বাংলা কাব্যে আধুনিকতার পথিকৃত ও বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র জীবনানন্দ দাশ ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ ফেব্রুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির (বর্তমানে বাংলাদেশ) অন্তর্গত বরিশাল শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্ব পুরুষগণ বাংলাদেশের ঢাকা জেলার বিক্রমপুর পরগণার নিবাসী ছিলেন। পিতামহ সর্বানন্দ দাশগুপ্ত (১৮৩৮-৮৫) বিক্রমপুর থেকে বরিশালে স্থানান্তরিত হন। জীবনানন্দ দাশের পিতার নাম সত্যানন্দ দাশ। তিনি ছিলেন বরিশাল ব্রজমোহন স্কুলের শিক্ষক, প্রাবন্ধিক, বরিশাল ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক এবং ব্রাহ্মসমাজের মুখপত্র ব্রাহ্মবাদী পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক। জীবনানন্দের মাতা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন গৃহিণী, কিন্তু তিনি কবিতা লিখতেন। তাঁর সুপরিচিত কবিতা “আদর্শ ছেলে” (আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে, কথায় না বড় হয়ে কাজে বড়ো হবে) আজও শিশুদের জন্য পাঠ্য। জীবনানন্দ ছিলেন পিতামাতার জ্যেষ্ঠ সন্তান; তাঁর ডাকনাম ছিল মিলু।
১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারিতে আট বছরের জীবনানন্দকে ব্রজমোহন বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে ভর্তি করানো হয়। বিদ্যালয়ে থাকাকালীন তাঁর বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় রচনার সূচনা হয়। এছাড়া সে সময়ে তাঁর ছবি আঁকার দিকেও ঝোঁক ছিল। ১৯১৫ খ্রিষ্টাব্দে ব্রজমোহন বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন (বর্তমানে মাধ্যমিক বা এসএসসি) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। দু'বছর পর ব্রজমোহন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট (উচ্চ মাধ্যমিক) পরীক্ষায় আবারও প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। অতঃপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজী সাহিত্যে অনার্সসহ বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি আইন বিষয়ে পড়া শুরু করেন। কিন্তু আইন বিষয় তাঁকে আকৃষ্ট না করায় অচিরেই আইন বিষয়ে পড়া পরিত্যাগ করেন। ১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে জীবনানন্দ কলকাতার সিটি কলেজে টিউটর হিসেবে অধ্যাপনা শুরু করেন।
মা কুসুমকুমারী দাশের প্রভাব ও অনুপ্রেরণায় জীবনানন্দ দাশ ছেলেবেলায় কবিতা লিখতে শুরু করেন। ১৯১৯ সালে তার লেখা প্রথম কবিতা “বর্ষা আবাহন ” প্রকাশিত হয়। তখন তিনি শ্রী জীবনানন্দ দাশগুপ্ত নামে লিখতেন। পরবর্তীতে ১৯২৭ সাল থেকে জীবনানন্দ দাশ নামে লিখতে শুরু করেন। ১৬ জুন ১৯২৫ দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এর লোকান্তর হলে তিনি 'দেশবন্ধুর প্রয়াণে' শিরোনামে একটি কবিতা লিখেছিলেন যা বঙ্গবাণী পত্রিকার ১৩৩২ সনের শ্রাবণ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। তবে দীনেশরঞ্জন দাস সম্পাদিত কল্লোল পত্রিকায় ১৩৩২ (১৯২৬ খ্রি.) ফাল্গুন সংখ্যায় তার “নীলিমা” শীর্ষক কবিতাটি প্রকাশিত হলে আধুনিক বাংলা কবিতা অঙ্গনে অনুপ্রবেশ হয়। জীবদ্দশায় প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ঝরাপালক, ধূসরপান্ডুলিপি, বনলতা সেন, মহাপৃথিবী, সাতটি তারার তিমির ইত্যাদি।
কবি নিজেই নিজ রচনার কড়া সমালোচক ছিলেন। তাই সাড়ে আট শত কবিতার বেশি কবিতা লিখলেও তিনি জীবদ্দশায় মাত্র ২৬২টি কবিতা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ও কাব্যসংকলনে প্রকাশ করতে দিয়েছিলেন। মৃত্যুর পর “রূপসী বাংলা“ ও “বেলা-অবেলা কালবেলা” কাব্যগ্রন্থ দুটি প্রকাশিত হয়। অর্থের প্রয়োজনে তিনি কিছু প্রবন্ধ লিখেছিলেন ও প্রকাশ করেছিলেন। তবে নিভৃতে গল্প এবং উপন্যাস লিখেছিলেন প্রচুর যার একটিও প্রকাশের ব্যবস্থা নেননি। এছাড়া ষাট-পয়ষটিট্টিরও বেশি খাতায় "লিটেরেরী নোটস" লিখেছিলেন যার অধিকাংশ এখনও প্রকাশিত হয়নি।
জীবনানন্দ দাশ প্রধানত কবি হলেও বেশ কিছু প্রবন্ধ-নিবন্ধ রচনা ও প্রকাশ করেছেন। তবে ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে মৃত্যুর পূর্বে তিনি ২১টি উপন্যাস এবং ১২৬টি ছোটগল্প রচনা করেছিলেন যার একটিও তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়নি।
বাংলার রূপ আমি দেখিয়াছি তাই পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে চাহিনা আর- বিংশ শতাব্দীর অন্যতম ও স্বতন্ত্র ধারার কবি জীবনানন্দ দাশ বাংলা প্রকৃতির নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যে মোহিত হয়েছিলেন। আর তাই সকল কাব্য গ্রন্থে গ্রাম বাংলার সবুজ, শ্যামল নির্মল প্রকৃতির স্বর্গীয়রূপ বিচিত্র বর্ণে অঙ্কন করে “রূপসী বাংলার” কবি হিসাবে খ্যাতি অর্জন করতে সমার্থ হয়েছিলেন। আর সমালোচকদের দৃষ্টিতে তিনি রবীন্দ্র, নজরুল পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের প্রধান কবি হিসাবে স্বীকৃতি অর্জন করেছিলেন। বাংলা সাহিত্যের এই লেখক শুধু কাব্য গ্রন্থ নয় প্রবন্ধ রচনাও ছিলেন সিদ্ধহস্ত। বাংলা প্রকৃতির শুদ্ধতম প্রেমী ও নৈসর্গিক সৌন্দর্যে বিমোহিত কবি জীবনানন্দ দাশের জন্মদিনে সশ্রদ্ধ শ্রদ্ধার্ঘ্য।