২৫ বৈশাখ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬১তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সহযোগীতায় ও স্থানীয় প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় যথাযোগ্য মর্যাদায় কুষ্টিয়ার শিলাইদহের কুঠিবাড়ীতে তিনদিনব্যাপী জাতীয় অনুষ্ঠানমালার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়েছে। রবিবার বেলা সাড়ে ৩টায় জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে এই অনুষ্ঠানমালার উদ্বোধন করেন জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী এমপি। এ উপলক্ষ্যে কুঠিবাড়ীর মূলমঞ্চে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন তিনি। সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ এমপির সভাপতিত্বে এসময় বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন, স্থানীয় সাংসদ সেলিম আলতাফ জর্জ এমপি। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সচিব মোঃ আবুল মনসুর। আলোচনা সভায় স্মারক বক্তব্য রাখেন রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের প্রফেসর সনৎ কুমার সাহা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী এমপি বলেন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে এতো সমৃদ্ধ করেছেন যার কোন তুলনা নেই। কুষ্টিয়ার শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে তিনি দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেন। সেখানে তিনি অসংখ্য সাহিত্য রচনা করেন। কাজেই এর ঐতিহ্য ও গৌরব অনেক। আমরা কবিগুরুকে নিয়ে গর্ব অনুভব করি স্মৃতি বিজরিত কুঠিবাড়ি বাংলাদেশের কুষ্টিয়া জেলাই অবস্থিত। শিলাইদহের রবীন্দ্র কুঠিবাড়িতে বাংলাদেশ এবং বিশ্বের মানুষ যাতে আসতে পারেন, ঘুরে-ঘুরে দেখতে পারেন এবং তাকে জানতে পারেন। এছাড়া কবিগুরুকে নিয়ে গবেষণা করতে পারেন সেজন্য সুযোগ তৈরি করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কুঠিবাড়ির গুরুত্ব অনুধাবন করে কাজ করছেন। যাতে এখানে অধীর আগ্রহ নিয়ে যারা আসবেন তারা যেনো তাদের প্রত্যাশার খুধা মেটাতে পারেন সে বিষয়গুলি নিয়ে তারা কাজ করছেন বলে আমি বিশ^াস করি। এর আগে তিনি রবীন্দ্রনাথের স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহাসিক বকুল তলার পুকুর পাড়ে একটি বকুল গাছের চারা রোপন করেন।
তিনি আরও বলেন, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাদেশের প্রকৃতিতে মুগ্ধ হয়েছিলেন। শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে কবিগুরু রচনা করেছেন কালজয়ী কাব্যগ্রন্থ সোনার তরী ও নোবেলজয়ী গীতাঞ্জলিসহ বহু কালজয়ী গল্প-কবিতা-উপন্যাসসহ নানা ধরনের সাহিত্য। রবিঠাকুর বাঙালির মানসপটে সদাই বিরাজমান। বাঙালির জীবনের যত ভাবনা, বৈচিত্র্য আছে, তার পুরোটাই লেখনী, সুর আর কাব্যে তুলে ধরেছেন কবিগুরু। তার সাহিত্যকর্ম, সঙ্গীত, জীবনদর্শন, মানবতা, ভাবনা সবকিছুই সত্যিকারের বাঙালি হতে অনুপ্রেরণা দেয়।
এসময় মঞ্চে উপস্থিত সাংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রনায়লয়ের সচিব মো: আবুল মনসুর বলেন, দীর্ঘ দুই বছর করোনা সংকটে নিষ্প্রান কুঠিবাড়িতে আমরা মহান এই কবির জন্মদিন উদ্যাপন করতে পারিনি। তবে এবার আমরা সর্বোচ্চ আয়োজনের মধ্যে দিয়ে ১৬১তম দিবসটি উদ্যাপন করছি।
