মানুষ তার প্রাত্যহিক জীবনে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে যুক্তি ও নিয়মের একটানা শাসনে। দিনগত গ্লানি ও ম্লানিমা মোচনের জন্য, ক্ষয়পূরণের জন্য তাই কিছুক্ষণের জন্য হলেও শরণ নেয় সে নন্দনশিল্পের-- গান, কবিতা, চিত্র, চলচ্চিত্রের। কিছুক্ষণের জন্য হলেও সে যেতে চায় লজিক থেকে ম্যাজিকের দিকে। কবিতা তেমনই এক লজিক-ভাঙা ম্যাজিক, যা সৃজিত হয় কল্পনা, উপকরণ আর ক্রাফটসম্যানশিপের যৌথ সমন্বয়ে, যে-ম্যাজিক বিস্ময় জাগায় মানুষের মধ্যে, আর সেই বিস্ময় থেকে জাগে মুগ্ধতা। ম্যাজিকের মতোই কবিতারও বিচরণ ধরা-অধরার দোদুল্যমানতায়।
কবিতা নানা ধরনের, নানা ঘরানার। কোনো কবিতা বিষয়কেন্দ্রিক। নির্দিষ্ট বিষয় বা ভাববস্তু ঘিরে ঘটে কবিতার বিস্তার। একটি পরম্পরার মধ্য দিয়ে ঘটে সেই ভাববিস্তার এবং যা শেষে নিয়ে চলে এক পরিণতির দিকে। এসব কবিতা পাঠককে এক স্নিগ্ধ নাতিধীর গতিতে চালিয়ে নিয়ে পৌঁছিয়ে দেয় গন্তব্যে-- খুবই সাধারণ এক স্টেশন থেকে উঠিয়ে নিয়ে নানারূপ দৃশ্য ও হাওয়াপ্রবাহের ভেতর দিয়ে, ভাবের ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়ে নিয়ে গিয়ে পৌঁছিয়ে দেয় এক নতুন, অভাবিতপূর্ব স্টেশনে। অভাবিত, তবে সুনিশ্চিত সেই স্টেশন। এসব কবিতা দেয় গন্তব্যের নিশ্চয়তা, নির্ভরতা। পাঠশেষে পাঠকের ভেতরে জাগে এক ধরনের মুগ্ধতা, সেইসঙ্গে সে পায় অভিযানের সম্পূর্ণতা।
পক্ষান্তরে, কোনো কোনো কবিতা এমন যে, সেখানে থাকে না নির্দিষ্ট কোনো বিষয়বস্তু। নানা উৎস থেকে উৎসারিত বিচিত্র বিষয়চূর্ণের সংশ্লেষ ঘটে সেসব কবিতায়। কোলাজ কম্পোজিশনের মতো। চূর্ণ চূর্ণ সৌন্দর্য কেলাসিত হয়ে পরিণত হয় এক স্ফটিক সৌন্দর্যে। সেখানে পঙক্তিগুলিকে মনে হবে পরম্পরাহীন, অসংলগ্ন, যেন ভেঙে গেছে সেতু, ছিঁড়ে গেছে যোগসূত্র। কিংবা মনে হবে, এক পঙক্তি থেকে আরেক পঙক্তির মধ্যে অস্ত গেছে অনেকানেক পঙক্তি। পঙক্তিগুলিকে তখন মনে হয় যেন এক-একটি সংকেতভাষ্য। এসব কবিতায় মুহুর্মুহু বদল হয় প্রসঙ্গ ও অনুষঙ্গ, কবিতা বয়ে যায় প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে। প্রসঙ্গ-অনুষঙ্গের এক অবাধ প্রবাহ এসব কবিতা। এই অবাধ প্রবাহ আবার কবিতার মর্মোদ্ধারের ক্ষেত্রে পাঠকের মনেও উসকিয়ে দেয় আরেক মুক্ত ভাবনাপ্রবাহ। পাঠক কবিতার