আইন অমান্য করে স্বদেশ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড কর্তৃপক্ষ কোম্পানির স্থায়ী আমানত বা পেইডআপ ক্যাপিটালের বিপরীতে এনআরবিসি ব্যাংক থেকে ১৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছে। নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) এই ঋণকে আত্মসাৎ বলে আখ্যায়িত করেছে। একইসঙ্গে এভাবে ঋণ নেওয়া বীমা আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন জানিয়ে কোম্পানির নিবন্ধন স্থগিতের বিষয়ে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছে।
গত ৪ ডিসেম্বর সংস্থাটির পরিচালক (আইন) মোহা. আব্দুল মজিদ স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত একটি চিঠি (স্মারক নম্বর- ৫৩,০৩,০০০০.০৭১.২৭.০০১.২২.৪৭ কোম্পানি চেয়ারম্যান মো. মাকসুদুর রহমানকে পাঠানো হয়েছে। একই কারণে ভিন্ন ভিন্ন স্বারকে সকল পরিচালক ও কোম্পানির ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তাকে চিঠির অনুলিপি পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে আগামী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
আইডিআরএ’র চিঠিতে বলা হয়, স্বদেশ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের অর্থ তফসিলি ব্যাংকে দায়মুক্তভাবে জমা রাখার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও কোম্পানি এনআরবিসি ব্যাংকে রাখা স্থায়ী আমানতের (paidup capital) বিপরীতে ১৪.৩০ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণ করেছে যা বীমা আইন ২০১০ এর ২১(২) ধারার সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
স্থায়ী আমানতের বিপরীতে এই ঋণ গ্রহণের তথ্য পরিদর্শনকারী কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়নি এবং কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদনেও প্রতিফলিত হয়নি। উক্ত অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে মর্মে প্রতীয়মান হয় যা বীমা আইন ২০১০ এর ১০(১) (২) ধারায় বর্ণিত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের শামিল।
আইডিআরএ চিঠিতে বলছে, এ অবস্থায়, বীমা আইন ২০১০ এর ১০ ধারার প্রদত্ত ক্ষমতাবলে স্বদেশ ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানির নিবন্ধন কেন স্থগিত করা হবে না তার ব্যাখ্যা আগামী ৩০ দিনের মধ্যে আবশ্যিকভাবে কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে।
আইন লঙ্ঘন করে অবৈধ ব্যয়, মাত্রাতিরিক্ত কমিশন দেওয়াসহ মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে গ্রাহকের প্রিমিয়ামের টাকা লেনদেন করে একাধিকবার খবরের শিরোনাম হয়েছে স্বদেশ লাইফ। তাছাড়া সাবেক সিইও’র বিরুদ্ধে কোম্পানির কোটি টাকা আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার, কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিন বেতন না দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
২০১৪ সালের জানুয়ারিতে অনুমোদন পায় স্বদেশ লাইফ ইন্স্যুরেন্স। কোম্পানিটি ২০২০ সালে ইসলামী বীমা কোম্পানিতে রূপান্তরিত হয়। একক বীমা, ক্ষুদ্রবীমা, গোষ্ঠী বীমা এবং স্বাস্থ্য বীমাসহ অন্যান্য বীমা পণ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও অনিয়ম আর বিতর্ক পিছু ছাড়েনি কোম্পানিটির। ফলে বিভিন্ন সময় আইডিআরএ’র নজরদারিতে পড়তে হয়। সর্বশেষ চলতি বছরের ৩ মে কোম্পানিকে নতুন পলিসি বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দেয় আইডিআরএ। যা অক্টোবর পর্যন্ত বহাল থাকে। বর্তমানে নতুন পলিসি বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও সাবেক মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা ইখতিয়ার উদ্দিন শাহীনের অর্থ আত্মসাতের কারণে ফের অনিশ্চয়তায় পরে কোম্পানিটি।
জানা গেছে, কোম্পানিটির পরিশোধিত মূলধন ১৮ কোটি টাকা। এরমধ্যে বিগত সময়ে আইডিআরএ’র অনুমতি নিয়ে দুই দফায় দুই কোটি করে মোট চার কোটি টাকা উত্তোলন করে কোম্পানিটি। সর্বশেষ কোম্পানির পেইডআপ ক্যাপিটালের বিপরীতে ১৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা ঋণ নেয় কোম্পানি কর্তৃপক্ষ।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চেয়ে কোম্পানির চেয়ারম্যান মো. মাকসুদুর রহমানকে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠালে তিনি হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করে বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করবো না।’
তবে কোম্পানির ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. জামাল উদ্দিন চিঠি পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘পেইডআপ ক্যাপিটালের বিপরীতে ঋণ নেওয়ার বিষয়ে আইডিআরএ একটি চিঠি বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ অন্য সদস্যদের পাঠিয়েছে। আমাকে অনুলিপি দিয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটা ভুল বোঝাবুঝি থেকে হয়েছে। কোম্পানির টাকা এফডিআর করা আছে। আইডিআরএ’র চাওয়া অনুযায়ী বোর্ড জবাব দেবে।’
বিষয়টি নিয়ে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জয়নুল বারী বলেন, ‘আমরা তাদের (স্বদেশ লাইফ) কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছি। জবাব দেওয়ার পর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবো। আইনে যা যা আছে আমরা সবই করবো।’