ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী চলতি সপ্তাহে ইরাকের ভূখণ্ড ব্যবহার করে সৌদি আরবে হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছেন সৌদি আরব ও তাদের আঞ্চলিক মিত্রদের দুটি সূত্র। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করেই এসব হামলা পরিচালনা করা হয়েছে, যা ইরান-সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে ক্রমবর্ধমান সমন্বয়ের ইঙ্গিত দেয়। খবর রয়টার্সের।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সূত্রগুলোর মূল্যায়ন সরকারি বক্তব্যের সঙ্গে ভিন্ন। তাদের মতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের ইসরায়েলে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক অভিযানের মুখেও ইরানের প্রতিরোধ অক্ষভুক্ত গোষ্ঠীগুলো নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক আরও জোরদার করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের ক্ষতিগ্রস্ত করার সক্ষমতাও বাড়িয়েছে।
সাম্প্রতিক হামলার মধ্যে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের তেল স্থাপনাগুলোও লক্ষ্যবস্তু ছিল। অঞ্চলটি দেশটির অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের প্রধান কেন্দ্র
এসব হামলার জবাবে বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যৌথভাবে ইরাকের কয়েকটি স্থাপনায় বিমান হামলা চালায় সৌদি আরব। সৌদি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছে। অন্যদিকে হুথিরা দাবি করেছে, হামলাগুলো তারাই চালিয়েছে। এ ঘটনায় তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে ইরাক।
তবে আঞ্চলিক সূত্রগুলোর দাবি, কয়েকটি হামলা ইরাকের ভূখণ্ড থেকেই হুথি ও ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যৌথভাবে পরিচালনা করেছে এবং পুরো কার্যক্রম তদারকি করেছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির গবেষক ফারিয়া আল-মুসলিমি বলেন, এখন শুধু ইরানের সঙ্গে নয়, প্রতিরোধ অক্ষভুক্ত গোষ্ঠীগুলোর নিজেদের মধ্যেও সরাসরি প্রশিক্ষণ ও সমন্বয় গড়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে সৌদি আরব, ইরান ও ইরাক সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি। হুথিরাও মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। তবে তারা আগেই জানিয়েছে, ইয়েমেনে সৌদি হামলার জবাব এবং সৌদি আরবের আরোপিত অবরোধ ভাঙতেই তারা এসব হামলা চালাচ্ছে। সৌদি আরব অবশ্য অবরোধের অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, চলতি বছর হুথি-নিয়ন্ত্রিত বন্দরে ইতোমধ্যে কয়েক ডজন জাহাজ পৌঁছেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হুথি ও ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে। বিশেষ করে ইরাকের সবচেয়ে সুসংগঠিত ও ভারী অস্ত্রে সজ্জিত গোষ্ঠী কাতাইব হিজবুল্লাহর সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালে হুথি নেতা আবদুল মালিক আল-হুথি হুথি ও ইরাকি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যৌথ অভিযানকক্ষ গঠনের ঘোষণা দেন। পরে ওই বছরই দুই পক্ষ ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে প্রথম যৌথ হামলার দাবি করে।
ইরাকে হুথিদের স্থায়ী উপস্থিতিও রয়েছে। দেশটিতে তাদের কার্যালয় ও আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধি আহমেদ আল-শারাফি ইরান-সমর্থিত শিয়া রাজনৈতিক দল ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে প্রকাশ্যে একাধিক বৈঠক করেছেন।
বাগদাদের বিভিন্ন স্থানে বহু বছর ধরে হুথিদের সারখা স্লোগানসংবলিত লাল-সবুজ পোস্টার টাঙানো রয়েছে। ওই স্লোগানে লেখা থাকে, আল্লাহ মহান, আমেরিকার মৃত্যু হোক, ইসরায়েলের মৃত্যু হোক, ইহুদিদের ওপর অভিশাপ, ইসলামের বিজয় হোক।
বিশ্লেষকদের মতে, বিস্তীর্ণ ভৌগোলিক এলাকা ও উন্মুক্ত মরুভূমির কারণে ইরাক হুথি ও অন্যান্য ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীর জন্য নিরাপদ আশ্রয় এবং গোপনে হামলা চালানোর উপযুক্ত স্থান।
সৌদি আরবের সঙ্গে ইরাকের ৮০০ কিলোমিটারের বেশি সীমান্ত পুরোপুরি নজরদারির আওতায় রাখা কঠিন। ফলে সৌদি আরব ও উপসাগরীয় অন্যান্য দেশে হামলার জন্য এটি একটি কার্যকর ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
গত কয়েক বছরে কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে শত শত হামলার জন্য ইরাকভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কর্মকর্তারা। এর মধ্যে গত মার্চে রিয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে দুটি ড্রোন হামলা এবং মে মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বারাকাহ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার ঘটনাও রয়েছে।
ইরাক সরকার বারবার বলেছে, তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে প্রতিবেশী আরব দেশগুলোতে হামলার অভিযোগ তদন্ত করা হবে। তবে সমালোচকদের মতে, এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে বাগদাদ খুব কমই সক্ষম হয়েছে, যা উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরাকের সম্পর্ক ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
সৌদি আরবে হামলার পর ইরাকে সৌদি বিমান হামলার জেরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদি বৃহস্পতিবার যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠকের জন্য সৌদি সফর বাতিল করেন।
আলি আল-জাইদি সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ সব ধরনের অস্ত্র রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। যদিও ইরাকের কয়েকটি সশস্ত্র গোষ্ঠী এ পরিকল্পনার বিরোধিতা করছে। সূত্র : রয়টার্স
ঢাকারিপোর্ট২৪.কম/জাক/আরএএম