ভাবানুষঙ্গগুলি, কম্পোজিশনগুলি বুঝে নেয়, কল্পনা করে নেয়, যার যার মতো করে। এসব কবিতা নিয়ে যায় না কোনো গন্তব্যে, কিংবা কোনো পরিণতির দিকে। পাঠককে নানারূপ বাঁকাগতি দেখিয়ে, চোরাপথে ঘুরিয়ে, নানারকম ইন্দ্রিয়হর্ষ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিয়ে গিয়ে হঠাৎ ছেড়ে দেয় এক অচেনা অনিশ্চিত প্রান্তরে। এই যে ইন্দ্রিয়হর্ষ অভিজ্ঞতা আর অভিযানের এই যে অসম্পূর্ণতা, তাতে মুগ্ধ হয় অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয় পাঠক।
কবি মজনু শাহ-এর কবিতা মূলত এই দ্বিতীয় ঘরানার।
কবির অনুভূতির সবচেয়ে সৎ প্রকাশ কবিতা । অনুভূতি বিমূর্ত। অথচ তাকে প্রকাশ করতে হয় ভাষা দিয়ে, অক্ষরের মতো এক মূর্ত উপকরণ দিয়ে। এই প্রকাশ করতে গিয়ে অনিবার্যভাবে ভাষা যায় দুমড়ে মুচড়ে। কবিতার ভাষা তাই প্রহেলিকাপূর্ণ। কবিতার ভাষা তাই অবধারিতভাবে যুক্তির-পরম্পরা-ভাঙা এক মেটা-ল্যাংগুয়েজ। কবিতায় কবির অনুভূতি অনূদিত হয় অক্ষরে, চেতনা রূপান্তরিত হয় ভাষায়।
মজনু শাহের কবিতা সেই ধাঁচের, সেই ঘরানার, যেখানে অনুভূতির ঠিক রূপান্তর নয়, খোদ অনুভূতি, খোদ চেতনারশ্মি যেন সরাসরি পতিত ও প্রতিফলিত হতে চায় পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠায়। আর বলাই বাহুল্য, বিমূর্ত যখন সরাসরি মূর্ত আকারে প্রকাশ পেতে চায় তখন যা হয়... বদলে যায় ভাষার সজ্জা ও বিন্যাস, মুহুর্মুহু পাল্টে যায় অনুষঙ্গ, একটি ভাবনা জমাট বাঁধার আগেই তা গড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে অন্য ভাবনায়, ভেঙে পড়ে সংগতি ও পরম্পরা। ভাষা হয়ে পড়ে আধো-চেনা আধো-অচেনা। অবচেতন থেকে রিল খুলে গড়িয়ে নামা মনোজ্যামিতির রাশপ্রিন্ট। মজনু শাহের কবিতার ল্যাংগুয়েজ এক ধরনের মেটা-ল্যাংগুয়েজ। তাঁর “ভাষা তৈরি হয় সেই নির্জনতায়, জেব্রা যেখানে তার শাবকদের নিয়ে খেলা করে”। আর পাঠককে তিনি আহ্বান করেন এভাবে--
“এইখানে সমুদ্রের শুরু, হে পাঠক, ধীরে ধীরে
গুটিয়ে নাও তোমার পাতলুন। লাঞ্ছনার অবতার
দূরে বালুতটে বসে থেকে লক্ষ করছে তোমাকে”।
“জ্বর” কবিতায় মজনু শাহ বলছেন, “...শিল্প এক নিরাময়-অযোগ্য জ্বর। সিঁদুর-হলুদে মেশা মেঘের দিনে, সৌন্দর্যের কচ্ছপ কামড়ে দিলে এই জ্বর বাসা বাঁধে কারো কারো দেহে। তারপর, অবশিষ্ট জীবন, শিকারশূন্য অরণ্যে, ক্ষুধা প্রশ্নে নিরুত্তর বাঘের মতো নিজেরই জ্বরতপ্ত জিভ চিবিয়ে অনন্তর সেই রক্ত পান করে বেঁচে থাকেন একেকজন শিল্পী।” (“জ্বর”, জেব্রামাস্টার)
