চুয়াডাঙ্গায় পরিবেশবান্ধব কৌশলে নিরাপদ ফসল প্রকল্পে দুর্নীতি
সালাউদ্দীন কাজল, জীবননগর প্রতিনিধি
DhakaReport24.com || 2023-11-27 15:07:45
কাগজে কলমে বাস্তবায়নের পর পরিবেশ বান্ধব কৌশলের মাধ্যমে নিরাপদ ফসল উৎপাদন প্রকল্প (১ম সংশোধনী) কার্যক্রম শেষ করা হয়েছে। প্রকল্প শেষে উঠে আসছে নানা অনিয়ম আর দূর্ণীতির খবর। লাখ লাখ টাকা ব্যয় করে প্রকল্প বাস্তবায়নের কোন কাজেই আসছেনা। নিম্নমানের উপকরণ ও সুবিধাভোগিদের বরাদ্দের টাকা নিয়েও নয়ছয় হয়েছে।
পরিবেশ বান্ধব কৌশলের মাধ্যমে নিরাপদ ফসল উৎপাদনের কথা বলা হলেও বাস্তবে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে ইউনিয়ন জুড়ে। কৃষকরা রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করছেন সবজিসহ সব ধরনের ফসলে। কৃষকরা কাঙ্খিত সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ৫ বছর মেয়াদী প্রকল্প হলেও বন্ধ রয়েছে কার্যক্রম। কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রকল্প চলমান রয়েছে। প্রকল্পে কোন সমস্যা ও অনিয়ম থাকলে আগের কর্মকর্তা বলতে পারবেন।
৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন হওয়া প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা সুবিধা নিলেও দায় নিচ্ছেন না কেউই। স্থানীয় চেয়ারম্যান জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়মের বিষয়টি আমি কৃষকদের মাধ্যমে শুনেছি। অনেক টাকার বিষয় সেহেতু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেন সাবেক দামুড়হুদা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান।
দামুড়হুদা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা উপজেলার পারকৃষ্ণপুর-মদনা ইউনিয়নে ২০২২-২৩ অর্থ বছরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর আইপিএম মডেল ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করে। আইপিএম মডেল ইউনিয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্দেশ্য ছিল পরিবেশ বান্ধব কৌশলের মাধ্যমে নিরাপদ ফসল উৎপাদন। কিন্তু মাঠে গিয়ে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। কৃষকরা আগের মতই সবজিসহ সব ফসলে রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করছেন। যার ফলে বিষযুক্ত সবজি উৎপাদন বাড়ছে। বাজারে ক্রেতারাও কিনছেন এ সব সবজি ও ফসল। প্রতি নিয়ত বাড়ছে স্বাস্থ্য ঝুঁকি।
আইপিএম মডেল ইউনিয়ন বাস্তবায়নের জন্য পারকৃষ্ণপুর-মদনা ইউনিয়ানের কৃষকদের নিয়ে ২০টি গ্রুপ গঠন করা হয়। প্রত্যোকটি গ্রুপে ২৫ জন করে কৃষক ও কৃষাণী আছেন। ২০টি গ্রুপে ৫০০ জন কৃষক কৃষাণী এই আইপিএম মডেল ইউনিয়নের সদস্য। পরিবেশ বান্ধব কৌশলের মাধ্যমে নিরাপদ ফসল উৎপাদনের লক্ষে সরকার এ প্রকল্পে ৭০ লাখ টাকা অর্থ বরাদ্দ দেয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর দেশের ২০টি ইউনিয়নে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন।
