চট্টগ্রামে এক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে একটি বাণিজ্যিক ভবনের ফ্লোর একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভূয়া কাগজপত্র দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করতে গেলে তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ লেলিয়ে দিয়ে হয়রানি করছেন ঐ ব্যবসায়ী। অভিযুক্ত ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আমান উল্লাহ জাহাঙ্গীর। কাদেরিয়া প্রপার্টিজ ডেভলপমেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক যা কেপিডিএল নামে পরিচিত। ঘটনাস্থল কেপিডিএল শাহ আমানত টাওয়ার, কাটাপাহাড়, টেরিবাজার।
জানা গেছে, মোহাম্মদ আমান উল্লাহ জাহাঙ্গীর ও গোলাম নবী নামে দুই ব্যবসায়ী যৌথভাবে সাড়ে ছয় গন্ডা জমি ক্রয় করেন।পরবর্তীতে উক্ত জমিতে শাহ আমানত টাওয়ার নামে বহুতল ভবন নির্মাণ শুরু করেন। জানা গেছে, টাওয়ারের দ্বিতীয় তলা টেরিবাজারের ব্যবসায়ী আবদুল গণি সওদাগরের কাছে করোনার শুরুর দিকে প্রতি বর্গফুট ৭ হাজার ৫০০ টাকা দরে পাঁচ হাজার বর্গফুট ফ্লোর বিক্রি করা হয়। এজন্য ৫০ লক্ষ টাকা অগ্রীম নেয়া হয়। যা স্ট্যাম্প ও নোটারি করা হয়। পরে ঐ ফ্লোর আবদুল গণিকে বুঝিয়ে না দিয়ে প্রায় দেড় বছর পর পার্টনার গোলাম নবীর অগোচরে হাজি প্লাজা সমিতির কাছে ১১ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করে দেয় মোহাম্মদ আমান উল্লাহ জাহাঙ্গীর।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী আবদুল গণি বলেন, করোনার শুরুর সময় মোহাম্মদ আমান উল্লাহ জাহাঙ্গীর ও গোলাম নবী টাওয়ারের দ্বিতীয় তলার প্রতি বর্গফুট ৭ হাজার ৫০০ টাকা দরে পাঁচ হাজার বর্গফুট ফ্লোর আমার কাছে বিক্রি করে। এর দেড় বছর পর করোনা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে মোহাম্মদ আমান উল্লাহ জাহাঙ্গীর তার অংশীদার গোলাম নবীকে না জানিয়ে এককভাবে হাজি প্লাজা সমিতির কাছে ঐ ফ্লোর বিক্রি করে দেন। প্রতি বর্গফুট ১১ হাজার ৫০০ টাকা দরে। এজন্য হাজি প্লাজা সমিতির কাছ থেকে এক কোটি ৫ লক্ষ টাকা অগ্রীম নেয়া হয়। সমিতির পক্ষে বিশিষ্ট ব্যবসায়ীদের উপস্থিতিতে ক্রয় চুক্তি করেন, সমিতির ক্রয় কমিটির সদস্য মফিজুল ইসলাম রয়েল। এ বিষয়ে টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতিসহ বিভিন্ন জায়গায় কয়েক দফা বৈঠক হলেও কোন সুরাহা হয়নি।
হাজি প্লাজা সমিতির প্রতিনিধি মফিজুল ইসলাম রয়েল বলেন, আমাদেরকে আমান উল্লাহ জাহাঙ্গীর বর্তমানে ফ্লোরও বুঝিয়ে দিচ্ছেন না, টাকাও ফেরত দিচ্ছেন না। আগে আরেকজনের কাছে বিক্রি হয়েছে জানলে সমিতি উক্ত ফ্লোর কিনতো না।