সত্যিই তো! কারণ শিল্পমাত্রই সৌন্দর্যসৃজন। আর এই সৌন্দর্যের কচ্ছপ একবার যাকে কামড়ে দিয়েছে, নিস্তার নেই আর তার। নিজেকে পুড়িয়ে, নিজের হাড় জ্বালিয়ে সৌন্দর্যসাধনার সেই নম্র কিন্তু উজ্জ্বল শিখাটিকে জ্বালিয়ে রাখতে হয় সারাটা জীবন। এ আলো দহনপ্রিয়, এ আলো প্রাচীন বটগাছের কোটরে জ্বলতে-থাকা মৃদুমন্দ মিথেনের মতো কুহকী। মজনু শাহ শিল্পপথের সেরকমই একজন একনিষ্ঠ ভ্রমিক-- জেদি, অধ্যবসায়ী, আত্মদহনে দগ্ধ। কবিতার এক নিস্তারহীন অনিঃশেষ সফরে তিনি লেগে থেকেছেন, এবং আছেন-- আগাগোড়া কোলাহলহীন, তাড়াহীন।
"বাল্মীকির কুটির" সংকলনগ্রন্থের ভূমিকায় ইন-জেনারেল কবিতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে মজনু শাহ বলেছেনে--“কবিতার কাজ এমন নয় যে তা বাজিমাত করতে এসেছে, তার একটা অন্তশ্চারী যাতায়াত আছে, তা কোথাও নীরব তীক্ষè সংবেদী কোনো প্রান্তবাসী মনের সমর্থন খুঁজে ফিরেছে মাত্র, আর এই জন্যে তার মধ্যে দিশেহারা হওয়ার কোনো ব্যগ্রতা নাই।” বস্তুত এ-কথা প্রযোজ্য তাঁর নিজের কাব্য-অভিযাত্রার ক্ষেত্রেই, যথাযথভাবে। তাঁর কবিতাশস্য যেন “তিমির-মথিত হর্ষ ও বিষাদ থেকে উত্থিত বাকফসল, নিজত্বে দুর্মর।” ভূমিকাগদ্যটির শেষদিকে খুব অল্প কথায় তিনি লিখেছেন নন্দনশিল্প বিষয়ে তাঁর ভাবনা ও অভিপ্রায়ের কথা--
“...শিকারের নিষ্ঠুরতা নিশ্চয় আছে জগতে, আমি তবু প্রথম পক্ষপাত রাখি তার (ঈগলের) ধীর উড়ে চলায়। তার রাজসিক একাকিত্বের অদ্ভুত লীলাই আমার অভিপ্রায়।”
ছোট-ছোট, দু-তিনটি করে টানা পঙক্তিমাত্র, শিরোনামহীন এরকম ২৬২টি অনুকবিতা কিংবা কবিতাংশ নিয়ে মজনু শাহের কবিতার বই "আমি এক ড্রপ আউট ঘোড়া" । বইটির সংক্ষিপ্ত ভূমিকায় কবি জানাচ্ছেন, “কবিতার সেট-থিয়োরি, করণকৌশল আর সমস্ত আখ্যানবর্ণনার বাইরে এসে, সন্ধ্যার আকাশে ভেসে বেড়ানো একখানি ছোট সিন্ধুমেঘ যতটুকু বলে, তারই আয়োজন (এই বইয়ে)।” জীবন ও জগতে, চারপাশে, তৈরি-হওয়া চিত্র ও দৃশ্যরাজি যেন মুহূর্তের ভাবনাবীজ হয়ে, সংকেত ও কূটাভাস হয়ে ভেসে বেড়ায় নিরন্তর। কবির সন্ধান এখানে, অন্তত এ-বইয়ে, সেইসব আপাত-তুচ্ছ “ইমেজারির সন্ধান”। যেমন--
“২২.
