গাজীপুরে ১৯২ টি সরকারি পুকুর খাতাপত্রে থাকলেও তা কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে।বেদখল হওয়া এসব পুকুরের অস্তিত্ব নেই।মাটি ভরাট করে সেখানে গড়ে উঠেছে ঘরবাড়ি ও রিসোর্ট।
গাজীপুর জেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, জেলায় সরকারি বা খাসপুকুরের সংখ্যা ৮৮৭টি। তবে এর মধ্যে হিমারদিঘির মতো ১৯২টি পুকুর পুরোপুরি বা আংশিক ভরাট করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ২২ শতাংশ পুকুর বেহাত হয়ে গেছে।
বেদখলে থাকা পুকুরের মোট আয়তন প্রায় ১৫১ একর। ক্ষমতাসীন দলের নেতা–কর্মী ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা এসব পুকুরের বেশির ভাগই ভরাট করে স্থায়ী–অস্থায়ী অবকাঠামো গড়ে তুলেছেন।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গাজীপুর জেলার ৮৮৭টি পুকুরের মধ্যে মহানগর ও আশপাশের এলাকায় পুকুর থাকার কথা ৩৯০টি। তবে বাস্তবে আছে ২৩৬টি। অর্থাৎ ১৫৪টি পুকুর পুরোপুরি বা আংশিক ভরাট করা হয়েছে। এই হিসাবে মহানগর ও আশপাশের এলাকার ৩৯ শতাংশের বেশি পুকুর অবৈধ দখলদারদের দখলে চলে গেছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গাজীপুরে পুকুর দখল হচ্ছে মূলত দুভাবে। একটি প্রক্রিয়া হচ্ছে প্রভাব খাটিয়ে, অন্যটি হচ্ছে লিজের (সাময়িক বন্দোবস্ত) নামে দখল। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দল ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা রয়েছেন দখলদারদের তালিকায়।
একাধিক কাউন্সিলর, এমনকি সরকারি কর্মকর্তা–কর্মচারীও আছেন দখলদারদের মধ্যে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল নির্মাণের নামেও ভরাট করা হয়েছে বেশ কয়েকটি পুকুর।
এসব পুকুর রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকির দায়িত্ব জেলা প্রশাসনের। গাজীপুরের জেলা প্রশাসক আনিসুর রহমান বলেন, ‘পুকুরগুলো আমরা ধরে রাখতে পারছি না। একদিকে পুকুর দখলমুক্ত করা হয়, অন্যদিকে আবার সেটি দখল হয়ে যাচ্ছে। যারা দুর্বৃত্ত, তারা প্রতিদিনই পুকুর দখল করতে যায়। সারাক্ষণ পুকুর পাহারা দেওয়ার মতো জনবল আমাদের নেই। পুকুর রক্ষণাবেক্ষণের বরাদ্দও খুব কম।’
সরকারি খাস জমির পাশাপাশি জাল নথির মাধ্যমে পুকুর দখল করে মাটি ভরাট করে চড়া দামে তা বিক্রি করে থাকে দালালচক্র। গাজীপুর সিটি করপোরেশন কার্যালয়ের পাশে একটি পুকুর গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি আবদুর রউফ ও তাঁর স্ত্রী তাসলিমার দখলে রয়েছে।
পুকুরের দক্ষিণ-পশ্চিম অংশে নিজেদের থাকার জন্য আধা পাকা বাড়ি রয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব অংশে পাঁচ কক্ষের একটি আধা পাকা বাড়ি নির্মাণ করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। আরও ১০ কক্ষের একটি আধা পাকা বাড়ি নির্মাণের কাজ চলছে। পুকুরের পশ্চিম অংশে রাস্তার পাশে একটি মার্কেট নির্মাণ করেছেন।
