চুয়াডাঙ্গার জীবননগরে টিসিবির পণ্য তালিকা তৈরিতে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। নিম্ম আয়ের মানুষের সুবিধাকে পাশ কাটিয়ে বিত্তশালীদের প্রাধান্য দেয়া হয়েছে তালিকায়। উপজেলা প্রশাসন নিজেদের পছন্দের লোকজনকে এই সুবিধা দিয়েছেন এমন অভিযোগ তুলেছেন খোদ জীবননগর পৌর মেয়র রফিকুল ইসলাম।
মেয়র রফিকুল ইসলাম বলেন, সরকার নিম্ন আয়ের মানুষের মাঝে স্বল্প দামে পণ্য বিক্রির জন্য টিসিবি সুবিধা নিশ্চিত করেছে। যাতে সাধারণ মানুষ লাগামহীন দ্রব্য মূল্যের বাজারে ন্যায্য দামে নিম্ন আয়ের মানুষ পণ্য কিনতে পারে। অথচ টিসিবির পণ্য সেবা গ্রহিতাদের তালিকায় নাম ওঠেছে বিত্তশালীদের। যাদেরকে ওই তালিকায় শ্রমিক অথবা দিন মজুর দেখানো হয়েছে।
মেয়র বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোবাইল ফোনে তার কাছ থেকে সুবিধা ভোগীদের নাম চান। প্রথম পর্যায়ে ১ হাজার ১০০ ব্যক্তির নাম পাঠাতে বলা হয়। পরবর্তীতে আবারও ৬১৫ ব্যাক্তির তালিকা চাওয়া হয়। অথচ পৌর এলাকায় পণ্য বিতরণের তালিকায় ৩ হাজার ২৪০ জনের নাম সংযোজন করা হয়েছে। যাদের মধ্যে বেশির ভাগ বিত্তশালী ও স্বচ্ছল পরিবারের সদস্য।
টিসিবির তালিকায় দেখা যায়, জীবননগর পৌরসভার কনস্ট্রাকশন (ঠিকাদার) ব্যাবসায়ী মেসার্স জাকা উল্লাহ এন্ড ব্রাদার্সের স্বত্তাধিকারী জাকা উল্লাহর নাম। তিনি চলতি বছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে আইকর জমা দিয়েছেন ১০ কোটি ৬৭ লাখ ৩২ হাজার ৯৮৬ টাকা। ভ্যাট ও আয়কর মিলে ৩০ কোটি ৬০ লাখ টাকা জমা দিয়েছেন।সম্প্রতি টিসিবির পণ্যের তালিকায় তার নাম রয়েছে। শুধু তার নয় পুরো পরিবারের নাম ওই তালিকায় স্থান পেয়েছে। তবে ঠিকাদার জাকা উল্লাহ টিসিবির পণ্য তালিকায় তার নাম থাকার বিষয়ে কিছুই জানেন না বলে দাবি করেন।তিনি বলেন, আমার ইট ভাটার শ্রমিকদের জন্য পণ্য দিতে তিন মাস আগে টিসিবি ডিলার সাগর কুমারকে বলেছিলাম। তাতে আমার শ্রমিকদের নামে পণ্য তালিকায় নাম থাকতে পারে। কিন্তু ওই তালিকায় আমার নাম থাকবে কেন?
