মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী উপজেলার বিস্তৃত শস্যভান্ডার খ্যাত দেশের বৃহৎ হাকালুকি হাওর। হাকালুকি হাওরের পাশাপাশি পুরো উপজেলাই বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এ অঞ্চলে কৃষি প্রধান অর্থকরী ফসল হিসেবে বোরো ধান কৃষকদের অন্যতম ভরসা। এই ধান রোপণ ও পরিচর্চায় কৃষকরা ব্যস্ত সময় পার করছেন। কয়েকদিন আগেও হাড় কাপানো শীতের মধ্যে জমির কাঁদা পানিতে নেমে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ধানের চারা রোপণ করছেন চাষিরা। তীব্র শীতের মাঝে কেউ জমি প্রস্তুত করছেন। আবার কেউবা বীজতলা থেকে চারা তুলছেন। আর চারা রোপনের সময় কৃষকদের মাঝে বিভিন্ন গল্প ও হাসি-ঠাট্রায় বিস্তীর্ণ মাঠ জুড়ে যেন আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মাঠে মাঠে সবুজের চোখজুড়ানো মনোরম পরিবেশ। কচি ধানের ডগায় চিকচিকে রোদের খেলা। সেই সবুজ খেতে মুখে হাসি নিয়ে কৃষক তার প্রিয় ফসল বোরো ধানে সার ছিটিয়ে দিচ্ছেন কেউবা একটু বাড়তি যত্ন করছেন।
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে মোট ৫৮০০হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড জাত-SL8H, টিয়া, রুপালী, উফশী, ব্রিধান-২৯, ব্রিধান ২৮, ব্রিধান ৮৯, বিআর১৪, বিআর ৯২ জাতের ধানসহ অন্যান্য জাতের ধানের চারা রোপণ করা হচ্ছে। সূত্র আরও জানায়, জানুয়ারি থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত বোরো ধান রোপনের সময়। ধান কাটার সময় আসতে ১৬০ থেকে ১৮০ দিন সময় লাগে।
এদিকে চারা রোপণের কাজ ঠিকমতো হলেও ধানের ন্যায্য দাম পাওয়া নিয়ে সবাই চিন্তিত ও হতাশায় রয়েছেন। বেলাগাঁও গ্রামের কৃষক সামছুল হক বলেন, রাতদিন পরিশ্রম করে ধানের আবাদ করতে হয়। ধান লাগানোর পর নিয়মিত পরিচর্যাও করতে হয়। তেল-সারের দাম বৃদ্ধিতে গতবারের চেয়ে এবছর খরচটা বেশি হচ্ছে। ন্যায্য দাম না পেলে বিশাল ক্ষতির মুখে পড়তে হবে। তাই সরকারের কাছে বোরো আবাদে ভর্তুকি দেওয়ার জন্য দাবি জানিয়েছেন তিনি।
আলাপকালে বোরো চাষি মোঃ হোসেন মিয়া বলেন, এবছর তিনি ৪ বিঘা জমিতে বোরোর আবাদ করছেন। প্রতি বিঘা জমিতে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা খরচ হয়। ভালো ফলন হলে প্রতি বিঘায় ২০ থেকে ২৫ মণ ধান হবে।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা চমক আচার্য্য বলেন, কৃষকরা পুরোদমে বোরো ধানের পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। আমারও অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে মাঠে রয়েছি কৃষকদের পাশে, পরামর্শ চাইলে দিচ্ছি।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, বোরো ধান চাষে কৃষকদের সকল ধরনের পরামর্শ ও সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ইতিমধ্যে বোরো রোপণের কাজ শেষ হয়েছে। পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে ফসলকে রক্ষা করার জন্য আলোক ফাঁদ ও পার্চিং পদ্ধতি স্থাপন করা হবে। কৃষকদের নিয়ে আমরা নিয়মিত উঠান বৈঠক ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছি। চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অধিক জমিতে ধান আবাদ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মৌলভীবাজার কার্যালয়ের উপ-পরিচালক কাজী লুৎফুল বারী বলেন, জেলার প্রতিটি উপজেলায় লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছে। জেলার বোরো চাষীদের প্রনোদনা কর্মসূচির আওতায় বীজ ও সার সহ সব ধরনের সরকারি সহায়তা করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকদের পরামর্শ ও সহযোগিতা প্রদান করার লক্ষ্যে কৃষি বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আরো বেশি বোরো ধান উৎপাদন হবে।