একদিকে কাটা হচ্ছে বনের পাহাড়। অন্যদিকে পাহাড়ের গাঁ ঘেঁষেই নির্মাণ করা হচ্ছে ঘর। নির্বিচারে পাহাড় কাটা ও বনের জায়গা জবরদখল করে বাড়ি নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বনগ্রামের কালাবাইজ্জ্যে ঘোনা এলাকায়।
সরেজমিন উপজেলার বনগ্রামের কালাবাইজ্জ্যে ঘোনা এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, কালাবাইজ্জ্যে ঘোনা এলাকার মুখে কাটা হয়েছে পাহাড়। কিছুদূর এগিয়ে যেতে দেখা যায় পাকা বাড়ির কাজ চলছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন বনবিভাগের সাবেক ভিলেজার মো. জাহেদ হোসেনের দখলী করা জায়গায় পাকা বাড়ি নির্মাণের কাজ চালাচ্ছে তারই ছেলে আবুল কালাম সওদাগর ও আবুল বশর।
আরও কিছুদুর অগ্রসর হয়ে দোকান-পাট ফেলে কয়েকশো ফুটের ব্যবধানে দেখা যায় আরও বেশকিছু ঘরবাড়ি।
জানা যায়, পাহাড় কাটা ও বনবিভাগের জায়গা জবরদখল করে বাড়ি নির্মাণ করা আইনত অপরাধ হলেও বনগ্রাম এলাকায় টাকা দিলে সব হয়। স্থানীয় প্রভাবশালী ও বনবিভাগের যোগসাজসে বনের জায়গা দখল করে বসতবাড়ি নির্মাণের হিড়িক পড়েছে ওই এলাকায়।
আবুল কালাম সওদাগর ও আবুল বশরের নির্মাণাধীন বাড়িতে গেলে তাদের বাবা মো. জাহেদ হোসেন দাবি করেন , "আমার ছেলেরা যে জায়গায় বাড়ি নির্মাণ করছে তা বনের জায়গা নয়, আমিন মেম্বারের জায়গা। তবে আমাদের কিছু বনবিভাগের জায়গা রয়েছে"।
আবুল কালাম সওদাগরের ছোট ভাই আবুল বশর জানান,"পাকা বাড়ি নির্মাণ নিয়ে গতবার স্থানীয় সাংবাদিকরা ঝামেলা করেছিলো তখন বনবিভাগে কাজগপত্র জমা দিলে তারা আর কখনওই আসেনি"।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন স্থানীয়রা জানান, "বন গ্রামের কালাবাইজ্জ্যে ঘোনা এলাকায় বনের পাহাড় কাটা ও বনের জায়গা জবরদখল করে বাড়ি নির্মাণ করা থেকে শুরু করে সব অনিয়মের নেতৃত্ব দেয় কথিত রাজাকারের ছেলে এই আবুল কালাম সওদাগর। তার চোরাই কাঠের ব্যবসার পাশাপাশি রয়েছে অবৈধ লাইসেন্সবিহীন করাত-কল। এসব বিষয় নিয়ে তার সাথে কথা বলতে গেলে এ প্রতিবেদককে শারীরিকভাবে লাঞ্চিত করার চেষ্টা করেন কালাম সওদাগর। সংবাদ প্রকাশ করলে পরিণতি খারাপ হবে বলেও হুমকি দেন তিনি।
আবুল কালাম সওদাগর বলেন, "আমি সরকারি ভিলেজার। কাঠের ব্যবসা করি। ভালো জায়গায় আসছ নাই তুই। বনে কি শুধু শেয়াল বিলাই থাকে? বনে বাঘ আর সিংহ থাকে, মনে রাখিস"।
এদিকে বনবিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জাহেদ হোসেন বনবিভাগের সাবেক ভিলেজার হলেও তার ছেলে আবুল কালাম সওদাগর বনবিভাগের কোনো ভিলেজার নন। ৯০ দশকের দিকে তাঁরা বাবা-ছেলে দুজনেরই বিরুদ্ধে পৃথক-পৃথক গাছ কাটার মামলা ছিলো। এছাড়াও আবুল কালাম সওদাগর বনবিভাগের তালিকাভুক্ত জবরদখলকারী।
চন্দ্রঘোনা কদমতলীর ৩নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সভাপতি আবদুল কাদের বলেন, "আবুল কালাম সওদাগর বনবিভাগের সাথে আঁতাত করে অবৈধ চোরাই গাছের ব্যাবসা করে। তার বাবা জাহেদ হোসেন একজন রাজাকার"।
স্থানীয় টিপুর স্ত্রী লায়লা জানান, "আমরা অন্য জায়গা থেকে এইখানে এসে গন্ডা প্রতি ১লক্ষ ১০ হাজার টাকা করে জায়গা কিনে বাড়ি নির্মাণ করেছি প্রায় ৭ মাস হল। তখন বনবিভাগকে ৬ হাজার টাকা দিতে হয়েছিল। টাকা না দিলে তো বাড়ি করতে দিবেনা তাঁরা। তাছাড়া আমরা কিছু বললে তাদের সোর্সরা আমাদের জন্য লাঠি নিবে তাই আসল কথা বলতে পারিনা"।
ওই এলাকার জহির বলেন, "এই কালাবাইজ্জ্যে ঘোনা এলাকায় শুধু বাড়ি নয় বাড়ির মেঝে বানাতে গেলেও বনবিভাগকে টাকা দিতে হয়। তাছাড়া তাদের ভিলেজারের মত লোক আছে, যাদের মাধ্যমে টাকা নেয় বনবিভাগ"।
আবুল কালাম সওদাগরের ভগ্নিপতি বনবিভাগের বরাত দিয়ে বলেন, "আমার শ্বশুর জাহেদ হোসেন ভিলেজার ছিলেন। বনবিভাগের প্রায় ২০ কানি জমি জবরদখলে রেখেছেন সে। বাকিটা সবাই জানে"। এখানে টাকা দিলে বনের জমি পাওয়া যায়। এটা সবাই জানে।
জানতে চাইলে বনবিভাগের কোদালা বিট কর্মকর্তা পিকে ধর নবীন বলেন, "আমি এসেছি ৭ মাস হলো এর আগে কি হয়েছে জানিনা। তবে বনবিভাগের পাহাড় কাটা ও বনবিভাগের জায়গা জবরদখল করে বাড়ি নির্মাণের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখবো, বনবিভাগের জায়গা হলেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে"।
এ বিষয়ে জানতে চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মো. সফিকুল ইসলামের মুঠোফোনে কল দিলে রিসিভ করেননি তিনি।
ঢাকারিপোর্ট২৪.কম/এনআই/আরএএম