আবদুর রউফের স্ত্রী তাসলিমা দাবি করেন, তাঁরা যেখানে বাড়ি–মার্কেট নির্মাণ করেছেন, সেটি পুকুরের জায়গা নয়। এটি বসতবাড়ি হিসেবে ২০ বছর ধরে লিজ নিয়েছেন। তবে কত দিন পর্যন্ত লিজের মেয়াদ আছে, সে বিষয়ে কিছু বলতে চাননি তিনি।
টঙ্গীর হিমারদীঘি পুকুরটিও বেদখল হয়ে গেছে।এছাড়া শ্রীপুরের বৈরাগীরচালা এলাকায় দীর্ঘ বছরের ঐতিহ্য ধারন করা একটি পুকুর গ্রীণভিউ রিসোর্ট দখলে নিয়ে মাটি ভরাট করে নিজেদের আয়ত্বে নিয়েছে জাল দলিল ও বিক্রেতার মাধ্যমে।অতি সম্প্রতি হাইকোর্টের রায়ে তা প্রমানীতও হয়েছে।
গাজীপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে ৪০০ মিটার দূরে ‘টাঙ্কিরপাড়’ নামে একটি পুকুর রয়েছে। পুকুরটির দক্ষিণ পাশের বড় একটি অংশ এরই মধ্যে বেদখলে চলে গেছে। গাজীপুরের কালীগঞ্জের সাবরেজিস্ট্রার কার্যালয়ের পিয়ন আবদুল আওয়াল ও তাঁর ভাই খোরশেদ আলম সেখানে বাড়ি করেছেন।
আবদুল আউয়াল দাবি করেন, জেলা প্রশাসন থেকে লিজ নিয়ে তাঁরা বাড়ি করেছেন। তাঁর মতো আরও কয়েকজন লিজ নিয়ে পুকুরের এক অংশে বাড়ি ও মার্কেট নির্মাণ করেছেন।
গাজীপুর সিটি করপোরেশন কার্যালয়ের পাশের পুকুর ও টাঙ্কিরপাড় পুকুর দুটি করপোরেশনের ২৮ নম্বর ওয়ার্ডে পড়েছে। এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাসান আজমল ভূঁইয়া বলেন, ‘সিটি করপোরেশনের কার্যালয়ের পাশের পুকুর দখলমুক্ত করতে প্রশাসনের বড় কর্মকর্তারা কিছু করতে পারেননি। সেখানে আমরা তো একেবারে নস্যি। পুকুর দখলমুক্ত করার ক্ষেত্রে আমাদের কিছু করার নেই।’
টঙ্গীর আউচপাড়া মৌজায় মামদী মোল্লা স্কুল অ্যান্ড কলেজ লাগোয়া ছয় বিঘা আয়তনের পুকুরটির দুই–তৃতীয়াংশ এরই মধ্যে ভরাট করা হয়েছে। সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির একটি টিনের ছাউনি তৈরি করা হয়েছে। একই ওয়ার্ডের খাঁপাড়া সড়কের পাশে ছয় বিঘা আয়তনের পুকুরটির পশ্চিম অংশ ভরাট করে নির্মাণ করা হয়েছে বাড়ি ও কবরস্থান। বাকি অংশটি ভরাটের জন্য ময়লা–আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। পুকুরটির একটি অংশে পানির পাম্প বসিয়েছে গাজীপুর সিটি করপোরেশন।
গাজীপুর জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানান, সবচেয়ে বেশি পুকুর বেহাত হয়েছে টঙ্গী ও গাছা এলাকায়। তবে পুকুরগুলো দখলমুক্ত করতে কার্যকর কোনো উদ্যোগের কথা জানাতে পারেননি তাঁরা। অবশ্য ভরাট ও দখল হয়ে যাওয়া ১৯২টি পুকুর খননের জন্য একটি তালিকা তৈরি করেছে জেলা প্রশাসন।
গত বছরের নভেম্বরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে তালিকাটি পাঠিয়ে খননের জন্য একটি প্রকল্প নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।বেদখল হওয়া এসব পুকুরগুলো সঠিক প্রক্রিয়ায় রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। যেসব পুকুর ব্যক্তি দখলে চলে গেছে, সেগুলো চিহ্নিত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
ঢাকারিপোর্ট২৪.কম/রাফিও/আরএএম