অরাজনৈতিক ইস্যুই মূল আলোচনায়
DhakaReport24.com || 2019-11-23 11:28:45
দেশে রাজনৈতিক ডামাঢোল নেই, রাজপথে রাজনৈতিক আন্দোলন-সংগ্রামও নেই। তবুও যেন কোথাও নেই স্বস্তি। একের পর এক ঘটতে থাকা ‘অরাজনৈতিক’ ইস্যুই এখন দেশ জুড়ে মুখ্য আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। এসব বিষয় কখনো কখনো রাজনৈতিক ইস্যুর চেয়েও জটিল ও বড়ো হয়ে সামনে আসছে। প্রায় প্রতিটি ইস্যুই ক্ষোভ সঞ্চার করছে সাধারণ্যের মনে। রাজনৈতিক অঙ্গন, অফিস-আদালত, পথ-ঘাট, দোকানপাট, ফুটপাত থেকে শুরু করে উঁচুতলার আড্ড-আলোচনা—সর্বত্রই কান পাতলে একটি কমন প্রশ্নই ভেসে আসছে, ‘এসব কেন ঘটছে, এগুলো কীসের আলামত’?
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদকে গত ৬ অক্টোবর রাতে ছাত্রলীগের একদল শিক্ষার্থীর পিটিয়ে হত্যার ঘটনা দিয়ে দেশব্যাপী শুরু হয় সাম্প্রতিক অস্থিরতা। এই ঘটনার রেশ না কাটতেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) ফারজানা ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস, যেই আন্দোলন এখনো নেভেনি, এখনো বন্ধ বিশ্ববিদ্যালয় ও এর হলগুলো। ১২ নভেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় আন্তঃনগর দুটি ট্রেন তূর্ণা নিশীথা ও উদয়ন এক্সপ্রেসের মুখোমুখি সংঘাতে ১৭ জনের প্রাণহানি এবং একদিন পরেই ১৪ নভেম্বর রংপুর এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন ও সাতটি বগি লাইনচ্যুত হয়ে অন্তত ২৫ জন আহত হওয়ার ঘটনা ভাবিয়ে তোলে সরকারকে। এর মধ্যেই পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে দেশ জুড়ে শুরু হয় লঙ্কাকাণ্ড। পেঁয়াজের ঝাঁজ কমতে শুরু করা মাত্রই মঙ্গলবার গুজবে ঘটে যায় লবণকাণ্ড। পেঁয়াজ-লবণকাণ্ডের পাশাপাশি চাল ও সবজিসহ কিছু নিত্যপণ্যের চড়া মূল্য চাপে ফেলে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্তসহ স্বল্প ও সীমিত আয়ের মানুষকে। ঢাকার টিকাটুলিতে রাজধানী সুপার মার্কেটে ও নোয়াখালীর চৌমুহনীতে বড়ো ধরনের অগ্নিকাণ্ডও দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সর্বশেষ নতুন সড়ক পরিবহন আইন নিয়ে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক এবং পরিবহনের চালক ও শ্রমিকদের আন্দোলনে সৃষ্ট সংকট এখনো সম্পূর্ণ দূর হয়নি, পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি পরিবহন খাত।
এসব ইস্যু সামাল দিতে সরকারকে হিমশিম খেতে হয়েছে, এখনো কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে সরকারকে। উল্লিখিত বিষয়গুলো সাধারণত ‘অরাজনৈতিক’ ইস্যু হলেও প্রতিটি ঘটনাতেই ‘অন্যরকম রাজনীতি’র সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা সংসদের ভেতরে-বাইরে দেওয়া বক্তব্যে প্রতিটি ইস্যুর নেপথ্যেই ষড়যন্ত্রের কথা বলেছেন। খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও বহুবার বলেছেন, ‘এসব ঘটনার পেছনে ষড়যন্ত্র রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখা দরকার।’ বৃহস্পতিবার সশস্ত্র বাহিনী দিবস উপলক্ষ্যে আয়োজিত অনুষ্ঠানেও প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘ষড়যন্ত্রকারীরা থেমে নেই, তাদের কাজই হচ্ছে ষড়যন্ত্র করা, এসব বিষয়ে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।’ পেঁয়াজকাণ্ডের ঘটনায় সরকারি দলের নেতারাই বলেছেন, এটা সিন্ডিকেটের কারসাজি। আর বিএনপিসহ সরকারবিরোধী দল-জোটগুলো প্রতিটি ঘটনাকে দেখছে সরকারের ‘ব্যর্থতা’ হিসেবে। উদ্ভূত পরিস্থিতিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেখছেন ’৭৪-এর আলামত হিসেবে। আর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ভাষ্য, ‘আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে চক্রান্তের পথে হাঁটছে বিএনপি।’
নতুন সড়ক পরিবহন আইন নিয়ে পরিবহন খাতে সৃষ্ট সংকটের অন্তরালে ‘অদৃশ্য শক্তি’র খেলা দেখছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কার্যকরী সভাপতি ও আওয়ামী লীগের নেতা শাজাহান খান। তিনি বলেছেন, ‘আমি এত বছর পরিহন শ্রমিক ফেডারেশনের সঙ্গে জড়িত, তবে কখনো দেখিনি যে শ্রমিকেরা আমাদের বা মালিকের কথা শোনে না। এই প্রথম দেখছি শ্রমিক ও চালকেরা কথা শুনছে না। এক দিকে বাস চলা শুরু হলে, আরেক দিকে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মালিকেরা ধর্মঘট না ডাকলেও চালকেরা বাস চালাচ্ছে না। এর পেছনে নিশ্চয়ই কোনো অশুভ শক্তি কাজ করছে।’