পৌর কাউন্সিলর আবুল কাশেম বলেন, টিসিবির পণ্য বিতরণ কার্যক্রমে নতুন করে হালনাগাদ তালিকা করা হয়েছে। পৌর মেয়র ও কাউন্সিলরদের সুপারিশ না নিয়ে এলাকার বিত্তশালীদের নাম ওই তালিকায় দেখা যাচ্ছে। এদের মধ্যে ঠিকাদার, ব্যবসায়ীসহ বিত্তবান শ্রেণির মানুষকে শ্রমিক সাজানো হয়েছে। এটার সঠিক তদন্ত হওয়া দরকার। জীবননগর বাজারের স্টেশনারিজ ব্যবসায়ী শ্রী সুসান্ত কুমার। পাইকারি ও খুচরা স্টেশনারীজ মালামাল বিক্রি করেন। এলাকায় বিত্তবান ব্যক্তিদের মধ্যে তিনিও একজন।
টিসিবি কার্ড আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি অকপটে স্বীকার করে বলেন, ইউএনও অফিসে জন্ম নিবন্ধন কাগজ দিয়ে এসেছিলাম। পরে দেখি কার্ড হয়ে গেছে। মালামাল দিলে পণ্য নিয়ে আনা হয়।
জানা গেছে, জীবননগর উপজেলায় টিসিবি কার্ডধারী ১২ হাজার ৫২১ টি পরিবার রয়েছে। এর মধ্যে পৌরসভায় ৩ হাজার ৩২৬ টি কার্ড। উথলী ইউনিয়নে ৯৫৮ টি, আন্দুলবাড়ীয়া ইউনিয়নে ১ হাজার ১৬৩ টি, বাঁকা ইউনিয়নে ১ হাজার ৩০৫ টি, সীমান্ত ইউনিয়নে ১ হাজার ৫৭২ টি, হাসাদহ ইউনিয়নে ৭৪৭ টি, রায়পুর ইউনিয়নে ৭৮৩ টি, মনোহরপুর ইউনিয়নে ১ হাজার ৩৪৬ টি ও কেডিকে ইউনিয়নে ১ হাজার ৩২১ টি কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। টিসিবি পণ্য তালিকায় শ্রমিক আবার দিন মজুর পরিচয় দেখিয়ে বিত্তবানদের নাম রয়েছে। আবার একই পরিবারে একাধিক ব্যাক্তির নাম তালিকায় ঠাঁই পেয়েছে।
টিসিবি ডিলার সাগর কুমার বিশ্বাস জানিয়েছেন, টিসিবি পণ্য বিতরণে এর আগে কোন তালিকা উপজেলা প্রশাসন আমাদের দেয়নি। শুধুমাত্র এনআইডি কার্ডধারী ব্যক্তিদের মধ্যে পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদে পণ্য বিতরণ করা হত। উপজেলা প্রশাসনের কাছে সুবিধা ভোগীদের কোন তালিকা ছিল না। যে কারণে একই ব্যাক্তির একাধিক নামে টিসিবি সুবিধা নিতেন।
তিনি আরও বলেন, গতমাসে নবাগত ইউএনও টিসিবির পণ্যের তালিকা প্রস্তুত করে ডিলারদের কাছে হস্তান্তর করেছেন। এখন থেকে কার্ডধারী ব্যাক্তিকে নিজের আইডি কার্ডের ফটোকপি সাথে আনলে পণ্য পাবেন।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, তৎকালীন সময়ে ইউএনও আরিফুল ইসলাম আমাকে যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন আমি তা পালন করেছি মাত্র। আসলে এটা বাণিজ্য মন্ত্রনালয় দপ্তরের কাজ। তবে দ্রুত সময়ে বাস্তবায়নে পূর্ণাঙ্গ তালিকা করা সম্ভব হয়নি। নতুন কর্মস্থলে যোগদান করা ইউএনও রোকুনুজ্জামান টিসিবির তালিকা না পেয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে পূর্বের সুবিধা ভোগীদের নাম হালনাগাদ তালিকা তৈরি করেছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রোকুনুজ্জামান জানান, দুইমাস আগে এই উপজেলায় যোগদানের পর টিসিবির পণ্যের সুবিধা ভোগীদের কোন তালিকা পাইনি। এক ব্যাক্তির একাধিক নামে পণ্য সুবিধা নিতেন। এসব কারণে প্রকৃত ব্যাক্তিরা যাতে সরকারের এই সুবিধা পান তা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন একটি তালিকা প্রস্তুত করেছে। এর মধ্যেও যদি কোন গড়মিল দেখা যায় তা সংশোধনের সুযোগ রয়েছে।