুনরুদ্ধারের কথা: অমরত্ব
আর অন্ধবিশ্বাস, মানুষ নিজের কাছে নিজেই অচেনা
আরও সে অচেনা তার সর্বস্বের কাছে
তারা তো জানে না, নিষ্পন্ন বাস্তব আজ এই দিকে
রেখে গেছে বিপর্যস্ত যাপনের সিগনেট,
জেনো দিয়োনিসুস, জীবন অস্পষ্ট এক স্মৃতিশাস্ত্র
রাত শেষ হলে তার নিঃশব্দ করোটি, একা,
অন্তর্মুখে গেয়ে ওঠে হননের গান।
ই উ লি সি স আ র আ মি
ইউলিসিস যে জাহাজের নাবিক
সেই জাহাজে চড়ে আমি বেড়াতে চাই দশটি বছর,
ইলিয়াম থেকে ইথাকা―
আমার ভ্রমণের দৈর্ঘ্য পরিমাপ করে আমার স্মৃতি,
আমারই স্বপ্নের দর্পণ।
আমার ভেতরে সমুদ্র বাইরেও সমুদ্র
ধমনিগুলোতে প্রবহমান বেদনার লিথি,
উড়ন্ত চুলগুলো মেঘে-ছাওয়া,
বৃষ্টি এলে ভেঙে পড়ে সমুদ্রে
―চিহ্নহীন, পরিবর্তনীয়তায়।
জানি আমি, অমরতা হলো ট্রয়ের ঘোড়া
যে অনেককে নিয়ে হয়ে যায় একা,
প্রতীক্ষার প্রহরগুলো ইউলিসিসের অশ্রুরাশি
যে ঝরে একা, জলহীন,
আর সমুদ্রের তলদেশ হলো তার বুক
যা সে বিছিয়ে দেয় অজানা সংকেতের দুরাশায়।
ইউলিসিস জানত প্রতিটি সমুদ্রের সীমা এবং সীমাহীনতা,
জানত তার সীমান্তগুলোর রহস্য
যেখানে মেঘেদের পাহারা বস্তুত জাহাজডুবির কথা মনে করিয়ে দেয়,
জানত―জীবন হলো অলীক উপস্থিতি,
এক অসম্ভব প্রত্যাবর্তন, যা সমুদ্রের আলগুলো ধরে
অনন্তের দিকে পথ করে নেয়
নিজেকে পুনর্বার একা করে তোলে।
নিয়তিগ্রস্ত আমি
নিয়তিগ্রস্ত আমি, দাঁড়িয়েছি এসে আজ
এই মর্মী নদীটির পাশে―
যে নদীর ভিতরে মিশেছে নদী, সমুদ্রসম্ভব দূরচিহ্ন,
হাজার বছর ধরে পাখিদের উষ্ণ মনঃস্রোত,
অজানা উদ্দেশ্যে।
বাতাস বইছে, দেখি দূরে― অন্তর্বস্তুরূপ,
বর্ণময়, একটি রমণীপ্রিয়
মাছরাঙা মুখে পুরে নিয়ে যায় জলের মরুৎ।
ভাবি, এ জীবন মৃত্যুকে সাজায়:
নদী জানে এই রূপকথা, বলে―
পাখিরা এখানে এসে ঠোঁটে করে মৃত্যুকেও তুলে নিয়ে যায়!
নেই কোনো মর্মধ্বনি
কোমল স্বরের স্পর্শে আমি শিশির হতে থাকি,
গলে যেতে থাকি, নীরবে,
তোমার বসন্তসমুদ্রের কাছে।
ফুল ফোটে নিয়মে বা অনিয়মে, কিন্তু
আমি তোমার চারণভূমিতে গুল্ম হয়ে জন্মাতে চাই,
হতেও চাই একটি রুদ্রপলাশ
যা বলবে অদৃশ্য ঋতুর কথা, দৃক্সন্ধ্যার কথা,
বলবে, হারিয়ে যাওয়া পরজবসন্তের কথা।
ওই দ্যাখো, ডাকছে বনপুলক,
ডাকছে হিমালয়ের নিঃসঙ্গ রডোডেনড্রন;
কেমন করে আজ স্পর্শ করি প্রেম, করি স্পর্শ
ঋতুর প্রান্তিকে থাকা তোমার মান্দার বা সোনাঝুরি,
কেননা, আমার জীবন শুধু স্তব্ধ বোধ, এক
সিন্ধুসারসের পাখা ঝাড়া।
স্মৃতিকে উসকে দেওয়া ছাড়া আমার
নেই কোনো অশ্রুপ্রেম, নেই কোনো বিস্ময়,
নেই কোনো মর্মধ্বনি আর!
