কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে চুয়াডাঙ্গায় জমে উঠেছে পশুহাটগুলো এবং বেড়েছে পশু বেচাকেনা। কোরবানি উপলক্ষে চুয়াডাঙ্গার হাটগুলোতে বাড়ছে ক্রেতা-বিক্রেতাদের ভিড়। তবে পশুর আমদানি বেশি হলেও দাম বেশি হওয়ায় বেচাকেনা তুলনামূলকভাবে কম। অন্যদিকে পশু কিনতে আসা ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মধ্য চলছে দর কষাকষি। চুয়াডাঙ্গা জেলার শিয়ালমারী পশু হাট, ডুগডুগি হাট, মুন্সীগঞ্জ হাট এবং আলমডাঙ্গা পশুহাট ঘুরে এমন দৃশ্য দেখা গেছে। এক সপ্তাহ আগে থেকে চুয়াডাঙ্গার গরু ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যেতে শুরু করেছে। এ জেলায় যে পরিমাণ গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া প্রস্তুত করা হয় তা স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের চাহিদার বড় একটি অংশ পূরণ করে থাকে। জেলার চাহিদার তুলনায় কোরবানীর যোগ্য গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া উদ্বৃত্ত রয়েছে বলে জানান স্থানীয় প্রাণিসম্পদ অধিদফতর। এ অঞ্চলের খামারিরা মূলত শাহীওয়াল ও ফ্রিজিয়ান জাতের গরু লালন পালন করেন। গরুর খাবার হিসাবে দেওয়া হয় খড়, খোল, ঘাস, ভুট্রা, চালের খুদ ইত্যাদি। গরু মোটাতাজাকরণ করার জন্য হরমোন জাতীয় কোন ওষুধ ব্যবহার করেন না খামারিরা।
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রাণী সম্পদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় ছোট-বড় ১১ হাজার ১৬০ টি খামার রয়েছে। এর মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় ১ হাজার ১৯৫টি, আলমডাঙ্গা উপজেলায় ৫ হাজার ১৯৫ টি, দামুড়হুদা উপজেলায় ২ হাজার ৫০৪ টি এবং জীবননগর উপজেলায় ২ হাজার ২৭০ টি। এসব খামারে কোরবাণী উপলক্ষে ১ লাখ ৫০ হাজার ৫৭২টি পশু প্রস্তুত রয়েছে। এর মধ্যে গরু ৩১ হাজার ৮৭১টি, মহিষ ১৩৮টি, ছাগল ১ লাখ ১৭ হাজার ৩৬টি ও ভেড়া ১ হাজার ৫২৭টি। এবার জেলায় কোরবানীর চাহিদা রয়েছে ৮৭ হাজার ৭৯৬ টি। এর মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় ২০ হাজার ৭৪৫ টি, আলমডাঙ্গা উপজেলায় ২২ হাজার ৮২৫ টি, দামুড়হুদা উপজেলায় ১৭ হাজার ৭২৬ টি ও জীবননগর উপজেলায় ২৬ হাজার ৫০০ টি। এবার স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে ৬২ হাজার ৭৭৬ কোরবানীযোগ্য পশু উদ্বৃত্ত থাকবে। তার মধ্যে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় ৭ হাজার ৬২০ টি, আলমডাঙ্গা উপজেলায় ২৪ হাজার ৪৫৭ টি, দামুড়হুদা উপজেলায় ১১ হাজার ৩১৮টি ও জীবননগর উপজেলায় ১৯ হাজার ৩৪১ টি। এসব পশু দিয়ে ঢাকাসহ অন্যান্য জেলায়ও চাহিদা মেটানো যাবে।
জীবননগর উপজেলার অনন্তপুর গ্রামের খামারি আবুল কালাম বলেন, ৩ বছর আগে খামার গড়েছিলাম। খামারে মোট ২০টি গরু রয়েছে। যার মধ্য ১৮ টি গরু কোরবানির বিক্রির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। যদি গরুর দাম বর্তমান বাজারমূল্যে থাকে তাহলে খামারিরা লাভবান হবেন।
একই উপজেলার সেনেরহুদা গ্রামের খামারি রহিম শেখ বলেন, ৫ বছর আগে শখের বশে একটি খামার তৈরি করি। আমার খামারে বর্তমানে ১০টি গরু রয়েছে। যার মধ্য তিনটি গরু বিক্রি করেছি। বাকী গরু ঈদের মধ্য বিক্রির আশা করছি। যদি এমন দাম থাকে তাহলে লাভবান হতে পারবো।
জীবননগর উপজেলার লক্ষ্মিপুর গ্রামের খামারী আবুল বাশার বলেন, ৭০ টি কোরবানী উপযুক্ত গরু ছিলো আমার খামারে। ২০ টি গরু ইতোমধ্যে ১ কোটি ১০ লাখ টাকায় বিক্রি করেছি। এখনও আমার খামারে ৩০ টি গরু আছে। এই গরুগুলো আরো সাইজে বড়। বিক্রি না হওয়া পর্যন্ত বলতে পারছি না লাভ হবে না ক্ষতি হবে। খাবারের দাম গত বছরের তুলনায় এ বছর অনেক বেশি। এলাকায় বিক্রির উপযুক্ত কোরবানীর গরু গত বছরের তুলনায় কম। বেচা-কেনা গত বছরের তুলনায় কম হবে।