সরেজমিনে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, দুই ভাগে বর্তমানে পেছনের অংশে ৭ তলা ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে। খোঁজ নিয়ে আরও জানা গেছে, আমান উল্লাহ জাহাঙ্গীর ও গোলাম নবী সাদা কাগজে চুক্তি করে চতুর্থ তলা জাহাঙ্গীরের স্ত্রী ও ৩য় তলা গোলাম নবী নিজের স্ত্রীর নামে করে নেয়। আমান উল্লাহ জাহাঙ্গীর চতুর্থ তলা আবুল মনছুর নামে এক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করে দেন। এই মনছুর আবার জামাতের অর্থ যোগানদাতা হিসাবেও পরিচিত। ইতোপূর্বে আল বয়ান হোটেলে জামাতের গোপন বৈঠক থেকে আইনশৃংখলা বাহিনী তাকে গ্রেফতার করেন।
৪৫ লক্ষ টাকা অগ্রীম নিয়ে গোলাম নবী ৩য় তলা বিক্রি করেন টেরিবাজারের ৩ ব্যবসায়ী মোহাম্মদ দিদার, মোহাম্মদ নিজাম ও মোহাম্মদ ফরহাদের কাছে। এখানেও আমান উল্লাহ জাহাঙ্গীর তার পার্টনার গোলাম নবীর সাথে প্রতারণা করেন।গোলাম নবীর অজান্তে তিনি মহাজোট গ্রুপের কাছে ১ কোটি টাকা অগ্রীম নিয়ে তা বিক্রি করে দেন। এ কাজে মধ্যস্থতা করেন নুরুল আবছার নামে টেরিবাজারের এক ব্যবসায়ী, যার কাজ অন্যায়কারীর পক্ষ নিয়ে ধান্দা করা। জানা গেছে বারবার এই বেচাকেনার সাথে নুরুল আবছার জড়িত।
ব্যবসায়ী গোলাম নবী বলেন, এ প্রজেক্টে আমান উল্লাহ জাহাঙ্গীর আমার রেজিষ্টার্ড পার্টনার। ২০১৭ সালের ৮ জুন রেজিষ্টার্ড চুক্তিপত্র মূলে এবং একই তারিখে অপ্রত্যাহার যোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নী মূলে আমমোক্তার নিযুক্ত হয়ে বহুতল ভবন নির্মাণে চুক্তিবদ্ধ হই। সে আমার সাথে প্রতারণা করেছে। আমার দারোয়ান খলিলকে জাহাঙ্গীর টেরিবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এস আই মৃণাল কান্তি মজুমদারের উপস্থিতিতেই মারধর করে। প্রবীণ ব্যবসায়ী ও সমিতির উপদেষ্টা মোঃ শওকত ওসমান চৌধুরীকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে। জাহাঙ্গীর জামাতের লোক।ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে এসব অপকর্ম করে চলেছে। আমি ওমরায় থাকাকালীন এসআই মৃণাল কান্তি মজুমদার তিনজনের বিরুদ্ধে আর্থিক প্রভাবে প্রলুব্ধ হয়ে আদালতে একতরফা প্রতিবেদন দাখিল করেন।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই অংশীদারের মাঝে বিরোধ ও দূরত্ব তৈরী হয়। চলতি বছরের ৪ জানুয়ারী উক্ত নির্মাণাধীন বাণিজ্যিক ভবনে গোলাম নবীর দারোয়ান খলিলকে মারধর করে আমানউল্লাহ জাহাঙ্গীর। এ ঘটনায় দু'দিন পর ৬ জানুয়ারী সালিশী বৈঠক হয়। বৈঠকে দু'পক্ষের মাঝে বাক বিতন্ডা হয়। ঝগড়া ও কথা কাটাকাটির সময় আমান উল্লাহ জাহাঙ্গীর সবাইকে দেখে নেয়ার হুমকি দেয়। এ সময় টেরিবাজার পুলিশ ফাঁড়ির এস আই মৃণাল কান্তি মজুমদারও উপস্থিত ছিলেন। তার উপস্থিতিতেই এমন ঘটনা ঘটেছে বলে বিবাদীরা জানিয়েছেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে উল্টো আমান উল্লাহ জাহাঙ্গীর বিবাদী ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শওকত ওসমান, মোঃ শাহানুর ইসলাম ও গোলাম নবীর বিরুদ্ধে কোতোয়ালী থানায় সাধারন ডায়েরি করেন।বিবাদী ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কোতয়ালী থানাধীন টেরিবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মৃণাল কান্তি মজুমদার বিবাদীর কোন বক্তব্য না নিয়ে একতরফাভাবে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন।
