টাঙ্গাইলের মধুপুরে অবস্থিত দেশের তৃতীয় বৃহত্তম শাল-গজারির বন মধুপুর গড়। মধুপুর শাল, গজারি, রাবার বাগান, কলা, পেঁপে ও আনারসের জন্য সুপরিচিত।
ধারণা করা হয়, বৈদিক যুগ থেকে মধুপুর বনের কাঠ, কলা, আনারসসহ সকল ধরণের মালামাল পরিবহন ও যোগাযোগের ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহারিত হতো ঘোড়ার গাড়ি।
আধুনিক যান্ত্রিক যানবাহনের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে বর্তমানে প্রায় বিলুপ্তির পথে ঘোড়ার গাড়ি! ইঞ্জিনের স্পর্শে আবহমান গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী অনেক যানবাহনই কালপরিক্রমায় পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সময় অতিবাহিত হবার সাথে সাথে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যের ধারক-বাহক অনেক বাহনেরই আমূল পরিবর্তন হয়ে আধুনিকায়ন সাধিত হয়েছে। আবার ঐতিহ্যবাহী অনেক বাহনই হারিয়ে গেছে দৃশ্যপট থেকে।
তেমনি মান্ধাতার আমলে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি ঘোড়ার সাহায্যে চলমান ঘোড়ার গাড়ি বহুবিধ কারণে বর্তমানে হারিয়ে যেতে বসেছে দৃশ্যপট থেকে। কয়েক বছর আগেও দু’চারটি ঘোড়ার গাড়ির দেখা মিললেও বর্তমানে তা যেন ডুমুরের ফুল।
জানা যায়, প্রাচীনকাল থেকে গ্রাম অঞ্চলে বাঁশ দিয়ে তৈরি করা হতো ঘোড়ার গাড়ির অবকাঠামো। গোলাকার করে পেরেক মেরে তৈরি করা হতো তার চাকা। ওই গাড়িকে টেনে নেয়ার কাজে ব্যবহার করা হতো ঘোড়াকে। কালের আবর্তে ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার কমে যেতে থাকলেও এখনও বিশ্বে আধুনিক সকল যানবাহনের জন্য তৈরিকৃত সকল ইঞ্জিনের ক্ষমতাকে ঘোড়ার শক্তি (অশ্বশক্তি) হিসাবে পরিমাপ করা হয়ে থাকে। যে ইঞ্জিনের অশ্বশক্তি (হর্স পাওয়ার) যত বেশি তার পরিবহন ক্ষমতা ও মূল্যও তত বেশি হয়ে থাকে।
প্রাচীনকাল থেকে দেশের গ্রামীণ জনপদের কাঁচা মেঠো পথে যাতায়াত ও মালামাল পরিবহনের ক্ষেত্রে গরুর গাড়ি, মহিষের গাড়ি ও ঘোড়ার গাড়ির বহুল প্রচলণ ছিলো। কিন্তু যখন থেকে বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি দ্বারা চালিত ইঞ্জিন দিয়ে তৈরি যানবাহনের প্রচলন হতে থাকে তখন থেকেই মান্ধাতা আমলের দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরিকৃত ‘ঘোড়ার গাড়ি’র কদর ও ব্যবহার হ্রাস পেতে থাকে।
বর্তমানে দেশের গ্রামীণ জনপদের বেশিরভাগ কাঁচা ও মেঠোপথ/সড়ককে আধুনিকায়ন করা হয়েছে। সড়কে যাতায়াত ও মালামাল পরিবহনের ক্ষেত্রে জায়গা করে নিয়েছে যান্ত্রিক ইঞ্জিন দ্বারা চালিত বাস, মিনিবাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, সিএনজি অটোরিক্সা, অটোভ্যান, ভটভটিসহ ইত্যাদি পরিবহন।
নদীমাতৃক এ দেশের চরাঞ্চলে সড়ক যোগাযোগ ও মালামাল পরিবহনে দু’চারটি ঘোড়ার গাড়ির দেখা মিললেও ক্রমান্বয়ে তাও দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে। ফলে প্রাচীনকাল থেকে সড়ক যোগাযোগে বহুল জনপ্রিয় ও বহুল ব্যবহৃত ‘ঘোড়ার গাড়ি’ বর্তমানে প্রায় বিলুপ্ত হয়ে পড়েছে।
মধুপুর বনাঞ্চল হওয়ায় এখনো এ উপজেলায় ঘোড়ার গাড়ির মত প্রাচীনকালের এই বাহনটি চালান অনেকেই।
উপজেলার শোলাকুড়ী ইউনিয়নের শোলাকুড়ী গ্রামের গ্রামের হাতেম আলী, শারাফত, স্বপন ও ফরহাদ আলীসহ কয়েকজন চালক জানান, আগে আমাদের বাপ-দাদারা এই ঘোড়ার গাড়ি চালাতো। তাই আমরাও এটি চালাই, কিন্তু আগের মত মালামাল বহন করা হয় না। আমরা এখন ঘোড়া বিক্রি করতে পারলে অন্যকাজ করতাম। ঘোড়া বিক্রি হয় না বলে আমরা ঘোড়ার গাড়ি দিয়ে পাহাড়ের কলা, আনারস, আদা, হলুদ ও বানের কাঠসহ কিছু কিছু জিনিস আনা নেওয়ার কাজ পাই। আর তা দিয়ে সংসারের খরচ, ছেলে মেয়ের লেখা পড়ার খরচ চালাই।
শোলাকুড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক এ্যাডভোকেট ইয়াকুব আলী বলেন, একটা সময় ঘোড়ার গাড়ির চাহিদা ছিল। আমাদের মধুপুরের এই পাহাড়ি অঞ্চলে বনের কাঠ, কলা, আনারস, পেঁপে, আদা, হলুদসহ সকল ধরণের পন্য আনা নেওয়া করা হতো ঘোড়ার গাড়িতে করে। এখন দেশ উন্নত হয়েছে, ইঞ্জিন চালিত গাড়ির অভাব নেই। তাই আগের মত ঘোড়ার গাড়ির চাহিদা নেই।
ঢাকারিপোর্ট২৪.কম/এএন/আরএএম