ছিপ ফেলে বসে আছ তুমি। কিছুক্ষণ পর পর পদ্মকে মৃদু ধাক্কা দিচ্ছে একটি
বৌমাছ। সবই কত পরিমাপহীন, চূড়ান্ত পার্থিব।”
এটুকুই। ছোট্ট একটু ইমেজ। পাঠককে যেন আহ্বান জানাচ্ছে টেক্সটের ফ্রি প্লে-তে অংশ নিতে। যেন বৌমাছের সেই মৃদু ধাক্কায় নিস্তব্ধ জলাশয়ে পদ্মপাতা থেকে এখনই টুপ করে ঝরে পড়বে একটি শিশিরফোঁটা, আর ওই দুষ্ট শিশুশব্দ এসে ভেঙে দেবে চরাচরের নৈশব্দ, আবহের ভাবগাম্ভীর্য।
কিংবা, নিচের এই একপঙক্তিকের কথাই যদি ধরি--
“২৬.
সেদিন সাপলুডু খেলা সমাপ্তির কিছু পরে তোমার অর্গাজম হল।”
বস্তুত সাপলুডু তো অর্গাজমেরই খেলা-- উত্থান, সঞ্চালন, পতন আর রাগরেচনেরই এক অনিঃশেষ লীলা।
শুধু এই বইয়েই নয়, মজনু শাহের সমগ্র কবিকৃতি জুড়ে কল্পচিত্রের পর কল্পচিত্র-- সংকেতময়, বিমূর্ত, এবং পরাবাস্তব। তা কখনো সচেতন, কখনো অবচেতন, কখনো সংলগ্ন, কখনো অসংলগ্ন। অসংলগ্ন হলেও ভেতরে ভেতরে যেন বয়ে চলে অন্তঃসলিলের চোরা স্রোত। এভাবে চিত্রের পর চিত্র দিয়ে কবি “সারিয়ে তোলেন স্বপনপারের পাতাহারা মেহেদিগাছ।” কারণ তখন “একটা ঝুঁটিবাঁধা কবুতর ছটফট করছে কবির ডার্ক চেম্বারে।” যদিও “এক মহাকাশ ঘুম জমে উঠেছে কোথাও”।
জেন সাধনায় এক ধরনের রীতি আছে যেখানে গুরু তার শিষ্যকে ধাঁধা লাগানো এক একটা প্রশ্ন দেন। প্রশ্নগুলিকে বলা হয় কোয়ান। শিষ্য রাতদিন কোয়ানের সমাধান ভাবেন। প্রায়শ বেরিয়ে আসে পারম্পর্যহীন অসংলগ্ন উত্তর। আবার সুফি টেক্সটেও দেখা যায় প্রশ্নের উত্তর সম্পন্ন হয় অবিরাম রূপক কাহিনিচূর্ণ বা কাহিনির ইশারা দিয়ে। "ব্রহ্মাণ্ডের গোপন আয়না" বইয়ে মজনু শাহ সেই কোয়ানের মতো করে, সুফি-জিজ্ঞাসার মতো করে পরিবেশন করেছেন একের পর এক প্রশ্ন আর রূপকাশ্রয়ী উত্তর--
“ ‘দৃশ্য বা বস্তুর এ কোন জ্যামিতি?’
ত্রিভুজ, স্টুডিও নাকি এসব স্ট্রবেরিজঙ্গলের কাহিনী, সেটা স্পষ্ট নয়। আজ পাহাড়ের গায়ে কে এত মেখেছে রঙ। কেঁপে উঠছে তোমার সকালবেলার মিথ, নির্জন খাঁচার পৃথিবী।”
“ ‘ঐ ডুবুরির কোনো শেষ ইচ্ছা আছে?’
এ-পথে হরিণ হেঁটে গেছে অজস্রবার, গৃহগণিকাও, তারা কিছু কিছু জানে। এই আমগাছ, এই এত নিদ্রায় ঝুঁকে পড়া আমগাছ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুষে নিয়েছে সমস্ত সংলাপ। আজ আমার কবিতার বাদামিবর্ণ ছোট ঘরখানি ফাঁকা, দূরের ঐ রক্তথিয়েটার ফাঁকা, ধুধু করছে মহানিসর্গের বিছানা।”
“ ‘মৃত্যুগোলাপ? কত আয়ু তার?’
