১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল, স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন করা হয় ঐতিহাসিক মুজিবনগর খ্যাত বৈদ্যনাথতলা আম্রকানে। স্বাধীনতার ৫২ বছরে মুজিবনগর বাসীর চাওয়া পাওয়া ছিল অনেক। কিন্তু সেই কাজের বাস্তবায়নের মুখ দেখে নি। আজও মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সের পূর্ণাঙ্গ কাজ শেষ হয়নি।
হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদ প্রথম মুজিবনগরকে গুরত্ব দিয়ে স্বাধীনতার স্মৃতিকে ধরে রাখতে ২৩ স্তম্ভ বিশিষ্ট স্মৃতি সৌধ গড়ে তোলেন। এরপর ৯৬ সালে প্রথমবারের মত আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় গিয়ে ৮০ একর জমি অধিগ্রহণ করে মুজিবনগর মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক স্মৃতি কেন্দ্রের কাজ শুরু করে। মেহেরপুর তথা মুজিবনগর বাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক এই স্থানটি একটি আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে, একটি স্থলবন্দর ও মুজিবনগর স্বরস্বতী খালের পূণ:খননসহ স্মৃতিবিজাড়িত এই স্থানটিতে বাংলাদেশের একটি মিনি সংসদ ভবন নির্মান এবং একটি সংসদ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। দীর্ঘদিন পর হলেও মুজিবনগরের উন্নয়নের জন্য ২০১৮ সালে ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্ধ দেয় বর্তমান সরকার।
নির্মান করা হবে একটি আধুনিক মানের পর্যটন কেন্দ্র, দৃষ্টিনন্দন লেক, একটি মিনি পার্ক, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক মিউজিয়াম, সিনেপ্লেক্স সহ আরো অনেক কার্যক্রম। এরই মধ্যে সম্প্রসারনের জন্য নতুন করে ৩৪ একর জমিও বরাদ্ধ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো কাজ শুরু হয় নি। তবে স্বাধীনতার ৫১ বছর পর হলেও এখন উন্নয়নের ছোয়া লাগতে শুরু করেছে বাংলাদেশের প্রথম রাজধানী মুজিবনগর তথা মেহেরপুর জুড়ে। জমি অধিগ্রহণসহ নতুন করে প্রকল্প বাস্তবায়নে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৪১০ কোটি টাকা। এরই মধ্যে প্রকল্পের নকশাও তৈরি করা হয়েছে। নতুন প্রস্তাবিত প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলে পাল্টে যাবে মুজিবনগরের চিত্র।
১৯৭১ সালে ১৭ এপ্রিলে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক স্মৃতি কমপ্লেক্সের অদূরে যে সড়ক দিয়েই ভারত থেকে মুজিবনগরে এসেছিলেন জাতীয় চার নেতাবৃন্দ সহ ভারতীয় বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গ। শপথ নিয়ে দেশের প্রথম সরকার গঠন করেছিলেন, সেই পথটিকে স্বরনীয় করে রাখার জন্য ২৬শে মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এই সড়কটির (ভার্চুয়াল) “স্বাধীনতা সড়ক” এর উদ্বোধন করেন। এরই মধ্যে প্রায় ১ কোটি টাকা ব্যায়ে বাংলাদেশের অংশে ৫’শ মিটার রাস্তার কাজ শেষ হয়েছে। বাস্তবায়ন করা হবে চেকপোস্ট। ফলে দু-দেশের মধ্যে বাড়বে ভাতৃত্ববোধ।
যোগাযোগ ব্যবস্থা ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবী ছিল রেল সংযোগের। এবার সেই দাবি পুরন হতে যাচ্ছে মেহেরপুরবাসীর।
এরই মধ্যে রেল সংযোগ স্থাপনের জন্য রেল পরিবহন উইং ভৌত অবকাঠামো বিভাগের পরিকল্পনা কমিশন থেকে নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন পদক্ষেপ। দর্শনা থেকে দামুড়হুদা এবং মুজিবনগর হয়ে মেহেরপুর পর্যন্ত রেল লাইন স্থাপনের জন্য ১২ কোটি টাকার একটি প্রাক-কোলোন (সমীক্ষা) অনুমোদিত হয়েছে। প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে ব্রডগেজ লাইন, ব্রীজ, স্টেশন, ইয়ার্ড, সিগন্যালিং, অপারেশন প্রভৃতির কনসেপচুয়াল ড্রইং ও ডিজাইন। আমঝুপি থেকে মুজিবনগর কেদারগঞ্জ বাইপাস সড়কের কাজ শেষ হয়েছে, জেলার গাংনী ও মুজিবনগর উপজেলায় ফায়ার স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে।
নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে ২০১৪ সালের অক্টোবর মাসে নৌ বাহিনীর অধীনে ডকইয়ার্ড এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কাস লিঃ এর তত্বাবধায়নে ২৯ কিঃ মিঃ খনন কাজ শুরু করা হয়। ব্যায় ধরা হয় ৭১ কোটি ৬৫ লাখ ৫১ হাজার ২’শ ১৬ টাকা। ২০১৬ সালের শেষ শেষ হয় নদী খননের কাজ। যার সুফল পাচ্ছে এলাকাবাসী। আবারো দ্বিতীয় ধাপের খনন কাজ শুরু হয়েছে।
মেহেরপুরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল মেহেরপুরে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হবে। ২০২০ সালে মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মুজিবনগর বিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় এর অনুমোদন দেওয়া হয়। এটি শিক্ষা খাতে মেহেরপুরবাসীর জন্য একটি মাইলফলক। যা বাস্তবায়ন হলে অত্র এলাকার শিক্ষার মান বৃদ্ধি পাবে। প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে এরই মধ্যে মুজিবনগর ডিগ্রি কলেজকে সরকারিকরন ও মেহেরপুর সরকারি কলেজে মাস্টার্স কোর্স চালু করা হয়েছে।
মেহেরপুরের সাথে সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতিকরনে ৪ লেন রাস্তা সহ রাস্তার সম্প্রসারণের দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। চলতি বছরের পহেলা জুন মেহেরপুর থেকে কুষ্টিয়া পর্যন্ত আঞ্চলিক মহাসড়ক প্রশস্ত ও মান উন্নয়নে ৬৪৩ কোটি টাকার একটি প্রকল্প একনেকে পাশ হয়েছে। কুষ্টিয়া (ত্রিমোহনী)-মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহ (আর-৭৪৫) আঞ্চলিক মহাসড়কটির মেহেরপুর হতে কুষ্টিয়া পর্যন্ত যথাযথ মান ও প্রশস্তাতায় উন্নীতকরণ” প্রকল্পের ব্যায় ধরা হয়েছে ৬৪৩ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হলে মেহেরপুরের সাথে সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হবে। কৃষি প্রধান এলাকা হওয়ায় কৃষিতে যেমন ব্যাপক ভূমিকা রাখবে সেই সাথে ব্যবসা- বানিজ্য সম্প্রসারণ ঘটবে, গড়ে উঠবে শিল্প কারখানা।
মেহেরপুর শহরের মিজানুর রহমান বলেন, মেহেরপুর বাসীর দীর্ঘদিনের চাওয়া পাওয়া পূরন হতে চলেছে। জেলায় চেক পোস্ট বাস্তবায়ন হলে ভারত এবং বাংলাদেশের সাথে যেমন যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হবে সেই সাথে এই অঞ্চলের ব্যপক উন্নয়ন ঘটবে।
মেহেরপুর মুজিবনগরের লাল্টু হোসেন বলেন, আমরা মুজিবনগর তথা মেহেরপুরবাসী দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিলাম। আমাদের এখানে বড় ধরনের কোন শিল্প কারখানা গড়ে উঠে নি। এখন জেলাব্যাপি যে সব উন্নয়ন মূলক কাজ চলছে সেগুলো বাস্তবায়ন হলে এই অঞ্চলের আর্থ সামাজিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে।
মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন বলেন, মুজিবনগর কমপ্লেক্সকে আমরা মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক একটি আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুলতে চাই। আমরা এরই মধ্যে নকশা তৈরি করেছি। ৪১০ কোটি টাকার নকশা নির্মান করা হয়েছে। এটিকে আরো দুই থেকে তিন ধাপে বাড়ানো সম্ভব। এটি একনেকে দেওয়া হয়েছে। একনেকে পাশ হলে এই মুজিবনগরের কাজ দ্রুত শুরু হবে।