কখনও আবার
কখনও আবার যদি দেখা হয়
মুখোমুখি বসব আমরা, বুনো-এক শিচিরিন রেস্তোরাঁয়,
উন্মুখর অস্তিত্বমুহূর্ত,
আমরা তো বসব পার্থিবরূপকে:
অর্ধলীন ওষ্ঠ থেকে তুলে নেব মহাজাগতিক বিস্ময়,
বিনিময় করব যে অমরতা:
ছোঁয়াব তোমার ঠোঁটে মহুয়ার ফুল, তুমি দেবে
শাত্যু শেভাল ব্লঁ, উন্মাতাল,
খুঁজে ফিরব ছায়াপথপ্রেম, আর নক্ষত্রের বাতুলতা।
ছিলাম একাকী আর একা, আজ
তোমাকে নিয়ে হব হে অনন্ত
অর্ধস্বচ্ছ মেঘ ছড়াবে মোহ, অদূরে ও দূরে
আমাদের দৃষ্টি ছোঁবে স্বর্গের ছায়া,
আমরা দুটি সোনালি ইগল বাম ডানায় ভর করে
দক্ষিণের ডানায় জড়িয়ে ধরব একে অপরকে
উড়ে গিয়ে বসব পামিরের ছাদে;
লগ-হাউসে সময়হারানো মুখরতা
আবারও বিনিময়, আবারও দেহীজীবনের গান,
সুদূরে গুম্ফার ঘণ্টাধ্বনি
আমরা শঙ্খরেখার মতো প্রবেশ করব
জীবনের জেরুজালেমে
ক্রন্দন দেয়ালে মাথা খুঁড়ে বলে উঠব: আলেল্লুইয়া
গাইব পরমগীত, এক গোপনজীবনের কথকতা
আবার কখনও দেখা হলে, একবার ছোঁব যে অতল
হব যে চাতক, আর পান করব বিস্মৃত স্ফটিকজল!
জীবনদিনের গান
মৃত্যুর পর ফেলে আসা ছায়াগাছ আর নরম নদীটির কথা মনে পড়বে আমার।
জীবনদিনের পাখি, আহা, পরানদিনের গান, তোমরা কোথায় গেলে আজ ?
কোথা সে-গুল্ম , মুগ্ধমাতাল, যেইখানে খাগরোলপাতা বিছিয়ে দিয়েছিল নীরবতার সকাল?
এইখানে স্তব্ধতা, বোবা হাওয়া তোলে না তো কোনো হাহাকার,
অস্তহীন আলো এক সারাক্ষণ মাথার ওপরে,
মধুময় পৃথিবীর মেঠোপথে ঘাসেরা যে বাজিয়েছিল গহনের সুর
খড়বিচালির আড়ালেই পতঙ্গপ্রাণ আজ পথ ভুলে নশ্বর অস্তিত্বের দিকে এগিয়ে দিয়েছে
দেহাতীত বেদনার রস।
অনশ্বর হে অস্তিত্ব, বলো নিজ ভুলে, কী করব আমি আজ, বলো?
অন্তহীনতা আর জীবনদিনের স্মৃতিজ্জ
হারানো গাছের কথা, ফেলে-আসা পতঙ্গের কথা,
মেঘের পিঠে উঠে যাওয়া কোনো নদীর কথা যেন মনে করায়!
জীবনদিনের গান, দ্যাখো আজ একটি ফড়িঙের মতো ঝরাপাতা উড়ে উড়ে যায়
জীবনদিনের গান, এসো, নিজেকে বিছিয়ে দিই আকাশভ্রমের নিবিড় ও নিস্তব্ধ খেলায়!
পাহাড়ি নদীর গান
আমি এক পাহাড়ি নদী, যে তার তলকে বিছিয়ে দিয়ে রাখে,
সেখানে পাথর আছে, পাথরেরা আকাশের রং ধরে আছে।
প্রকৃতি সরল শোভা, আমি তাকে প্রণয়ভাষণ করি,
মানুষেরা আসে উন্মুক্ত সৌন্দর্যের কাছে, দ্যাখে, বুকপাথরের ছায়া,
দাঁড়ায় ওপরে তার, ব্যথা ওঠে বেজে আমার পাঁজরে,
কিন্তু জল ধুয়ে দেয়, করে উপশম, কিছুটা আরাম পাই,
তারপর অসমাপ্ত বেদনার গান, বাজে, বেজে চলে হৃদয়ের দেশে, ও প্রদেশে।
মানুষ জানে না, ব্যথা দিতে নাই, নিতে হয় নিজ নিজ দেওদারবনে
জীবনের গানের সকালে সেই ব্যথা সুর হয়ে, লয় হয়ে
সারাবেলা গেয়ে গেয়ে ওঠেজ্জ
ভাঙনের কথা বলে, বলে উদাসীন স্বরে
পাখি সেই সুর ধার করে গিয়ে বসে ডালে-আবডালে,
ফুল শোনে সেই সুর, তারপর ফলকেও নিয়ে যায় আত্মের ধারায়।
এভাবেই আমার গান জীবনের মরণের ঘুম হয়ে, স্বপ্ন হয়ে,
একটি আহা ও হাহার সুরে, একা, রয়ে যায় !