বুয়েটের তড়িত্ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার মামলায় ২৫ জনকে অভিযুক্ত করে গত ১৩ নভেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেয় পুলিশ। তবে আন্দোলনকারীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বুয়েট প্রশাসনের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অভিযুক্তদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থায়ী বহিষ্কার না করায় অচলাবস্থা এখনো কাটেনি। র্যাগিংয়ের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি প্রদান এবং র্যাগিং বন্ধে নীতিমালা প্রণয়নসহ আন্দোলনকারীদের বাকি দুটি দাবিও এখনো পূরণ হয়নি। এ কারণে বুয়েটের শিক্ষার্থীরা শিক্ষা কার্যক্রম থেকে এখনো বিরত রয়েছেন। বিষয়টির সুরাহা না হওয়ায় প্রায় দেড় মাস ধরে বুয়েট অচল। কবে নাগাদ বুয়েটের এই অচলাবস্থা কাটবে, সেটিও নির্দিষ্ট করে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট কেউই।
বুয়েটের অচলাবস্থার মধ্যেই সংকটের আবর্তে পড়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। জাবির ভিসি ফারজানা ইসলামের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আগামীকাল রবিবার রাজধানীর শাহবাগে সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছেন। চলতি নভেম্বরের শুরু থেকেই আন্দোলনের ফলে বিশ্ববিদ্যালয় ও হলগুলো বন্ধ থাকায় বুয়েটের মতো জাবিতেও চলছে অচলাবস্থা। জাবি কবে স্বাভাবিক হবে, সেটিও জানা নেই সংশ্লিষ্ট কারোরই।
অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে কয়েক লাফে এবার পেঁয়াজের দর উঠেছিল বাজারভেদে ২৫০ থেকে ২৭০ টাকা পর্যন্ত, যা দেশ জুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার জরুরি ভিত্তিতে বিভিন্ন দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানির উদ্যোগ নিলেও রান্নার অপরিহার্য এই উপাদানের মূল্য এখনো স্বাভাবিক হয়নি। মূল্যের অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাওয়া দেশি-বিদেশি পেঁয়াজের দাম এখনো ১৮০ থেকে ২৩০ টাকা। পেঁয়াজের দর দ্বিশতক ছাড়িয়ে যাবে, সেটি কারও সুদূরতম কল্পনাতেও ছিল না। বাজারে বর্তমানে সবজির দরও চড়া। বেড়েছে চাল, ভোজ্যতেলসহ কয়েকটি নিত্যপণ্যের দামও। পাইকারি বাজারে সরু, মোটা চালসহ বিভিন্ন ধরনের চালের দাম গত কয়েক দিনে গড়ে ৩ থেকে ৭ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এমন সময়ে চালের দাম বেড়েছে, যখন প্রান্তিক কৃষকের কাছেও ধান নেই। লাগামহীনভাবে এভাবে নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে হিসাব মেলাতে হিমমিশ খাচ্ছেন স্বল্প ও সীমিত আয়ের লোকজন।
এসব ঘটনার মধ্যে এখন পরিবহন খাতে শুরু হয়েছে নতুন ধরনের সংকট। নতুন সড়ক পরিবহন আইনের বিরোধিতা করে গত বুধবার দেশের অন্তত ২৭টি জেলায় পরিবহন শ্রমিকেরা ধর্মঘট করেন। এতে বাধাগ্রস্ত হয় মালামাল পরিবহন। সড়ক অবরোধে বুধবার কার্যত অচল হয়ে যায় পণ্য পরিবহন ও যাত্রীসেবা। ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের ধর্মঘটের কারণে ঐ দিন সারাদেশে পণ্য পরিবহন প্রায় বন্ধ হয়ে যায়, যার প্রভার পড়ে নিত্যপণ্যের বাজারে। নতুন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ‘বাড়াবাড়ি’ হবে না—সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বারবার এরকম আশ্বাস দিলেও এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিকদের বৈঠকের পর ধর্মঘট প্রত্যাহার করা হলেও এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি পরিবহন খাত। এসব ইস্যু ছাড়াও সৌদি আরব থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে শত শত নারী গৃহকর্মীর দেশে ফিরে আসা এবং প্রতিদিনই একাধিক ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাও দুর্ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সূত্র: ইত্তেফাক