আলমডাঙ্গা উপজেলার খামারী হাবেল উদ্দীন বলেন, গত কোরবানীর পর থেকে এ পর্যন্ত ৬০ টি গরু বিক্রি করেছি। ৪-৫টি গরু লোকসানে বিক্রি করেছি। বাকি গরু লাভে বিক্রি হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর কেজিতে খাবারের দাম ১৫-২০টাকা বেশি। প্রতিটি গরুর পেছনে মাসে খাবার বাবদ ১০-১২ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার আলুকদিয়া গ্রামের খামারী লিয়াকত হোসেন বলেন, আমার খামারে ১০ টি গাভী আছে। গরু ১০ টি ১৫ লাখ টাকার মধ্যে বিক্রি হবে বলে আশা করছি।
আলমডাঙ্গা উপজেলার হাঁপানিয়া গ্রামের খামারি সানোয়ার হোসেন জানান, মহামারি করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে গত দুই বছর কোরবানির পশুর হাটগুলো বন্ধ থাকায় ন্যায্য দামে গরু বিক্রি করতে পারিনি। তবে এবছর কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকায় গরু হাটে নিয়ে ভালো দামে বিক্রি করতে পারবো। তাছাড়া পদ্মাসেতু চালু হওয়ায় খুব সহজেই রাজধানীর পশুর হাটে গরু বিক্রি করতে যেতে পারবো। সেখানে ভালো দামও পাওয়া যাবে। কিন্তু ভারত থেকে গরু এলে দেশী গরুর দাম কমে যাবে। ভারতীয় গরু আসা বন্ধ থাকলে এবছর লাভ করতে পারবো বলে আশা করছি।
শিয়ালমারী হাটে পশু কিনতে আসা মোনারুল ইসলাম নামে এক ক্রেতা বলেন, প্রতি বছর খামার থেকে গরু কিনে থাকি। খামার থেকে গরু কিনলে সুবিধা রয়েছে। ঈদ পর্যন্ত গরু খামারে রাখা যায়। বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হয় না। তবে এবছর গরুর দামটা একটু বেশি।
হাটে গরু কিনতে আসা নাসিম উদ্দিন নামে এক ক্রেতা বলেন, কোরবানি করার জন্য মাঝারি গরু খুঁজছি। এবছর গরু প্রতি ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা দাম বেশি মনে হচ্ছে। যেহেতু কোরবানি করতে হবে তাই বেশি দাম দিয়েই গরু কিনতে হচ্ছে।
চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. গোলাম মোস্তফা জানান, জেলায় এবার কোরবানীর জন্য প্রায় ৩২ হাজার ৯ শত গরু ও মহিষ মোজাতাজা করা হয়েছে। চুয়াডাঙ্গার চাহিদা পুরণ করে প্রায় ৬২ শতাংশ গরু দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যাবে। এছাড়াও এবার ১ লাখ ১৮ হাজার ৫৬৩ ছাগল ও ভেড়া কোরবানীর জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। খামারগুলোতে নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত পশু উৎপাদনে খামারিদের প্রাণিসম্পদ বিভাগ থেকে নিয়মিত পরামর্শসহ বিভিন্ন সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে।
জেলার বিভিন্ন হাট ও খামারগুলোতে কোরবানির পশু বিক্রি শুরু হয়েছে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে খামারিদের বিভিন্ন সময় প্রণোদনা দেয়া হয়েছে। খামারীদের পালনকরা পশু ঢাকা-চিটাগাংসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় চাহিদা পূরণ করবে। তিনি আরও বলেন, ভারতের গরু যেন কোনোভাবেই আমাদের দেশে প্রবেশ করতে না পারে সেদিকে আমাদের দৃষ্টি রয়েছে। খামারীরা এবার কোরবানী পশুর ন্যায্যমূল্য পাবেন বলেও জানান তিনি। মহামারি করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে গত দুই বছর লকডাউনে বন্ধ ছিলো জেলার পশুহাটগুলো। এবছর নিষেধাজ্ঞা না থাকায় বেচা বিক্রি চলছে জেলার ৬টি পশুহাটে। সবকিছু ঠিক থাকলে এবছর লাভের মুখ দেখবেন খামারিরা। এছাড়া ফেরিঘাটে ভোগান্তি এড়াতে পদ্মাসেতু দিয়ে কোরবানির পশুবাহী পরিবহণ রাজধানীর পশুহাটে নিতে খামারিদের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।