শুরুতে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রত্যেক সদস্যকে নিয়ে দলগঠন ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। কৃষক কৃষাণীদের ২ সেশনে দলগঠন ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ২ সেশনের জন্য প্রত্যেক সদস্যর বরাদ্দ ৪০০ টাকা করে। ৫০০ জনকে ২ লাখ টাকা দেওয়া হয়। ৩০ জনের রিফ্রেশমেন্ট বাবদ ২ সেশনে ৬০ হাজার টাকা, ৫০০ জন কৃষকের ৫ সেশনের ২০০ টাকা হারে প্রশিক্ষণের জন্য ৫ লাখ টাকা, ফ্যাসিলিটেটরের ২০টি গ্রুপে ৫ সেশনের ২ জনের ৬০০ টাকা হারে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ২০টি গ্রুপে প্রশিক্ষণ সামগ্রী ক্রয় ৫০ হাজার টাকা, এসএপিপিও/এসএএও ২০টি গ্রুপে ৫ সেশনের ১ জনের ৪০০ টাকা হারে ৪০ হাজার টাকা, অতিথি বক্তা ভাতা ২০টি গ্রুপের ৫ সেশনের ২ জনের ১ হাজার টাকা হারে ৪০ হাজার টাকা এবং অন্যান্য ব্যায় দেখানো হয়েছে ৬০ হাজার টাকা। খাত গুলোতে মোট ব্যায় দেখানো হয়েছে ১১ লাখ টাকা।
দামুড়হুদার নাস্তিপুর গ্রামের বাসিন্দা আজিবর রহমান বলেন, আইপিএমের নামে যে প্রকল্প দিয়েছে তা আমাদের কোন উন্নয়ন হয়নি। বরং সরকারের কোটি কোটি টাকা দুর্ণীতি হয়েছে।
দামুড়হুদা সুলতানপুর গ্রামের কৃষক আইপিএম সদস্য রেজাবুল বলেন, একদিন ২শ' টাকা একদিন ১২শ' টাকা পেয়েছি। আর এক বস্তা জৈব সার দিয়েছে সেটা একেবারে মাটি। এক বস্তার ওজন আশি কেজি। বীজ, মগ, তাবিজ, হাবিজাবি পেয়েছি। ভ্যান পেয়েছি ওতো ডুপ্লিকেট। দামুড়হুদা পারকৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক ও গ্রুপ লিডার আশরাফ আলী বলেন, ভাঙা ক্যারেট দিয়েছে। যে বীজ দিয়েছিল তা ভাল না।
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা পারকৃষ্ণপুর-মদনা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এসএম জাকারিয়া আলম বলেন, বড় পরিমাণের টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সে পরিমাণ কাজ দেখতে চায়। ক্রুটি বিচ্যুাতির কথা শুনছি। যারা সংশ্লিষ্ট আছেন তারা খতিয়ে দেখবেন। আমার ইউনিয়নকে আইপিএম মডেল ইউনিয়ন করা হয়েছে। প্রকল্প সমাপনি দিনে বরাদ্দ ও কি কি কাজ করা হয়েছে তা জানতে চেয়েছিলাম। কৃষি কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান আমাকে জানায়নি। অল্প কিছু কাজ হয়েছে বলে কৃষকরা জানান। অল্প সম্মানী ও উপকরণ দেওয়া হয়েছে। দামুড়হুদা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (বর্তমান) শারমিন আক্তার বলেন, কি কি বাস্তবায়ন হয়েছে আমাকে জিজ্ঞাসা করলে হবে না। আগের অফিসার প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। ওই অফিসারের কাছে প্রকল্প সম্পর্কে জানতে হবে।
চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও সাবেক দামুড়হুদা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামানের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নাম্বারে কথা বললে তিনি বলেন, আমি এখন খাচ্ছি, খাওয়া শেষে কথা বলবো। এক ঘন্টা পর ফোন করলে তিনি বলেন মাঠ দিবসে আছি। পরে কথা বলবো।
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক ভিভাস চন্দ্র সাহা বলেন, দূর্ণীতির কথা আমরা বলছিনা। তৃতীয় পক্ষ বলছে। আর যে কাজ করছে সে বক্তব্য দেবে। পরিবেশবান্ধব কৌশলের মাধ্যমে নিরাপদ ফসল উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক মো. সালাহ্ উদ্দীন সরদার বলেন, প্রকল্পে অনিয়ম হওয়ার কথা না। অনিয়মের বিষয়ে অভিযোগ পেলে তদন্ত করা হবে।
ঢাকারিপোর্ট২৪.কম/এসপি/আরএএম