মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলা শহরে যেতে পুরো একদিনের সময় নিয়ে বের হতে হয় উপজেলা থেকে বিচ্ছিন্ন তিনটি ইউনিয়নের জনসাধারণকে।
অথচ উপজেলা সদর থেকে তিনটি ইউনিয়নের দূরত্ব সর্বোচ্চ দশ কিলোমিটার। কোন কোন এলাকা থেকে মাত্র ৫/৬ কিলোমিটারের পথ। অথচ বহমান আড়িয়াল খাঁ নদ এই দূরত্বকে বাড়িয়ে তুলেছে বহুগুণ। শুধুমাত্র একটি সেতুর অভাবে যুগ যুগ ধরে শিবচর উপজেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে শিরুয়াইল, নিলখী ও দত্তপাড়া ইউনিয়ন। বর্তমানে এই নদের উপর নির্মান হচ্ছে সেতু। সেতুটির নির্মান কাজ শেষ হলে দূর্ভোগ দূর হবে তিন ইউনিয়নের অসংখ্য মানুষের। তাই সেতুটি নিয়ে নদীপাড়ের মানুষরের উৎসাহ ব্যাপক!
জানা গেছে, যুগ যুগ ধরে নৌকা-ট্রলারে করে নদী পার হয়ে যোগাযোগ রক্ষা করতে হচ্ছে উপজেলা সদরের সাথে। ঘন্টার পর ঘন্টা নদের পাড়ে অপেক্ষা করা, সন্ধ্যার পর নদী পার হতে বিড়ম্বনা; শিবচর সদরের সাথে যোগাযোগকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে উপজেলার তিনটি ইউনিয়নসহ আশেপাশের এলাকার অসংখ্য মানুষকে। সম্প্রতি আড়িয়াল খাঁ নদের উপর নির্মানাধীন ‘লিটন চৌধুরী’ সেতুটি নির্মান শেষ হলে যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আমূল পাল্টে দেবে বলে জানান এলাকাবাসী এবং একই সাথে দীর্ঘ দিনের ভোগান্তি দূর হবে সাধারণ মানুষের।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শিবচর উপজেলার কোল ঘেঁষে বয়ে যাওয়া আড়িয়াল খাঁ নদ উপজেলার দত্তপাড়া, শিরুয়াইল ও নিলখী ইউনিয়নকে উপজেলা সদর থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। যদিও ঢাকা-খুলনা মহাসড়ক দিয়ে সড়ক পথে উপজেলা সদরে পৌছানো যায়। তবে তাতে সময় এবং দূরত্ব বেড়ে যায় অনেক। আড়িয়াল খাঁ নদ পার হয়ে গেলে মাত্র ১৫ মিনিটেই উপজেলা শহরে পৌছানো যায়। নদী পার হয়ে উপজেলা সদর মাত্র ৫ কিলোমিটার। আর মহাসড়ক ঘুরে গেলে কমপক্ষে ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার পথ! নদীতে সেতু না থাকায় নদী পার হতেই বিড়ম্বনার শিকার হতে হয় সাধারণ মানুষকে। তবে মানুষের এই ভোগান্তি দূর হবে অচিরেই। আড়িয়াল খাঁ নদের উৎরাইল-শিবচর অংশে নির্মিত হচ্ছে ৫শত ৫০ মিটার দৈর্ঘ্যরে একটি সেতু এবং সংযোগ সড়ক। বর্তমানে সেতুটির নির্মান কাজ চলমান রয়েছে।
শিবচর উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, চুক্তি অনুযায়ী ২০১৯ সালের ডিসেম্বরের ১২ তারিখে সেতুটির নির্মান কাজ শুরু হয়েছে এবং শেষ হবে ২০২২ সালের অক্টোবরের ২২ তারিখে। বর্তমানে সেতুটির নির্মান কাজ এগিয়েছে ৭৫ ভাগ। সেতু নির্মানে প্রাক্কলিত মূল্য ধরা হয়েছে ৯০ কোটি ২৭ লক্ষ ৭৭ হাজার ৯২৪ টাকা এবং চুক্তিমূল্য ৯৭ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা। দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে সেতুটির নির্মান কাজ করছে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ‘২০১৮ সালের অক্টোবর মাসের শেষের দিকে সেতুটির ভিত্তি প্রস্তর উন্মোচণ করেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নূর ই আলম চৌধুরী এমপি। সেতুটির নামকরণ করা হয় ‘লিটন চৌধুরী সেতু’। ৫৫০ মিটার দৈর্ঘ্য এবং ৯.৮০ মিটার প্রস্থের সেতুটিতে স্প্যান সংখ্যা ১১টি এবং পিয়ার ৯টি। সেতুটির পাইলের সংখ্যা ১২৩ টি, পাইলের দৈর্ঘ্য ৪৮ মিটার। সেতুর জন্য এ্যাপ্রোচ সড়কের দৈর্ঘ্য ১.৫০ কিলোমিটার।’
স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ‘লিটন চৌধুরী’ নামের সেতুটির নির্মান কাজ শেষ হলে শিবচর উপজেলা সদরের সাথে শিরুয়াইল ইউনিয়নের উৎরাইল, সাদেকাবাদ, সিপাইকান্দি, শিরুয়াইলসহ অন্যান্য গ্রাম, নিলখী ইউনিয়ন এবং দত্তপাড়া ইউনিয়নের গুয়াগাছিয়া, মগড়া, শৈল্যা, তাজপুর, বাজেহারচরসহ অন্যান্য এলাকা এবং ফরিদপুরের ভাঙ্গা উপজেলার আজিমনগর ইউনিয়নের পাতরাইল-দিঘিরপাড় এলাকার অসংখ্য মানুষের জন্য শিবচর যাতায়াত সহজতর হয়ে উঠবে। এসকল এলাকার লক্ষাধিক মানুষের উপজেলা সদরে যাওয়ার দীর্ঘদিনের ভোগান্তির অবসান হবে। যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে এই সকল এলাকার উন্নয়নও তরান্বিত হবে বলে স্থানীয়দের প্রত্যাশা।’
উৎরাইল মহিলা দাখিল মাদ্রাসার একাধিক শিক্ষক জানান,‘আগে নদীর অপর পারের এলাকা থেকে আমাদের মাদ্রাসায় অসংখ্য মেয়েরা পড়তে আসতো। কিন্তু নদী পার হওয়ার ভোগান্তি, বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টি ও স্রোতের কারণে ঝুঁকি বিবেচনা করে ইদানিং কমে গেছে ছাত্রীর সংখ্যা। সেতুটি নির্মান হলে নদীপাড়ের গ্রামের শিক্ষার্থীরা সহজেই এখানে এসে লেখাপড়া করতে পারবে।’
দত্তপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মুরাদ মিয়া জানান,'সেতুটি চালু হলে যোগাযোগের আমূল পরিবর্তন হবে। শিবচরের সাথে যাতায়াত সহজ হয়ে যাবে। এ এলাকার নানা ধরনের উন্নয়ণ তরান্বিত হবে।'
উপজেলা সহকারী প্রকৌশলী কে এম রেজাউল করিম বলেন, আড়িয়াল খাঁ নদের লিটন চৌধুরী সেতুর নির্মানকাজ চলমান রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত সময়েই কাজ শেষ করার কথা রয়েছে। সেতুটির নির্মান কাজ এগিয়েছে ৭৫ ভাগ।'
ঢাকারিপোর্ট২৪.কম/এসএম/আরএএম