আকাশে শায়িত একটি দীর্ঘ ঘুমরেখা।”
“ ‘সত্যের থেকে যা-কিছু পালিয়ে বেড়ায়, তা-ই কি নয় আত্মজীবনী?’
আপন মনে ঘাস খেয়ে চলেছে যুদ্ধ-ফেরত ঘোড়া। পাশে উড়ো নদী। আর তোমাদের সরোবরে একটা ঝিনুক প্রথমবারের মতো নিজেকে খুলে ধরছে আরেকটা ঝিনুকের সামনে। ঘুমন্ত পৃথিবীর গা থেকে মৃদু মৃদু লবঙ্গগন্ধ বেরিয়ে মিশছে এই সরোবর আর ঐ কমলা নদীর উড়ো নদীর সঙ্গে।”
বস্তুত মরমী জিজ্ঞাসা আর ততোধিক মরমী ও পরাবাস্তব জবাবের ভেতর দিয়ে নিষ্পন্ন হয়েছে এই "ব্রহ্মাণ্ডের গোপন আয়না" । কখনো কখনো প্রশ্নের পর উত্তর, সেই উত্তরের সূত্র ধরে আবার পরিপশ্ন, আবার উত্তর, এভাবেও এগিয়ে চলেছে কথোপকথনের ধারাবাহিকতায়। মোট কথা, ক্যানভাসের ওপর রেখার বহুবিশৃঙ্খলতার মধ্য থেকে যেমন সহসা ফুটে উঠতে পারে কোনো অচেনা, অচিন্ত্য আকৃতি, এই দীর্ঘ নিরবচ্ছিন্ন প্রশ্নোত্তর-কবিতাটিও যেন অনেকটা সেরকম বহু বিশৃঙ্খল ও বিভ্রান্ত রেখাচিত্রের মধ্য থেকে অদেখা অবয়বের অনুসন্ধান। বইটির উপক্রমণিকা থেকে জানা যাচ্ছে ধারাবাহিত এই কবিতা সম্পর্কে কবির মতামত-- মনের মধ্যে ঘটে চলা ‘আমি’ ও ‘অ্যান্টি-আমি’র স্বগতকথনের দিকে যাওয়ার একটা দুশ্চেষ্টা এই কবিতা।
৩৬টি চতুর্দশপদী আর একটি উপক্রমণিকা কবিতা দিয়ে মজনু শাহের "লীলাচূর্ণ" কাব্যগ্রন্থ। উপক্রমণিকাটিও চতুর্দশপদী। সবগুলিই ১৮ মাত্রার অক্ষরবৃত্তে লেখা। প্রতিটি কবিতার এক্স-অক্ষ বরাবর মাত্রাসীমার শাসন আর ওয়াই-অক্ষে পঙক্তিসংখ্যার বাঁধন। মাত্রা ও পঙক্তির এই সুনির্দিষ্ট সংখ্যা ও সীমার মধ্যেই এখানে ভাবের বিস্তার। কবিতার এই গড়ন স্বভাবতই কবিকে টেনে নিয়ে যায় শব্দসংযম ও লাগসই শব্দের ব্যবহারের দিকে; প্ররোচিত করে বাকসংযমের প্রতিও। প্রকৃতপক্ষে, অনটন-পরিস্থিতির মধ্যেই যথার্থ সম্পন্ন হয় সম্পদের সুষম ও উপযুক্ত ব্যবহার এবং তা হয়ে ওঠে এক ধরনের চ্যালেঞ্জও বটে। আবার অন্যদিকে অনটন থেকে আসে টানাপড়েনও। আর টানাপড়েন যে-কোনো কিছুকে করে তোলে অধিকতর স্থিতিস্থাপক, টান- ও ঘাতসহ। কবিতার ক্ষেত্রেও তা-ই। বইটি থেকে কিছু উদ্ধৃতি দিই:
“আমাকে নিক্ষেপ করো পৌরাণিক গল্পের অরণ্যে
একটি বিন্দুর মতো, শোনো, আর কিছু চাইব না।
কোথাও রয়েছে প্রশ্ন প্রহরীর স্খলিত নিদ্রায়,
সেইসব দেখি আর থমকে থাকি ঘাসের পাখায়
..............”
