ফুটবল, ক্রিকেট, বাস্কেটবল যেমন আলাদা আলাদা খেলা, সাহিত্যে কবিতা, ছড়া, গল্প, প্রবন্ধ এসব ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যম। সাহিত্যের আরও যেসব মাধ্যম বা শাখা, যেমন নাটক, রম্যরচনা, এসবও আলাদা আলাদা,তবে অতো বিস্তারের ভেতর যেতে চাইছি না। এই টুকরো লেখায় আজ শুধু কবিতা ও ছড়ার কথাটুকুই বলতে আমার মন চাইছে। কবিতা ও ছড়া অবশ্যই আলাদা আলাদা মাধ্যম, তবে ফুটবল আর হকির মতো নিয়মকানুনে কবিতা ও ছড়ার অতি নিকট সম্পর্কের জন্য কবিরা কেউ কেউ সচেতনে যখন কবিতায় ছড়ার মিশেল দিয়ে দেন, তাতে জনমনোরঞ্জন হয় বটে, কবিতা ছায়াশরীরে মিলিয়ে যেতে থাকে। কবিতা ও ছড়ার ভিন্নতার বিচার অতি সূক্ষ্ম। এবিষয়ে সেই কোন্ যুগে 'সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত' ও 'নজরুল ইসলাম' লেখা দুটিতে জীবনানন্দ আমাদের,কবিতার পাঠক সমাজকে, বোধ করি, সতর্কই করেছেন। (দ্রষ্টব্য:সমালোচনা সমগ্র, জীবনানন্দ দাশ,আবদুল মান্নান সৈয়দ সম্পাদিত,রূপম প্রকাশনী, ঢাকা।)
জীবনানন্দের ওই সতর্কীকরণের পর ঢের ঢের বছর কেটে গিয়েছে। জীবনানন্দ-উত্তরকালে পঞ্চাশের দশকে কবিদের ভেতর কবিতা ও ছড়া পাশে পাশে হেঁটে গায়ে গায়ে লেগে গিয়েছে, এমনটি খুঁজলে পাবো না, তা নয়। আমাদের মতো কবিতা প্রয়াসী ও পাঠকদের কাছে মান্যতায় দেবতা সমান অতুলনীয় কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায় অকালে প্রয়াত হয়েছিলেন, তাঁর জীবনের শেষদিকটার কবিতায় অনুরাগীদের ভেতর যে উসখুস জেগেছিল, এবং আশ্চর্যের বিষয় এই এইসময় নবীন কবিতাপ্রয়াসীদের এবং তরুণ পাঠকদের ভেতর তাঁর প্রাপ্য মান্যতার অভাব আমাকে পীড়িত করেছে ঠিকই, কার্যকারণের হদিশও পেয়েছি। শক্তি চট্টোপাধ্যায় একা নন, সমাজ জাগরণে, জনহিতার্থে বাংলার বিবেকব্ৎ হয়ে উঠেছিলেন, সেই কবি শঙ্খ ঘোষও বোধ করি জনসমাজের সাড়া পেতেই এই পশ্চিমবাংলার সঙ্কটকালগুলিতে কবিতা ও ছড়ার ভেদরেখাটি রাখেননি। আমি বলবই কবিতা তখন টাল খেয়েছিল।
এরও পরে নব্বই দশকের প্লাবনে জনমনোরঞ্জনে কবিতা ও ছড়ার নিকট সম্পর্কের সমান্তরাল ধারা দুটি মিলেমিশে একাকার হয়ে তছনছ দশা হয়েছে, কবিতা পড়ুয়া হিসাবে থতমতভাবে তা দেখেছি্। এখানে এও বলার, আমাদের সময়ের, অর্থাৎ সত্তর দশকের কবিরা সকলেই ছন্দে সিক্ত এবং দক্ষ, তাঁদেরই এক বা একাধিকের ছায়ায় স্নাত নব্বইয়ের ওই করতালিপুষ্ট প্লাবন। সে প্লাবনে নব্বই দশকীয় নবীন কবিতাপ্রয়াসীরা সকলেই নিমজ্জিত হয়েছিলেন, এমনটি নয়। এমনটি নয়।
আমি নিজে কিশোর বয়স থেকে কবিতা রঢনার মরিয়া প্রয়াসের পাশাপাশি হরবখত ছড়া লিখি। তাই ওই অল্পবয়স থেকে দুর্ঘটনার ভীতিতে বরাবর থেকেছি, ভয়ে একশেষ হয়ে ভেবে যদি বা মদিরা আবোল তাবোলে একই পাত্রে মিলে মিশে চোলাই হয়ে যায়! ঘোর আশঙ্কা থেকে জীবনব্যাপী সমান্তরাল হাঁটিয়েছি কবিতা ও ছড়া ভাইবোন দুটিকে। সধর্মে সফল হয়েছি কিনা তা বিবেচনা পাঠকের।
এটা ঘটনাই, সমান্তরালে হাঁটতে হাঁটতে কবিতা ও ছড়ার কখনও কখনও উভয়ের স্পর্শ ঘটে যায়, ঘটে। আমি মনে করি, ছড়ায় যদি কবিতার স্পর্শ ঘটে, তাহলে ছড়া উন্নীত হয়। কিন্তু কবিতায় ছড়া ঢুকে গেলে, অর্থাৎ স্পর্শ লেগে গেলে, তা বিপদ, কবিতা তরল হয়ে যায়। আমরা ররীন্দ্র-উত্তর কালে এযাবৎ ওই পঞ্চাশ-ষাটের দশকে আর ওই নব্বইয়ে বড়সড়ভাবে দুবার কবিতার তরল দশা দেখেছি। দেখেছি। তবে কিনা, সাহিত্য এমন জিনিস, যে কেউ বলতে পারেন, কবিতা তরল হয়েছে, ভালোই তো। কবিতা সকলের কাছে পৌঁছে গিয়েছে! তা বটে। তা বটে।
কবি এক রসায়নাগার। অত্যাধুনিক রসায়নাগার। তাতে ইউরেকা এবং বিস্ফোরণ দুয়েরই সম্ভাবনা বা সুযোগ রয়েছে।
মৃদুল দাশগুপ্ত,কবি