সোমবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬

৬ আশ্বিন ১৪৩৩

সরকার অনুমোদিত অনলাইন গণমাধ্যম
BD.GOV.REG.NO-88

সোমবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬

৬ আশ্বিন ১৪৩৩

সরকার অনুমোদিত অনলাইন গণমাধ্যম
BD.GOV.REG.NO-88

আপনি পড়ছেন : শিল্প-সাহিত্য

কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: দিনের সালোক-সংশ্লেষণ, রাতের মাইফেল


মাসুদ খান
DhakaReport24.com || 2023-01-10 22:22:30
কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ: দিনের সালোক-সংশ্লেষণ, রাতের মাইফেল

সমকালীন বাংলাসাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নাম সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ।  ৭ জানুয়ারি তাঁর জন্মদিন। জন্মদিনে তাঁকে জানাই আমার আন্তরিক শুভেচ্ছা।

সুব্রত আমার সুহৃদ ও সতীর্থ। একই সময়কালের কাব্যতীর্থে, একই জলবায়ুতে আমাদের বেড়ে ওঠা। সুব্রতর কবিতা, গদ্য ও কথাশিল্প পাঠ করে আসছি দীর্ঘদিন ধরে। বৈচিত্র্যের সমারোহে পূর্ণ তাঁর কবিতা ও গদ্য-- ওঙ্কারে, ঝংকারে, ভাবে ও ভাষায়, রূপে ও শৈলীতে। তাঁর আধার যেমন বহুবিচিত্র, আধেয়ও তেমনই। বাংলা কবিতা ও কথাশিল্পের ধারায় এ এক নতুন ও ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা। 

আপ্রাচীন-আধুনিক বাংলার কাব্য ও সংস্কৃতিধারার নির্যাসে আমোদিত তাঁর সাহিত্যভুবন। কেবল বাংলা নয়, সারাবিশ্বের আলোবাতাস জলহাওয়ার ওপর তাঁর আকৈশোর অধিকার। জগতের বহুবিচিত্র উৎস থেকে আহৃত বিচিত্র উপাদানে ফুল্ল ও জমকালো তাঁর লেখালিখি। আমরা বিস্মিত হই-- একসঙ্গে কত শব্দ, প্রসঙ্গ ও অনুষঙ্গ মাথায় নিয়ে লিখতে বসেন আমাদের এই মুনশি কবি। ভাষা ও প্রকরণের ওপর তাঁর অগাধ দখল, আর সে-সুবাদেই ভাষার ভেতর বিচরণ তাঁর অবাধ ও অনায়াস। ছন্দ তাঁর অনুগত দাস, শৈলী তাঁর কাছে আকাশ-বাতাস। 

যে কোনো সাহিত্যকর্ম আসলে লেখকের অনুভূতি ও উপলব্ধির সৎ প্রকাশ। যে-স্থানিক ভাষার ভেতর একজন লেখক বেড়ে ওঠেন, শ্বাসপ্রশ্বাস নেন, সে-ভাষার চলনভঙ্গিতে ভর করে যখন তিনি প্রকাশ করেন তাঁর অনুভূতি ও উপলব্ধি, তখন তা হয়ে ওঠে অকপট ও অকৃত্রিম। সুব্রত-র জন্ম ও বেড়ে ওঠা বাংলাদেশে, বিশেষভাবে বললে, বৃহত্তর ঢাকা-অঞ্চলে। আমরা জানি, প্রতিটি অঞ্চলেরই থাকে নিজস্ব ভাষাভঙ্গি ও ভাষাগতি, যা সূক্ষ্ম ও স্বতন্ত্র। ভাষার স্বতন্ত্র গতিবিধি মানেই স্বতন্ত্র শক্তি। সুব্রত সাবলীলভাবে ব্যবহার করেছেন তাঁর সেই স্থানিক ভাষার সুপ্ত শক্তি ও সম্ভাবনাগুলিকে, গড়ে তুলেছেন তাঁর স্বকীয় ভাষারীতি, নিজস্ব ভাষাভুবন। সে-ভুবনের বাতাবরণ কখনো কঠিন, কড়া ও ঝাঁজালো, কখনো কোমল, সরস, সুরেলা। সে-ভুবনের আবহাওয়ায় কখনো উজ্জ্বল আলোর উদ্ভাস, কখনো মেঘলা বিষণ্নতা। পলিবহুল তাঁর স্রোতস্বী, তাই হয়তো তা ঘোলাটে কখনো-কখনো, তবে সুনাব্য। তাঁর উদ্যানে ফলে নানা রঙের, নানা জাতের ফল-- মসৃণত্বকা, কঠিনাবরণ, রোমশ...। সব ফল যে মিষ্ট ও মুখরোচক, তা নয়, তবে পুষ্টিপ্রসঙ্গে তারা অনুপম।    
       
