কথিত আছে তরমুজের ব্যবসা করতেন ফেরাউন। ফেরাউনের যুগে সাধারণ মানুষ যেনো তরমুজ কিনতে না পারেন সে জন্য কেজি দরে বিক্রি হতো তরমুজ। এই কথিত কথার সত্যতা যাই হোক কেজি দরে তরমুজ বিক্রি করায় এর স্বাদ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ খেটে খাওয়া নিম্ন আয়ের মানুষ।
তরমুজের বর্তমান বাজার দরের সাথে নিম্ন সাধারণ মানুষের আয়ের কোনো সংগতি না থাকায় তারা রমজান মাসেও তরমুজ কিনে খেতে পারছেন না। কারণ কেজি দরে তরমুজ বিক্রি হলেও এক কেজি পাওয়া যায় না। এতে তারা কিনতেও পারেন না। বিশেষ করে রমজানে রসালো ফলের চাহিদা থাকে বেশি। রসালো ফলের মধ্যে অন্যতম তরমুজ। যার কারণে এবার রমজানে তরমুজের চাহিদার সাথে দামও বেশি। বিশেষ করে ৫০ থেকে ৭০ টাকা পিস হিসাবে বিভিন্ন জেলা থেকে তরমুজ এনে রাজশাহীতে সেটি বিক্র করা হচ্ছে দুই থেকে তিনশ টাকায়।
এবার চৈত্রের প্রথম থেকে রাজশাহীর প্রকৃতিতে কাঠফাটা রোদ ও ভ্যাপসা গরম। এমন অস্বস্তিময় সময়ের মধ্যেই শুরু হয় রমজান মাস। সারাদিন সিয়াম সাধনার পর ইফতারে তৃপ্তি মেটাতে অধিকাংশ মানুষই কিনছেন তরমুজ। বাড়তি চাহিদার কারণে তরমুজের দামও কিছুটা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
এবার রাজশাহী শহরে প্রায় ২শ’ টির বেশি খুচরা ও পাইকারি তরমুজ ব্যবসায়ী রয়েছে। এর মধ্যে শালবাগানে পাইকারি তরমুজের আরত রয়েছে ৭টি ও খুচরা দোকান ৮টি। রাজশাহীতে যে তরমুজ আমদানি হয় তা মূলত বরিশাল ও পটুয়াখালী থেকে। বর্তমান রাজশাহী নগরীতে দুই জাতের তরমুজ পাওয়া যাচ্ছে।
এরমধ্যে রয়েছে বাংলালিংক, হলুদ তরমুজ ও জাপানি জাতের কালো সিটিসেল জাতের তরমুজ। এবার অন্য বছরের তুলনায় বাজারে তরমুজ অনেক কম। বাজারে ৫ থেকে ১২ কেজি পর্যন্ত ওজনের তরমুজ রয়েছে। এসব তরমুজের দাম কেজি প্রতি বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৫৫ টাকায়। অন্যদিকে ৫ কেজি ওজনের চেয়ে কম তরমুজগুলো কেজি প্রতি বিক্রি হচ্ছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়। বাংলালিংক ও জাপানি কালোজাতের উভয়ের দামই একই হলেও হলুদ তরমুজগুলো বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা কেজি দরে।
তরমুজ ব্যবসায়ীদের ভাষ্যমতে, মার্চের শুরুর দিকে রাজশাহীর বাজারে তরমুজ উঠলেও প্রথম দিকে তুরমুজের তেমন চাহিদা ছিল না। কিন্তু রমজানের প্রথম থেকেই তরমুজের চাহিদা বেড়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা জানান, আগে যেখানে দিনে ৪০ থেকে ৫০ টি তরমুজ বিক্রি হতো। এখর রমজান পড়ার পর থেকে বিক্রি ডাবল হয়ে গেছে। ইফতারের আগ মূহুর্ত পর্যন্ত পর্যন্ত বেচাবিক্রি বেড়ে যায় তিনগুণ। মূলত গরমে দিনশেষে ইফতারে তৃপ্তি পেতে লোকজন তরমুজের দিকে বেশি ঝুকে পড়েন।
এদিকে ক্রেতাদের অভিযোগ রমজান মাস আসার পর তরমুজের ওপর মানুষের চাহিদা বেশি হওয়ায় বিক্রেতারা ইচ্ছাকৃতভাবেই তরমুজের দাম বাড়িয়েছে। সপ্তাহ দেড়েক আগেই বড় তরমুজ বিক্রি হচ্ছিল ৪৫ টাকায় আর ছোট তরমুজগুলো ছিল ৪০ টাকায়। এখন এসব তরমুজই বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি দরে। শালবাগানে তরমুজ কিনতে আসা আরিফুর রহমান নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘রোজার এক সপ্তাহ আগেই বড় তরমুজ কিনেছি ৪০ টাকায়।
এখন সেই তরমুজ ১০ টাকা কেজিপ্রতি বেশি কিনতে হচ্ছে।’ সাহেব বাজারে তরমুজ কিনতে এসেছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান নামের এক বৃদ্ধ। তিনি বলেন, একসময় এই তরমুজ আমরা পিস হিসেবে কিনে খেয়েছি। আর এখন কেজিপ্রতি কিনতে হচ্ছে। তরমুজের খোসার ওজনই তো অর্ধেক। সে হিসেবে কেনো এসব ফল কেজি দরে বিক্রি হবে? সরকারের এদিকে নজর দেওয়া উচিৎ।
দাম বৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে তরমুজ ব্যবসায়ী আমির হোসেন বলছেন, এক সপ্তাহ আগেও আমরা পাইকারি তরমুজ কিনেছি ১৫০০ থেকে ১৬০০ টাকা মন। আর ছোট তরমুজগুলো ছিল ১৩০০ থেকে ১৪০০ টাকায়। কিন্তু এখন সেই তরমুজই মনপ্রতি কিনতে হচ্ছে ১৭০০ থেকে ১৮০০ টাকায়। আমরা যদি কম টাকায় মাল পাই তবে কমেই বিক্রি করতে পারবো। কিন্তু দাম বেশি পড়লে তো খরচ অনুসারে সামান্য বাড়াতেই হবে। তাঁর দাবি, দাম বৃদ্ধির জন্য মূলত মধ্যসত্ত্বভোগীরা দায়ী। তারা কৃষকদের কাছে থেকে কম দামে কিনে হাত বদল করে আমাদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করছেন। আমরা যে দামে কিনতে তার থেকে সব খরচ বাদ দিয়ে দিলে ২ থেকে ৩ টাকা লাভে বিক্রি করছি।
তরমুজের বাজার নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর রাজশাহী জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক অপুর্ব অধিকারী বলেন, রাজশাহী অঞ্চলের মধ্যে কোন ব্যবসায়ী যদি সাধারণ একজন ভোক্তার অধিকার ক্ষুন্ন করেন তবে অবশ্যই আমরা তার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিবো।
তবে কৃষি পণ্য ও বিপনন থেকে তরমুজের কেজিপ্রতি নির্দিষ্ট মূল্য না থাকায় এবিষয়ে নির্ণয় করা আমাদের জন্য জটিল। তবে কেউ বাজার মূল্যের চাইতে অধিক মূল্যে তরমুজ বিক্রি করলে অবশ্যই পদক্ষেপ নিবো। এছাড়াও প্রতিটি দোকানদারকে বিক্রির চার্ট টাঙ্গীয়ে তরমুজ বিক্রি করার নিদের্শ দেয়া হয়েছে।
ঢাকারিপোর্ট২৪.কম/এনআই/আরএএম