সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল ভিডিও নিয়ে বিতর্কের রেশ না কাটতেই এবার ছুটির অনুমোদন ও কর্মস্থল ত্যাগের সময় নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়েছেন কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তানজিলা তাসনিম। জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া ছুটির আবেদনপত্রে অনুমোদনের দৃশ্যমান সিল-স্বাক্ষর নেই।
অন্যদিকে, আবেদনপত্রে উল্লেখ করা ছুটির সময়ের সঙ্গে কর্মস্থল ত্যাগের সময়েরও অমিল পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ইউএনওর অনুপস্থিতিতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সেবা না পেয়ে ফিরে যাওয়ার অভিযোগ করেছেন সেবাপ্রত্যাশীরা। উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদ শূন্য থাকায় ভোগান্তি আরও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন তাঁরা
সোমবার (২৬ অক্টোবর) ও মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) প্রয়োজনীয় কাজে ইউএনওর কার্যালয়ে এসে তাঁকে না পেয়ে ফিরে যান কয়েকজন সেবাপ্রত্যাশী। তাঁদের অভিযোগ, বিভিন্ন আবেদন নিষ্পত্তি, স্বাক্ষর ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার প্রয়োজন হলেও তাঁকে না পাওয়ায় আটকে যাচ্ছে কাজ।
সেবা নিতে আসা মো. হানিফ আলী একটি আবেদনপত্র দেখিয়ে বলেন, ‘ইউএনও অফিসে এসেছি, স্যারের একটা স্বাক্ষর লাগবে এই কাগজে। উনি নাকি ছুটিতে আছেন। এজন্য আমার কাজটা হলো না।’
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রাশেদুল ইসলাম বলেন, ‘ইউএনও নাই। কত মানুষকে আসতে দেখলাম, আবার কাজ না পেয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে।’
জেলা প্রশাসক বরাবর দেওয়া ছুটির আবেদনপত্রে পারিবারিক কারণ দেখিয়ে ২৫ থেকে ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত চার দিনের নৈমিত্তিক ছুটি চেয়েছেন তানজিলা তাসনিম। একই আবেদনে ২৩ ও ২৪ অক্টোবর সাপ্তাহিক ছুটিতে কর্মস্থল ত্যাগের অনুমতি চাওয়া হয়েছে। তবে আবেদনপত্রে ছুটি মঞ্জুরের দৃশ্যমান সিল বা স্বাক্ষর নেই। ফলে ছুটি যথাযথভাবে অনুমোদিত হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অন্যদিকে, ইউএনও কার্যালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা জাকারিয়া হোসেনের ভাষ্য, ২২ অক্টোবর ছুটি নিয়ে কর্মস্থল ত্যাগ করেন ইউএনও। তিনি বলেন, ‘ইউএনও স্যার ২২ তারিখ ছুটি নিয়ে গেছেন। বৃহস্পতিবার আসার কথা।’
আবেদনপত্রে উল্লেখ করা ছুটির সময়ের সঙ্গে ২২ অক্টোবর কর্মস্থল ত্যাগের এই বক্তব্যের পার্থক্য থাকায় ছুটির অনুমোদন ও কর্মস্থল ত্যাগের সময় নিয়ে অস্পষ্টতা তৈরি হয়েছে। তবে এ বিষয়ে ইউএনওর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ইউএনও তানজিলা তাসনিমের অনুপস্থিতিতে রাজারহাট উপজেলার রুটিন দায়িত্বে রয়েছেন কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ইউএনও মো. মাহমুদুল হাসান। তিনি বলেন, ‘আমি রুটিন দায়িত্বে আছি। ডিসি স্যার আমাকে জানিয়েছেন। কিন্তু দায়িত্বের কোনো কাগজ দেখাতে পারেননি।’
তিনি মৌখিকভাবে দায়িত্ব পালনের কথা জানান। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, দায়িত্বে থাকার কথা থাকলেও তাঁকে রাজারহাট উপজেলায় দেখা যায়নি। এতে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সেবা পেতে ভোগান্তিতে পড়ছেন তাঁরা।
এদিকে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথও ২২ অক্টোবর থেকে ছুটিতে রয়েছেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আসাদুজ্জামান দায়িত্ব পালন করছেন। আসাদুজ্জামান বলেন, ‘ডিসি স্যারও ছুটিতে রয়েছেন। আমি বর্তমানে ছুটিকালীন দায়িত্ব পালন করছি। রাজারহাট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা অনুপস্থিত থাকার বিষয়ে আমাকে কোনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি।’
তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দেন তিনি। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। গত ২২ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে আলোচনায় আসেন ইউএনও তানজিলা তাসনিম। ভিডিওতে প্রায় দেড় মিনিটে এক মন্ত্রীকে ৩৫ বার ‘স্যার’ সম্বোধনের বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। এর কয়েক দিনের মাথায় তাঁর ছুটির আবেদন, কর্মস্থল ত্যাগের সময় এবং অনুপস্থিতিতে প্রশাসনিক সেবা ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ সামনে এল।
এর আগেও বিতর্কে জড়ানোর অভিযোগ উঠেছিল তানজিলা তাসনিমের বিরুদ্ধে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কক্সবাজার সদর উপজেলার ইউএনও থাকাকালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা পরিচয়ে এক পর্যটক তাঁকে গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে। ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করেও আলোচনায় এসেছিলেন তিনি।
সর্বশেষ অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে রাজারহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানজিলা তাসনিমের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ছুটির আবেদন যথাযথভাবে অনুমোদিত হয়েছিল কি না, নির্ধারিত সময়ের আগে কর্মস্থল ত্যাগের অনুমতি ছিল কি না এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে দায়িত্ব পালনের কার্যকর ব্যবস্থা ছিল কি না—এসব প্রশ্নের স্পষ্ট ব্যাখ্যা চান সেবাপ্রত্যাশীরা। তাঁদের দাবি, ছুটি ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের অস্পষ্টতার কারণে সাধারণ মানুষ যেন সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত না হন, তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
ঢাকারিপোর্ট২৪.কম/জাক/আরএএম