সুব্রত লিখেছেন প্রচুর, এবং নানাবিধ জাগতিক, অধিজাগতিক সংকটের ভেতরে থেকেও এখনো লিখে চলেছেন অক্লান্ত, সমান তালে-- কবিতা (বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায়), কথাসাহিত্য, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, অনুবাদ, গানের লিরিক, খণ্ড ও অখণ্ড ভাবনানিচয় (যা আমরা পাই তাঁর সাক্ষাৎকারে, এমনকি ফেসবুক স্ট্যাটাসেও)। তাঁর ‘তনুমধ্যা’, ‘কালকেতু ও ফুল্লরা’, ‘পুলিপোলাও’, ‘অন্তউড়ি’ (চর্যাপদের আধুনিক বাংলা রূপান্তর)... বাংলাসাহিত্যের মূল্যবান সংযোজন বলে মনে করি। কবির সেই বৈচিত্র্যমণ্ডিত সাহিত্যকৃতি সামগ্রিকভাবে, মর্মসার হিসাবে আমার কাছে যে-রূপে ধরা দিয়েছে, তা নিয়ে ছোট্ট একটি লেখা লিখেছিলাম অনেকদিন আগে। সেই নির্ণয়টুকুও পেশ করলাম এখানে।

// দিনে সালোক-সংশ্লেষণ, রাতে মাইফেল //

বড়-বড় বৃক্ষেরা তাদের নিজ-নিজ এলাকায় তো বটেই, শিকড় ছড়িয়ে দেয় দূর-দূরান্তের পরগনায়। আহরণ করে আনে বিচিত্র সব খাদ্যরস ও খনিজ, আর আবহাওয়া থেকে শুষে নেয় বায়ব অঙ্গার। তারপর সেগুলিকে ধীরে ধীরে রূপান্তরিত করে ফেলে ফুলে, ফলে, অক্সিজেনে, পাতায়, ছায়ায়। সে-এক দুর্দান্ত আলকেমি, এক জাদুজটিল তেলেসমাতি।  

বৃক্ষের ওই কেরামতি শিখে নিয়েছে আমাদের এই কবি। সুব্রত অগাস্টিন গোমেজ। জগতের বিচিত্র উৎস থেকে রস শুষে এনে অবলীলায় ঘটিয়ে তোলেন এক অভিনব রসায়ন, আপন তেজ, মধু ও মশলাপাতি সহযোগে। আমরা যারা বৃক্ষসন্নিহিত, বৃক্ষনির্ভর, তারা আনায়াসে পেয়ে যাই ফুল ফল কাঁটা পাতা ছায়া ও শুশ্রূষায় ভরা এক সবুজ ঘটনা, আস্ত এক সবুজ প্রস্ফুটন-- ফুলের মন-উন্মন-করা চেনা-অচেনা আঘ্রাণ, ফলের অম্লমধুর কটুকষায় উগ্রসার-তির্যক আস্বাদ, অক্সিজেনের উৎসাহ-উত্তেজনা, ছায়ার নিরিবিলি শুশ্রূষা, এমনকি, বলা বাহুল্য, কাঁটার অব্যর্থ জ্বলুনিসমেত। এ-ই হচ্ছে সুব্রত-র কবিতা।  
সালোক-সংশ্লেষণের এই কুশলী কলাকারকে আমাদের অভিনন্দন।

আবার মাঝে-মধ্যে কবি বৃক্ষতলে জমিয়ে তোলেন এক উন্মাতাল মাইফেল। স্বর্গ মর্ত্য নরক থেকে যত সাধুসন্ত, ভূতপ্রেত, ফেরেশতা-শয়তান, ডাকিনী-যোগিনী, কিন্নরী-অপ্সরা আর সুশীলা-দুঃশীলারা সব হাজির হয় সেই মাইফেলে, তাদের অভিনব পোশাক, স্বর, সুর, ভাষা, ছন্দ ও অভিব্যক্তি নিয়ে। যজ্ঞ চলে দীর্ঘরাত অবধি। কোনো-কোনোদিন তুঙ্গ-তুখোড় উন্মত্ততা, আবার কোনোদিন ধীর-শান্ত শমভাবের ভেতর দিয়ে শেষ হয় মাইফেল। সুব্রত-র দীর্ঘ কবিতাগুলিকে অন্তত সেরকমই মনে হয়। 

মাইফেলের এই কালো কাপালিককেও আমাদের অভিবাদন।

দিনে সালোক-সংশ্লেষণ, রাতে মাইফেল-- খুব জমিয়েছ বাবা, সাধু সুব্রতজি!

 

মাসুদ খান,কবি