রবীন্দ্র গবেষক রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সনৎ কুমার সাহা তার স্মারক বক্তব্যে বলেন, “রবীন্দ্রনাথ মাত্র ১৫বছর বয়সে এই কুঠিবাড়িতে এসেছিলেন ১৮৭৫ খৃষ্টব্দে। তার পরিবারের পক্ষ থেকে তাকে এই শিলাইদহে পাঠানো হয়েছিল মূলত: পৈতৃক জমিদারী দেখাশুনার জন্য। তবে তখনও বর্তমানের আদলে কুঠিবাড়ি প্রতিষ্ঠা পায়নি। প্রারম্ভিক কালে সেটি ছিল পুরানো একটি নীল কুঠি যা ইতোমধ্যে পদ্মা নদীর গর্ভে বিলীন। এসময় তিনি অবস্থান করেন জমিদারি দেখাশুনার অত্রাঞ্চলের কাচারীতে। কিন্তু জমিদারিত্ব এবং প্রজাসত্ত্বের মাঝে বিবদমান ব্যবধান তাকে ব্যাথিত করেছিল। সেকারণেও তিনি আরও বেশী মনোযোগী হয়ে উঠেন তার সাহিত্য প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটাতে। ১৫বছর বয়সে এই শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে বসে রচিত রবীন্দ্রনাথের প্রথম কাব্য ıবনফুল’ প্রকশিত হয়। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের এমন কোন শাখা প্রশাখা নেই যেখানে তার লেখনী বিচরণ নেই। আর এর সবই সম্পন্ন হয়েছে তার স্মৃতি বিজড়িত শিলাইদহের কুঠিবাড়িতে। তার সাহিত্য কর্মের সিংহভাগ সময় প্রায় তিন যুগ ধরে অবস্থানকালীন সময়ে শেষে ১৯১১ খৃষ্টাব্দে কোলকাতার বলপুরে বিশ^বিখ্যাত শান্তি নিকেতন এবং বিশ^ ভারতী বিশ^বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। তৎকালীন বিশ^ রাজনৈতিক অস্থিতিশীল পরিমন্ডলে বিপর্যন্ত মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে রচনা করেন তার অনবদ্য ıগীতাঞ্জলী’ কাব্য গ্রন্থ যা বিশে^র কয়েকটি ভাষায় অনুদিত হয়ে গোটা বিশে^র মানুষের মাঝে সাড়া জাগিয়েছিল। তার ফলস্বরূপ এই গীতাঞ্জলী কাব্যগ্রন্থে তিনি ১৯১৩সালে নোবেল প্রাপ্ত হন। অত:পর বাঙালীর হৃদয়ে শোকের বারি ঝড়িয়ে ১৯৪১ খৃষ্টাব্দের ৭আগষ্ট কোলকাতা জোড়াসাঁকো নিজ গৃহে শেষ প্রয়াণে সমর্পিত করেন। মৃত্যুকালে তিনি পিছন ফেলে যান তার বর্ণাঢ্য স্মৃতি বিজড়িত ৮০টি বছর। কবি তার জীবদ্দশার সিংহ ভাগ স্বর্ণালী সময়ে কেবলমাত্র একজন সাহিত্য রচয়িতাই নয়; বরং অসহায় বঞ্চিত প্রজাসাধারনের মাঝে বঞ্চনা মুক্তির দূত হয়ে আবির্ভুত হয়েছিলেন একজন সমাজ সংস্কারক হিসেবেও। সেকারণে বিশ^ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং শিলাইদহ কুঠিবাড়ি এক ও অভিন্ন সত্ত্বার আধার হয়ে চির ভাস্বর হয়ে আছেন। ১৯১৩সালে সাহিত্যে নোভেল বিজয়ী বিশ^ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চরণধন্য শিলাইদহের কুঠিবাড়ি এবং রবীন্দ্রনাথ এক এবং অভিন্ন সত্তা।’
আলোচনা শেষে মূল মঞ্চে রবীন্দ্র সংঙ্গীত, কবিতা আবৃতি, দলীয় নৃত্য ও রবীন্দ্রনাথের লেখা নাটক পরিবেশন করছেন কুষ্টিয়া জেলা ছাড়াও জাতীয় পর্যায়ের রবীন্দ্র শিল্পীরা।
এদিকে, রবিবার দুপুরের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের মধ্যদিয়ে শুরু হওয়া তিনদিনের এই আয়োজন চলবে আগামী ১০ মে ২০২২ ইং এবং বাংলা ২৭ বৈশাখ, ১৪২৯ তারিখ মঙ্গলবার পর্যন্ত। তিনদিনের এই জন্ম উৎসবকে ঘিরে রবীন্দ্রপ্রেমী ও দর্শনার্থীদের ভিরে মুখরিত এখন কুঠিবাড়ী প্রাঙ্গন। করোনার কারনে গত দুই বছর এই অনুষ্ঠান না হওয়ায় এবারের আয়োজনকে ঘিরে তাদের মধ্যে ব্যপক উৎসাহ উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। র অন্যদিকে সাজ সাজ উৎসবকে প্রানবন্ত মাত্রা যুক্ত করেছে গ্রামীন মেলার বিকিকিনি।
উল্লেখ্য, জমিদারী দেখাশোনার জন্য ১৮৯১ সালে প্রথম এই কুঠিবাড়ীতে আসেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। নিরিবিলি পরিবেশ, জমিদারী আর ব্যবসার কারনে বার বার কুষ্টিয়ার এই কুঠিবাড়িতে ফিরে আসতেন তিনি। নিভূত বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চল কুষ্টিয়ার শিলাইদহে কবীর জীবনের বেশকিছু মূল্যবান সময় কেটেছে। এখানে বসে রচিত গীতাঞ্জলী কাব্যই রবীন্দ্রনাথকে এনে দিয়েছে নোবেল পুরষ্কার আর বিশ্বকবির মর্যাদা। এছাড়াও তিনি এখানে বসেই আমাদের জাতীয় সঙ্গীতসহ অসংখ্য কালজয়ী সাহিত্য রচনা করেছেন। কুঠিবাড়িতে সংরক্ষন আছে সে সব দিনের নানা স্মৃতি।
ঢাকারিপোর্ট২৪.কম/এনআই/আরএএম