সময়ের সাথে সাথে বাড়ছে অনলাইন গেমিংয়ের জনপ্রিয়তা। বিশ্বজুড়ে গেমিং ইন্ডাস্টির বিকাশ এতো দ্রুতই হয়েছে যে এখন এটির ব্যাপ্তি হলিউডকেও ছাড়িয়ে গেছে। আমাদের দেশেও ব্যাপকহারে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে সহজলোভ্য হয়েছে কম্পিউটার, স্মার্টফোন, গেমিং কনসোল বিবিধ গেমিং ডিভাইস। এর ফলে বাংলাদেশও ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ‘প্লেয়ার আননোন’স ব্যাটলগ্রাউন্ড’ বা পাবজি’ এবং ফ্রি ফায়ার এর মত ব্যাটেল রয়েল ঘরানার গেমগুলো । বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতই বিনোদনের মাধ্যম ছাড়াও যা হয়ে উঠেছে কিছু মানুষের অর্থ উপার্জনের মাধ্যম । সৃষ্টি হয়েছে গেমের মাধ্যমে বৈদিশিক মুদ্রা উপার্জনের সম্ভাবনা। এরই মধ্যে বাংলদেশের একদল তরুণ “A1 esports” এর ব্যানারে আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত হওয়া PUBG Mobile Global Championship- এ বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে এসেছেন । এরপরও এ ধরনের গেমগুলো দেশের কিশোর তরুণদের উপর এর বিরূপ প্রভাব ফেলছে কি না এ ধরণের বিতর্কে অনিশ্চয়তা তৈরী হয়েছে আমাদের দেশে এই দুটি গেমের ভবিষ্যৎ নিয়ে। বাংলাদেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে গেম দুটিকে। এর ফলে ভাটা পড়েছে দেশের প্রতিযোতামূলক গেমিং অর্থাৎ ই-স্পোর্টস সেক্টরে। যার ফলে আর্থিভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে অনেক ব্যক্তি এবং প্রতিষ্ঠান।

এ বিষয়ে ঢাকা রিপোর্ট ২৪ কে বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় স্ট্রিমার কাজী অর্পা বলেন, আমাদের দেশে গেম খেলে যখনই ক্যারিয়ার গড়ার একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে, গেম ক্যারিয়ার নিয়ে যখন দেশে ভালো কিছু হতে যাচ্ছিল ঠিক তখনই গেম ব্যান করে দেয়া হয়। সদ্য ই-স্পোর্টস প্লেয়ার যারা অনেক ভালো পারফরমেন্স দিয়ে দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছিল ঠিক তখনই তাদের পেটে লাথি মারা হয়। ই-স্পোর্টস এখন পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহত্তম একটি খাত, যার বাজেট কখনো কখনো হলিউড এর সবচেয়ে ব্যায়বহুল মুভির থেকেও বেশি। বাংলাদেশে গেম ব্যান না হলে এতদিনে তারা নিজেদের অনেক বড় প্লাটফর্মে নিয়ে যেতে পারত, কিন্তু সরকারের এই হুজুগে ডিসিশন যেন কালো মেঘের ছায়া হয়ে আসে। আমি কাজী অর্পা একজন গেমার ও স্ট্রিমার, আমি জানি একজন গেমারের ক্যারিয়ার তৈরি করাটা কতটা কষ্টের, এই কষ্ট একজন ইস্পোর্টস প্লেয়ারও করে, নিজের স্কিল ও পারফর্মেন্স দিয়ে দেশকে রিপ্রেজেন্ট করা যেত এবং বৈদিশিক ডলারও ইনকাম করতে পারতো। কিন্তু সরকারের এই ভুল ডিসিশন এখন সব আশায় পানি ঢেলে দেয়।
তিনি আরও বলেন, আমরা গেম খেলতে পারছি ঠিকই। কিন্তু ইস্পোর্টস টিম নিয়ে বড় পরিসরে দেশকে রিপ্রেজেন্ট করতে পারছিনা। বাংলাদেশে ক্রিকেট, ফুটবলের মত ই-স্পোর্টসও একটি ইন্টারন্যাশনাল প্লাটফর্ম যেখানে দেশ বনাম দেশ ফাইট হয় এবং উইনাররা পায় সম্মানি। আর গেম ব্যান হওয়ার আগে আমরা অনেক ই-স্পোর্টস টুর্নামেন্টের স্পন্সর পেতাম, বড় বড় LAN ইভেন্ট হতো। তাছাড়া গেমিং ফোন কম্পানিগুলোর স্পন্সর থাকত, এখন গেম ব্যান হওয়ার ফলে কিছুটা হলেও এফেক্ট করছে এসব সস্পন্সরে।
আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই পেশাদার ও সৌখিন গেমারদের মাঝে ব্যাপকহারে জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে গেম দুটির । বিশেষ করে পাবজি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতামূলক গেমিংয়ে (ই-স্পোর্টস) ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। সাম্প্রতিক কয়েক বছরে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও অনলাইন গেমিংয়ের জনপ্রিয়তা অনুমিতভাবেই বৃদ্ধি পেয়েছে । তাই অনেকের মনেই প্রশ্ন তৈরী হয়েছে গেম দুইটি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে। এছাড়াও এ ধরণের গেমের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গবেষক-বিশেষজ্ঞ মহলেও দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলে আসছে ।
আমেরিকান সাইকোলজিকাল অ্যাসোসিয়েশনের (এপিএ) ২০০৫ সাল থেকে ২০১৩ পর্যন্ত প্রকাশিত কয়েকশ’ গবেষণা প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে মতামত দিয়েছিলো, “সহিংস ভিডিও গেমের সঙ্গে আক্রমণাত্মক আচরণ, মনোভাব, সমাজবিরোধী আচরণ এবং সহানুভূতির অভাবের যোগসূত্র পাওয়া গেছে গবেষণা থেকে”।
এ ধরণের গেমের ক্ষতিকর প্রভাবের পক্ষে যেমন কিছু গবেষণা প্রতিবেদন আছে তেমনি বিপক্ষেও রয়েছে অনেক গবেষণা প্রতিবেদন।
“ডাজ প্লেয়িং ভায়োলেন্ট ভিডিও গেইমস ক'জ এগ্রেশন? এ লংয়িটিউডিনাল স্টাডি” শিরোনামের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে গবেষকরা বলেন, “সহিংস ভিডিও গেম খেলার নেতিবাচক কোনো প্রভাব খুঁজে পাইনি আমরা। এমনকি ২০৮ টি পরীক্ষার মধ্যে কেবল তিনটি পরীক্ষার ফলাফল আমাদের প্রাথমিক অনুমানের সঙ্গে সামজ্ঞস্যপূর্ণ। যেহেতু অন্তত ১০টি পরীক্ষার ফলাফল প্রাথমিক অনুমানের সঙ্গে সামজ্ঞস্যপূর্ণ হবে বলে ধরেই নিয়েছিলাম আমরা, শেষ কথা হিসেবে আমরা এটা বলতে পারি যে সহিংস ভিডিও গেম খেলার কোনো স্থায়ী নেতিবাচক প্রভাব নেই”।
এছাড়াও বিবিসির সাথে এক সাক্ষাৎকারে মিডলসেক্স ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞানের প্রফেসর ড. মার্ক কোলসন মন্তব্য করেন, “বারবার সহিংসতার মুখোমুখি হলে একজন মানুষের উপর যে তার স্বল্প মেয়াদী প্রভাব পড়বে আমি সেটা অস্বীকার করছি না - আপনি একজন বোকা হলেই সেটা অস্বীকার করতে চাইবেন, কিন্তু অপরাধ ও আক্রমণাত্মক আচরণের দীর্ঘমেয়াদী ফলাফলের সঙ্গে সহিংস ভিডিও গেইমের সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ নেই।” “আপনি যদি তিন ঘণ্টা ধরে কল অফ ডিউটি (আরেকটি জনপ্রিয় ফার্স্ট পার্সন শুটিং গেম) খেলেন, তাহলে আপনি উত্তেজিত হবেনই। তারমানে এই নয় যে, আপনি বাইরে বের হয়ে কাউকে পেটাবেন”।
সারা বিশ্বেই গেম নিয়ে এধরণের বিতর্ক চলে আসলেও জনপ্রিয় গেমগুলো মানুষের জন্য উন্মুক্তই থেকে গেছে অধিকাংশ দেশে। বাংলাদেশের অনেকেরই ধারণা এ ধরণের গেমের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। এছাড়াও দেশের গেমিং সেক্টরের সাথে জড়িত অনেকেই মনে করেন সঠিক নীতিমালা ও দিকনির্দেশনা প্রদান করে গেমগুলো সচল রাখলে দেশেরই উপকার হবে। তৈরী হবে দেশের অগণিত মানুষের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা ।
ঢাকারিপোর্ট২৪.কম/আরআইটি/আরএএম