“........ ভ্রষ্ট সেই সন্ধেবেলা
গোলাপ ও আফিমের প্রজ্ঞাময় সংলাপের দিকে
হেঁটে গেছি এক স্বপ্নরিক্ত নটরাজনের মতো।”
“গ্রন্থের প্রহার আছে, শেষ স্নান আছে নীলিমায়।
আমি দুদিকেই যাবো ভেবে গ্রীষ্মরজনীর প্রান্তে
ভয়ে ভয়ে দাঁড়ালাম,...........”
মাত্র সাতদিনের আয়ু নিয়ে এসেছিল আলী, কবির জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। অদেখা, বিস্মৃতপ্রায় সেই ভাইকে, বয়স যার থমকে আছে মাত্র সাতদিনে, বিস্মরণদেশ থেকে তুলে এনেছেন কবি। “অনেক দূরের কেউ হয়ে যাওয়া” সেই ভাইয়ের স্মরণে লিখেছেন একটি দীর্ঘ কবিতা। সেটিই বই আকারে প্রকাশিত হয়েছিল "মধু ও মশলার বনে" শিরোনামে। বইটির ভূমিকায় তিনি জানাচ্ছেন--
“...আলীকে দেখিনি আমি, কোনো ফটোগ্রাফও না থাকায় তার রূপ কল্পনাতীত। এই ত্রুটিপূর্ণ লেখা, ডালা-খোলা উড়ন্ত কফিন হয়ে তাকে অনুসরণ করছে।”
ডালা-খোলা এক উড়ন্ত কফিনের মতোই যেন এই কবিতার কুয়াশা-মোড়ানো নিঃশব্দ উড়ে চলা-- বিমূর্ত, নিস্তরঙ্গ।
মজনু শাহের কবিতা নিয়ে আরো অনেক কথাই বলা যায়, তাঁর কবিতা থেকে আরো অনেক উদ্ধৃতিও দেওয়া যায়। তবে এ-পর্যায়ে আমি শুধু তার কবিতার বৈশিষ্ট্য ও গতিপ্রকৃতি নিয়ে সামগ্রিকভাবে দুটি কথা বলে এই লেখাটির সমাপ্তি টানছি।
ত্রিশিরা কাচ হচ্ছে আলোরশ্মির জন্য এক গোলকধাঁধা। সেখানে রশ্মি ঢুকে বেরুবার জন্য পায় না কোনো সরাসরি পথ। ভুলভুলাইয়ার মধ্যে কয়েক মুহূর্ত দিগ্বিদিক ঘুরপাকশেষে বেরিয়ে আসে কোনো এক পথে। কোনো কোনো রশ্মি হয়তো অস্তও যায় অবলীলায়, প্রিজমের ভেতরেই। কিন্তু যে-পথে বেরিয়ে আসে সফল রশ্মিরা, সে-পথ নয় কোনো পূর্বনির্ধারিত পথ। সে-পথ অচিন্ত্য, অনির্দেশ্য। মজনু শাহের কবিতার কল্পজগতের ভেতরে পাঠকের চেতনারশ্মিরও ঘটে তেমনই এক অনির্দেশ্য, পরাবাস্তবিক পরিভ্রমণ। আলোকরশ্মির মতো সেখানে চেতনারশ্মিও নানা বর্ণে বিশ্লিষ্ট হয়ে তৈরি করে বর্ণালি বিচ্ছুরণ। সামগ্রিকভাবে মজনু শাহের কবিতা সেরকমই এক ত্রিশিরা কাচ, পূর্বাপর।
মাসুদ খান,কবি