নদী ও সমুদ্র
নদীটির নিকটে হারানো স্তব্ধতা রয়েছেজ্জ
মৃত্যুর পর আমি এই নদীটির ধারে এসে দাঁড়াতে চাই,
তার নিস্তব্ধ ধ্বনির ভিতর আমি পেতে চাই মরজগতের ভাষা।
নদীর কাছে গেলে মনের ভিতর সমুদ্রসম্ভব ব্যাপকতা আসেজ্জ
সমুদ্র আমাকে ডাকে, অনুস্বরে, গভীর পরশে।
এ জীবনে নদী আছে, সমুদ্রও আছে,
জীবনের ভিতর তাদের আমি বয়ে বেড়াইজ্জ
তাদের কলরোলে মুখরিত হয় আমার জলবোধ,
গান গায় সময় ও শূন্যতাজ্জ
নড়ে ওঠে জীবনের বিন্দু আর বৃত্তের মহাল;
নদী ও সমুদ্র আমাকে এক হারানো পৃথিবীর কথা বলে,
বলে, এ জগৎ স্বপ্নের আধার
শ্বাসমূল জীবন
যা কিছুই পল্লবিত তাকে শূন্যে রেখে অস্তিত্বকে মাটির গভীরে পুঁতে দিই,
এভাবেই আকাশবোধ, মহাশূন্যতার খেলা চলে অহরহ, আমার জীবনে। হাওয়াঘর আর দেহের দূরত্বে
বাসা বাঁধে অজানা চড়ুই। একদিন তারা উড়ে চলে যাবে জীবন পেরিয়ে কোনো নির্জন
মৃত্তিকার আশ্রয়ে যেখানে শ্বাসমূল আকাশের দিকে মুখ করে অবশেষে নিখিলকে
ডেকে বলে: আয় আয় আয়
জীবন মাটির গান, সুরগুলো গুল্ম হয়ে, ঝোপ হয়ে, পাতা হয়ে,
মর্মরের দিকে উড়ে চলে যায়
পাখিরা এসব বোঝে না, তারা শুধু শূন্য থেকে উড়ে এসে পুনরায় শূন্য হয়ে
শূন্যে চলে যায়
বিস্ময়চিহ্নিত
একটি অনুদিত পথে হাঁটতে হাঁটতেই এসে পড়লাম
গুপ্ত কোনো জগৎবিন্দুতে,
অব্যক্তের এই ক্ষণ, গূঢ় কোনো বেদনার-পাখি অস্ফুট জীবন নিয়ে
এইখানে লীলাময়, এইখানে বেলাশেষে, এইখানে...
লাস্য করে ওঠে!
জীবনের পথগুলো অজানাস্তম্ভিত, একদিন এই বোধে চলাচলজ্জ
অনন্তধাবিত, স্তব্ধ, অধরাও হয়ে পড়ে চিন্তামণি তার,
এইসব ভাবনার তরুণিমা, এইসব ভাবালু অস্তিত্ব
শুধু আকাশের দিকে চেয়ে অবশেষে, দূরে যেতে চায়
এ জীবন, বাক্হীন বিস্ময়চিহ্নিত, দূরবেলা স্মৃতি হয়ে যায়।
হিজলের ফুল
প্রভাতের জলে-ভাসা হিজলের ফুল, আমাকে অতলে নিয়ে যাও,
ডুবে যেতে যেতে, হারাব যে অস্তিত্বের যত আভরণ,
যত আছে জীবনের ফুল, তারা আজ ঝরে যাবে পুনরায় অনন্তের ভুলে।
কেন যে রাত্রেই ফোটো, কে-বা জানে এ রহস্য, অপ্রত্যাশিতের দান,
রাত্রির সুগন্ধ নিয়ে কেন ঝরো সুদিনের পটে,
জলে-ভাসা নিয়তি তোমার, ভেসে যাও দিশাহারা অজানার দিকে,
ভাবনাহীন, জীবন তোমার।
আমার জীবনস্রোতে আছে কিছু উপহ্রদ, কুন্দফুল, আকন্দের ধ্বনি
আরো কিছু হাহাকার, তারা যাবে সমুদ্রসন্ধানে
সেখানে রয়েছে গভীরতা, তলদেশে ঝিনুকের গান হৃদয়বাসনা ব্যক্ত করে,
সে বলে গোপন স্বরে, যদি চাও ডুবে যেতে নিজের ভিতরেজ্জ
আগে চলো ভেসে ভেসে, তারপর অব্যক্তের ছলে ডুবে যাও, হে, অজানা আধার
গভীরের পথে যেতে নিমজ্জন কাক্সিক্ষত এবার!