এ ঘটনার প্রতিকার চেয়ে বিবাদী ব্যবসায়ী শওকত ওসমান, গোলাম নবী, মোঃআমিরুল ইসলাম শাহানুর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার বরাবরে আবেদন করেছেন। বিষয়টি টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতির কাছে অভিযোগ করা হয়েছে। সমিতি দু'পক্ষকে চিঠি দিয়ে সালিশি বৈঠক ডাকা হলেও সেখানে আমান আমান উল্লাহ জাহাঙ্গীর উপস্থিত হননি। টেরিবাজার পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মৃণাল কান্তি মজুমদার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি এভাবে একতরফা প্রতিবেদন দিতে পারব নাকি? বিবাদীর সাথে কথা বলেই আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছি।তিনি বিবাদীদের আদালতের আশ্রয় নেয়ার পরামর্শ দেন।
কেপিডিএল'র ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমান উল্লাহ জাহাঙ্গীর বলেন,আমার সাথে ব্যবসায়িক লেনদেন ও পার্টনারশিপ রয়েছে গোলাম নবীর সাথে। অন্যদের সাথে আমার কোন ব্যবসায়িক লেনদেন কিংবা পরিচিত নেই।তারা বহিরাগত হিসাবে আমার প্রজেক্টে এসে হুমকি ধমকি ভয়ভীতি দেখালে আমি থানায় জিডি করি। জিডির ভিত্তিতেই পুলিশ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন। আদালত যেই সিদ্ধান্ত দেয় তা মাথা পেতে নেব। তিনি আরও বলেন,আমি এ প্রজেক্টে ৭ কোটি ১৪ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছি। কেউ কিছু টাকা অংশিদার হয়ে মালিকানা দাবি করতে পারেনা।ডেভলপমেন্ট পার্টনার হতে হলে কিছু টার্মস এন্ড কন্ডিশন থাকে।তবে গোলাম নবীকে আমি পার্টনার নির্বাচন করে ভূল করেছি।
টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আমিনুল বলেন, ব্যবসায়ী আবদুল গণির অভিযোগের ভিত্তিতে দু'পক্ষ গোলাম নবী ও আমান উল্লাহ জাহাঙ্গীরকে চিঠি দিয়ে ডাকা হয়।কিন্তু গোলাম নবী সমিতির বৈঠকে হাজির হলেও জাহাঙ্গীর না থাকায় কোন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়নি।
জানা গেছে, স্থানীয় প্রশাসনের দূর্নীতি পরায়ন একটি চিহ্নিত অংশকে বশে রেখে তাদের এসব অপকর্ম চালানো হচ্ছে বলে ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন।এ ছাড়া প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় বখাটে, মাদকসেবী, সুবিধাভোগী ও স্বাধীনতা বিরোধী চক্র ও পুলিশের যোগসাজশে ঐতিহ্যবাহী বৃহৎ এই পাইকারী বাজারের ব্যবসায়ীদের সুনাম ক্ষুন্ন করছে।টেরিবাজার ব্যবসায়ী সমিতি গঠনের পর এখানে এ ধরনের জঘন্য ঘটনা ঘটেনি। সমিতির সাধারন সম্পাদক আহমদ হোসেন বলেন,যেহেতু পুরো ঘটনাটি টেরিবাজার এলাকায় সংঘটিত এবং এতে টেরিবাজারের ব্যবসায়ীরাই জড়িত। সুষ্ঠু নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা প্রয়োজন সমিতি তাই করবে। সৎ ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার্থে অতীতের ন্যায় সমিতি এখানেও তাই করবে।
ঢাকারিপোর্ট২৪.কম/এমজার/আরএএম