মানুষ সুন্দরের পূজারী, ছেলেদের সৌন্দর্যের অনেকটাই বহন করে তাদের চুল-দাড়ি কাটের ধাঁচের ওপর। তাই দেহে সৌন্দর্য বর্ধনে নরসুন্দর বা নাপিতদের কদর ও প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। আধুনিকতার ছোঁয়ায় বর্তমানে চুয়াডাঙ্গা জেলায় এই পেশা বিলুপ্তির পথে। এখন আর চোখে পড়ে না হাট-বাজার ও গ্রাম-গঞ্জের নরসুন্দর বা নাপিত সম্প্রদায়ের টুলে বা পিঁড়িতে বসিয়ে চুল ও দাড়ি কাটার সেই চিরচেনা দৃশ্য।
চুয়াডাঙ্গায় একটা সময় ছিল, যখন গ্রামে গ্রামে ঘুরে, বিভিন্ন হাট-বাজারে চুল-দাড়ি কাটতেন অসংখ্য নরসুন্দর বা নাপিতরা। এই আধুনিকতার ছোঁয়ায় অর্থাৎ ডিজিটালাইজেশনের মহাত্বে তেমন একটা দেখা মিলে না। সময়ের পরিক্রমায় নাপিতরা তাদের পেশা বদল করতে বাধ্য হচ্ছেন।
কালের বিবর্তনে ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন নরসুন্দর বা নাপিত পেশা বর্তমানে শহর-বন্দর ও গ্রামের হাট-বাজারগুলোতে রয়েছে এসি ও নন-এসি সেলুন। সে সব সেলুনে চুল-দাড়ি কাটার জন্য রয়েছে আধুনিক যন্ত্রপাতি ও মেশিন। মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতিতে আধুনিকতার ছোঁয়ায় হাটে টুল বা পিঁড়িতে বসে মানুষ আর চুল-দাড়ি কাটতে চায় না। এছাড়া সেলুনগুলোতে উন্নতমানের প্রসাধনী ব্যবহারের ফলে বহুকালের ঐতিহ্যগত চুলকাটার কারিগর প্রথাগত নাপিতের খুব কমই দেখা যায় হাটে-ঘাটে, গ্রামাঞ্চলে। অনেকেই পিঁড়িতে বসে চুল কাটতে লজ্জাবোধ করেন, অথচ সেই ছোটবেলায় বাবার হাত ধরে কে না গিয়েছে নিকটতম গঞ্জের হাটে পিঁড়িতে বসে চুল কাটতে। আবার কিছু ছিল গ্রামে গ্রামে বিভিন্ন গৃহস্থবাড়িতে গিয়ে চুল-দাড়ি কাটতো এবং মৌসুমে মৌসুমে তার বিনিময়ে ধান নিত।
বুধবার সরেজমিনে জীবননগর উপজেলার ধোপাখালী ও উথলী হাটে গিয়ে কয়েক জন বয়োজ্যেষ্ঠ নরসুন্দরের সঙ্গে কথা হলে তারা জানান, এখন চুল-দাড়ি কাটতে ১৫-২০ টাকা নেয়। তবুও এখন আর আগের মতো হাটে কাজ হয় না। আধুনিকতা ও অর্থনৈতিক উন্নতির ফলে মানুষ হাটে এসে পিঁড়িতে বসে চুল-দাড়ি কাটতে চায় না। এত কম দামেও চুল-দাড়ি কাটার মানুষ পাওয়া যায় না। আগের মতো আয় রোজগার হয় না।
নাপিত মনোরুদ্দিন জানান, তিনি প্রায় ৫০ বছর ধরে বিভিন্ন হাট-বাজারে, গ্রামে-গঞ্জে ঘুরে নরসুন্দরের কাজ করেন। সারা দিনে যা উপার্জন হয় তা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
শুরুতে ৩ টাকায় চুল, ২ টাকা দাড়ি-গোঁফ কাটতেন, তখনই ভালো আয় রোজগার হতো আর এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বাড়লেও সারা দিন ঘুরে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরেন রোজগার ভালো হয় না। তিনি বহু বছরের ঐতিহ্য বাপ-দাদার পেশাটা ছাড়তে পারছেন না। তাদের যন্ত্রাংশ একটি বাজারের ব্যাগে ভরে নিয়ে ঘুরে বেড়ান গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। নরসুন্দর রবিউল আলম জানান, গ্রামে-গঞ্জে কাজ করলে সকল বয়সের প্রিয় মানুষের দেখা মিলে যা এই বৃদ্ধ বয়সে মনের প্রশান্তি আনে। অন্য পেশায় যাওয়ার কোনো উপায় নেয়। অর্থাভাবে ভালো একটি সেলুনের দোকান দিতেও পারছেন না তিনি। ফলে সময়ের চাহিদা অনুযায়ী তাল মেলাতে না পারায় অনেকাংশেই বিলুপ্ত এই নাপিত সম্প্রদায়। যার কারণে গ্রাম-বাংলার শ্রমজীবী ও নিম্ন আয়ের খেটে খাওয়া মানুষ অল্প টাকায় তাদের চুল-দাড়ি কেটে পরিষ্কার হওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদের বেশি টাকার বিনিময়ে শহরের চাকচিক্যময় সেলুন নামের কাচঘেরা গদি আটাচেয়ারের বিউটি সেলুনে। আদিকালের নাপিতের দুঃখ-কষ্টের কথা কেউ শুনে না। এই পেশায় আয় কমে যাওয়ায় দিন দিন অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন এ পেশার অনেকেই। এই পেশাকে টিকিয়ে রাখতে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন অনেকেই।
ঢাকারিপোর্ট২৪.কম/জাক/আরএএম