চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে মিশ্র ফলের বাগানে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন রুহুল আমিন লিটন নামে (৪০) এক তরুণ কৃষি উদ্যোগতা। একই জমিতে ড্রাগন ফলের পাশাপাশি তিনি স্ট্রবেরি ফলের আবাদও করেছেন। এতে তিনি অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছেন।
জীবননগর উপজেলা সদর থেকে চার কিলোমিটার দুরে পেয়ারাতলা গ্রামে ৪৫ বিঘা জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে মিশ্র ফলের এ বাগানটি। তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা রুহুল আমিন লিটন জীবননগর উপজেলার লক্ষীপুর গ্রামের মো. মুজিবর রহমানের ছেলে। ২০১৯ সালের মাঝামাঝি ৪৫ বিঘা জমি লিজ নিয়ে শুরু করেন ড্রাগন ফলের চাষ। এবছর নতুন করে আরও ২০ বিঘা জমি নিয়ে গড়ে তুলেছেন এ বাগান।
গত নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়ে সেই বাগানের ড্রাগন ফলের সারির ফাঁকা জায়গায় স্ট্রবেরি ফলের ৯০ হাজার চারা লাগানো হয়। ড্রাগনগাছগুলো থেকে গত তিন বছর ধরে ফলন পাচ্ছেন। আর এবারই প্রথম তিনি স্ট্রবেরি ফল বাজারে বিক্রি করছেন। বর্তমানে প্রতিদিন ১৫০ কেজি থেকে ২০০ কেজির মতো স্ট্রবেরি সংগ্রহ করা হচ্ছে। তার মিশ্র ফলের বাগানে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে শতাধিক কৃষকের। মিশ্র ফল বাগান করে রুহুল আমিন লিটন এলাকার অন্যান্য কৃষকদের তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। লিটনের এ মিশ্র বাগান দেখতে প্রতিনিয়ত বিভিন্ন বয়সী মানুষসহ বেকার যুবকরা ভিড় জমাচ্ছেন। কাছে আসছেন অভিজ্ঞতা এবং পরামর্শ নিয়ে বাগান করার জন্য। আবার কেউ কেউ ইতোমধ্যে বাগান করার পরিকল্পনা করেছেন।
লিটনের বাগানে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে সবুজ বেষ্টনীতে সৌন্দর্যে ভরপুর এক বৈচিত্র্যময় প্রাকৃতিক পরিবেশ। ড্রাগনগাছের সারির ফাঁকে স্ট্রবেরির গাছ। এসব গাছে সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ছোট-বড় স্ট্রবেরি। কোনো কোনো গাছে থোকায় থোকায় স্ট্রবেরি ধরে আছে। গাছে ধরা প্রতিটি স্ট্রবেরি পলিথিন দিয়ে ব্যাগিং করা হয়েছে। বাগানে ৮ থেকে ১০ জন শ্রমিক বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে স্ট্রেবেরি সংগ্রহ করছেন। স্ট্রবেরি সংগ্রহ করার পর প্যাকেটজাত করে তা ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে।
বাগান ঘুরতে ঘুরতে লিটন বলেন, ২০১৯ সালে পিয়ারাতলা গ্রামের মাঠে ৪৫ বিঘা জমি ইজারা নিই। এরপর ওই জমিতে বারি-১ জাতের ড্রাগন ফলের চারা রোপন করি। চারা লাগানোর ১০ মাসের মাথায় গাছগুলোতে ফুল আসতে শুরু করে। দেড় বছরের মাথায় বাগান থেকে ড্রাগন সংগ্রহ শুরু করি। গত বছর এ বাগান থেকে ৩০ টন ড্রাগন বিক্রি করেছি। তিনি বলেন, শীতকালে ড্রাগন হয়না। এ কারণে সিদ্ধান্ত নিই ড্রাগন গাছের সারির ফাঁকা জায়গাগুলোতে স্ট্রবেরি গাছ লাগানোর। সিদ্ধান্ত মোতাবেক গত বছরের নভেম্বর মামের প্রথম সপ্তাহে রাজশাহী থেকে ৯০ হাজার স্ট্রবেরি গাছের চারা সংগ্রহ করেন লিটন। এরপর স্ট্রবেরি গাছের চারাগুলো ড্রাগন গাছের সারির ফাঁকা জায়গাগুলোতে রোপন করা হয়। চারা লাগানোর ১ মাসের মাথায় গাছগুলোতে ফুল আসে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে ফল পরিপক্ব হয়। গাছে থোকায় থোকায় ধরে আছে ড্রাগন। প্রথম দিকে প্রতি কেজি ড্রাগন ১ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে প্রতি কেজি ৬৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ড্রাগন ফলন শেষ হতে না হতেই আমার স্ট্রবেরির ফলন শুরু হয়েছে। আগামী এপ্রিল মাস পর্যন্ত বাগান থেকে স্ট্রবেরি সংগ্রহ করা যাবে।
লিটন বলেন, অন্যান্য ফসলের তুলনায় মিশ্র ফল চাষ অধিক লাভজনক। মিশ্র বাগানে তেমন কোনো পরিচর্যা করতে হয় না। প্রথমে গাছ লাগানো এবং জমি তৈরির পর কীটনাশক ও সামান্য পরিচর্যা ছাড়া কঠিন কোনো পরিচর্যা করতে হয় না। চাকরির পেছনে না ছুটে শিক্ষিত বেকার যুবকরা যদি নিজে কিছু করার উদ্যোগ নেয় তাহলে সফল হবে। প্রত্যেক দিন আমার এই বাগান দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসে এবং আমার কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে যায়। তারাও বাগান করবে। এছাড়া আমার দেখাদেখি এখন আমাদের এলাকায়ও অনেকেই বাগান করা শুরু করছেন।
লিটন বলেন, বাগান তৈরি করে প্রথম বছরেই আশার আলো দেখতে পেয়েছি। কেউ যদি সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে পারে অবশ্যই সফল হবে। শ্রমিকের সঙ্গে নিজেকেও শ্রমিক হতে হবে। আমার বাগানের ড্রাগনের এলাকায় ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।
বাগানে কাজের শ্রমিক মিনাজুল হক বলেন, জমির বেড তৈরি, পানি সেচ ও পরিচর্চা এবং ড্রাগন ও স্ট্রবেরি সংগ্রহসহ সব ধরনের কাজ বছরজুড়ে থাকে। এজন্য অন্য কোথাও যাওয়ার দরকার হয় না। এ বাগানে কাজ করে সংসার চলছে।
ফল বিক্রেতা মাহফুজ বলেন, জীবননগর উপজেলার মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় মিশ্র ফলের বাগান। গত দুই বছর থেকে এ বাগানের ড্রাগন ফল সংগ্রহ করছি।
জীবননগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন আক্তার বলেন, রুহুল আমিন লিটন পিয়ারাতলা গ্রামে ৪৫ বিঘা জমিতে মিশ্র ফলের বাগান করেছে। লিটন শুধু ড্রাগন চাষ করলে এই বাগান থেকে বছরের ৬ থেকে ৭ মাস উৎপাদন পেতেন। এখন বাড়তি লাভ পাচ্ছেন। মিশ্র বাগান হচ্ছে সামান্য জমিতে অল্প সময়ে স্বল্প খরচে অধিক লাভবান হওয়ার একটি সময় উপযোগী প্রক্রিয়া। মিশ্র বাগানে উদ্বুদ্ধকরণে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। জীবননগর উপজেলার কৃষকরা ফলের বাগানের দিকে বেশি ঝুঁকছেন। মানুষের মধ্যে ফলের বাগান করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। আমের পাশাপাশি প্রতিবছরই উপজেলায় বিভিন্ন ফলের চাষ বাড়ছে।
লিটনের সফলতা দেখে অনেকে অনুপ্রাণিত হয়েছেন। লিটনের মতো মিশ্র ফল বাগান গড়ে তোলার জন্য আমাদের কাছে অনেকেই পরামর্শ নিতে আসছেন। সে ক্ষেত্রে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে সব ধরনের টেকনিক্যাল সাপোর্ট বা কারিগরি পরামর্শ আমরা কৃষকদের দিয়ে থাকি। বছরব্যাপী ফল বাগান এবং পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের আওয়তায় বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।
ঢাকারিপোর্ট২৪.কম/হাদি/আরএএম